ক্রীড়া

ক্রীড়া

ক্রীড়াকে নিছক বিনোদন ভেবে নিলেও একথা স্বীকার্য যে, ক্রীড়া আমাদের মনোদৈহিক জগত গঠনে বিস্ময়কর ভূমিকা রাখে। তাই সমাজ বিকাশের ধারায় উৎপাদন, ব্যবসা, শিক্ষা, রাষ্ট্রনীতির মতই ক্রীড়াকে সকল দেশেই অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বলে বিবেচনা করা হয়। আমাদের দেশে আজ তা কেবল ক্রীড়াই হিসেবে নয় তা ক্রীড়া জগৎ হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর গুরুত্ব দিনের পর দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। অকথা ঠিক যে, আমাদের ক্রীড়া জগৎ আন্তর্জাতিক মানে উন্নত নয় কিন্ত ইংলিশ চ্যানেলে পাড়ি দেওয়ার বিরল বীরত্বের অহস্কারের দাবিদার আমাদেরই দেশের সন্তান ব্রজেন দাস। ফুটবলের যাদুকর সামাদ বাঙালি সন্তান, বিশ্ববিখ্যাত যাদুকর জুয়েল আইচ এদেশেরেই সন্তান। আমাদের রাজবাড়ির সন্তান ড. কাজী মোতাহার হোসেন আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দাবা খেলোয়াড়।রাজবাড়ি তথা দেশের

আর এক কৃতি সন্তান নূর হোসেন। তিনি ফুটবলে সর্বাধুনিক ৪-৪-২ পদ্ধতি প্রবর্তনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। বাংলাদেশ হাঁটি হাঁটি পা পা করে ক্রিকেটে আন্তর্জাতিক সুনাম অর্জনে এগিয়ে চলেছে। নিয়মতান্ত্রকভাবে শারীরিক কসরতই ক্রীড়া। দ্রুত পা ফেলে গেলে দৌড়, পানিতে গেলে সাঁতার, হাতাহাতি হলে মল্ল, লাঠি দিয়ে খেললে লাঠি খেলা, আবার দলে দলে ভাগ হয়ে গেলে তা বিভিন্ন নামের খেলা। এভাবে আজকের দিনে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার, ভলিবল, বাস্কেটবল, কাবাডি, দাঁড়িয়াবাঁধা, গোল্লাছুট, লাঠিখেলা, নৌকা বাইচ, ঘোড়ার দৌড়, ষাঁড়ের দৌড়, হাই জাম্প, লং জাম্প, পাথর ছোঁড়া, বর্শা নিক্ষেপ, এরকম হাজার খেলা। এরুপ সুসংবদ্ধ খেলা কবে শুরু হয়েছিল তা জানা নেই। তবে সুপ্রাচীন গ্রীকরাই বোধহয় ক্রীড়া বিষয়কে একটি সুসংবদ্ধ রুপ দিতে সমর্থ হন। তাদের সময় থেকেই ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রুপ লাভ করে।

গ্রীসের পোলাপোনেসাসের অন্তর্গত আলিম্পিয়া পর্বতের পাদদেশে ছিল অলিম্পিয়া নগর। এখানে প্রতি চার বছর অন্তর সারা গ্রীসের শ্রেষ্ঠ ক্রীড়াবিদরা একত্র হয়ে দৌড় ঝাঁপ, মল্লযুদ্ধ, রথ চালনার প্রতিযোগিতায় অংশ নিতেন। অলিম্পিক খেলা দেখার জন্য হাজার হাজার দর্শক অলিম্পিক নগরীতে উপস্থিত হতেন। এথেন্স তৎকালীন নগরসমূহের মধ্যে সংহতি বৃদ্ধি করেছিল। বলাবাহুল্য আজকের অলিম্পিকের শুরু সেখান থেকে।

 পদ্মা, গড়াই, চন্দনার সমতলের মানুষ কোমল আর কঠিনে বাঁধবাঙ্গা স্রোতের মতই উদ্দাম উত্তাল গ্রামীণ জীবনের সংস্কৃতির ধারায় লালিত। নদ-নদী বিল বাওড়ের সমতল মাটির মানুষ অগ্রহায়ণের নবান্ন উৎসবে যেমন মেতেছে তেমনি আষাঢ়ের ঘন বর্ষার প্লাবনের ধারায় উচ্ছসিত হয়েছে। চৈত্রের খরা আর বৈশাখের ঝড় ঝঞ্ছার দিনে শিরদাঁড়া খাড়া করে প্রতিকুল পরিবেশকে মোকাবেলা করেছে। জীবন প্রবাহের ধারায় তারা মেতেছে আনন্দ উৎসবে। খেলায় মেলায় সৃষ্টি করেছে সাহিত্য সংস্কৃতির নিজের ইতিহাস। ৫০০ বছরের ক্রীড়ার ধারা বহন করে চলেছে রাজবাড়ি জেলা। ফলে ক্রীড়ার সৃজনশীল ঐতিহ্য গড়ে উঠেছে এখানে। নদী বিল আর সমতলের সমান্তরাল জীবনে দৌড়, লম্ফ, রথ টানা, ঘোড়া দৌড়, ষাঁড়ের দৌড়, লাঠি খেলা, ম্যাজিক, তাস, পাশা, গুটি, পুতুল খেলা, নৌকা বাইচ, সাঁতার এ অঞ্চলের মানুষের ক্রীড়ার বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। একসময় এ সব ক্রীড়ার মহরত জমে উঠত বিভিন্ন মেলা ও পার্বনকে লক্ষ্য করে। লক্ষীকোল মেলা, পাঁচুরিয়া মেলা, মদাপুর মেলা, বালিয়াকান্দি হরিঠাকুরের মেলা, ভীমনগর মেলা, জাননগর মেলা, বেরুলী মেলা, পাংশা মেলা, কালুখালি মেলা, যশাই মেলা, গোয়ালন্দ মেলা সে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। এখনো বেরুলী মেলার ঘোড়ার দৌড় এবং বেলগাছি মেলার রথের খেলা, মদাপুর মেলায় এখনো লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। গোবিন্দপুর (বেলগাছি) কালু খাঁ একসময় অঞ্চলভিত্তিক শ্রেষ্ঠ লাঠি খেলোয়াড় ছিল। বিল, হাওড়, খাল শুকিয়ে যাওয়ায় নৌকা বাইচ সে সব স্থানে অনুষ্ঠিত হয় না। তবে পদ্মায় এখনো নৌকা বাইচের খেলা অনুষ্ঠিত হয়। গ্রামীণ সংস্কৃতির ধারায় কাবাডি (স্থানীয় ভাষায় হা-ডু-ডু) দাঁড়িয়াবান্দা, ডাঙগুলি, তাস প্রিয় খেলা।

১৮৭১ সালে রাজবাড়ি জেলায় রেল স্থাপনের পর থেকে ক্রীড়া জগৎ ভিন্ন মাত্রা লাভ করে। সে সময় কলকাতাকেন্দ্রিক সংস্কৃতির বিকাশে রেল ও গোয়ালন্দের সূত্রে এ অঞ্চল হয়ে ওঠে মিলন ভূমি। কলকাতা মোহনবাগান এবং মোহামেডান স্পেটিং ক্লাব অতি বিখ্যাত। বালিয়াকান্দির কোড়কদি গ্রামের তৎকালীন ফুটবল তারকা শিবদাস এবং বিজয় দাস কলকাতা মোহনবাগান ফুটবল টিম গঠন করেন। আর মহামেডান স্পোটিং ক্লাবের অন্যতম সংগঠক ছিলেন পদমদীর মীর মোহাম্মাদ আলী। খানখানাপুরের জোতদার ছিলেন রাম কানাই কুণ্ডু। তার পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৩৫ সাল থেকে রামকানাই শীল্ড প্রতিযোগিতা শুরু হয়। এই শীল্ড আইএফএ শীল্ড এর সমান থাকায় তা কেটে ২ ইঞ্চি ছোট করে দেওয়া হয়।


এ প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ  করতে আসত কলকাতার নামীদামী ফুটবল টিম। বেলগাছিতে আলিমুজ্জামান শীল্ড এর খেলা অনুষ্ঠিত হত। ফুটবলের যাদুকর বলে পরিচিত সামাদ ১৯৩৬ সালের দিকে রাজবাড়ি ফুটবল মাঠে মোহামেডানের পক্ষে খেলতে আসতেন। আর এক কৃতি ফুটবলার ছিলেন জগদীশ গুপ্ত। তিনি কল্লোল যুগের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক, ছোট গল্পকার। জন্ম বালিয়াকান্দির খোর্দ্দ মেগচামী। থাকতেন কুষ্টিয়া। অমিয় গুহ, বামনদাস গুহরায়, নুর হোসেন (সোনাদা), সাত্তার মৌলভী, যোগেশ চন্দ্র, যোগেশ দত্ত তখনকার ফুটবল তারকা। এরমধ্যে সোনাদাই ৪-৪-২ পদ্ধতির প্রবর্তন করেন। পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তান আমলে কৃতি ফুটবলার ও সংগঠক ছিলেন ডিএমএন ইসলাম, কেএস রহমান, রোস্তম আলী, অমল চক্রবর্তী, শৈলেশ রায়, কাদের নেওয়াজ, এনামুল কবির, আব্দুস সামাদ, প্রফেসর এহিয়া ইসলাম, আব্দুর রাজ্জাক, নিরোদ ভজন, সমর দাস, কাজী হেদায়েত হোসেন, হাবিবুর রহমান প্রমুখ। তাদের মধ্যে ডিএমএন ইসলাম ও কেএম রহমান, কালীপদ কলিকাতা লীগের বেঙ্গল রেলওয়ে দলে খেলতেন।

১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৬৮ সাল পর্যন্ত ফুটবল রাজবাড়ির বিভিন্ন অঞ্চলে অতিপ্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ খেলায় রুপ নেয়। রেলওয়ে মাঠকে কেন্দ্র করে খানখানাপুর, বেলগাছি, বসন্তপুর, বিভিন্ন ক্লাব গড়ে ওঠে। রেলওয়ে ক্লাব, এমও ক্লাব, মার্চেন্ট এসোসিয়েশন, কলেজ টিম প্রভৃতি ক্লাব গড়ে ওঠে এবং নিয়মিত লীগ খেলা অনুষ্ঠিত হয়। এ সময়ের খেলোয়াড়দের মধ্যে যারা প্রতিভাবান যশস্বী ছিলেন তারা হলেন রবিউল আলম, এনায়েতুর রহমান, কালীপদ, অমূল্য, নিখিল নাগ, রোকন চৌধুরী, রঞ্জু চৌধুরী, কুদরত আলী, কুটি মনি, গোলাম মওলা, খলিলুর রহমান, গণেশ, শুকরী, মঞ্জুর মোর্শেদ বাদশা, এনায়েত করিম, মোহন, নিমাই, রাধাকান্ত, আজিজ, গৌড় ও আরো অনেকে। সকলেই ফুটবল জগতের রাজবাড়ি তথা দেশের কৃতি সন্তান। এদের মধ্যে অনেকেই ঢাকা ১ম বিভাগ ফুটবল লীগে নিয়মিত খেলতেন। স্বাধীনতা পরবর্তী কালেও ফুটবলের এ গৌরব অক্ষুন্ন থাকে এ প্রজন্মের ফুটবলারের মধ্যে- মোয়াজ্জেম, মঞ্জুরুল আলম দুলাল, শাজাহান, এনামুল, লিটন, হোসেন, মনোজ, কমল, হাই, মান্নান, হাবিব, হারুন, সাহা, জলিল, কুটি, হিরা প্রমুখ। তাদের মধ্যে অনেকেই ভাতীয় পর্যায়ের খেলোয়াড় ছিলেন। ফুটবলের সংগঠক ও রেফারী হিসেবে গৌরবময় ঐতিহ্য সৃষ্টি করেছেন ভুপেশ চন্দ্র মজুমদার, যোগেশ কুণ্ড, (এরা দুজনই এফআইএ অনুমোদিত) সুরেন লাহিড়ী, হাবিবুর রহমান, ডিএমএন ইসলাম, জলিল মিয়া, নবকৃষ্ণ চক্রবর্তী, ফজলুল হক মোকাতার, এম এ মোমেন (বাচ্চু মাস্টার), মোশারফ হোসেনে, রণজিৎ কুমার বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। বর্তমানে যারা এ গুরুদায়িত্ব পালন করে চলেছেন তারা এনায়েতুর রহমান, কমল চক্রবর্তী, কুটি, নিমাই ঘোষ, শাজাহান, মোয়াজ্জেম, কাজী মতিন, মঞ্জুরুল আলম দুলাল প্রমুখ।

লন টেনিসে রাজবাড়ির বিশেষ গৌরব রয়েছে। হোসনেবাগ হল সংলগ্ন টেনিস মাঠ (বর্তমানে অবলুপ্ত) সে ঐতিহ্যের ধারক। বর্তমানে অফিসার ক্লাব লন টেনিস মাঠ সে ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। বেলগাছির হিরালাল, শিবলাল দুই ভাই বিশ্বমানের টেনিস খেলোয়াড়। তারা জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন।

১৯৮৬ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ে যুব ভলিবল প্রতিযোগিতায় রাজবাড়ি জেলা দল রানার্স আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে। সুযোগ্য কোচ মঞ্জুর এলাহী এ খেলার নেতৃত্ব দেন। ১৯৯১ সালে অনুষ্ঠিত জাতীয় পর্যায়ে বিভিাগীয় মিলনার্স ভলিবল প্রতিযোগিতায় রাজবাড়ি দল ২য় স্থান অধিকার করে। ১৯৮৯-১৯৯২ সাল পর্যন্ত  ঢাকা বিভাগীয় ভলিবল রাজবাড়ি চ্যাম্পিয়ন হয়। পুতুল ঘোষ সাফ গেমসে খেলার সুযোগ লাভ করে।

এ্যাথলেটিক্স এ রয়েছে রাজবাড়ির গৌরময় ইতিহাস। শহিদুন্নবী আলম ও মোসলেহ উদ্দিন বিশেষভাবে এ কৃতিত্বের দাবিদার। দৌড়ে শহিদুন্নবী আলম প্রথমবার পূর্ব-পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন হন এবং ২য় বার ৮০০ মিটার দৌড়ে পূর্ব-পাকিস্তান অলিম্পিকে ৩য় স্থান অধিকার করেন। মোসলেহ উদ্দিন নৌবাহিনীর হয়ে হাই জাম্পে পাকিস্তান অলিম্পিকে অংশ নিতেন। শের আলী পাকিস্তান অলিম্পিকে প্রতিবারই ডাইভিংয়ে ১ম হতেন। ১৯৯০-৯১ এ অনুষ্ঠিত বিভাগীয় এ্যাথলেটিক্স প্রতিযোগিতায় কৃষ্ণা সরকার এবং নিঃস্কৃতি দেশমুখ যথাক্রমে বর্শা নিক্ষেপ এবং লৌহ গোলক নিক্ষেপে সোনা জয় করেন।

পদ্মা আর গড়াইয়ের উদ্দাম উত্তাল ঢেউয়ের সাথে পাল্লা দিয়ে গড়ে উঠেছে রাজবাড়ির মানুষের জীবন ধারা। এ ধারার সাঁতার তাদের জীবনের প্রতিষ্ঠা। পঞ্চাশের দশক থেকে সাঁতার প্রতিযোগিতা হিসেবে রুপ নিলেও স্বাধীনতার পর থেকে রজাবাড়ির সাতারুরা বিশ্বমানে উঠে এসেছে। আঃ রব, আঃ রাজ্জাক, এটিএম রফিক উদ্দিন পারিবারিক সূত্রে চার সহোদর এক শক্তিতে উদ্ধুদ্ধ হয়েছিলেন সেই কবে, কয়েক যুগ পূর্বে।


সেই থেকে শহিদুন্নবী আলম, মোহাম্মদ আলী, মহসীন উদ্দিন, এরশাদুন্নবী সেলু (বর্তমানে জাতীয় কোচ) গ্রথিত হয়েছেন কালের সৃষ্টির প্রক্রিয়া সাঁতারে। আজ রাজবাড়ি তথা দেশের গৌরবময় ইতিহাসে জাতীয় কোচ এরশাদুন্নবী ও তাঁর সহযোগী কোচ স্বপন চন্দ্র ও কৃষ্ণা বসুর অক্লান্ত শ্রমে রাজবাড়িতে গড়ে ওঠে একদল কৃতি সাঁতারু। আসমা, আলেয়া, সীমা, খাদেজাতুল কোবরা, কৃষ্ণা, বিথি, সেলিনা আক্তার, লায়লা নূর, নূরই-আফরোজ, পুতুল, মিতা, নিবেদিতা, সালমির নাম উল্লেখযোগ্য। ১৯৮৩ সালে বয়সভিত্তিক জাতীয় সাঁতারে লায়লা নূর একাই ১২টি সোনা জিতে রেকর্ড সৃষ্টি করেন। তিনি জাতীয় পর্যায়ে ব্যক্তিগত ৬ বার চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেন। তিনিই একমাত্র মহিলা সাঁতারু যিনি আন্তর্জাতিক সাঁতার প্রতিযোগিতায় শ্রীলঙ্কার সাফ গেমসে অংশ নিয়ে ২টি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। লায়লা নূর দেশের ১ম মহিলা কোচ হিসেবে ভারত, পাকিস্তান এবং জার্মানিতে উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য ডাক পান। তিনি এ পর্যন্ত ৮০টি পদকের কৃতিত্বের দাবিদার। বর্তমান তিনি সাঁতার ফেডারেশনের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য। এরপর মিতা সোম ৪টি সোনা, নিবেদিতা ৩টি সোনা ও ১টি রুপা ও ২টি তামা জয়ের গৌরব অর্জন করেন। ১৯৯২-৯৩ সালে বয়সভিত্তিক জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় নিবেদিতা দাস ৩টি জাতীয় রেকর্ডসহ ব্যক্তিগত চ্যাম্পিয়ন এবং মিতা সোম নতুন রেকর্ডসহ ব্যক্তিগত রানার্সআপ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন রাজবাড়িতে একটি সুইমিং পুল নির্মিত হয়েছে।

রাজবাড়ির কৃতি সন্তান এবং দেশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র মুন্নী আক্তার ডলি। সিডনী অলিম্পিক-২০০০ তিনি প্রথম একমাত্র মহিলা সাঁতারু যিনি আন্তর্জাতিক ইভেন্টে যোগদান করেন। সাফ গেমসসহ জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় সোনা, রুপা জিতে নিয়েছেন এবং চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেন। তার সঙ্কল্প দৃঢ়। সু-শৃংখল তাঁর কর্মপ্রয়াস। তিনি আগামী দিনে দেশের মান বৃদ্ধি করবেন এ তার প্রত্যাশা।

জেলার ক্রীড়া জগতের এ গৌরবের স্বীকৃতি জেলাবাসী অনেকাংশে লাভ করেছে। রাজবাড়ি জেলার ক্রীড়া জগতের অবকাঠামোগত উন্নয়নে যাঁর অবদান অস্বীকার করলে অকৃতজ্ঞ হতে হবে তিনি হচ্ছেন অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম (সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিষয়ক মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি স্টেডিয়ামের আংশিক নির্মাণকাজ, জাতীয় এক্রোবেটিক সেন্টার ও সুইমিংপুল নির্মাণে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।

 সাবেক মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য রাজবাড়ি-১ আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং রাজবাড়ি-২ আসনের মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য- মোঃ নাসিরুল হক সাবু জেলার ক্রীড়া জগতের উন্নতি ও প্রসারে বলিষ্ঠ ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমান মাননীয় জাতীয় সংসদ সদস্য রাজবাড়ি-১ কাজী কেরামত আলী ও রাজবাড়ি-২ আসনের জিল্লুল হাকিম ক্রীড়া জগতের উন্নতিতে অনন্য ভূমিকা রেখে চলেছেন। সাবেক জেলা প্রশাসক বিজনকান্তি সরকারের উদ্যোগে ক্রীড়া জগৎসহ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ভিন্নমাত্রা লাভ করে। এর সাথে যাদের অবদান, আগ্রহ, প্রচেষ্টা ও নিরন্তর রাজবাড়ি ক্রীড়া জগতের প্রসার পরিমার্জন পরিবর্ধন করেছে, তারা এ জেলারই সকল গুণী মানুষ ও সকল স্তরের জনগণ।

বি.দ্র. ক্ষুদ্র পরিসরে অনেক কৃতি খেলোয়াড়ুদের নাম উল্লেখ করা সম্ভব হয়নি এ জন্য লেখক ক্ষমাপ্রার্থী।

জাতীয় এ্যাক্রোবেটিকস রাজবাড়ি

এ্যাক্রোবেটিসসের আভিধানিক অর্থ মল্লক্রীড়া বা ব্যায়ামদি বা দড়াবাজিকর। এর শব্দমান যাহোক এ্যাক্রোবেটিকস বলতে যা বোঝায় তা হলো অপূর্ব শারীরিক কৌশল প্রদর্শনে একধরনের খেলা। দড়ি বেয়ে এ্যাক্রোবেটস তাতে অনেক উঁচুতে ভারসাম্য রক্ষা করে, বল নাচিয়ে, বিভিন্ন কৌশলে শূন্যে ডিগবাজী দিয়ে, শারীরকে বিভিন্ন কৌশলে বাঁকিয়ে খেলা প্রদর্শন করে। এটি বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের শিল্প বলে পরিচিতি লাভ করেছে। এ ব্যাপারে চীন, দক্ষিণকোরিয়া পৃথিবীতে সেরা এ্যাক্রোবেটিকস বলে পরিচিত। বাংলাদেশে আন্তজাতিক মানের এ্যাক্রোবেটিকস দল গঠনের নিমিত্তে তৎকালীন সংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম রাজবাড়িতে ১৯৯৩ সালে জাতীয় এ্যাক্রোবেটিকস সেন্টার প্রতিষ্ঠা করেন।


রাজবাড়ি থেকে টুটুল জাহাঙ্গীর, আসমা, নাজমা, ফরিদা, রাশেদা, আনোয়ারসহ ৩৭ জন এ্যাক্রোবেটিক বাছাই করে ঢাকায় চীনা প্রশিক্ষক দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয়। পরবর্তীতে দলটি স্থানীয়ভাবে হোসনেবাগ হলে নিয়মিত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে থাকে। বর্তমানে রাজবাড়ি থেকে ২ কিলোমিটার দূরে শ্রীপুর জাতীয় এ্যাক্রোবিটিকস প্রশিক্ষণ কমপ্লেক্স প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। চীনা প্রশিক্ষক উইই বর্তমানে এ কমপ্লেক্স ৩৭ সদস্যবিশিষ্ট দলকে আন্তর্জাতিক মানের এ্যাক্রোবেটিক দল গঠনের উদ্দেশ্যে নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রদান করেন। উল্লেখ্য সার্কভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে রাজবাড়ি জাতীয় এ্যাক্রোবেটিকস একমাত্র প্রতিষ্ঠান।

রামকানাই শীল্ড

রাজবাড়ির খানখানাপুর ঐতিহ্যবাহী স্থান বৃটিশ শাসনামলে জমিদার, জোতদার, খানবাহাদুরের পৃষ্ঠপোষকতায় এ অঞ্চলে ফুটবল খেলা বিশেষ সুনাম অর্জন করে। খানখানাপুরের জোতদার ছিলেন রামকানাই কুণ্ডু। রামকানাই কুণ্ডুর পৃষ্ঠপোষকতায় ১৯৩৫ সাল থেকে রামকানাই কুণ্ডু শীল্ডের লীগ খানখানাপুর মাঠে শুরু হয়। কথিত আছে, এ শীল্ড আইএফএ শীল্ডের সমান ছিল। পরবর্তীতে এ শিল্ডটি আইএফএ থেকে দুই ইঞ্চি ছোট করে দেওয়া হয়। খানখানাপুর মাঠে এ শীল্ডের লীগ খেলায় কলিকাতা থেকে নামকরা সব টিম যোগদান করত। তৎকালীন সময়ে বাংলায় এ শীল্ডের নাম ছড়িয়ে পড়ে এবং ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, মাগুরা এতদঞ্চলে এত বড় লীগ খেলা হত না।

 

বেলগাছি আলীমুজ্জামান শীল্ড

বেলগাছিতে আলীমুজ্জামান শীল্ডের খেলা বেলগাছি মাঠে অনুষ্ঠিত হত। এই শীল্ডের খেলাও তৎকালীন সময়ে এলাকায় আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল।

 

 

নূর হোসেন (সোনা দা)

রাজবাড়ির খেলাধুলার জগতে নূর হোসেন (সোনা দা) কিংবদন্তি নাম। রাজবাড়ির নূর হোসেন (সোনা দা) ছিলেন বিভাগ পূর্ব কলিকাতা মোহামেডানের বিখ্যাত ফুটবলার। পরে এদেশেও ঢাকায় অপরিহার্য ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত ছিলেন। মধ্য ষাট দশকে ফুটবলে সর্বাধুনিক ৪-৪-২ পদ্ধতি প্রবর্তনে তিনি ছিলেন অগ্রসৈনিক।

 

হিরালাল, শিবলাল

লনটেনিস রাজবাড়ির অতীত গৌরব। হোসনেবাগ হলের লনটেনিস মাঠ, পোস্ট অফিস সংলগ্ন লনটেনিস মাঠ (বর্তমানে অবলুপ্ত), অফিসার্স ক্লাব লনটেনিস মাঠ এ ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। রাজবাড়ি জেলার এ ঐতিহ্যের সূত্র ধরে বর্তমানে হিরালাল, শিবলাল বিশ্বমানের টেনিস খেলোয়াড়। হিরালাল শিবলালের পিতা সূর্যলাল, গ্রাম-হরিহরপুর, ইউনিয়ন খানগঞ্জ (বেলগাছি)। হিরালাল, শিবলাল ছোট বেলা থেকেই ঢাকা ক্লাবের সাথে সংশ্লিষ্ট হয়ে বর্তমানে বাংলাদেশের সেরা লনটেনিস খেলোয়াড়। হিরালাল শিবলাল জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত হয়েছেন এবং বর্তমানে আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষক।


অলিম্পিক তারকা ডলি আক্তার

বাংলাদেশের ক্রীড়া জগৎকে উচ্চতর মানে উন্নীত করেছেন রাজবাড়ির মেয়ে ডলি আক্তার। তিনি সাঁতার জগতের তারকা। মেয়েদের মধ্যে একমাত্র ডলি আক্তার পর পর তিনবার বাংলাদেশ থেকে অলিম্পিকে যোগদান করেন। ২০০০ সালে সিডনী অলিম্পিকে, ২০০৪ সালে গ্রীস অলিম্পিকে এবং ২০০৮ সালে চীনে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ থেকে ছয় ক্রীড়াবিদের মধ্যে ডলি অংশগ্রহণ করেন। অলিম্পিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে সে কথা সকলের জানা। অনুন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ ক্রীড়ার উন্নয়নে অর্থ ব্যয় করতে পারে না। তারপরেও অলিম্পিকে অংশগ্রহণ জাতির ভাবমর্যদা বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া সাফগেমসে বাংলাদেশের অর্জন কম নয়।

সংগ্রামী জীবনের প্রতীক ডলি মেধা, একনিষ্ঠতা আর অনুশীলনে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্থান করে নিয়েছেন। রাজবাড়ি শহরের ভবানীপুরের রওশন আলী ও আমেনা বেগমের এক ছেলে এক মেয়ে। বড় সন্তান ডলি আক্তার শিশু বয়সেই বড় কিছু হওয়ার স্বপ্ন লালন করে মনে মনে। দারিদ্র পিতা মাতার সন্তানদের আকাশ দেখার স্বাদ যেন আকাশ কুসুম কল্পনা। তাই বলে কি তাদের আকাশ দেখা মানা? দরিদ্র পিতা মাতা তাকে স্কুলে ভর্তি করেন। সে সাথে সাঁতারু হয়ে ওঠার জন্য জেলর অন্যতম ক্রীড়াবিদ শহীদুন্নবী আলমের তত্ত্বাবধানে দেন। শহীদুন্নবী আলম ধীরে ধীরে নানা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাকে যোগ্য করে তোলেন। প্রথমে স্থানীয় পর্যায়ে এবং পরে জাতীয় পর্যায়ে একের পর এক প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অধিকার করেন। এক সময় ডলি জাতীয় অঙ্গন থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেন। ‘৯৯ সালে কাঠমুণ্ডু সাফ গেমসে ১০০ মিটার ব্রেস্ট স্ট্রোকে রৌপ্যপদক জয় করেন। ইসলামাবাদ সাফ গেমসে ২টি ব্রোঞ্জ, কলম্বো সাফ গেমসে ১টি রৌপ্য ও ২টি ব্রোঞ্জ পদক জয় করেন। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সাঁতারু ডলি আক্তার রাজবাড়ি তথা দেশের গর্ব। রাজবাড়িতে তাকে ২০০২ সালে শিল্পকলা একাডেমীতে নাগরিক সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

এএসএম এরশাদুন নবী

এএসএম এরশাদুন নবী রাজবাড়ির গৌরব ও কৃতিসন্তান। জেষ্ঠ্য ভ্রাতা শহীদুন্নবী আলম বীর মুক্তিযোদ্ধা ও জাতীয় এথলেটিকস। দৌড়ে তৎকালীন পূর্ব - পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন। শহীদুন্নবী রাজবাড়ির ক্রীড়া জগতের উন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেন। রাজবাড়িতে গড়ে তোলেন সাঁতার প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা। জেষ্ঠ্য ভাইয়ের উৎসাহে এরশাদুন নবী সাঁতার জগতে প্রবেশ করেন। নিরলস প্রচেষ্টা, দক্ষতায় নিজের ভূবনে নিজেকে সু্রিতিষ্ঠিত করেছেন। সাঁতার নৈপুণ্যে তিনি নানা সম্মাননা লাভ করেন। পরবর্তীকালে তিনি দেশের সাঁতার জগতের উন্নয়নে নিজেকে সমর্পণ করেন। বর্তমানে তিনি জাতীয় স্পোর্টস কাউন্সিল সাঁতার বিভাগের চীফ কোচ। তার প্রচেষ্টায় রাজবাড়ির সাঁতার জগৎ ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। রাজবাড়ির সুইপিংপুল প্রতিষ্ঠায় নানা ভূমিকাসহ তিনি স্থানীয় ও জাতীয় পর্যায়ে অসংখ্য সাঁতার তারকা গড়ে তুলেছেন। এরশাদুন নবীর জন্ম ১৯৫৩ সালে রাজবাড়ি শহরে। পিতা মরহুম মওলানা সৈয়দ আশরাফ আলী আল কাদরী। ছাত্রজীবন কেটেছে জেলা স্কুল ও রাজবাড়ি কলেজে। অতি বিনয়ী ও ভদ্র এরশাদুন নবী রাজবাড়ির গর্ব।

 

 

Additional information