লোক ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-১৬

আঞ্চলিক নৃত্য : মণিপুরী নৃত্য, গম্ভিরা নৃত্যের মতো রাজবাড়ি অঞ্চলের নৃত্যের তেমন বিশেষত্ব নেই। তবে সাপুড়ে-নৃত্য, ধান কাটার নৃত্য, মহররমের নৃত্য, সুইপারদের নৃত্য, বৃষ্টি নামানোর জন্য মেঘ-নৃত্যের বিশেষত্ব রয়েছে।

লোককারু ও চারুশিল্প : মানুষ মাটির বিছানা থেকে তক্তপোষ এবং তা থেকে খাট, পালঙ্ক, সোফা তৈরি করেছে। এভাবে জীবনকে আয়েসী করতে যেয়ে তাকে নানাভাবে শিল্পসম্মত করার চেষ্টা করেছে। ব্যবহার্য বস্তুকে যেমন রুচিসম্মত করা হয়েছে আবার তাতে রং, বার্ণিশ, ফুল, কারুকাজ দ্বারা অলংকৃত করা হয়েছে আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে। প্রস্ফুটিত পদ্ম, শাপলা, গোলাপ, নৌকা, মাঝি, মাঠ, ফসল, বৃক্ষ, লতা-পাতা মোটিফ হিসেবে কাজ করেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত কুলাচিত্র, কাঁথা-বালিশ, বালিশের কভার, পাখা, জায়নামায, বিছানার চাদর, দস্তর খানা, শিকা, ছাঁচ, থালা বাটি, ঘট, পাত্র, দেয়ালচিত্র, কুলাচিত্র, পিঁড়ি, ধামা, কাঠা, সানকি, প্রতিমা, মুখোশ কত না বিচিত্র ধারণ করে আছে। মূলত এসবই লোককারু। লোককারু অনেকসময় শিল্পীর নান্দনিক হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে। এসব সাধারণ চিত্রে উঠে  এসেছে ক্যানভাসে, তার ‍রুপায়ন হয়েছে চারুশিল্পে। ক্যানভাসের পাতায় শিল্পীর তুলির আঁচড়ে গ্রামীণ জীবনের জীবিকা, গল্প-গাথা, নকশা, প্রকৃতি, মেঘ, বৃষ্টিসহ চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি। লোকনাটকে এসব ধারণা আমাদের দেশের শিল্পীবৃন্দের অবদান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অবদান রেখেছে।

রাজবাড়ি জেলার বিল, ঝিলের পদ্ম, শাপলা, কলমি, কচুরী ইত্যাদি ফুলের সৌন্দর্য এক সময় মন কেড় নিত। পদ্মা, গড়াই, চন্দনা নদীর মাঝি মাল্লা, পাল তোলা নৌকা জীবনজীবিকার আশা বহন করে। সরল সহজ মানুষের শিল্পকর্ম ফুটে ওঠে এ অঞ্চলের নকশী কাঁথা, চাদর, বালিশের কভার আর রুমালে। শিকা, পিঁড়ি, দোলনায় পাট, ছন দ্বারা ঘরবাড়ির ছাউনিতে শিল্পের ছাপ রাখে। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের সংগ্রহে রয়েছে রাজবাড়ির অদূরে মধুখালিতে নির্মিত সরওয়ার জানের তৈরি চৌচালা ছনের ঘর। এ ঘরটি তৎকালীন সময়ে তৈরি খরচ পড়ে ১২ হাজার টাকা। ঘরের বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যে, একটা মোমবাতি জ্বালালে সমস্ত ঘর একইভাবে আলোকিত হত। রাজবাড়ি বাঁশ, বেত, পাটের জন্য বিখ্যাত। বাঁশের তৈরি ঝাঁকা, কুলা এবং বেতের তৈরি ধামা, কাঠার আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রাজবাড়ি অঞ্চলে একসময় রেশমের চাষ হত এবং এখনো হয়। ইংরেজ আমলে রাজবাড়ির অদূরে কুমারখালিতে রেশম কারখানার ক্ষেত্র ছিল। কুমারখালি মার্কা রেশম সুতার খুব আদর ছিল ইংল্যান্ডে। কারুশিল্পে রাজবাড়ির পৃথক ঘরানা রয়েছে। লক্ষীসরা, পুতুল, প্রতীমা, কুলা, চালুন, বেতের কাজ, কুড়েঘর, নকশীকাঁথা, তালের পাখা, তালের পুতুল তালের বাঁশি, আল্পনা, নৌকার আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শিল্পজগতে তা আলাদা ঘরনার সৃষ্টি করেছে। রাজবাড়ি শিল্পের এ বিশিষ্টতা জন্ম দিয়েছে দেশবরেণ্য অনেক শিল্পীর। তাদের মধ্যে আবুল কাশেম, রশীদ চৌধুরী, মনসুরুল করিম (ঠাণ্ডু), তরুণ ঘোষের নাম বিশেষভাবে খ্যাত। উদীয়মান শিল্পী হিসেবে আছেন দিলীপ কর, মুশারফ হোসেন, আব্দুল কুদ্দুস, তোফাজ্জ্বল হোসেন, গোলাম আলীসহ আরো অনেকে। তারা সবাই যার যার ঘরনায় কাজ করে যাচ্ছেন।

লোকনৃত্য : নৃত্য দৈহিক গতিছন্দ। আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনেও লক্ষ্য করলে দেখা যাবে একটি গতিছন্দ প্রবাহমান। প্রকৃতির নিয়মের ছন্দ বাদ দিলেও নৈমিত্তিক কর্মেও ছন্দ রয়েছে। আমরা তালে তালে পা ফেলে হাঁটি, কোমর হেলিয়ে দুলিয়ে চলি। অনেক মানুষেরই হাঁটার ছন্দ আছে। ল্যাংড়া লোক যখন খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটে তখন তার হাঁটার ছন্দ আকৃষ্ট করে। দৈনন্দিন এ বিষয় নৃত্য নয়। দৈনন্দিন জীবনের খেয়াল থেকে স্বতন্ত্র একটি রুপাঙ্গিকতা নৃত্যের আছে। যে কারণে তা নৃত্য। রুপাঙ্গিকে অঙ্গভঙ্গিতে নৃত্যের কয়েকটি ভাগ লক্ষ্য করা যায় যেমন ‍উচ্চাঙ্গ নৃত্য, কত্থকনৃত্য, আঞ্চলিক নৃত্য, লোকনৃত্য প্রভৃতি। লোকনৃত্যের বিশিষ বৈশিষ্ট্য হল তাতে অঙ্গভঙ্গী বা মুদ্রার ব্যবহার থাকলেও তা অনিয়ন্ত্রিত রুপে লোকজীবনের নানাভাবে প্রকাশ পায়। অঙ্গভঙ্গির সুস্থ কৌশলের চেয়ে দেহের স্থুল গতিবিধিতে লোকনৃত্য অধিক সীমাবদ্ধ। ওয়াকিল আহমেদের ভাষায়, ‘ক্লাসিক নৃত্যের বেলায় লোকে শিখে নাচে আর লোকনৃত্যে নেচে শেখে।’

Additional information