লোক ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-১৩

লোকবিজ্ঞানীরা মনে করেন লোকসংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি মূল যাদু বা ‘Magic'। এ যুক্তির পিছনে কাজ করে মানবজাতির বিকাশের ধারায় প্রাচীন ধ্যান ধারণা, বিশ্বাস ও আস্থা। প্রায় ৫ হাজার বছরের সভ্যতায় সেকালের মানুষের কল্পনায় যে বিশ্বাস ও আস্থা তা এ কালের মানুষের না থাকাটাই স্বাভাবিক। জীবন, জীবিকা, প্রকৃতি আর প্রাকৃতিক ঘটনার বিষয়ে বর্তমান মানব জাতি একটি সম্যক ধারণায় উপনীত হয়েছে। তৎকালীন মানুষের ভয়মিশ্রত সাধারণ দেখাই ছিল বিশ্বাস। ঝড়ের শক্তিতে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে যায়, সূর্যের প্রখর তাপে শরীর দগ্ধ হয়। এ সব থেকেই প্রকৃতির মধ্যে অলৌকিক শক্তির বিশ্বাস মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো সৃষ্টি করে। ভয় অলৌকিক বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় ‘Magicla' শক্তির উপর বিশ্বাস। মানব মানবীর আদলে এ সব অদৃশ্যলোকের মানব মানবী একেবারে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে আশ্রয় নেয়। অদৃশ্যলোকের দেবতা যাদু শক্তির ব্যবহার মানুষের মনে দানা বাঁধে। এভাবেই যাদু, তন্ত্র, মন্ত্র, ঝাড় ফুঁকের প্রভাব সমাজে বিস্তার লাভ করে। একালের মানুষ ও যাদু, মন্ত্র ইত্যাদি থেকে মুক্ত নয়।

বর্তমান সংস্কৃতিতে এর মূল্য কতটুকু? এ সব যাদু বিশ্বাসের সাথে কার্যকরণ বিধির মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। তা সত্ত্বেও মানুষ বিরাটাকার প্রাণশক্তিতে বিশ্বাসী। যা অলৌকিক শক্তির প্রভাব সৃষ্টি করে। যাদুর এ প্রভাব ধীরে ধীরে মানুষের প্রাণ শক্তিতে রুপ নেয়। যাদুবিদ্যার উপাদান মন্ত্র, আচার অনুষ্ঠান ও বিধি নিষেধের মাধ্যমে বর্বর মানুষ ভাগ্য, দুর্ঘনা, ভয়, জয়, পরাজয় নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আজও মানুষ যুক্তি ও বিজ্ঞানের পদ্ধতিতে অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে লোকসমাজে নানা বিশ্বাসে যে শেকড় আঁকড়ে আছে তার প্রভাব থেকে লোকসমাজ আজও মুক্ত নয়।

মন্ত্র : মন্ত্রের কোনো যান্ত্রিক কৌশলের ভিত্তি নেই। কেবল কিছু ছন্দ বাক্য বা কথা ব্যবহার করে বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে ব্যবহার করা হয়। সর্প দংশন, ককুরের কামড়, কাঁটা বেধা, রোগ ব্যাধির নিরাময় এসকল বিষয়ে মন্ত্র পাঠ করা হয়। রাজবাড়ি জেলার মধ্যে মন্ত্র ব্যবহারের রীতি বিশেষভঅবে প্রচলিত আছে।

ওঝা, গুনিণ : সর্প দংশন, কুকুরের দংশন কাঁটা বেধা বিষয়ে যারা মন্ত্র পাঠে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ওঝা বলে। এরুপ অনেক ওঝা, গুনিণ এ জেলায় রয়েছে।

তাবিজ-কবজ, পানিপড়া : রোগব্যাধি বালা মুসিবত থেকে মুক্তির জন্য তাবিজ কবজ, পানিপড়া দেওয়া হয়। আমাদের দেশে গুনিণ ও পীর বলে যারা পরিচিত তারা এ কাজ করেন। এছাড়া বর্ষীয়ান ইমাম, মোল্লা, মুসল্লীগণ এ ধরণের ব্যবস্থা দিয়ে থাকেন।

চটা চালান, বাটি চালান, হাত চালান, চালপড়া : কারো টাকা, গহনা বা জিনিস হারিয়ে গেলে বা চোর সিঁধ কেটে চুরি করলে চটা, বাটি, হাত চালান দেওয়ার রীতি এ অঞ্চলে চালু আছে। এ ছাড়া বাসার মধ্যে কোনোকিছু হারিয়ে গেলে আশেপাশের সন্দেহজনক মানুষকে চালপড়া পাওয়ানো হয়।

বানমারা, শর--নিক্ষেপ, বাড়ি বন্ধ, ঘরবন্ধ, নষ্ট করা : কোপ কুদৃষ্টি এ বিষয়গুলি পুরোপুরি যাদু প্রভাবিত। ব্যবসা নষ্ট করা এমনকি হত্যা করার জন্য বান মারা হয়। এ বিষয়ে প্রচলিত আছে যার উপর বান মারা হয় তার শরীর জ্বালাপোড়া করে, ফোসফা পরে ইত্যাদি। এছাড়া আপদ বালাই থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য বাড়ি বন্ধের রেওয়াজ আছে। ছোট শিশুকে নাকি মাথার চুল কেটে বা শিশুর মায়ের কাপড় কেটে নিয়ে শিশুকে নষ্ট করা যায়।

প্রেম ছিটা : প্রেমের ব্যাপারে পাত্র/পাত্রীকে গুণিন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এ বিশ্বাস চালু আছে। অনেক সময় ঘরের বধু পরপুরুষের প্রতি আসক্ত হলে বা প্রেমিকের সাথে ঘর থেকে বের হয়ে গেলে ‘ছিটা দেওয়া ‘ হয়। জ্বীনের আসর : জ্বীন পরী, ভূতপ্রেতের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এখন পর্যন্ত বিশেষ করে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বিদ্যামান রয়েছে। মানসিকভাবে অসুস্থ হলে অনেকে জ্বীনের আসর বলে। সবার বিশ্বাস হলো জ্বীন মেয়ে মানুষের এবং পরী ছেলে মানুষের উপর আসর করে। জ্বীন পরীর আসর হলে তারা আবোল তাবোল ব্যবহার করে। তাদের বিশ্বাস এ সব জ্বীন পরী আসরকৃত ব্যক্তিকে দূরে নিয়ে যায়, অনেক সময় গাছের ডালে বসিয়ে রাখে।

Additional information