ক্রীড়া

ক্রীড়া

ক্রীড়াকে নিছক বিনোদন ভেবে নিলেও একথা স্বীকার্য যে, ক্রীড়া আমাদের মনোদৈহিক জগত গঠনে বিস্ময়কর ভূমিকা রাখে। তাই সমাজ বিকাশের ধারায় উৎপাদন, ব্যবসা, শিক্ষা, রাষ্ট্রনীতির মতই ক্রীড়াকে সকল দেশেই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়। আমাদের দেশে আজ তা কেবল ক্রীড়াই হিসেবে নয় তা ক্রীড়া জগৎ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর গুরুত্ব দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অকথা ঠিক যে, আমাদের ক্রীড়া জগৎ আন্তর্জাতিক মানে উন্নত নয় কিন্ত ইংলিশ চ্যানেলে পাড়ি দেওয়ার বিরল বীরত্বের অহস্কারের দাবিদার আমাদেরই দেশের সন্তান ব্রজেন দাস। ফুটবলের যাদুকর সামাদ বাঙালি সন্তান, বিশ্ববিখ্যাত যাদুকর জুয়েল আইচ এদেশেরেই সন্তান। আমাদের রাজবাড়ির সন্তান ড. কাজী মোতাহার হোসেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবা খেলোয়াড়।রাজবাড়ি তথা দেশের

আর এক কৃতি সন্তান নূর হোসেন। তিনি ফুটবলে সর্বাধুনিক ৪-৪-২ পদ্ধতি প্রবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ হাঁটি হাঁটি পা পা করে ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জনে এগিয়ে চলেছে। নিয়মতান্ত্রকভাবে শারীরিক কসরতই ক্রীড়া। দ্রুত পা ফেলে গেলে দৌড়, পানিতে গেলে সাঁতার, হাতাহাতি হলে মল্ল, লাঠি দিয়ে খেললে লাঠি খেলা, আবার দলে দলে ভাগ হয়ে গেলে তা বিভিন্ন নামের খেলা। এভাবে আজকের দিনে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার, ভলিবল, বাস্কেটবল, কাবাডি, দাঁড়িয়াবাঁধা, গোল্লাছুট, লাঠিখেলা, নৌকা বাইচ, ঘোড়ার দৌড়, ষাঁড়ের দৌড়, হাই জাম্প, লং জাম্প, পাথর ছোঁড়া, বর্শা নিক্ষেপ, এরকম হাজার খেলা। এরুপ সুসংবদ্ধ খেলা কবে শুরু হয়েছিল তা জানা নেই। তবে সুপ্রাচীন গ্রীকরাই বোধহয় ক্রীড়া বিষয়কে একটি সুসংবদ্ধ রুপ দিতে সমর্থ হন। তাদের সময় থেকেই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রুপ লাভ করে।

গ্রীসের পোলাপোনেসাসের অন্তর্গত আলিম্পিয়া পর্বতের পাদদেশে ছিল অলিম্পিয়া নগর। এখানে প্রতি চার বছর অন্তর সারা গ্রীসের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদরা একত্র হয়ে দৌড় ঝাঁপ, মল্লযুদ্ধ, রথ চালনার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। অলিম্পিক খেলা দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শক অলিম্পিক নগরীতে উপস্থিত হতেন। এথেন্স তৎকালীন নগরসমূহের মধ্যে সংহতি বৃদ্ধি করেছিল। বলাবাহুল্য আজকের অলিম্পিকের শুরু সেখান থেকে।

 পদ্মা, গড়াই, চন্দনার সমতলের মানুষ কোমল আর কঠিনে বাঁধবাঙ্গা স্রোতের মতই উদ্দাম উত্তাল গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতির ধারায় লালিত। নদ-নদী বিল বাওড়ের সমতল মাটির মানুষ অগ্রহায়ণের নবান্ন উৎসবে যেমন মেতেছে তেমনি আষাঢ়ের ঘন বর্ষার প্লাবনের ধারায় উচ্ছসিত হয়েছে। চৈত্রের খরা আর বৈশাখের ঝড় ঝঞ্ছার দিনে শিরদাঁড়া খাড়া করে প্রতিকুল পরিবেশকে মোকাবেলা করেছে। জীবন প্রবাহের ধারায় তারা মেতেছে আনন্দ উৎসবে। খেলায় মেলায় সৃষ্টি করেছে সাহিত্য সংস্কৃতির নিজের ইতিহাস। ৫০০ বছরের ক্রীড়ার ধারা বহন করে চলেছে রাজবাড়ি জেলা। ফলে ক্রীড়ার সৃজনশীল ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে এখানে। নদী বিল আর সমতলের সমান্তরাল জীবনে দৌড়, লম্ফ, রথ টানা, ঘোড়া দৌড়, ষাঁড়ের দৌড়, লাঠি খেলা, ম্যাজিক, তাস, পাশা, গুটি, পুতুল খেলা, নৌকা বাইচ, সাঁতার এ অঞ্চলের মানুষের ক্রীড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একসময় এ সব ক্রীড়ার মহরত জমে উঠত বিভিন্ন মেলা ও পার্বনকে লক্ষ্য করে। লক্ষীকোল মেলা, পাঁচুরিয়া মেলা, মদাপুর মেলা, বালিয়াকান্দি হরিঠাকুরের মেলা, ভীমনগর মেলা, জাননগর মেলা, বেরুলী মেলা, পাংশা মেলা, কালুখালি মেলা, যশাই মেলা, গোয়ালন্দ মেলা সে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এখনো বেরুলী মেলার ঘোড়ার দৌড় এবং বেলগাছি মেলার রথের খেলা, মদাপুর মেলায় এখনো লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। গোবিন্দপুর (বেলগাছি) কালু খাঁ একসময় অঞ্চলভিত্তিক শ্রেষ্ঠ লাঠি খেলোয়াড় ছিল। বিল, হাওড়, খাল শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকা বাইচ সে সব স্থানে অনুষ্ঠিত হয় না। তবে পদ্মায় এখনো নৌকা বাইচের খেলা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারায় কাবাডি (স্থানীয় ভাষায় হা-ডু-ডু) দাঁড়িয়াবান্দা, ডাঙগুলি, তাস প্রিয় খেলা।

১৮৭১ সালে রাজবাড়ি জেলায় রেল স্থাপনের পর থেকে ক্রীড়া জগৎ ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। সে সময় কলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশে রেল ও গোয়ালন্দের সূত্রে এ অঞ্চল হয়ে ওঠে মিলন ভূমি। কলকাতা মোহনবাগান এবং মোহামেডান স্পেটিং ক্লাব অতি বিখ্যাত। বালিয়াকান্দির কোড়কদি গ্রামের তৎকালীন ফুটবল তারকা শিবদাস এবং বিজয় দাস কলকাতা মোহনবাগান ফুটবল টিম গঠন করেন। আর মহামেডান স্পোটিং ক্লাবের অন্যতম সংগঠক ছিলেন পদমদীর মীর মোহাম্মাদ আলী। খানখানাপুরের জোতদার ছিলেন রাম কানাই কুণ্ডু। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৩৫ সাল থেকে রামকানাই শীল্ড প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই শীল্ড আইএফএ শীল্ড এর সমান থাকায় তা কেটে ২ ইঞ্চি ছোট করে দেওয়া হয়।

Additional information