মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-২

রাত্রি হল কাল

পূব গগণে সূর্য উঠেছে

রক্ত লাল রক্ত লাল

চৈত্রের খরায় পুড়ছে ফসল, গুলিতে মরছে মানুষ। কেবল মাঝে মাঝে কলিকাতা বেতার থেকে ভেসে আসছে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ সে এক অভাবনীয় লোমহর্ষক ভয়াল অনুভূতি। কালের যাত্রা কোনো কালেই থেমে থাকে না। যে যাত্রা শুরু হল তার রথ চলতে থাকবে এটাই জাগতিক বিধি।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তন্তর বিষয়ে ইয়াহিয়া ও ভুট্রো নানা টালবাহানা শুরু করে। সৃষ্টি হতে থাকে নানা বাদ প্রতিবাদ। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ক্ষমতা হস্তান্তর। ২৮ ফেব্রুয়ার রাজবাড়ি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের অভিষেক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি রাজবাড়ি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন যুগ্ন সচিব কাজী আজহার আলী বক্তৃতার শুরুতেই বললেন, ‘আমি দেশের যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি তাতে এ জাতির বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া কোনো গতি নেই। উচ্চ পদস্থ এ কর্মকর্তার এমন ভাষণে সমবেত কয়েক হাজার ছাত্র, শিক্ষক, জনতা সচকিত হয়ে উঠেছিল। তাঁর এ ভাষণ ছিল অজানা আশঙ্কার সঙ্কেত এবং সে সাথে কোনো অনিশ্চিত ও ভয়াবহ ঘটনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটমূলে ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব (ডাকসুর ভিপি) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশে ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম----মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম---স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ সময় এ জেলার মানুষ একাত্মতা ঘোষণা করে। চলতে থাকে মিছিল, সমাবেশ। এরপর কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ থেকে ঘোষণা আসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হবে। ২১ মার্চ এক সভায় সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজবাড়িতে পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রনেতা ফরিদ আহমেদ। ঐদিন বেলা ১১টায় রাজবাড়ি শহর মিছিলের শহরে পরিণত হয়। বেলা ১১টায় জলিলুর রহমান, নাজিবুর রহমান, এটিএম রফিক উদ্দিন, মকসুদ আহমেদ (রাজা ভাই), গণেশ নারায়ণ চৌধুরী, অমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ বিল্ডিং এর সামনে সমবেত হন। তাঁরা পাকিস্তানের চাঁদ-তারা খচিত পতাকা ছিঁড়ে ফেলেন। বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলিত হয়। উক্ত পতাকা তৈরি করেছিলেন মজনু খলিফা এবং আলোকচিত্র ধারণ করেন বলাকা স্টুডিওর মালিক সিরাজুল আলশ। পাংশায় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল হাই এবং মাছপাড়ায় এ দায়িত্ব পালন করেন রাজবাড়ি কলেজের তৎকালীন ছাত্রনেতা আব্দুল মতিন। এ সময় পাংশায় উপস্থিত থাকেন আওয়ামী লীগ নেতা হাসান আলী, ছাত্রইউনিয়ন নেতা আব্দুর রহমান, বর্তমান মাননীয় সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিম, সাবেক মাননীয় সংসদ সদস্য নাসিরুল হক সাবু-সহ নেতৃবৃন্দ। পাংশায় পতাকা উত্তোলিত হয় হামিদ আলী হল ময়দানে। ‘গ্রাম বাংলায় লেগেছে আজ গণজোয়ারের ঢেউ’---শিরোনামে রাজবাড়িতে ‘গোয়ালন্দ মহকুমা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’র উদ্যোগে আজাদী ময়দানে এমএ মোমেন বাচ্চু মাস্টারের সভাপতিত্বে পূর্ববাংলার স্বাধীকার ও নির্যাতনের যে সভা অনুষ্ঠিত হয় তা পত্রিকায় প্রকাশ পায়। (১৭ মাচ ১৯৭১, দৈনিক সংবাদ) ২৫ মার্চের কালোরাত্রির পর থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাজবাড়ির মানুষ অসহায় হতবাক হয়ে পড়েছিল। ইতিমধ্যে রাজবাড়িতে সংবাদ আসে ডা. একেএম আসজাদ সাহেবের ভগ্নিপতি আগরতলা মামলার ২নং আসামী, পাকিস্তান নৌবাহিনীর লে.ক. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ভোর রাত্রে পাকিস্তানবাহিনী হত্যা করেছে (দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে বিএনএস শহীদ মোয়াজ্জেম)।

Additional information