লোক ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৪

এতদ্বসত্ত্বেও দেশকাল ভেদে সংস্কৃতি ভিন্ন। সাধারণ অর্থে সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্র স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চারু কারু শিল্পকে আমরা সংস্কৃতি বলি। শিল্পকলা সংস্কৃতির উপাদান তবে তা সঠিক অর্থে সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না। মানুষের চিন্তা, চেতনা, কল্পনা, ধ্যান ও জ্ঞানের বিকাশ সংস্কৃতির প্রকৃত পরিচয়।

জীবন ছাড়া সংস্কৃতির বিকাশ নেই। জীবন অবাক, অচল, অক্ষম হলে চলে না। জীবন সবাক, সজীব, সক্ষম হওয়া আবশ্যক। প্রাণহীন জড় প্রকৃতির সংস্কৃতি নেই। প্রাণ থেকেও অচল উদ্ভিদের সংস্কৃতি নেই, আবার মানবেতর প্রাণীর জীবন স্পন্দন এমন কি বাসস্থান ও দলবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কোকিল সুমধুর গান করে, বাবুই সুদৃশ্য বাসা নির্মাণ করে, হাতি দলবদ্ধ হয়ে বাস করে, তোতা, ময়না, টিয়া, মানুষের কণ্ঠ পর্যন্ত নকল করে তথাপিও তাদের সংস্কৃতি নেই। সুতরাং সংস্কৃতি এমন একটি রুপ যা জীবন সম্পৃক্ত হলেই স্বরুপ প্রকাশ পায় না। মানুষের মননশক্তি, চিন্তাশক্তি, ও সৃজনশক্তির গুণেই মানবসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

সভ্যতাকে সংস্কৃতি থেকে পৃথক করলে সংস্কৃতির বোধ আরো স্পষ্ট হয়। জীবন ধারণের উদ্দেশ্যে মানুষের প্রয়োজনীয় উপাদান সামগ্রীই সভ্যতার উপকরণ। বলা যায় সভ্যতা হচ্ছে Martial adjunct that we have। বিকাশমানকালে মানুষের চিন্তা, চেতনা, মননশক্তি অগ্রায়ন পথের সঙ্কট নিরসনে যেভাবে কৌশল হিসেবে কাজ করে তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতির বিষয়। ব্যবহার্য কৌশল জীবনধারাকে পরিশীলিত, গতিময় ও স্বাচ্ছন্দময় করে তোলে। জীবনযাপনে সমাজের অন্তসম্পর্ক, দৈহিক, আর্থিক, নৈতিক, অলৌকিক, লৌকিক, প্রাকৃত, অপ্রাকৃত ভাব ভাষার জন্ম দেয়। তা দিয়েই গড়ে একটি জাতির সমগ্র সংস্কৃতি----Civilization is that we have and culture is what we are'. সংস্কৃতি মূলত ঐতিহ্যানুগামী কিন্তু গতনুগতিকতা বিরোধী। সংস্কৃতি বৈচিত্রপন্থী এবং ক্রোমৎকর্ষধর্মী। সংস্কৃতি জীবন সম্পৃক্ত, বস্তু সংলগ্ন এবং মানবসম্ভত সংস্কৃতি একাধারে জীবনযাত্রার নিয়ম পদ্ধতি আচার, ব্যবহার, রীতিনীতি, উৎসব, অনুষ্ঠান, ধর্ম, প্রাত্যহিক ক্রিয়াকলাপ, শিক্ষাদীক্ষা, ভাবভাষা, খেলাধুলা, আমোদ প্রমোদ। অন্যদিকে জীবনযাপনের যাবতীয় বস্তু ও উপকরণ যথা ঘরবাড়ি, খাদ্য দ্রব্য, বস্ত্র, অলঙ্কার ইত্যাদি। তৃতীয়ত মানসফসল যথা সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, দর্শন, বিজ্ঞান।

ঐতিহ্য ছাড়া সংস্কৃতির বিকাশ সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের জীবনচর্চার নিয়ম ও জীবনচর্চার ফসল একত্রে সংস্কৃতির বুনিয়াদ গড়ে তোলে। সংস্কৃত ঐতিহ্যবাহী কিন্তু ইতিহাসনিষ্ঠ নয়। ঐতিহ্যের অনকে উপকরণই সংস্কৃতির মধ্যে সঞ্চারমান। কিন্তু সব উপাদানই সকল সময় বিরাজমান থাকে না। নদী যেমন চলতে চলতে অনেক বাঁক গ্রহণ করে সংস্কৃতির প্রবাহেও থাকবে এমন বাঁক। ক্রোমৎকর্ষ বৈশিষ্টের গুণে সংস্কৃতি রুপান্তরিত ও বিবর্তিত হতে থাকে। নতুনের স্বাচ্ছন্দতায় পুরাতনের বন্ধন ছিন্ন হয়। সংস্কৃতির ধারা রুপলাভ করে। সংস্কৃতি বিকাশ ও প্রকাশ কতকগুলি অবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন ভৌগোলিক পরিবেশ, প্রকৃতিক অবদান, ধর্মীয় বিধি বিধান, সামাজিক রীতিনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি গঠন ব্যবস্থা ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে ভৌগোলিক তথা পারিপার্শিক প্রভাব এবং প্রাকৃতিক উপাদান দ্বারা সংস্কৃতি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত ও নিরুপিত হয়। মানুষের জীবনের লক্ষ্য হল পারিপার্শিকতার সাথে সামঞ্জস্য বিধান। প্রকৃতিলোকের সাথে মানবলোকের আত্মার সম্পর্ক না হলে সংস্কৃতি দূরের কথা জাতির অস্তিত্বই বিলুপ্ত হবে।

সংস্কৃতি বিকাশের ধারায় তা তিনভাগে ভাগ করা যাবে যথা----আদিম সংস্কৃতি, লোকজ সংস্কৃতি এবং নগর সংস্কৃতি। এ পর্যন্ত সংস্কৃতি বিষয়ে যা বলা হলো তা সংস্কৃতির সাধারণ রুপ। সংস্কৃতির এ রুপ থেকে লোকজ সংস্কৃতিকে আলাদা করা যাবে। সংস্কৃতি প্রবাহে মানুষ মাংসকে কাঁচা খাওয়ার পরিবর্তে পুড়িয়ে খাওয়ার সংস্কৃতির মধ্যে চলে আসে। সংস্কৃতির আদিম প্রবাহে মানুষ তা নুন, তেলসহ খাওয়ার সংস্কৃতি চালু করে। নগরীয় সংস্কৃতিতে এসে তা রোস্ট, পিজ্জায় পরিণত করে। এভাবে সংস্কৃতি আদিম থেকে লোকজ, তা থেকে নগরীয় সংস্কৃতিতে বির্বতিত হয়। সংস্কৃতির এ ধারায় Folk, belief, Superstion, Magic এ কথাগুলি চালু আছে। একথা ঠিক যে, সমাজের একাংশ মানুষের মধ্যে এমন কিছু বিষয় থেকে যা পূর্ব থেকেই প্রচলিত। আবার অনেক বিষয় আছে যার কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার এমন অনেক আছে যার আবেদন শ্বাশত----‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা’।

Additional information