লোক ঐতিহ্য

রাজবাড়ি মহিলা পরিষদ

নারীর অধিকার সংরক্ষণ, নারী প্রগতি, চেতনা বৃদ্ধির লক্ষ্যে রাজবাড়ি মহিলা পরিষদ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। মহিলা পরিষদের মাধ্যমে বিভিন্ন সময় জাতীয় পর্যায়ের নারী নেতৃত্বে সেমিনার, আলোচনার মাধ্যমে রাজবাড়ির নারী সমাজের অগ্রায়ণকে ত্বরান্বিত করছে। ১৯৮৬ সালে শামসুন্নাহার চৌধুরীকে আহবায়ক করে মহিলা পরিষদ গঠিত হয়। বর্তমান সভানেত্রী নারী জাগরণের নিবেদিতপ্রাণ অ্যাডভোকেট দেবাহুতি চক্রবর্তী। সেক্রেটারী পদে আছেন আর এক নারী প্রগতির প্রতীক শামসুন্নাহার চৌধুরী। আরো সংশিল্প আছেন নারী জাগরণ, সমাজসচেতন অতি পরিচিত হেনা রহমান, সুলতানা আপা, জাহানারা ইসলাম। মহিলা পরিষদের সদস্য সংখ্যা তিন সহস্রাধিক। ব্যক্তিক প্রচেষ্টা ও সরকারি অনুদানে পরিচালিত মহিলা পরিষদ সফলতার সাথে কর্তব্য পালন করে যাচ্ছে।

নোশিন স্মৃতি চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা

ফুল ফোটে কাননে, তারা ফোটে গগনে, নোশিন ফুটেছিল স্বপনে।

কখন মরিচীকা হাওয়ায় ভরে

কথা হয় নিত্য সংসারে

কে আমি বলত বাবা?

তুমি নোশিন

ঐ দেখ বাবা

কত ফুল, কত পাখি, কত প্রজাপতি ওড়ে

আকাশের রং কত নীল, দেখ তারারা কতদূরে !

ওরাইত আমার খেলার সাথী ছিল।

ওসব কী বল

তুমি আমার নোশিন।

আমি তোমার নোশিন

পুতুল, খেলনা যা কিছু পাও------

বাজার থেকে আনবে কিন্তু।

কেন নয়?

শোন বাবা


আমার সাথীরা পদ্মার, উথাল পাথাল

ঢেউ দেখে ভয় পায়

জাহাঙ্গীর স্যারের চোখ নাকি গরম

ওরা এসব কী বলে বাবা?

আমি তো দেখি

পদ্মার পানি পশ্চিম থেকে

কোথায় যেন যায় আর যায়।

স্যার আমাকে বলে

আমি নাকি ফোটা ফুল।

বলত বাবা? ফুল কেন নোশিন নয়?

তুমিই ফুল, তুমিই নোশিন

তাহলে বাবা এবার যাই

ফুলের শ্রান্তি দুচোখে মেখে

ফুলে ফুলে ঘুমাই

কাঁদছ বাবা?

কেঁদো না--------

আমিই ফুল, আমিই পাখি তারায় তারায় লীন

আমিই তোমার স্বপনের নোশিন।

ফুটফুটে নোশিন টাউন মক্তব তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী। বোনম্যারো ক্যান্সার আক্রান্ত হয়ে ২০০৯ সালে জুন মাসে সকলকে ফাঁকি দিয়ে তারার মেলায় মিশে যায়। ভেলোরে চিকিৎসাধীন নোশিনের বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টে বিপুল অর্থের প্রয়োজন। পাগল প্রায় বাবা গাজী হাবিবকে সাহায্যের হাত বাড়াল রাজবাড়ির শিক্ষক সমাজ, ইমাম কমিটি, ব্যবসায়ী, প্রশাসকসহ রাজবাড়ির সকল স্তরের মানুষ। নোশিনকে বাঁচানো গেল না। বাবা ও ব্যথিত মানুষ গঠন করল ‘নোশিন স্মৃতি চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা, রাজবাড়ি’। উদ্দেশ্য বিপন্ন আর্ত মানুষের চিকিৎসা সহায়তা প্রদান। সংস্থাটির দৃঢ় ভিত ও অনন্ত স্থিতির লক্ষ্যে কাজ করে চলেছেন শক্তিশালী কার্যনির্বাহী কমিটি। পৃষ্ঠপোষক, কার্যকরী সদস্য, উপদেষ্টা মণ্ডলী, সাধারণ সদস্যসহ সকল স্তরের মানুষ। সংস্থাটির ০৯/০৮/২০১০ তারিখের সভায় বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক কাজী ইরাদত আলী ৫০,০০০.০০ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খন্দকার দেলোয়ার হোসেন, প্রভাত দাস বিষ্ণু ও প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খানসহ বিশিষ্ট নাগরিক বৃন্দ বিপুল অংকের অর্থ মানবতার কল্যাণে সংস্থাটিকে দেন। ঐ  দিন ক্যান্সার আক্রান্ত রোগীকে নোশিন স্মৃতি চিকিৎসা সহায়তা সংস্থা থেকে একলাখ টাকার চেক প্রদান করা হয়।


নোশিনের স্মৃতি বহনকারী ও প্রতিষ্ঠান অসহায় মানুষের চিকিৎসা সেবায় নিবেদিত ভূমিকা রাখবে। মানুষ মানুষের প্রতি শ্রেষ্ঠতম বন্ধন অটুট রাখবে। কাল কালান্তরে স্মৃতির আবরণে থাকবে নোশিন। সংস্থাটির সভাপতি প্রফেসর মোঃ কেরামত আলী, সাধারণ সম্পাদক রফিকুজ্জামান সেলিম।

কেএস আলম ফাউন্ডেশন

কাজী শামসুল আলম ডা. কেএস আলম নামে সমধিক খ্যাত। খ্যাতিমান এক শৈল চিকিৎসক তৎকালীন সময়ে দেশের চিকিৎসা জগতে এক কিংবদন্তি নাম। আজকের দিনে দেশে চিকিৎসা সেবার প্রভূত উন্নতি হলেও সে সময় বিশেষ করে বিগত পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে শৈল চিকিৎসক ছিলেন খুবই কম। এ সময় উচ্চ ডিগ্রিধারী কেএস আলম রাজবাড়ি ও ঢাকা মেডিকেল কলেজের অত্যন্ত নামি দামি চিকিৎসক। সাধারণ মানুষের চিকিৎসা সেবায় ছিলেন নিবেদিত। অত্যন্ত দক্ষতার সাথে তিনি সেবা প্রদান করেন। রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব ইলা মিত্র আহত হলে তাঁর চিকিৎসার ভার পড়ে ডা. কেএস আলমের উপর। তিনি ছিলেন কর্তব্যনিষ্ঠ, ব্যক্তিত্ববান ও রসিক। তাঁর অনেক গুণগ্রাহী ছাত্র কেএস আলমের প্রশংসা করে থাকে। তিনি রাজবাড়ি কাজিকান্দায় বিখ্যাত কাজী পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। কলিকাতা; পিজি হাসপাতাল, বরিশাল এ্যাসিটেন্ট সার্জন, ঢাকা মিটফোর্ড, ঢাকা মেডিকেল ও সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে কর্মরত থাকেন। এফআরসিএস এডেনবরা ১৯৪৪। তার আর এক ভাই ব্যারিস্টার শেলী খ্যাতনামা ব্যক্তিত্ব। তিনি ১৯৭৮ সালে পরলোকগমন করেন।

কেএস আলমের কন্যা ড. সুলতানা আলম আমেরিকার ল্যাকসাস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে শিক্ষকতা শুরু করেন। অতঃপর জাতিসংঘের কনসালট্যান্ট (as a gender consultant)  হিসেবে কর্মরত হন। তিনি অবসর গ্রহণ করে পিতৃভূমি রাজবাড়ির পরিবেশ উন্নয়ন, সমাজ এবং সাংস্কৃতিক উন্নয়নের লক্ষ্যে কেএস আলম ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তিনি ‘একটি বাড়ি একটি খামার’  আদর্শে সজ্জনকান্দায় একটি মনোমুগ্ধকর বাগানবাড়ি ও গো খামার গড়ে তুলেছেন। তাঁর উদ্যোগে রাজবাড়িতে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নানা জাতের বৃক্ষ রোপন করেছেন। মাঝে মাঝে তারকা শিল্পীদের দ্বারা নানা ধরণের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন। ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে তিনি রাজবাড়ির নানাবিধ উন্নয়ন কর্মকান্ড সম্পাদন করে চলেছেন।

রাজবাড়ি জেলার লোকঐতিহ্য

১। লোককাহিনী, লোকচার, কিংবদন্তি।

২। ছড়া, প্রবাদ, ধাঁধা, হেয়ালী, পাঁচালী, পুঁথি, গাথা।

৩। যাদু, মন্ত্র, তাবিজ, কবজ, ঝাড়ফুঁক।

৪। উৎসব অনুষ্ঠান : গ্রাম্য মেলা, সার্কাস, সাপের খেলা, নাগরদোলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, রথের খেলা, লৌকিক খেলাধুলা, ঈদ, পূজা পার্বণ, বিবাহ, খাৎনা, মহরম।

৫। লোকনৃত্য, লোকনাট্য, লোকজচারু ও কারু শিল্প।

সংস্কৃতি ব্যক্তি ও সমাজের পরিচিতি দান করে। দৈশিক মানুষ একই সংস্কৃতির মধ্যে বসবাস করে না তবে বিভিন্ন জাতির সংস্কৃতি ভিন্ন হলেও মানবসংস্কৃতির আদিম প্রবাহের সাথে অনেক মিলও রয়েছে। শোক, দুঃখ, হাসি, উচ্চাস প্রকাশের ধারা প্রতিটি মানুষের মধ্যে প্রায় একই রকম।


এতদ্বসত্ত্বেও দেশকাল ভেদে সংস্কৃতি ভিন্ন। সাধারণ অর্থে সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্র স্থাপত্য, ভাস্কর্য, চারু কারু শিল্পকে আমরা সংস্কৃতি বলি। শিল্পকলা সংস্কৃতির উপাদান তবে তা সঠিক অর্থে সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে না। মানুষের চিন্তা, চেতনা, কল্পনা, ধ্যান ও জ্ঞানের বিকাশ সংস্কৃতির প্রকৃত পরিচয়।

জীবন ছাড়া সংস্কৃতির বিকাশ নেই। জীবন অবাক, অচল, অক্ষম হলে চলে না। জীবন সবাক, সজীব, সক্ষম হওয়া আবশ্যক। প্রাণহীন জড় প্রকৃতির সংস্কৃতি নেই। প্রাণ থেকেও অচল উদ্ভিদের সংস্কৃতি নেই, আবার মানবেতর প্রাণীর জীবন স্পন্দন এমন কি বাসস্থান ও দলবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও তাদের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। কোকিল সুমধুর গান করে, বাবুই সুদৃশ্য বাসা নির্মাণ করে, হাতি দলবদ্ধ হয়ে বাস করে, তোতা, ময়না, টিয়া, মানুষের কণ্ঠ পর্যন্ত নকল করে তথাপিও তাদের সংস্কৃতি নেই। সুতরাং সংস্কৃতি এমন একটি রুপ যা জীবন সম্পৃক্ত হলেই স্বরুপ প্রকাশ পায় না। মানুষের মননশক্তি, চিন্তাশক্তি, ও সৃজনশক্তির গুণেই মানবসংস্কৃতি গড়ে উঠেছে।

সভ্যতাকে সংস্কৃতি থেকে পৃথক করলে সংস্কৃতির বোধ আরো স্পষ্ট হয়। জীবন ধারণের উদ্দেশ্যে মানুষের প্রয়োজনীয় উপাদান সামগ্রীই সভ্যতার উপকরণ। বলা যায় সভ্যতা হচ্ছে Martial adjunct that we have। বিকাশমানকালে মানুষের চিন্তা, চেতনা, মননশক্তি অগ্রায়ন পথের সঙ্কট নিরসনে যেভাবে কৌশল হিসেবে কাজ করে তা হয়ে ওঠে সংস্কৃতির বিষয়। ব্যবহার্য কৌশল জীবনধারাকে পরিশীলিত, গতিময় ও স্বাচ্ছন্দময় করে তোলে। জীবনযাপনে সমাজের অন্তসম্পর্ক, দৈহিক, আর্থিক, নৈতিক, অলৌকিক, লৌকিক, প্রাকৃত, অপ্রাকৃত ভাব ভাষার জন্ম দেয়। তা দিয়েই গড়ে একটি জাতির সমগ্র সংস্কৃতি----Civilization is that we have and culture is what we are'. সংস্কৃতি মূলত ঐতিহ্যানুগামী কিন্তু গতনুগতিকতা বিরোধী। সংস্কৃতি বৈচিত্রপন্থী এবং ক্রোমৎকর্ষধর্মী। সংস্কৃতি জীবন সম্পৃক্ত, বস্তু সংলগ্ন এবং মানবসম্ভত সংস্কৃতি একাধারে জীবনযাত্রার নিয়ম পদ্ধতি আচার, ব্যবহার, রীতিনীতি, উৎসব, অনুষ্ঠান, ধর্ম, প্রাত্যহিক ক্রিয়াকলাপ, শিক্ষাদীক্ষা, ভাবভাষা, খেলাধুলা, আমোদ প্রমোদ। অন্যদিকে জীবনযাপনের যাবতীয় বস্তু ও উপকরণ যথা ঘরবাড়ি, খাদ্য দ্রব্য, বস্ত্র, অলঙ্কার ইত্যাদি। তৃতীয়ত মানসফসল যথা সাহিত্য, সঙ্গীত, চিত্রকলা, স্থাপত্য, ভাস্কর্য, দর্শন, বিজ্ঞান।

ঐতিহ্য ছাড়া সংস্কৃতির বিকাশ সম্ভব নয়। দীর্ঘদিনের জীবনচর্চার নিয়ম ও জীবনচর্চার ফসল একত্রে সংস্কৃতির বুনিয়াদ গড়ে তোলে। সংস্কৃত ঐতিহ্যবাহী কিন্তু ইতিহাসনিষ্ঠ নয়। ঐতিহ্যের অনকে উপকরণই সংস্কৃতির মধ্যে সঞ্চারমান। কিন্তু সব উপাদানই সকল সময় বিরাজমান থাকে না। নদী যেমন চলতে চলতে অনেক বাঁক গ্রহণ করে সংস্কৃতির প্রবাহেও থাকবে এমন বাঁক। ক্রোমৎকর্ষ বৈশিষ্টের গুণে সংস্কৃতি রুপান্তরিত ও বিবর্তিত হতে থাকে। নতুনের স্বাচ্ছন্দতায় পুরাতনের বন্ধন ছিন্ন হয়। সংস্কৃতির ধারা রুপলাভ করে। সংস্কৃতি বিকাশ ও প্রকাশ কতকগুলি অবস্থার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। যেমন ভৌগোলিক পরিবেশ, প্রকৃতিক অবদান, ধর্মীয় বিধি বিধান, সামাজিক রীতিনীতি, রাজনীতি ও অর্থনীতি গঠন ব্যবস্থা ইত্যাদি। এগুলির মধ্যে ভৌগোলিক তথা পারিপার্শিক প্রভাব এবং প্রাকৃতিক উপাদান দ্বারা সংস্কৃতি বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত ও নিরুপিত হয়। মানুষের জীবনের লক্ষ্য হল পারিপার্শিকতার সাথে সামঞ্জস্য বিধান। প্রকৃতিলোকের সাথে মানবলোকের আত্মার সম্পর্ক না হলে সংস্কৃতি দূরের কথা জাতির অস্তিত্বই বিলুপ্ত হবে।

সংস্কৃতি বিকাশের ধারায় তা তিনভাগে ভাগ করা যাবে যথা----আদিম সংস্কৃতি, লোকজ সংস্কৃতি এবং নগর সংস্কৃতি। এ পর্যন্ত সংস্কৃতি বিষয়ে যা বলা হলো তা সংস্কৃতির সাধারণ রুপ। সংস্কৃতির এ রুপ থেকে লোকজ সংস্কৃতিকে আলাদা করা যাবে। সংস্কৃতি প্রবাহে মানুষ মাংসকে কাঁচা খাওয়ার পরিবর্তে পুড়িয়ে খাওয়ার সংস্কৃতির মধ্যে চলে আসে। সংস্কৃতির আদিম প্রবাহে মানুষ তা নুন, তেলসহ খাওয়ার সংস্কৃতি চালু করে। নগরীয় সংস্কৃতিতে এসে তা রোস্ট, পিজ্জায় পরিণত করে। এভাবে সংস্কৃতি আদিম থেকে লোকজ, তা থেকে নগরীয় সংস্কৃতিতে বির্বতিত হয়। সংস্কৃতির এ ধারায় Folk, belief, Superstion, Magic এ কথাগুলি চালু আছে। একথা ঠিক যে, সমাজের একাংশ মানুষের মধ্যে এমন কিছু বিষয় থেকে যা পূর্ব থেকেই প্রচলিত। আবার অনেক বিষয় আছে যার কোনো যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায় না। আবার এমন অনেক আছে যার আবেদন শ্বাশত----‘আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা, চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা’।


চাঁদ মামা নয় বা শিশুর কপালে টিপ দিতেও আসে না অথচ পল্লী মানুষের মানসলোকে তা অপূর্ব ভাবাবেগের সৃষ্টি করে। এভাবে  লোকসংস্কৃতি সমৃদ্ধ স্থান দখল করে আছে। তবে একটি প্রশ্ন লোকসংস্কার বা লোক সংস্কৃতির পূর্বে লোক কথাটি ব্যবহারের কারণ কী? Folk বা লোক বলতে মূলত অশিক্ষিত, নিরক্ষর জনসমষ্টিকে বোঝানো হয়। এ কথা সর্বত্র খাটে না। কারণ সমস্ত পৃথিবীর শিক্ষিত অশিক্ষিত অনেক মানুষই লোকসংস্কৃতিতে বিশ্বাসী। কাজেই লোক বলতে শিক্ষিত অশিক্ষিত উভয়বিধ সমাজের লোককে বোঝায়।

স্মরণ রাখতে হবে শিক্ষিত সমাজ ক্রমাগতভাবে মুক্ত বুদ্ধির মাধ্যমে জগত ও জীবনকে বিচার করেছে। লোকসংস্কারে বিশ্বাসী শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা কম তবে এ কথা সত্য যে, সব সমাজেই প্রতিনিয়ত নতুন সংস্কার গড়ে উঠছে। কিন্তু নিরক্ষর সমাজের মধ্যে প্রচলিত লোক সংস্কারই মূলতঃ লোকতাত্ত্বিকের আলোচনার মধ্যে আসে। তাই লোকসংস্কারের সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া যায়।

লোকসংস্কার বা লোকসংস্কৃতি প্রধানত নিরক্ষর লোকসমাজে এবং অল্পাধিক পরিমাণে শিক্ষিত সমাজে প্রচলিত সমস্ত বাহ্যিক কর্মকাণ্ড যথা অর্থনৈতিক, সামাজিক, ধর্মীয়, রাজনৈতিক আচরাণাদি। অপরদিকে মানসিক ক্রিয়াদি যথা ধারণা, বিশ্বাস, প্রবণতা, সহজাত প্রবৃত্তিসমূহের সমস্যার উপাদানের নাম যার মধ্যে যুক্তি অপেক্ষা অযুক্তির প্রাধান্যই বেশি। মাথার উপর দিয়ে কাক কা কা করে উড়ে গেলে অমঙ্গল হয় আবার শনিবার মঙ্গলবার যাত্রা নাস্তি। এগুলি লোকবিশ্বাস। এর কোনো যুক্তির ভিত্তি নেই। এসব সংস্কারের মূলে একটি মাত্র কারণ আছে বলে মনে করা যাবে না। মানব জাতির বিকাশের সাথে মানুষকে নানা প্রতিকুল অবস্থার সাথে সংগ্রাম করতে হয়েছে। খাপ খাওয়াতে হয়েছে প্রকৃতির সঙ্গে। এভাবে সংস্কৃতির একস্তর থেকে অন্য স্তরে পৌঁছেছে। পথে পথে সে সঞ্চয় করেছে অমূল্য অভিজ্ঞতা। অনেক ক্ষেত্রে লোক সংস্কার এ অভিজ্ঞতার ফল। লোকসংস্কারের মূলে সর্বপ্রাণবাদ মতবাদটি প্রনিধানযোগ্য। পশুপাখি, গাছপালা, পাথর, মাটি, নদী, সূর্য, চন্দ্র এমন কি ব্যবহার্য সকল বস্তুর মধ্যে প্রাণ বা আত্মা আছে। এসকল বিশ্বাস থেকে পরবর্তীতে দেবতা, অশরীরী আত্মা, যাদু, মন্ত্রে রুপ নেয়। এসব লোকসংস্কারের সাথে মানুষ কথায়, ভাষায়, গল্পে, উদাহরণে, প্রবাদবাক্য, ছড়ায়, অভিজ্ঞতায় তা প্রকাশ করেছে। এছাড়াও জীবনধারণের ক্ষেত্রে ধর্ম, বিশ্বাস, বাদ্য, গান, কবিতা, ছড়া, খেলা, মেলা, শিল্পকর্ম, হাতের কাজ, চাষাবাদ একটি নিয়মে পরিচালিত হয়েছে। ফলে আমাদের লোকজ ভান্ডারে সঞ্চিত হয়েছে লোকসম্ভার।

বাংলায় প্রায় ২০০০ বছরের সংস্কৃতি বহমান। প্রাচীন অস্ট্রীক, দ্রাবিড়, নিগ্রবটু মানুষের সংস্কৃতিসহ বৌদ্ধ, হিন্দু, খ্রিস্টান, মুসলিম বহুজাতি উপজাতি বাংলার সংস্কৃতি ধারা সমৃদ্ধ করেছে। এসকল কিছুর মূলে গ্রামীণ সংস্কৃতি আলাদা বৈশিষ্ট্য নিয়ে আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের সৃষ্টি করেছে। সংস্কৃতির এক মহাভাণ্ডারের মধ্যে থেকেও আমরা এর গুরুত্ব বুঝতে পারি না। সেই কথাটিই বলতে হয় -----‘পল্লীর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্য উপাদান কিন্তু আমরা তার গুরুত্ব বুঝতে পারি না যেমন বাতাসের মধ্যে বসবাস করে বুঝতে পারি না বাতাসের গুরুত্ব।’ নৃতাত্ত্বিক বিচারে একটি দেশ জাতি বা অঞ্চল একটি বিশেষ পরিমণ্ডলভুক্ত প্রবাহমান ঐতিহ্যের মধ্যে গড়ে ওঠে। এ ঐতিহ্যের থাকে ধর্ম, প্রার্থনা, উৎসব আচার, খাদ্য খাবার, ধ্যান ধারণাসহ লৌকিক ঐতিহ্য যথা লোককাহিনী, গাথা, গীতিকা, কিংবদন্তি। এসকল বিষয়ের ভাবধারাকে বলে মটিফ। লোকবিজ্ঞানীদের মতে এই মটিফই লোকসংস্কৃতির প্রাণ।

রাজবাড়ি জেলা প্রাচীন ইতিহাস ধারণ করে আছে। পদ্মা, হড়াই, গড়াইয়ের সমতলে পলল মাটির উর্বর ভূমিতে আবহমানকালের প্রাচীন ঐতিহ্যের সাথে যে লোকসাহিত্য ও সংষ্কৃতি বিদ্যামান রয়েছে তার সংগ্রহ, সংরক্ষণ প্রয়োজন। কারণ আগামী দিনের পথে আমাদের সংস্কৃতি ভিন্নমাত্রা পেলেও আমরা ভুলে যেতে পারব না আমাদের অতীত। এ অতীতই আমাদের পরিচয় ও পরিচিতি বহন করবে। লোকসংস্কৃতির স্বল্পসংখ্যক লোকজ বিষয় এখানে তুলে ধরা হল।


লোককাহিনী

মালু ভাগ্যবানের পুকুর

লোককথা কোনো কোনো সময়ে ইতিহাসের ভিত রচনা করে। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকৃত ইতিহাস আড়ালে রেখে লোককথা লোকমুখে ইতিহাস হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে আমাদের দেশে এমন লোককাহিনীভিত্তিক ইতিহাস চর্চার অধিক প্রাপ্যতা লক্ষণীয়। খোকসা ও পাংশা রেল স্টেশনের মাঝামাঝি মাছপাড়ায় ‘মালু ভাগ্যবানের পুকুর’ ইতিহাসের আড়ালে ‘একজন জমিদার মালুর ইতিহাস’ লোকমুখে শোনা যায়।

কাহিনীমতে জমিদার মালু ছিল অত্যন্ত জেদী। কারো নিকট কোনো বিষয়ে হারার পাত্র নন। মান সম্মান বোধে অতি সচেতন। এতটুকু মান গেলে যেন প্রাণ যায়।  একবার জমিদার মালু জমিদারী সংক্রান্ত এক মামলায় জড়িয়ে পড়ে। মামলার রায় প্রকাশের দিন ধার্য হল। রায়ের দিন মালু একটি পোষা কবুতর নিয়ে আদালতে যাওয়ার সময় স্ত্রী, পুত্র ও কন্যাদের বলে -----‘যদি দেখ কবুতর ফিরে এসেছে তাহলে বুঝবে আমি মামলায় হেরে গেছি। তোমরা পায়ে কলসী বেঁধে ঘাটে বাঁধা নৌকায় মাঝ পুকুরে আত্মবির্সজন দিবে।’ মামলায় মালু ভাগ্যবানের জীত হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে কবুতরটি কোনোভাবে ছাড়া পেয়ে বাড়ি চলে আসে। কবুতর দেখে মালু ভাগ্যবানের আদেশ মতে পুকুরে আত্মবিসর্জন দেয় পরিবারের লোকেরা। এদিকে মালু কবুতর না পেয়ে দ্রুত বাড়ি এসে দেখে সব শেষ। শেষে মালু পুকুরে আত্মবির্সজন দেয়। পরবর্তীতে এ ঘটনা নিয়ে নানা রহস্যজাল সৃষ্টি হয়। অমাবশ্যা পূর্ণিমায় নাকি মালু তা তার পরিবার পুকুরে নৌকা নিয়ে ভেসে ওঠে। ধীরে ধীরে পুকুরটি সাধারণ মানুষ পূণ্যস্থান ভাবতে থাকে এবং পুকুরে স্নান করে জলপান করলে রোধব্যাথি সেরে যায়। বিগত একশত বছরের মধ্যে ৪/৫ বার এ পুকুরে হাজার হাজার মানুষ রোগমুক্তির জন্য আসার ঘটনা ঘটে। ১৯৬৫ সালের কথা, আমি তখন সূর্যনগর থেকে ট্রেনে রাজবাড়ি কলেজ যাতায়াত (ছাত্রাবস্থায়) করতাম। ঐ সময় শত শত মানুষ ট্রেনে রোগমুক্তির জন্য এ পুকুরে যেত। শেষে রেল কর্তৃপক্ষ একটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করতে বাধ্য হয়। এরপর প্রায় বিশ বছর পর পুনরায় এই ঘটনা ঘটে। এই হলো মালুর কাহিনীর ইতিহাস। এবার প্রকৃত ইতিহাসের দিকে তাকানো যাক। মালু জমিদার ছিলেন না, সে ছিল মৎস্যজীবীদের ‘হলদার’, যাদের মালো বলা হয়। মালু তার আসল নাম নয়। মৎস্যজীবী মালো লোকমুখে হয়েছে মালু। আর মালু ভাগ্যবান হওয়ায় প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরেছেন ত্রৈলোক্যনাথ তার স্মৃতিকথা গ্রন্থে। গ্রন্থের ৮৪ পৃষ্ঠায় ‘ভাগ্যবানের বোঝা’ নিবন্ধ থেকে জানা যায় তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার অন্তর্গত পাংশার নিকটবর্তী মাছপাড়ায় এক পৌঢ়-মৎস্যজীবী মালো বাস করতেন। তিনি একদিন বাসা ত্যাগ করে গড়া হাতে একটি পুরাতন পুস্করিণীর চালা দিয়া মাঠের দিকে যাচ্ছিলেন। ঠিক ঐ সময় লক্ষী ঠাকুরানী জল হতে উঠে এসে একটি কাঁসার ঘটি মালোর হাতে দিয়ে বললেন আমাকে একটু দুধ এনে দাও। মালো ঘটি হাতে চললেন গ্রামের দিকে দুধ আনতে। তখনও গাভী দহন হয় নাই। দুধ আনতে একটু দেরি হল। এসে দেখে লক্ষীরানী অন্তর্নিহিত হয়েছেন। এরপর মালোর সে কী কান্না। অল্প সময়ের মধ্যে গ্রামে গ্রামে রাষ্ট্র হয়ে গেল মালোকে লক্ষী ঠাকুরানী আদেশ দিয়ে গিয়াছেন ঐ পুস্করিণীর চালায় তাঁর পূজা করতে এবং যে ঐ পুকুরে স্নান করবে তার দুরারোগ্য ব্যাধি থাকলেও তা হতে মুক্ত হবে। আর যায় কোথা ! ঐ পুকুরের চারিদিকে পরিস্কার করা হল। ধুমধামের সাথে পূজা চলতে লাগল। মেলা বসে গেল। দূরবর্তী স্থান হতে পদব্রজে ও ট্রেনে শতশত লোক পূজা দিতে আসতে লাগল। আসলে প্রদত্ত এক আনা, দুই আনা, সিকি, আধুলী, আধুলী, টাকা রোজ সংগ্রহ করে হঠাৎ মালো ভাগ্যবান হয়ে গেলেন এক মাসের মধ্যেই।

এ ঘটনা ঘটে ১৯১৫ সালে। তখন রাজবাড়ির এসডিও ছিলেন আলফ্রেড বোসা। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে ত্রৈলোক্যনাথ তার বন্ধু চারুচন্দ্রকে নিয়ে সেখানে যান এবং সেখানকার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, আবেগতাড়িত মানুষের উম্মাদনা, চোর পকেটমারদের উপদ্রব বিষয়ে এসডিওকে অবহিত করেন।


এসডিও ১৪৪ ধারা জারি করে তা বন্ধু করে দেন। ইতিমধ্যে মালো বেশ কিছু অর্থের মালিক হয়ে পড়েছেন। এরপর থেকে মৎস্যজীবীর নাম ‘মালো ভাগ্যবান’ বলে রটে যায়। বর্তমান কালেও আমাদের দেশে এমন নানা ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি মাগুরায় পানি পড়া নিয়ে মাগুরা ও এর পার্শবর্তী জেলা ঝিনাইদহ, ফরিদপুর, লড়াইল, রাজবাড়ি হুলস্থুল কাণ্ড ঘটে গেল। অশিক্ষিত, শিক্ষিত, ধনি, গরীব সর্বশ্রেণীর হাজার হাজার মানুষ ট্যাক্সি, বাস মাইক্রো, পায়ে হেঁটে মাগুরায় যেতে থাকে। প্রতিদিন লক্ষাধিক মানুষের সমাগম ঘটতে থাকে। রাজবাড়িতে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল যে, একমাত্র মাগুরা যাওয়া ছাড়া অন্যত্র যাওয়ার কোনো মাইক্রো ভারা পাওয়া যাচ্চিল না।

টাকার মাইট

রাজবাড়ি জেলায় বালিকান্দি উপজেলায় টাকার মাইটের গল্পকাহিনী শোনা যায়। সেকালে গ্রামের ধনী মানুষের ছিল বড় বড় পুকুর। তারা কাঁচা টাকা কোলায় ভরে শিকল দিয়ে গোপনে পুকুরে ডুবিয়ে রাখত। এসব টাকার কোলাকে স্থানীয় ভাষায় মাইট বলা হয়।

কিছুদিন পানিতে থাকার পর টাকার মাইটটি দেওদা (জীবন্ত) হয়ে ৭টি মাইটে পরিণত হত এবং পুকুরে ভুর ভুর করে কখনো কখনো ভেসে উঠতো। আবার অনেক ধনী টাকার মাইট ঘরের মাটির নীচে রেখে দিত এবং সেগুলি একসময় দেওদা হয়ে পুকুরে ঐ সকল মাইটের সাথে মিশে যেত। এসব টাকার মাইট আবার অনেককে স্বপ্নে দেখা দিত। স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলত আমি অমুক পুকুরের চালায় উঠে বসে থাকব। তুই শনি অথবা মঙ্গলবার এমন একটা দিন তারিখে নিশিরাতে এসে আমাকে নিয়ে যাবি। এরকম স্বপ্ন দেখে যারা সাহস করে মাইট নিয়ে আসত তারা ধনী হয়ে যেত। এখনো এলাকায় ধনি ব্যক্তিদের প্রতি নিরক্ষর মানুষ উক্তি করে সে টাকার মাইট পেয়েছে। আবার অনেকে বলে পুকুর কাটার সময় সে পুকুরে মাইট পেয়েছে।

বাণীবহে পুস্কুলাগা

রাজবাড়ি সদর উপজেলায় বাণীবহ একটি প্রাচীন প্রসিদ্ধ গ্রাম। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায় ২৫০/৩০০ বৎসর পূর্বে বাণীবহে এক উন্নত জনপদ গড়ে ওঠে। গ্রামটি কয়েকটি পাড়ায় যেমন---বিদ্যাবাগীশ পাড়া, আচার্য পাড়া, সরখেল পাড়া, সেনহাটি পাড়া, পচা পাড়া নামে বাণীবহে ছিল সাতশত ঘর বাড়ী--ব্রাহ্মণ দুইশত ঘর বৈদ্য আর অন্যান্য আড়াইশত ঘল গ্রামে এরুপ জনতাপূর্ণ ছিল যে কারো কোনো বহিরাঙ্গণ এমন কি বারান্দাও ছিল না। এ গ্রামে ১২৩৩ বাংলা সালে এক মহামারীতে গ্রামের প্রায় ৮০ ভাগ লোক মারা যায় এবং জীবিতরা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এ ঘটনাকে নিয়ে এলাকায় একটি লোকসংস্কার গড়ে ওঠে। কথিত সংস্কারটি হল ‘বাণীবহে পুস্কুলাগা’। লোকে বলে বাণীবহে হঠাৎ একদিন রাতে পূস্কু নামে এক অলৌকিক শক্তির আর্বিভাব ঘটে। কথিত ভাষায় পূস্কু এক প্রকার মহামারি রোগের আর্বিভাব ঘটায় এবং এক রাতে সকল মানুষকে মেরে ফেলে। এসব মানুষ মরে গেলে পুস্কু তাদের দেহে ভর করে ঐ সকল মানুষের দেহধারী হয় এবং অলৌকিক আচরণ করতে থাকে। গ্রামের দূরের আত্মীয়রা সে রাতের কোনো ঘটনাই জানত না। তাদের মধ্যে সকালে দু’একজন আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে আসলে পুস্কুলাগা লোকটি হাত লম্বা করতে করতে উঠান থেকে পিড়ি এনে দেয়, অন্যঘর থেকে খাবার এনে দেয়। কথা বলার সময় দেখা যায় হা দিয়ে আগুন বের হয়। হাঁটার সময় দেখা যায় ১০/১২ হাত দূরে পা ফেলছে। বলাবাহুল্য এ গ্রামের পাশ দিয়ে মানুষ যাতায়াত করত না। বাণীবহ অনেকদিন বিরাণভূমিতে পরিণত ছিল।


লোকাচার

বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও অঞ্চলভিত্তিক জীবনযাপন, আচার-আচরণ, ভাব-ভাষায় বিশেষত্ব রয়েছে। রাজবাড়ি জেলার মানুষের জীবনযাপনে-খাদ্য, কাজকর্ম, চলাচল, বাসভূমির বৈচিত্র আছে। এ ছাড়া ভাব প্রকাশ, ব্যবহাররীতি, আদানপ্রদান এবং ভাষা ব্যবহারেও বিশেষত্ব রয়েছে। এসব তাদের শত শত বছরের লোকজ মানসের মোটিফের প্রকাশ। রাজবাড়ি জেলা ভৌগোলিক অবস্থানে নদীয়া, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, পাবনা ও মানিকগঞ্জ প্রভাবিত। এসব জেলা থেকে কমবেশি মানুষ রাজবাড়ি জেলায় অভিবাসিত হলেও বেশি পরিমাণ অভিবাসন ঘটেছে পাবনা জেলা থেকে। ষাটের দশকে কুমিল্লা, নোয়াখালি থেকেও কিছু পরিমাণ মানুষের অভিবাসন ঘটে। রাজবাড়ি জেলা ঐতিহাসিকভাবে বঙ্গের এলাকা। বঙ্গ ছিল ভাটির দেশ। বঙ্গ বলতে সমতটীয় বর্তমান রাজবাড়ি, ফরিদপুর, যশোহরকে বোঝানো হয়। বঙ্গের মানুষের জীবনচারিতা সহজ সরল ও আড়ম্বরহীন। ইষ্টিকুটুম বাড়িতে এলে সবাই আনন্দিত হয়। চাউলের রুটির সাথে মুরগীর গোস্ত, সে সাথে চিতাই পিঠা, কুশলী পিঠা তৈরি করে। ইলিশ, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল এসব গ্রামের মানুষের প্রিয় খাবার। এককালে এলাকাটি হিন্দু প্রধান ছিল। এখনো অনেক হিন্দু বসবাস করে। হিন্দু মুসলমানের মধ্যে একে অপরের ভাব ভালোবাসার অভাব নেই। মুসলমানদের বাড়ির দাওয়াত হিন্দু খায়, হিন্দুর নিমন্ত্রণে মুসলমান তাদের বাড়িতে যায়। মুসলমান একে অপরকে দেখলে সালাম এবং হিন্দু আদাব দেয়। তবে সকলেরেই জীবনাচরণ একসাথে, এক মাঠে, এক ঘাটে।ভাষা ব্যবহারে রাজবাড়ির মানুষের বিশেষত্ব রয়েছে। এরা ভাইকে-বাই, উঠানকে-উঠোন---কেমন করে অর্থাৎ ক্যাম্বা, যেমন করে অর্থাৎ য্যাম্বা, খাওয়াকে বলে খাবোনে, যাওয়াকে বলে যাবোনে, যাওনা কেন বলবে যাসনে কেন, আসিসনে কেন, হওয়াকে বলবে হয়া, গাওয়াকে বলবে গায়া। পাবনার প্রভাবিত অনেকে ‘স’ এ স্থলে ‘হ’ উচ্চারণ করে। যেমন সুঁইকে হুই, সন্ধ্যাকে হন্দে। রাজবাড়ির ভাষার নিম্নরুপ লক্ষ্যণীয়----- ‘একজন মানষির দুই ছাওয়াল ছিল। তার মুদি তার ছোট ছাওয়াল কলো, বাজান বিষয় আসয়ের যা আমি পাব তা ভাগ করে দেও। তার বাপ তহন তার অংশ ভাগ করে দিল, সে তহন সব বেঁচে দূর দ্যাশে চলে গেল। সেহানে বাউটেমি করে কিছুদিনির মুদি সব খোয়া ফেলল। তহন হে দ্যাশে ভারি আহাল অল আর সে বড় কষ্ট পাল।’ এরুপ নিজস্ব ভাষার সংস্কৃতি প্রবাহ রয়েছে রাজবাড়ি জেলার।

প্রবাদ,প্রবচন, ধাঁধা, ছড়া

জার্মান দেশে প্রবাদ সম্বন্ধে একটি প্রবাদ আছে  As the country so the proverb. অর্থাৎ যে দেশ যেমন তার প্রবাদও তেমনি। আবার স্কটল্যান্ডের একটি প্রবাদ আছে As the People so the Proverb.  অর্থাৎ যেমন মানুষ তেমনি প্রবাদ। প্রাকৃতিক আর সামাজিক বহু বিচিত্র পরিবেশের মানুষ সৃষ্টি করেছেন এমন কিছু শ্বাশত কথা যা চন্দে, বর্ণনায়, লোকজ মনে সত্য বিশ্বাসের শেকড় গেড়েছে শক্ত করে। যাকে বলা হয় প্রবাদ। রাজবাড়ি জেলায় প্রচলিত কয়েকটি প্রবাদ।

প্রবাদ

১। ‘যে যায় পাবনা, তার নাই ভাবনা।                            ৬। কোদালে কোদালে মেঘের গা

(যথাসম্ভব নীলচাষের সময় এলাকাটি                                  যেখান ইচ্ছা সেখান যা।

অত্যাচারিত হওয়ায় অপেক্ষাকৃত ভালো                               (আকাশের সাদা মেঘের সারি ফাঁকা

জায়গা মনে করে লোকে এ প্রবাদ                                     ফাঁকা হলে বৃষ্টির সম্ভবনা থাকে না)।


তৈরি করেছিল)।                                                   ৭। আমে ধান, তেঁতুলে বান।

২। ‘নামে খায় বেলগাছির গুর’                                    ৮। পিঠা বল মিঠা বল ভাতের মতো নাই,

বেলগাছির গুরের একসময় খুব সুনাম ছিল।                        খালা বল ফুফু বল মায়ের মায়ের মতো নাই।

এ সুনাম আজও রয়েছে।                                           ৯। যদি বর্ষে ফাগুনে

৩। ‘এ কয় টাকা লাভ পেলেই আমি                                  চিনা কাওন দ্বিগুণে

বালেকান্দির ঠাকুর’---অল্পতেই তুষ্ট--                                যদি বর্ষে মাঘের শেষ

৪। ফল খেয়ে জল খায়,                                              ধন্য রাজার পূণ্য দেশ।

জম বলে আয় আয়।                                                   ----খনার বচন

৫। চৈত্র মাসে চাষ দিয়ে না, বোনে বৈশাখে                         ১০। দাঁত ওঠে নাই, কলই চাবাও

কবে সে হেমন্তের ধান্য পেয়ে থাকে                                          -----ইচড়ে পাকা

 প্রবচন

১। মাথায় বোঝা কোদালে চাষ                                        ৯। দাদার নামে আধা, বাপের নামে গাধা

যে বাঁচবে শত সে বাঁচে পঞ্চাশ                                             নিজের নামে শাহজাদা

২। গড্ডার মা’লো তোর গড়গড়াটা কই                             ১০। দুই সতীনের ঘর, খোদায় রক্ষা কর।

হালের বলদ বাঘে খেয়েছে                                           ১১। বাড়ির শোভা বাগ বাগিচা

পিঁপড়ে টানে মই।                                                          ঘরের শোভা ডোয়া,

৩। অতি বড় হয়ো না, ঝড়ে ভেঙ্গে নেবে                                 ধান কাউনে মাঠের শোভা,

অতি ছোট হইওনা ছাগলে মুড়ে খাবে।                                    রাতের শোভা শোয়া

৪। ভাবে (ভাবনায়) মরে কুরনের মা,                             ১২। আক্কেলে সকল বন্দি জালে বন্দি মাছ

আটের মানুষ শুবেন কনে? (অহেতুক ভাবনা)                          বউয়ের কাছে পুরুষ বন্দি, ছালে বন্দি গাছ।

৫। সব নদী খান খান

হড়াই নদী সাবধান

৬। পাখির মধ্যে খঞ্জন, মাছের মধ্যে রন্ধন,

নারীর মধ্যে রাধা শাড়ির মধ্যে সাদা

৭। এমনি ছাই তার উপর বাতাস।


 ছড়া

১। গড়াই, হড়াই, চন্দনা

চলছে দেখ মন্দনা,

চলত যখন চাঁদ সওদাগর

করত সবাই বন্দনা।

২। আসে গেছে রেলের গাড়ি

যাওয়ার নাই আর মানা

ঢাকা মেলে কুষ্টে যাব

তা না না না।

৩। ইলিশ মাছের তিরিশ কাঁটা

বোয়াল মাছের দাড়ি

টিক্কাখান ভিক্ষা চায়

গোয়ালন্দের বাড়ি।

৪। খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালো

বর্গী এলো দেশে

বুলবুলিতে ধান খেয়েছে

খাজনা দিব কি সে?

৫। ষোল চাষে মূলা

তার অর্ধেক তুলা

তার অর্ধেক ধান

বিনা চাষে পান

----খনার বচন

৬। আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা

চাঁদের কপালে চাঁদ টিপ দিয়ে যা


৭। আয় বৃষ্টি ঝেঁপে

ধান দেব মেপে

ধান কাউনে এক মণ

আয় বৃষ্টি ঝম ঝম

৮। ইটে কোমরে মা’ লো,

ভিটে বাঁদে দে,

তোর ছাওয়ালের হবে বিয়ে

সাজনা সেজেছে।

৯। মদাপুরের মাদার বাবা,

সোনাপুড়ের খড়,

বহরপুরের পান শুপারী

নিয়ে আয়ছে বর,

বরের মুখে চুনকালী

করবো না তোর

গেরস্তালী।

উৎসব অনুষ্ঠান

মেলা, সার্কাস, সাপের খেলা, নাগর দোলা, পুতুল নাচ, পালা গান, লাঠি খেলা, নৌকা বাইচ, পুনাহ, নববর্ষ, হাল-খাতা, মহররম, দুর্গাপূজা, বৌদ্ধপূর্ণিমা, বিবাহ , খাৎনা, খাদ্য আনুষ্ঠানিকতা, ঈদ উৎসব এসব জাঁকজমকের সাথে রাজবাড়িতে পালন করা হয়। এরমধ্যে মেলা, পার্বন, মহররম, ঈদ, দুর্গাপূজা, বিবাহ, খাৎনা প্রধান উৎসব হিসেবে পালিত হয়।

মেলা

রাজবাড়িতে অনুষ্ঠিত কয়েকটি মেলার পরিচয়-লক্ষীকোল বুড়ির মেলা, লক্ষীকোল রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি সংলগ্ন কয়েকশত বৎসরের পুরাতন প্রকাণ্ড বটগাছের নিচে পহেলা বৈশাখ থেকে এক মাসব্যাপি মেলা বসত। সাধারণ লোকে একে বুড়ির মেলা বলত। মেলাটি রাজা সূর্যকুমারের সময় অত্যন্ত জাকমজকের সাথে পালিত হত। তার পুত্র কুমার বাহাদুর সে ঐতিহ্য রক্ষা করে গেছেন। লক্ষীকোল রাজার বাড়ির স্মৃতি চিহ্ন নেই। তবে এখানো মেলা বসে কিন্ত মেলার সে আমেজ নেই।

পাঁচুরিা বারুণী মেলা : বারণী স্নান উপলক্ষে পাঁচুরিয়া বাগচী বাড়িতে  একদিনের মেলা বসে। এ মেলায় বিভিন্ন প্রকার মাটির তৈরি খেলনা, চাকু, বটি, দা, বাঁশ ও বেতের তৈরি হস্ত শিল্পের আমদানি হয়।


খানগঞ্জ পুস্পরথের মেলা : বেলগাছি খানগঞ্জ প্রাচীন প্রসিদ্ধ স্থান। স্থানটি রাজা রামজীবন ও নাটোরের রানী ভবানীর স্মৃতি চিহ্ন হিসেবে সানমঞ্চ ও দোলমঞ্চ রয়েছে। এটি এলাকার ঐতিহ্যবাহী মেলা। এ মেলায় রথের খেলা দেখানো হয়।

মদাপুর রাজ রাজেশ্বরী দেবতার মেলা : মদাপুর হাটের প্রাচীন বটগাছটি রাজ রাজেশ্বরী জাগ্রত দেবতা হিসেবে পরিচিত। কয়েকশত বৎসর যাবৎ এই বৃক্ষকে কেন্দ্র করে প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে মেলা বসে। এ মেলায় বহু লোক সমাগম হয়। সুদূর ভারত থেকেও ভক্তজনের আগমন ঘটে।

সমাধিনগর মেলা : মাস্টার নরেশ চন্দ্র আর্য সংঘের প্রতিষ্ঠাতা এবং স্বামী সমাধি প্রকাশরণ্য বলে পরিচিত। তার উদ্দেশ্যে জন্মতিথি উপলক্ষে মেলা বসে।

নলিয়া হরি ঠাকুরের মেলা : নলিয়া জামালপুরের নলিয়ায় প্রাচীন জোড়বাংলা মন্দির রয়েছে। মাঘি পূর্ণিমা উপলক্ষ্যে ৭ দিনের মেলা বসে। মেলায় বাঁশি খেলনাসহ রং বেরঙের বাহারি দ্রব্যের সমাগম ঘটে। এখানে নাগোরদোলা, পুতুল নাচ ইত্যাদির আসর বসে।

পাংশার মেলা : মাঘি পূণিমায় পাংশার শ্মশান ঘাটে মেলা বসে।

ভীমনগর সাধুপাড়া মেলা : বালিয়াকান্দি থানার জঙ্গল ইউনিয়নে ভীমনগর প্রসিদ্ধ স্থান। বারুণী স্নান উপলক্ষ্যে ১ দিনের মেলা বসে।

বেরুলী মেলা : বালিয়াকান্দি থানার ইসলমাপুর ইউনিয়নে বেরুলীতে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসে। এ মেলায় অতীতে ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হত।

গোয়ালন্দের মেলা : গোয়ালন্দে একদিনের মেলা বসে। অতীতে এ মেলায় ষাঁড়ের দৌড় প্রতিযোগিতা হত।

মাছপাড়া হরিঠাকুরের বারুণী স্নান মেলা : বারুনী স্নান উপলক্ষ্যে ১০ দিনের মেলা বসে।

রাজবাড়ি নববর্ষের মেলা : রাজবাড়ি শহরে ১লা বৈশাখ উপলক্ষে শহর কেন্দ্রে মেলা বসে।

২১ ফেব্রুয়ারি বইমেলা : মহান ২১-কে উপলক্ষ্য করে ২০০৩ সাল থেকে জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে ৭ দিনব্যাপী সরকারি জেলা স্কুল মাঠে এক শিক্ষা মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় আবুল হোসেন কুইজ প্রতিযোগিতা একটি আকর্ষণীয় অনুষ্ঠান। শিল্পকলা একাডেমী কর্তৃক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়।

বৃক্ষমেলা : বৃক্ষরোপণসহ পরিবেশ সংরক্ষণে প্রতি বৎসর আজাদী ময়দানে বৃক্ষ মেলা অনুষ্ঠিত হয়।

দুর্গাপূজায় মেলা : দুর্গা পূজা উপলক্ষে রাজবাড়ি শহরসহ জেলার বিভিন্ন স্থানে মেলা অনুষ্ঠিত হয়। নববর্ষের মেলা, বৃক্ষ মেলা, বই মেলা ইত্যাদি লোকজমেলা নয়। তবে ইতিহাসের উপাদান হিসেবে লেখা হল।

তন্ত্রমন্ত্র

যাদু, মন্ত্র, তাবিজ, কবজ, ওঝা, পানিপড়া, চটাচালান, বাটিচালান, বানমারা, শর-নিক্ষেপ, চালপড়া, বাড়িবন্ধ, ঘরবন্ধ, প্রেম, বিবাহ বন্ধন, দোয়া, জ্যোতিষী, ভাগ্য নির্ধারণ ইত্যাদি।


লোকবিজ্ঞানীরা মনে করেন লোকসংস্কৃতির প্রধান ভিত্তি মূল যাদু বা ‘Magic'। এ যুক্তির পিছনে কাজ করে মানবজাতির বিকাশের ধারায় প্রাচীন ধ্যান ধারণা, বিশ্বাস ও আস্থা। প্রায় ৫ হাজার বছরের সভ্যতায় সেকালের মানুষের কল্পনায় যে বিশ্বাস ও আস্থা তা এ কালের মানুষের না থাকাটাই স্বাভাবিক। জীবন, জীবিকা, প্রকৃতি আর প্রাকৃতিক ঘটনার বিষয়ে বর্তমান মানব জাতি একটি সম্যক ধারণায় উপনীত হয়েছে। তৎকালীন মানুষের ভয়মিশ্রত সাধারণ দেখাই ছিল বিশ্বাস। ঝড়ের শক্তিতে ঘরবাড়ি ভেঙ্গে যায়, সূর্যের প্রখর তাপে শরীর দগ্ধ হয়। এ সব থেকেই প্রকৃতির মধ্যে অলৌকিক শক্তির বিশ্বাস মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো সৃষ্টি করে। ভয় অলৌকিক বিশ্বাস থেকে জন্ম নেয় ‘Magicla' শক্তির উপর বিশ্বাস। মানব মানবীর আদলে এ সব অদৃশ্যলোকের মানব মানবী একেবারে সাধারণ মানুষের বিশ্বাসের মধ্যে আশ্রয় নেয়। অদৃশ্যলোকের দেবতা যাদু শক্তির ব্যবহার মানুষের মনে দানা বাঁধে। এভাবেই যাদু, তন্ত্র, মন্ত্র, ঝাড় ফুঁকের প্রভাব সমাজে বিস্তার লাভ করে। একালের মানুষ ও যাদু, মন্ত্র ইত্যাদি থেকে মুক্ত নয়।

বর্তমান সংস্কৃতিতে এর মূল্য কতটুকু? এ সব যাদু বিশ্বাসের সাথে কার্যকরণ বিধির মিল খুঁজে পাওয়া যাবে না। তা সত্ত্বেও মানুষ বিরাটাকার প্রাণশক্তিতে বিশ্বাসী। যা অলৌকিক শক্তির প্রভাব সৃষ্টি করে। যাদুর এ প্রভাব ধীরে ধীরে মানুষের প্রাণ শক্তিতে রুপ নেয়। যাদুবিদ্যার উপাদান মন্ত্র, আচার অনুষ্ঠান ও বিধি নিষেধের মাধ্যমে বর্বর মানুষ ভাগ্য, দুর্ঘনা, ভয়, জয়, পরাজয় নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। আজও মানুষ যুক্তি ও বিজ্ঞানের পদ্ধতিতে অনেক বিষয় নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। ফলে লোকসমাজে নানা বিশ্বাসে যে শেকড় আঁকড়ে আছে তার প্রভাব থেকে লোকসমাজ আজও মুক্ত নয়।

মন্ত্র : মন্ত্রের কোনো যান্ত্রিক কৌশলের ভিত্তি নেই। কেবল কিছু ছন্দ বাক্য বা কথা ব্যবহার করে বিষয়কে নিয়ন্ত্রণ করার বিষয়ে ব্যবহার করা হয়। সর্প দংশন, ককুরের কামড়, কাঁটা বেধা, রোগ ব্যাধির নিরাময় এসকল বিষয়ে মন্ত্র পাঠ করা হয়। রাজবাড়ি জেলার মধ্যে মন্ত্র ব্যবহারের রীতি বিশেষভঅবে প্রচলিত আছে।

ওঝা, গুনিণ : সর্প দংশন, কুকুরের দংশন কাঁটা বেধা বিষয়ে যারা মন্ত্র পাঠে নিয়ন্ত্রণ করে তাদের ওঝা বলে। এরুপ অনেক ওঝা, গুনিণ এ জেলায় রয়েছে।

তাবিজ-কবজ, পানিপড়া : রোগব্যাধি বালা মুসিবত থেকে মুক্তির জন্য তাবিজ কবজ, পানিপড়া দেওয়া হয়। আমাদের দেশে গুনিণ ও পীর বলে যারা পরিচিত তারা এ কাজ করেন। এছাড়া বর্ষীয়ান ইমাম, মোল্লা, মুসল্লীগণ এ ধরণের ব্যবস্থা দিয়ে থাকেন।

চটা চালান, বাটি চালান, হাত চালান, চালপড়া : কারো টাকা, গহনা বা জিনিস হারিয়ে গেলে বা চোর সিঁধ কেটে চুরি করলে চটা, বাটি, হাত চালান দেওয়ার রীতি এ অঞ্চলে চালু আছে। এ ছাড়া বাসার মধ্যে কোনোকিছু হারিয়ে গেলে আশেপাশের সন্দেহজনক মানুষকে চালপড়া পাওয়ানো হয়।

বানমারা, শর--নিক্ষেপ, বাড়ি বন্ধ, ঘরবন্ধ, নষ্ট করা : কোপ কুদৃষ্টি এ বিষয়গুলি পুরোপুরি যাদু প্রভাবিত। ব্যবসা নষ্ট করা এমনকি হত্যা করার জন্য বান মারা হয়। এ বিষয়ে প্রচলিত আছে যার উপর বান মারা হয় তার শরীর জ্বালাপোড়া করে, ফোসফা পরে ইত্যাদি। এছাড়া আপদ বালাই থেকে নিস্কৃতি পাওয়ার জন্য বাড়ি বন্ধের রেওয়াজ আছে। ছোট শিশুকে নাকি মাথার চুল কেটে বা শিশুর মায়ের কাপড় কেটে নিয়ে শিশুকে নষ্ট করা যায়।

প্রেম ছিটা : প্রেমের ব্যাপারে পাত্র/পাত্রীকে গুণিন দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যায় এ বিশ্বাস চালু আছে। অনেক সময় ঘরের বধু পরপুরুষের প্রতি আসক্ত হলে বা প্রেমিকের সাথে ঘর থেকে বের হয়ে গেলে ‘ছিটা দেওয়া ‘ হয়। জ্বীনের আসর : জ্বীন পরী, ভূতপ্রেতের প্রতি মানুষের বিশ্বাস এখন পর্যন্ত বিশেষ করে গ্রামীণ সংস্কৃতিতে বিদ্যামান রয়েছে। মানসিকভাবে অসুস্থ হলে অনেকে জ্বীনের আসর বলে। সবার বিশ্বাস হলো জ্বীন মেয়ে মানুষের এবং পরী ছেলে মানুষের উপর আসর করে। জ্বীন পরীর আসর হলে তারা আবোল তাবোল ব্যবহার করে। তাদের বিশ্বাস এ সব জ্বীন পরী আসরকৃত ব্যক্তিকে দূরে নিয়ে যায়, অনেক সময় গাছের ডালে বসিয়ে রাখে।


লোকসংস্কার ও গণনাশাস্ত্র : মানবজাতির সৌভাগ্য এমন যে, তারা অতীত স্মরণ করতে পারে আর দুর্ভাগ্য যে, তারা ভবিষ্যত জানে না। এ সীমাবদ্ধতা থেকেই যাত্রার শুভাশুভ, ভবিষ্যৎ ভাগ্য, প্রাকৃতিক ঘটনা, দুর্ঘটনা জানার জন্য নানা কৌশল করেছে। এগুলি লোকসংস্কার ও গণনাশাস্ত্র হিসেবে বর্ণনা করা যায়। রাজবাড়িতে এরুপ কয়েকজন জ্যোতিষী রয়েছে।

জ্যোতিষবিদ্যা : জ্যোতিষবিদ্যা গ্রহ নক্ষত্র বিষয়ে পঠন পাঠনের শাস্ত্র। আকাশের একটা অঞ্চলের তারাকে বিভিন্ন নামে চিহ্নিত করা হয় যাকে ‘জোডিয়াক’ বলে। এই গ্রহ নক্ষত্রের প্রভাব মানুষের উপর থাকে। জন্ম তিথি গণনা করে ভবিষ্যৎ, অতীত গণনা করা হয়। রাজবাড়ি জেলার নবাবপুর ইউনিয়নে খালকুলা গ্রামে একসময় অত্র অঞ্চলের জ্যোতিষশাস্ত্র কেন্দ্র ছিল। মাদরীপুরের ফতেহজঙ্গপুরে এরুপ একটি কেন্দ্রের সন্ধান পাওয়া যায়। খালকুলা গ্রামের শতানন্দ সিদ্ধান্ত বাগীষদের বংশীয় জ্যোর্তিবিদগণ খুব প্রসিদ্ধ ছিলেন। রাজবাড়ি জেলার মানুষ জ্যোতিষ বিদ্যার প্রতি বেশ আসক্ত। অনেকেই এর চর্চা করে থাকে।

অন্যান্য বিষয়ের সাহায্যে ভবিষ্যৎ নির্ণয় : মোরগের ডাক, কুকুরের কান্না, স্বপ্নের সাহায্যে, তিন সংখ্যার সাহায্যে, মৃত আত্মার সাহায্যে, হস্তরেখার সাহায্যে, তন্ত্র, মন্ত্র, ধর্মীয় সাধানার সাহায্যে ভবিষ্যৎদ্বাণী করা হয়।

যাদুবিদ্যা ও মন্ত্র

শিং মাছের বিষ ঝাড়ার মন্ত্র

শিঙ্গী বিঙ্গী চোখের মুড়ি

কোনে পামু তুই বিষের হাঁড়ি

বিষের হাঁড়ি পায়া

শিন্ধী গেল ধাইয়া

আগে যায় গুরু, পিছে যায় শিষ্য

ঝাড়িয়া ঝাড়িয়া নামাও

কেচু শিন্দীর বিষ।

পিঠা নষ্ট করা মন্ত্র

আলো পিঠা কালো পিঠা

পিঠার নিচে ফুটা ফুট

পিঠায় দিলাম ফু

পিঠা হলো গু

হাতচালানো মন্ত্র

হাতচালানি, হাতচালানি


আতাসে পাতাসে বাঁশি চালানি

চল হাত চল

যেখানে বিষ থাকে

সেখানে চল

বিষ থুয়ে এদিক ওদিক যাস

ঈম্বর মহাদেব জটা খাস

ভূ মন্ত্রকে খীন পড়।

ধবংসাত্মক মন্ত্র

এজাজাল জেলাতেল আরদে মালেকা

ফলনার পাচতুন জ্বলে জা

মিলনের মন্ত্র

বিসমিল্লা গুণকর

ফলনার সাথে ফলনীর মিল কর

এরুপ শত শত মন্ত্র রয়েছে। কেবলমাত্র এ থেকেই আন্দাজ করা যায় আমাদের গ্রাম সমাজ এক প্রকার লোক বিশ্বাসে ধাঁধায় পড়ে আছে। এখনো ক্ষ্যাপা কুকুরে কামড়ালে খাপড়া পড়া দেওয়া হয়, জন্ডিস রোগে হলুদ পড়া দেওয়া হয়। এরুপ কত রকমের ভাব রয়েছে। এসব লোকজ বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে আমরা হাজার হাজার বছর কাটিয়েছি।

লোকনাট্য, আঞ্চলিক নৃত্য

লোকনাট্য : লোকনৃত্যের যেমন একটি প্রাকৃতিক ভিত্তি আছে লোকনাট্যে এমন প্রাকৃতিক ভিত্তি নেই। লোকনাট্য লোকজ জীবনের প্রতিচ্ছবি। তা অনুষ্ঠিত হয় পরিকল্পনা মাফিক সাজানো গোছানোভাবে। লোকনাটক লোকজ জীবনের সাধারণ চিত্র ফুঠে ওঠে। লোকজ সঙ্কট, গাথা, গল্প-প্রেমকাহিনী লোকনাটকের ভিত রচনা করে। লাইলী মজনু, শিরি ফরহাদ প্রেমভিত্তিক আখ্যান। এগুলোতে যাত্রার আমেজ থাকলেও তা যাত্রা নয়। আবার শ্রোতাদের দিক থেকে এর ভিত্তি গ্রামীণ হলেও আখ্যান পুরোপুরি লোকভিত্তিক নয়। সিরাজ-উদ-দ্দৌলা, টিপু সুলতান, জমিদার দর্পণ সার্থক নাটক তবে তা লোকনাটকভুক্ত নয়। লোকচিত্র এতে ফুটে ওঠেনি। এ সব নাটকে সমাজের অগ্রগামীতার চিত্র প্রকাশ পায়। লোকনাট্য সাধারণ জীবনের প্রতিচ্ছবি। গাথা ও পুঁথিভিত্তিক জীবনলেখ্য লোকনাটকের ভিত্তি এ কথা বলা যায়। লোকনাটকে কথার সাথে নাটকের ভাব বিদ্যামান। রাজবাড়ি জেলার নাটকে পুরাতন ভিত্তি রয়েছে। জেলা প্রসিদ্ধ জমিদার বাড়িতে বিশেষ করে বাণীবহ জমিদার বাড়ি, রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি, পদমদির নবাববাড়ি, রতনদিয়া নাট্যচর্চা হত। পরবর্তীতে বর্তমান চিত্রা হলটি বাণীবহের জমিদার ডানলফ রংমহল নামে নাট্যচর্চা কেন্দ্র গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে হোসনেবাগ হল যাকে শফিউর রহমান হল বলা হয়। সেখানে নাট্যচর্চা ও নাটক অনুষ্ঠিত হয়। হলটিতে এখনো নাটক অনুষ্ঠিত হয়। রামদিয়া, সোনাপুর, পাংশা, গোয়ালন্দ, নাড়ুয়া, পাঁচুরিয়া, বেলগাছি এসব স্থানে নিয়মিত নাট্যচর্চা হত। এসব স্থানে গ্রাম জীবনভিত্তিক নাটকই বেশি অভিনীত হত। বর্তমানে গোয়ালন্দের একটি নাট্যদল গ্রামীণভাষায় নাটক করে। সাধারণ মানুষ একে ‘ভ্যাজাইলা’ নাটক বলে।


আঞ্চলিক নৃত্য : মণিপুরী নৃত্য, গম্ভিরা নৃত্যের মতো রাজবাড়ি অঞ্চলের নৃত্যের তেমন বিশেষত্ব নেই। তবে সাপুড়ে-নৃত্য, ধান কাটার নৃত্য, মহররমের নৃত্য, সুইপারদের নৃত্য, বৃষ্টি নামানোর জন্য মেঘ-নৃত্যের বিশেষত্ব রয়েছে।

লোককারু ও চারুশিল্প : মানুষ মাটির বিছানা থেকে তক্তপোষ এবং তা থেকে খাট, পালঙ্ক, সোফা তৈরি করেছে। এভাবে জীবনকে আয়েসী করতে যেয়ে তাকে নানাভাবে শিল্পসম্মত করার চেষ্টা করেছে। ব্যবহার্য বস্তুকে যেমন রুচিসম্মত করা হয়েছে আবার তাতে রং, বার্ণিশ, ফুল, কারুকাজ দ্বারা অলংকৃত করা হয়েছে আমাদের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে। প্রস্ফুটিত পদ্ম, শাপলা, গোলাপ, নৌকা, মাঝি, মাঠ, ফসল, বৃক্ষ, লতা-পাতা মোটিফ হিসেবে কাজ করেছে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহৃত কুলাচিত্র, কাঁথা-বালিশ, বালিশের কভার, পাখা, জায়নামায, বিছানার চাদর, দস্তর খানা, শিকা, ছাঁচ, থালা বাটি, ঘট, পাত্র, দেয়ালচিত্র, কুলাচিত্র, পিঁড়ি, ধামা, কাঠা, সানকি, প্রতিমা, মুখোশ কত না বিচিত্র ধারণ করে আছে। মূলত এসবই লোককারু। লোককারু অনেকসময় শিল্পীর নান্দনিক হৃদয়কে ছুঁয়ে গেছে। এসব সাধারণ চিত্রে উঠে  এসেছে ক্যানভাসে, তার ‍রুপায়ন হয়েছে চারুশিল্পে। ক্যানভাসের পাতায় শিল্পীর তুলির আঁচড়ে গ্রামীণ জীবনের জীবিকা, গল্প-গাথা, নকশা, প্রকৃতি, মেঘ, বৃষ্টিসহ চলমান জীবনের প্রতিচ্ছবি। লোকনাটকে এসব ধারণা আমাদের দেশের শিল্পীবৃন্দের অবদান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে অবদান রেখেছে।

রাজবাড়ি জেলার বিল, ঝিলের পদ্ম, শাপলা, কলমি, কচুরী ইত্যাদি ফুলের সৌন্দর্য এক সময় মন কেড় নিত। পদ্মা, গড়াই, চন্দনা নদীর মাঝি মাল্লা, পাল তোলা নৌকা জীবনজীবিকার আশা বহন করে। সরল সহজ মানুষের শিল্পকর্ম ফুটে ওঠে এ অঞ্চলের নকশী কাঁথা, চাদর, বালিশের কভার আর রুমালে। শিকা, পিঁড়ি, দোলনায় পাট, ছন দ্বারা ঘরবাড়ির ছাউনিতে শিল্পের ছাপ রাখে। ড. দীনেশ চন্দ্র সেনের সংগ্রহে রয়েছে রাজবাড়ির অদূরে মধুখালিতে নির্মিত সরওয়ার জানের তৈরি চৌচালা ছনের ঘর। এ ঘরটি তৎকালীন সময়ে তৈরি খরচ পড়ে ১২ হাজার টাকা। ঘরের বৈশিষ্ট্য এমন ছিল যে, একটা মোমবাতি জ্বালালে সমস্ত ঘর একইভাবে আলোকিত হত। রাজবাড়ি বাঁশ, বেত, পাটের জন্য বিখ্যাত। বাঁশের তৈরি ঝাঁকা, কুলা এবং বেতের তৈরি ধামা, কাঠার আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রাজবাড়ি অঞ্চলে একসময় রেশমের চাষ হত এবং এখনো হয়। ইংরেজ আমলে রাজবাড়ির অদূরে কুমারখালিতে রেশম কারখানার ক্ষেত্র ছিল। কুমারখালি মার্কা রেশম সুতার খুব আদর ছিল ইংল্যান্ডে। কারুশিল্পে রাজবাড়ির পৃথক ঘরানা রয়েছে। লক্ষীসরা, পুতুল, প্রতীমা, কুলা, চালুন, বেতের কাজ, কুড়েঘর, নকশীকাঁথা, তালের পাখা, তালের পুতুল তালের বাঁশি, আল্পনা, নৌকার আলাদা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। শিল্পজগতে তা আলাদা ঘরনার সৃষ্টি করেছে। রাজবাড়ি শিল্পের এ বিশিষ্টতা জন্ম দিয়েছে দেশবরেণ্য অনেক শিল্পীর। তাদের মধ্যে আবুল কাশেম, রশীদ চৌধুরী, মনসুরুল করিম (ঠাণ্ডু), তরুণ ঘোষের নাম বিশেষভাবে খ্যাত। উদীয়মান শিল্পী হিসেবে আছেন দিলীপ কর, মুশারফ হোসেন, আব্দুল কুদ্দুস, তোফাজ্জ্বল হোসেন, গোলাম আলীসহ আরো অনেকে। তারা সবাই যার যার ঘরনায় কাজ করে যাচ্ছেন।

লোকনৃত্য : নৃত্য দৈহিক গতিছন্দ। আমাদের নিত্যনৈমিত্তিক জীবনেও লক্ষ্য করলে দেখা যাবে একটি গতিছন্দ প্রবাহমান। প্রকৃতির নিয়মের ছন্দ বাদ দিলেও নৈমিত্তিক কর্মেও ছন্দ রয়েছে। আমরা তালে তালে পা ফেলে হাঁটি, কোমর হেলিয়ে দুলিয়ে চলি। অনেক মানুষেরই হাঁটার ছন্দ আছে। ল্যাংড়া লোক যখন খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটে তখন তার হাঁটার ছন্দ আকৃষ্ট করে। দৈনন্দিন এ বিষয় নৃত্য নয়। দৈনন্দিন জীবনের খেয়াল থেকে স্বতন্ত্র একটি রুপাঙ্গিকতা নৃত্যের আছে। যে কারণে তা নৃত্য। রুপাঙ্গিকে অঙ্গভঙ্গিতে নৃত্যের কয়েকটি ভাগ লক্ষ্য করা যায় যেমন ‍উচ্চাঙ্গ নৃত্য, কত্থকনৃত্য, আঞ্চলিক নৃত্য, লোকনৃত্য প্রভৃতি। লোকনৃত্যের বিশিষ বৈশিষ্ট্য হল তাতে অঙ্গভঙ্গী বা মুদ্রার ব্যবহার থাকলেও তা অনিয়ন্ত্রিত রুপে লোকজীবনের নানাভাবে প্রকাশ পায়। অঙ্গভঙ্গির সুস্থ কৌশলের চেয়ে দেহের স্থুল গতিবিধিতে লোকনৃত্য অধিক সীমাবদ্ধ। ওয়াকিল আহমেদের ভাষায়, ‘ক্লাসিক নৃত্যের বেলায় লোকে শিখে নাচে আর লোকনৃত্যে নেচে শেখে।’


ঢেঁকিনাচ, জারীনাচ, সারিনাচ, লাঠিনাচ, দেওয়ারনাচ, ঘেটুনাচ, বাউলনাচ, ফকিরনাচ, বেহারানাচ, মহররমের নাচ, কীর্তননাচ, পূজা পার্বনের নাচ, খেমটানাচ, মুখোশনাচ, গাজননাচ, ব্রতনাচ, ধুপনাচ, হিজরেনাচ, সাপুড়েনাচ, ছোকরানাচ, ঢোলনাচ, ডাকনাচ ইত্যাদি লোকনৃত্য।

রাজবাড়ি জেলার প্রচলিত লোকনৃত্য

ঢেঁকিনাচ : ঢেঁকি বাংলার লোকজ সংস্কৃতির বাহন। ঢেকিতে ধান বানার সময় তালে তালে পা উঠানামা করে এবং শরীর দোলে। ঢেঁকির ছন্দের মতো ছন্দ তুলে নাচ করা হয়। এ সাথে গানও করা হয়।

ও ধান বানিরে ঢেঁকিতে পাড় দিয়া

ঢেঁকি নাচে আমি নাচি

হেলিয়া দুলিয়া

ও ধান বানিরে-----

ঢেঁকির পাড় শুনে ও ভাই

কুটুম আল বাড়ি

তিন কুটুমের গলায় দড়ি

আর কুটুমের আড়ি

ও ধান বানি রে-----

আয় ধান বানি লো ধান বানি

আয় লো বানি ধান

কুককুর কুক কুককুর কুক

ঢেঁকি করে গান

এই না ধানের চাল কুইটা

পিঠা পায়েস করে

সেই না পিঠার দাওয়াত দেব

পাড়ার ঘরে ঘরে লো পাড়ার ঘরে ঘরে

একসাথে সব খাব আমরা লইয়া পোলাপান

কুককুর কুক কুককুর কুক

ঢেঁকি করে গান---------

----ইদ্রিস মিয়া ময়না


জারীনাচ : রাজবাড়ি অঞ্চলে জারিগান বিশেষভাবে প্রচলিত। এছাড়া গ্রামে বিশেষ আকর্ষণ এই জারিগান। জারিগানের সাথে দলনেতাসহ সকলেই নেচে নেচে গান করে। গানের সাথে নাচের বৈশিষ্টতা লক্ষ্য করা যায়।

সারিনাচ : সারিনাচ নৌকা বাইচের নাচ। নৌকা বাইচের সময় বাইচেরা নাচ করে।

ছোকরানাচ : রাজবাড়ি অষ্টক গানের প্রচলন আছে। এই অষ্টক গান সাধারণত ছেলে ছোকরাদের দ্বারা গাওয়া হয়। এই ছেলেরা গানের সাথে নাচ করে।

কীর্তননাচ : রাজবাড়ি একসময় হিন্দু প্রধান ছিল। পূজা পার্বন ছাড়াও অন্যসময় কীর্তনের সাথে এ নাচ করে। রাজবাড়ি এবং অঞ্চল বিশেষে। সোনাপুর সমাধিনগর এলাকায় এ নাচের প্রচলন রয়েছে।

বৃষ্টি নামানোর নাচ : বৃষ্টি নামানোর জন্য এলাকায় মেয়েরা দল বেঁধে ‘দেওয়ারে তুই অঝোরে অঝোরে নামো, বেহানে বেহানে নাম’  এ গানের সাথে নাচ করে।

লাঠিনাচ : রাজবাড়িতে লাঠি খেলা একটি প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী খেলা। এখনো এলাকায় মেলা, পার্বনকে ঘিরে লাঠিখেলা অনুষ্ঠিত হয়। এটি একটি ছন্দের খেলা। খেলার সাথে নাচের দৃশ্য ফুটে ওঠে।

ঘেটুনাচ : ঘেটু নাচ গ্রামীণ লোকজকথা ও সুরে অতি সাধারণ নাচ। এ রকম গানের তালে নাচ করে-----

ও মোর সুন্দরী

ক্যান করেছ মন ভারি

আমি এনে দেব আলতা সাবান

আর করো না মান ভারি

সুন্দরী ক্যান করেছ মন ভারি

মহরমের নাচ : মহরমের সময় রাজবাড়ি শহরের এবং চর অঞ্চলের কিছু মানুষ মহরমের খেলা ও নাচে মেতে ওঠে। তারা তাজিয়া তৈরি করে, দরগা বানায়, মাতম করে, লাঠি খেলে এবং নাচ করে।

বিশেষ বিশেষ অঞ্চলে মার্সিয়া গান হয়। যেমান-------

আজ পানি পানি কইরা রে হোসেন

বেড়ায় কহর দইরার পাড়ে

হায় হায় তোমারে যে দিতেরে পানি

আমার আল্লাজি কইরাছে মানা।

নামটি আমার কহররে দইরা

তাতে অগাধ মেলে পানি

হায় হায় তোমারে যে দিতেরে পানি

আমার আল্লাজি কইরাছে মানা......


সাপুড়েনাচ : এটি রাজবাড়ির লোকনৃত্যের বিশেষ অঙ্গ। রাজবাড়ি নদী ও বিল বাওড় বেষ্টিত হওয়ায় এর প্রচলন বেশি-----

বাবু সেলাম বারে বার

আমার নাম গয়া বাইদা

বাড়ি পদ্মার পার

পঙ্খি বেচি, পঙ্খি মারি

পঙ্খি বেচে খাই

মোদের ঘর বাড়ি নাই।

হিজরেনাচ : রাজবাড়ির হিজরের দল কোনো বাড়িতে নবজাতকের খোঁজ পেলে নবজাতককে নিয়ে বিশেষ ভঙ্গীতে নাচ করে অর্থ উপার্জন করে।

ভাইফোটার গান : হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে ভাইফোটা বলে একটি অনুষ্ঠান প্রচলিত আছে। বোন ভাইয়ের কপালে ফোটা দেয় আর কথার সুরে গান করে------

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোটা

জমের দুয়ারে পড়লো কাঁটা

ভাই আমার হোক গ্রামের মাথা

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

ভাই বোঝে বোনের ব্যথা

ভাই যাওনা যথা তথা

ভুলোনা ভাই বোনের কথা

ভাইয়ের কপালে দিলাম ফোঁটা

জমের দুয়ারে পড়ল কাঁটা।

ভাই আর বোন একই মায়ের গর্ভজাত সন্তান। পরিবারভুক্ত স্নেহ মায়া মমতার বন্ধনে বেড়ে উঠেছে। গর্ভজাত সন্তানের শরীর এক না হলে মনের জগতে তারা ঐক্যবদ্ধ। মায়া মমতায় একে অপরকে হারাতে রাজী নয়। ভাইয়ের বিপদে বোন শংকিত। নানারুপ সংস্কারে এক বৃত্তের মধ্যে ভাইয়ের সুরক্ষা কামনা করে। লোকজ মনে তারই প্রতিফলন ভাইফোটার অনুষ্ঠান ও গান।

নৌকা বাইচের গান : নদীমাতৃক বাংলায় নৌকা এসময়ে একমাত্র পরিবহন ও যোগাযোগের মাধ্যম। প্রাচীনকাল থেকেই এ দেশের মানুষ নৌকা বানানোর কৌশল আয়ত্ব করে। নৌকা বাইচ তাদের প্রিয় খেলা। বিল হাওড় মাত্রিক রাজবাড়ি জেলার মানুষ নৌকা বাইচ প্রতিযোগিতায় মেতে উঠত। বর্ষার দিনে পদ্মা, গড়াই, তেঢালা, পাঁচুরিয়া বিলে অনুষ্ঠিত হয় নৌকা বাইচ। নৌকা বাইচের সময় এরুপ গান গাওয়া হয় -----

জোড়ে টান-----হেঁইও

আরো জোড়ে -----হেঁইও


বৈঠামার -----হেঁইও

যাব হাটে ----হেঁইও

পৌনে কুড়ি---হেঁইও

আবার নৌকা বাইচ শেষে ঘাটে আসার পথে----

বাইচা টান দেরে

বাড়ির ঘাটে যাই

পড়পাড়ে আইছে চিঠি

সময়ত আর নাই

বাইচা টান দেরে।

উজান বাইয়া গেলাম নৌকা

ভাটির খবর নাই

ভাটির খবর আইলেও আর

থাকার সময় নাই।

নবান্নের গান : কৃষিনির্ভর রাজবাড়ি জেলার মানুষের ক্ষুধা, দারিদ্র একসময় ছিল নিত্যসঙ্গী। আউশ আর আমন ধানই ছিল একমাত্র ফসল এবং তা বছরে একবারই জন্মিত। কখনো খড়া কখনো বৃষ্টি বন্যায় ফসল নষ্ট হয়ে যেত। এরপরও কৃষককুল নবান্নে নতুন ধানের আশায় বুক বেঁধে কাজ করত। নতুন ধান ঘরে এলে আনন্দে ফুর্তিতে মেতে উঠত।

এবার ধান আইলো ঘরে বুঝি

ধান আইলো ঘর

পিঠা পায়েস খাব কত

কতদিন পররে বুঝি

ধান আইর ঘর

আউশ ধানের পিঠা পায়েস

আমন ধানের খই

বিলে আছে কৈ সিঙ্গী

আর বাজারে আছে দই

রে বুঝি

ধান আইল ঘর।


বৃষ্টি নামানোর গান : ঋতুচক্রের সাথে বাংলার মানুষের জীবন আবর্তিত হয়। বৃষ্টিই জীবনের আশ্রয়, জীবন ধারণের উপাদান। খড়ায় ফসলের মাঠ যখন খাঁ-খাঁ করে তা দেখে বুক ভেঙ্গে যায়। চাতকের মতো বৃষ্টির জন্য আকাশ পানে প্রার্থনা করে, দোয়া করে, নামায পড়ে। গ্রামের মেয়েরা দল বেঁধে নাচে, গান করে।

দেওয়ারে তুই অঝোরে অঝোরে নামো

দেওয়ারে তুই আজলে আজলে নামো.......

ধোয়াগান : ধোয়াগান গ্রাম সংস্কৃতির বিশেষ আকর্ষণ। এ গান ফসল নিড়ান, ফসল কাটার সময় দলবেঁধে গ্রামের সাধারণ কৃষকগণ গায়। এছাড়া কৃষকগণ অবসর সময়ে গ্রামে দল বেঁধে এ গান গেয়ে থাকে।

 মেয়েলী গীত : পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই মেয়েলী গীতের প্রচলন দেখা যায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বিশেষ করে বিয়ে বাড়িতে মেয়েরা দল বেঁধে সুর করে গীত পরিবেশন করে থাকে। এসব গীতে অবশ্য কোনো প্রকার বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতে দেখা যায় না।

প্রচলিত কয়েকটি গীতের নমুনা দেওয়া গেল------

আম্বু গাছে জাম্বু ফলরে

খাজোর ভালো শোভে দামাদরে

ময়দানেতে বসে দাম উকিল ভালো পাঠায়রে

দেখে আইস উকিল ভাই, দেখে আইস ঘটক ভাই

সেই না বিবির কিনা সুরতরে

দেখে আইলাম দামাদরে

যেয়সা মিয়া, তেইসা বিবিরে

পাঁচ টাকার সিদুর হলি বিবির ভালো শোভেরে

দশ টাকার শাড়ি হলি বিবির ভালো শোভেরে

শও টাকার শাড়ি হলি বিবির ভালো শোভেরে

হাজার টাকার গয়না হলি বিবির ভালো শোভেরে।

(২)

নারিকেল লাগালাম সারি সারি

ও সারিরে সদাগর

আমার ডাগুরি ঘিরিলবাড়ি।

আস্তে আস্তে বওরে সদাগর


ও পাংসীরে সদাগর----

আমি মা’জানের কান্না শুনি।

আমার মা’জান কাঁদে

ও কাঁদেরে সদাগর-----

যেমন গাঙের তুফোন ওঠে

আমার বাবাজান কাঁদে

যেমন বিরিক্ষিত পাতা ঝরে

(৩)

পাঁচ কাপড়া পড়িয়া নীলে ঘোড়ায় চড়িয়া

যায়রে ছাওয়াল রহিমগঞ্জের হাটে

সেইখঅনেতে আছে এক ভাবের মালিনীরে

থাপা দিয়ে ধরে ঘোড়ার বাগর

ছাইড়ে দেও মোর কালিনী : ছাইড়া দেও মোদ মালিনী

আমার চলন ঘোড়ার বাগররে।

আবার ফিরে আসিব আবার ফিরে বসিব

খায়া যাব তোমার বাটার পানরে।।

দৌলতদিয়া নিষিদ্ধপল্লী

সভ্যতার উষালগ্ন থেকে পরস্পরের সৌন্দর্যে বিমোহিত মানব জাতি। নর ও নারীর ক্ষুধায় সুধায় জগত প্রবাহ। মানবজাতির প্রগতির ইতিহাসে প্রকৃতির নিয়মে নারী রমণীয়, কমনীয়। নারীর উপর ভার পড়েছে সন্তান জন্মদান, প্রতিপালন। অন্যদিকে শারীরিক গঠনে শক্তিশালী নর শিকারের সন্ধানে হাতে নিয়েছে বর্শা। সমাজ বিবর্তনের ধারায় নারীর জীবনের ক্ষেত্র হয়েছে সীমিত আর পুরুষ কর্মের বিশাল পরিধিতে সমাজের একমাত্র অধিকর্তা। সৌন্দর্য প্রিয় নর অধিকর্তা হয়েওনারীর সৌন্দর্যে বিভোর। সৌন্দর্য পিপাসু নর নারীর সৌন্দর্যের মূর্তি এঁকে দিল পাথরের গায়ে, পাহাড়ের গুহায়, বৃক্ষের ছালে। নারী জীবিত হলো সৌন্দর্যে। মানবিক মূল্যবোধের এ যুগে এসেও নারী বিভিন্নভাবে নিগৃহীত, ক্ষেত্র বিশেষে পণ্য, নরের লালসার শিকার। এ দেশে বাদশা, মোগলের হেরেমের কথা কারো অজানা নয়। শোনা যায় রাজা শুদ্ধোধন পুত্র সিদ্ধার্থের জন্য এমন এক কন্যার সন্ধান করছিলেন যার শারীরিক গুণাবলী হবে নর্তকীর মত। সোমনাথ মন্দিরের নর্তকীদের বিষয় ইতিহাসের উপাদান। এভাবে সমাজ গভীরের অন্তসলীলার এক প্রবাহমান ধারায় সৃষ্টি হলো বাঈজী, পতিতা আরো কত অস্পৃশ্য অনুচ্চারিত নাম। বিখ্যাত হয়ে উঠলো দিল্লী, লক্ষ্ণৌ বাঈজীপাড়া।

এরপর আরম্ভ হলো বৃটিশ ঔপনিবেশিক শাসন। বৃটিশ বেনিয়ারা নিদারুণ শাসনের হাজারমণি পাথর আর শোষণের জাতাকলে এদেশের মানুষকে নিস্পেষিত করেই ক্ষান্ত হলো না, নারী লোভে, শতশত নারীকে সমাজ বন্ধন থেকে ছিনিয়ে সৃষ্টি করল এক অপরিচ্ছন্ন বাজার ব্যবস্থা। যে বাজারে নারী হল পণ্য। এর ইন্ধন যোগালো যান্ত্রিক জীবন। পাক-ভারত রেলপথ চালু হয়। রেল গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হলে ১৮৭১ সালে পতিতাপল্লী গড়ে ওঠে।


তখন গোয়ালন্দ ঘাট বর্তমান দৌলতাদিয়া থেকে ১০ মাইল আরিচা মুখে ছিল। পরবর্তীতে বন্দর ভাঙ্গনে পড়লে তাদের একাংশ বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে রাজবাড়িতে স্থান নেয় এবং বর্তমান মাছবাজাড় সংলগ্ন উত্তর পাশে পতিতালয় গড়ে ওঠে। এদের আর এক অংশ ভাঙ্গনের মুখে বর্তমান গোয়ালন্দ বাজার সন্নিকটে স্থান নেয়। এদের কিছু অংশ সোনাপুর, পাংশাতেও স্থান নেয়। সত্তর দশকের শেষে রাজবাড়িতে পতিতালয় উচ্ছেদ অভিযান চলে। এরফলে তারা রাজবাড়ি থেকে গোয়ালন্দে স্থান নেয়। ফেরিঘাট দৌলতদিয়ায় স্থানান্তরিত হয়। ১৯৮৬/৮৬ সালের দিকে তারা প্রবল চাপের মুখে গোয়ালন্দ ঘাট থেকে দৌলতদিয়ায় স্থান গ্রহণ করে। বর্তমানে রাজবাড়ি জেলায় একমাত্র দৌলতদিয়ায় নিষিদ্ধপল্লীর অবস্থান রয়েছে।

 সমাজ অগ্রায়ণের এ যুগে মানুষ নিষিদ্ধ শব্দটির সাথে পল্লী শব্দ ব্যবহার করে পতিতালয় বৃত্তিকে নিষিদ্ধপল্লী নামকরণ করে বিষয়টিকে একটি শব্দমান দিয়েছে। এ কোনো গুণগত মান নয়। এর আড়ালে কাজটি সামজ গর্হীত, অমানবিক, অপবিত্র। সমাজজীবনে অপবিত্র সলীলার এ প্রবাহ, অনুমোদনে সমর্থিত। এ অনুমোদনের আড়ালেও রয়েছে সমাজশাসনের কুরুচী ও কুটিল স্বার্থ। সামাজিক মান থেকে বঞ্চিত এ পল্লীর মানুষের মানবতার আকাঙ্খী। দেশে দেশে এ বিষয়ে মানবিক মূল্যবোধের বিকাশ ঘটেছে। হংকং, থাইল্যান্ড, ভারত এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন করে পতিতাবৃত্তিকে নিরুৎসাহিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। ইউএনডিপি আর্থ-সামাজিক উন্নতির জন্য কাজ করে চলেছে। বর্তমানে দেশে ইউএনডিপি এ বিষয়ে ৪টি প্রকল্প হাতে নিয়েছে তারমধ্যে দৌলতদিয়অ নিষিদ্ধপল্লী একটি।

Additional information