লোক ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৫

চাঁদ মামা নয় বা শিশুর কপালে টিপ দিতেও আসে না অথচ পল্লী মানুষের মানসলোকে তা অপূর্ব ভাবাবেগের সৃষ্টি করে। এভাবে  লোকসংস্কৃতি সমৃদ্ধ স্থান দখল করে আছে। তবে একটি প্রশ্ন লোকসংস্কার বা লোক সংস্কৃতির পূর্বে লোক কথাটি ব্যবহারের কারণ কী? Folk বা লোক বলতে মূলত অশিক্ষিত, নিরক্ষর জনসমষ্টিকে বোঝানো হয়। এ কথা সর্বত্র খাটে না। কারণ সমস্ত পৃথিবীর শিক্ষিত অশিক্ষিত অনেক মানুষই লোকসংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। কাজেই লোক বলতে শিক্ষিত অশিক্ষিত উভয়বিধ সমাজের লোককে বোঝায়।

স্মরণ রাখতে হবে শিক্ষিত সমাজ ক্রমাগতভাবে মুক্ত বুদ্ধির মাধ্যমে জগত ও জীবনকে বিচার করেছে। লোকসংস্কারে বিশ্বাসী শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কম তবে এ কথা সত্য যে, সব সমাজেই প্রতিনিয়ত নতুন সংস্কার গড়ে উঠছে। কিন্তু নিরক্ষর সমাজের মধ্যে প্রচলিত লোক সংস্কারই মূলতঃ লোকতাত্ত্বিকের আলোচনার মধ্যে আসে। তাই লোকসংস্কারের সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া যায়।

লোকসংস্কার বা লোকসংস্কৃতি প্রধানত নিরক্ষর লোকসমাজে এবং অল্পাধিক পরিমাণে শিক্ষিত সমাজে প্রচলিত সমস্ত বাহ্যিক কর্মকাণ্ড যথা অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক আচরাণাদি। অপরদিকে মানসিক ক্রিয়াদি যথা ধারণা, বিশ্বাস, প্রবণতা, সহজাত প্রবৃত্তিসমূহের সমস্যার উপাদানের নাম যার মধ্যে যুক্তি অপেক্ষা অযুক্তির প্রাধান্যই বেশি। মাথার উপর দিয়ে কাক কা কা করে উড়ে গেলে অমঙ্গল হয় আবার শনিবার মঙ্গলবার যাত্রা নাস্তি। এগুলি লোকবিশ্বাস। এর কোনো যুক্তির ভিত্তি নেই। এসব সংস্কারের মূলে একটি মাত্র কারণ আছে বলে মনে করা যাবে না। মানব জাতির বিকাশের সাথে মানুষকে নানা প্রতিকুল অবস্থার সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে। খাপ খাওয়াতে হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে। এভাবে সংস্কৃতির একস্তর থেকে অন্য স্তরে পৌঁছেছে। পথে পথে সে সঞ্চয় করেছে অমূল্য অভিজ্ঞতা। অনেক ক্ষেত্রে লোক সংস্কার এ অভিজ্ঞতার ফল। লোকসংস্কারের মূলে সর্বপ্রাণবাদ মতবাদটি প্রনিধানযোগ্য। পশুপাখি, গাছপালা, পাথর, মাটি, নদী, সূর্য, চন্দ্র এমন কি ব্যবহার্য সকল বস্তুর মধ্যে প্রাণ বা আত্মা আছে। এসকল বিশ্বাস থেকে পরবর্তীতে দেবতা, অশরীরী আত্মা, যাদু, মন্ত্রে রুপ নেয়। এসব লোকসংস্কারের সাথে মানুষ কথায়, ভাষায়, গল্পে, উদাহরণে, প্রবাদবাক্য, ছড়ায়, অভিজ্ঞতায় তা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও জীবনধারণের ক্ষেত্রে ধর্ম, বিশ্বাস, বাদ্য, গান, কবিতা, ছড়া, খেলা, মেলা, শিল্পকর্ম, হাতের কাজ, চাষাবাদ একটি নিয়মে পরিচালিত হয়েছে। ফলে আমাদের লোকজ ভান্ডারে সঞ্চিত হয়েছে লোকসম্ভার।

বাংলায় প্রায় ২০০০ বছরের সংস্কৃতি বহমান। প্রাচীন অস্ট্রীক, দ্রাবিড়, নিগ্রবটু মানুষের সংস্কৃতিসহ বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান, মুসলিম বহুজাতি উপজাতি বাংলার সংস্কৃতি ধারা সমৃদ্ধ করেছে। এসকল কিছুর মূলে গ্রামীণ সংস্কৃতি আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতির এক মহাভাণ্ডারের মধ্যে থেকেও আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারি না। সেই কথাটিই বলতে হয় -----‘পল্লীর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্য উপাদান কিন্তু আমরা তার গুরুত্ব বুঝতে পারি না যেমন বাতাসের মধ্যে বসবাস করে বুঝতে পারি না বাতাসের গুরুত্ব।’ নৃতাত্ত্বিক বিচারে একটি দেশ জাতি বা অঞ্চল একটি বিশেষ পরিমণ্ডলভুক্ত প্রবাহমান ঐতিহ্যের মধ্যে গড়ে ওঠে। এ ঐতিহ্যের থাকে ধর্ম, প্রার্থনা, উৎসব আচার, খাদ্য খাবার, ধ্যান ধারণাসহ লৌকিক ঐতিহ্য যথা লোককাহিনী, গাথা, গীতিকা, কিংবদন্তি। এসকল বিষয়ের ভাবধারাকে বলে মটিফ। লোকবিজ্ঞানীদের মতে এই মটিফই লোকসংস্কৃতির প্রাণ।

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীন ইতিহাস ধারণ করে আছে। পদ্মা, হড়াই, গড়াইয়ের সমতলে পলল মাটির উর্বর ভূমিতে আবহমানকালের প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে যে লোকসাহিত্য ও সংষ্কৃতি বিদ্যামান রয়েছে তার সংগ্রহ, সংরক্ষণ প্রয়োজন। কারণ আগামী দিনের পথে আমাদের সংস্কৃতি ভিন্নমাত্রা পেলেও আমরা ভুলে যেতে পারব না আমাদের অতীত। এ অতীতই আমাদের পরিচয় ও পরিচিতি বহন করবে। লোকসংস্কৃতির স্বল্পসংখ্যক লোকজ বিষয় এখানে তুলে ধরা হল।

Additional information