মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি

মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ জেলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। জেলায় সংগঠিত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাথাসহ সকল সংগঠিত ঘটনার বিবরণ স্বল্পপরিসরের এ গ্রন্থে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে লেখক ক্ষমা প্রার্থনা জানায়। রাজবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যতটুকু এ গ্রন্থে আলোকপাত করা হল তা কোনো গবেষকের সাহায্য করবে বলে আমি মনে করি। আমি কেবল রাজবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের একটি রুপরেখা অঙ্কন করলাম। রাষ্ট্রবিকাশ ঐতিহাসিক ধারার ক্রিয়াফল। অধ্যাপক গার্নার রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিকাশের অন্ত র্নিহিত উপাদানের মধ্যে জাতি রাষ্ট্রের বিকাশে জাতি তত্ত্বই মুখ্য বিষয় বলে ব্যক্ত করেছেন। দুই হাজারেরও বেশি সময় ধরে গঙ্গা, ভাগিরথী, পদ্মা, মেঘনার উত্থিত সমতলে বাঙ্গাল বলে একটি জাতি আত্মপরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে।

রাজবাড়ির প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা  আব্দুল আজিজ খুশীএ জাতি শারীরিক গঠনে বেঁটে, বর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম, স্বভাব নরম কোমল সাদাসিদে, বুদ্ধিতে তিক্ষ্ণতার ছাপ। বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেও তাদের মধ্যে জাতিতত্ত্বের বিকাশ না ঘটায় হাজার বছরের স্বকীয়তায় স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে সমর্থ হয় নাই। বৃটিশ শাসনের অবসানকালে ১৯৪৭ এ বাংলার এক অংশ (পশ্চিমবাংলা) ভারতের সাথে এবং অন্য অংশ পূর্ববাংলা পাকিস্তানের সাথে অঙ্গীভূত হয়। পশ্চিমবাংলা এখনো ভারতের অঙ্গরাষ্ট্র কিন্তু পূর্ববাংলা জাতিত্বের সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, ১১ দফা, ৬ দফা ১৯৬৯ এর গণ-আন্দোলনসহ সকল আন্দোলন ও আত্মপরিচিতির মাধ্যমে পূর্ব-পাকিস্তানিরা যেভাবে জাতিবোধে উজ্জীবিত হয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বাঙালি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন করে। জাতিত্বের ভিত্তিতে তারা বাঙালি এবং জাতীয় ভিত্তিতে বাংলাদেশী বলে পরিচিতি লাভ করে।

চরম আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং আক্রোশের কারণে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনে রাজনৈতিক অধিকার অত্যাবশ্যক। এ সূত্রেই বাঙালি জাতি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় ইয়াহিয়া ও ভুট্রোর কূটকৌশল, টিক্কা খানের নির্বিচার গণহত্যায় এ যুদ্ধ ছিল অনিবার্য। যুদ্ধের এ অনিবার্যতা মেনে নিলেও বাঙালি জাতির মধ্যে ক্রমে ক্রমে যে আক্রোশ ও স্বাধীকার জমে উঠেছিল ঘটনার প্রবাহে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটেছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও তৎকালীন সামরিক শাসক প্রধান ও পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্রোর চক্রান্তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে দেওয়া হবে না এ চক্রান্তেই তারা মেতে ওঠে। ‘খো বদেরা বাহনা বেশিয়ার’ প্রবাদটি পশতু ভাষায়, ‘দুর্জনের ছল অনেক রকম।’ প্রায় বাংলার কাছাছাছি, ‘দুর্জনের ছলের অভাব হয় না।’ বলাবাহুল্য সব আলোচনাই ব্যর্থ হল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রি। বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিকজান্তার হাতে বন্দি হলেন। ২৫ মার্চের সেই রাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে ভারী অস্ত্রের গুলির আঘাতে শত শত মানুষ নিহত হল। কামান, মর্টার বন্দুকের গুলির শব্দে ঢাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। অসহায় মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক পালাতে শুরু করল। হতবাক মানুষের বুক ফেটে আর্তনাদ

Additional information