লোক ঐতিহ্য - পৃষ্ঠা নং-৬

লোককাহিনী

মালু ভাগ্যবানের পুকুর

লোককথা কোনো কোনো সময়ে ইতিহাসের ভিত রচনা করে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত ইতিহাস আড়ালে রেখে লোককথা লোকমুখে ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে আমাদের দেশে এমন লোককাহিনীভিত্তিক ইতিহাস চর্চার অধিক প্রাপ্যতা লক্ষণীয়। খোকসা ও পাংশা রেল স্টেশনের মাঝামাঝি মাছপাড়ায় ‘মালু ভাগ্যবানের পুকুর’ ইতিহাসের আড়ালে ‘একজন জমিদার মালুর ইতিহাস’ লোকমুখে শোনা যায়।

কাহিনীমতে জমিদার মালু ছিল অত্যন্ত জেদী। কারো নিকট কোনো বিষয়ে হারার পাত্র নন। মান সম্মান বোধে অতি সচেতন। এতটুকু মান গেলে যেন প্রাণ যায়।  একবার জমিদার মালু জমিদারী সংক্রান্ত এক মামলায় জড়িয়ে পড়ে। মামলার রায় প্রকাশের দিন ধার্য হল। রায়ের দিন মালু একটি পোষা কবুতর নিয়ে আদালতে যাওয়ার সময় স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের বলে -----‘যদি দেখ কবুতর ফিরে এসেছে তাহলে বুঝবে আমি মামলায় হেরে গেছি। তোমরা পায়ে কলসী বেঁধে ঘাটে বাঁধা নৌকায় মাঝ পুকুরে আত্মবির্সজন দিবে।’ মামলায় মালু ভাগ্যবানের জীত হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কবুতরটি কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে বাড়ি চলে আসে। কবুতর দেখে মালু ভাগ্যবানের আদেশ মতে পুকুরে আত্মবিসর্জন দেয় পরিবারের লোকেরা। এদিকে মালু কবুতর না পেয়ে দ্রুত বাড়ি এসে দেখে সব শেষ। শেষে মালু পুকুরে আত্মবির্সজন দেয়। পরবর্তীতে এ ঘটনা নিয়ে নানা রহস্যজাল সৃষ্টি হয়। অমাবশ্যা পূর্ণিমায় নাকি মালু তা তার পরিবার পুকুরে নৌকা নিয়ে ভেসে ওঠে। ধীরে ধীরে পুকুরটি সাধারণ মানুষ পূণ্যস্থান ভাবতে থাকে এবং পুকুরে স্নান করে জলপান করলে রোধব্যাথি সেরে যায়। বিগত একশত বছরের মধ্যে ৪/৫ বার এ পুকুরে হাজার হাজার মানুষ রোগমুক্তির জন্য আসার ঘটনা ঘটে। ১৯৬৫ সালের কথা, আমি তখন সূর্যনগর থেকে ট্রেনে রাজবাড়ি কলেজ যাতায়াত (ছাত্রাবস্থায়) করতাম। ঐ সময় শত শত মানুষ ট্রেনে রোগমুক্তির জন্য এ পুকুরে যেত। শেষে রেল কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়। এরপর প্রায় বিশ বছর পর পুনরায় এই ঘটনা ঘটে। এই হলো মালুর কাহিনীর ইতিহাস। এবার প্রকৃত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। মালু জমিদার ছিলেন না, সে ছিল মৎস্যজীবীদের ‘হলদার’, যাদের মালো বলা হয়। মালু তার আসল নাম নয়। মৎস্যজীবী মালো লোকমুখে হয়েছে মালু। আর মালু ভাগ্যবান হওয়ায় প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছেন ত্রৈলোক্যনাথ তার স্মৃতিকথা গ্রন্থে। গ্রন্থের ৮৪ পৃষ্ঠায় ‘ভাগ্যবানের বোঝা’ নিবন্ধ থেকে জানা যায় তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার অন্তর্গত পাংশার নিকটবর্তী মাছপাড়ায় এক পৌঢ়-মৎস্যজীবী মালো বাস করতেন। তিনি একদিন বাসা ত্যাগ করে গড়া হাতে একটি পুরাতন পুস্করিণীর চালা দিয়া মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক ঐ সময় লক্ষী ঠাকুরানী জল হতে উঠে এসে একটি কাঁসার ঘটি মালোর হাতে দিয়ে বললেন আমাকে একটু দুধ এনে দাও। মালো ঘটি হাতে চললেন গ্রামের দিকে দুধ আনতে। তখনও গাভী দহন হয় নাই। দুধ আনতে একটু দেরি হল। এসে দেখে লক্ষীরানী অন্তর্নিহিত হয়েছেন। এরপর মালোর সে কী কান্না। অল্প সময়ের মধ্যে গ্রামে গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে গেল মালোকে লক্ষী ঠাকুরানী আদেশ দিয়ে গিয়াছেন ঐ পুস্করিণীর চালায় তাঁর পূজা করতে এবং যে ঐ পুকুরে স্নান করবে তার দুরারোগ্য ব্যাধি থাকলেও তা হতে মুক্ত হবে। আর যায় কোথা ! ঐ পুকুরের চারিদিকে পরিস্কার করা হল। ধুমধামের সাথে পূজা চলতে লাগল। মেলা বসে গেল। দূরবর্তী স্থান হতে পদব্রজে ও ট্রেনে শতশত লোক পূজা দিতে আসতে লাগল। আসলে প্রদত্ত এক আনা, দুই আনা, সিকি, আধুলী, আধুলী, টাকা রোজ সংগ্রহ করে হঠাৎ মালো ভাগ্যবান হয়ে গেলেন এক মাসের মধ্যেই।

এ ঘটনা ঘটে ১৯১৫ সালে। তখন রাজবাড়ির এসডিও ছিলেন আলফ্রেড বোসা। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে ত্রৈলোক্যনাথ তার বন্ধু চারুচন্দ্রকে নিয়ে সেখানে যান এবং সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, আবেগতাড়িত মানুষের উম্মাদনা, চোর পকেটমারদের উপদ্রব বিষয়ে এসডিওকে অবহিত করেন।

Additional information