মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-১১

তারা বিমান থেকে শেল নিক্ষেপ করতে পারে এমন আশংকায় ১০ এপ্রিল থেকে বিমান আসামাত্রই রাইফেলের গুলি ছুঁড়ে। ১২ এপ্রিল পাকিস্তানবাহিনী জেএন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা নিক্ষেপ করে। দ্বিতীয় বোমা ফেলা হয় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়িতে। এতে মালগাড়ির একটি বগী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তৃতীয় বোমা ফেলা হয় গোয়ালন্দের ঘোষপট্রিতে। এখানে ছয়টি শেল নিক্ষেপ করা হয় যা ছয়টি ঘরে আঘাত করে। এতে নিহত হয় শরৎচন্দ্র ঘোষ, নিয়তী রানী ঘোষ, দিলীপ চন্দ্র ঘোষ। আহন হন দশ জন। ঘোষপট্রির অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল আবু ওসমান চৌধুরীর নির্দেশনায় এক প্লাটুন ইপিআর, ১টি ট্যাংক বিধবংসী কামান, ১টি মেশিনগান, ২টি মেশিনগান ও ৩০৩ বোরের রাইফেলসহ গোয়ালন্দে আসেন। ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা আরিচা থেকে ফেরি ও লঞ্চের বহর নিয়ে গোয়ালন্দ মুখে অগ্রগামী হয়। তারা রেঞ্জের মধ্যে এসে গোয়ালন্দে আক্রমণ চালায়। যোদ্ধারা অবিরল ধারায় গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পাকসেনাদের একটি লঞ্চ ডুবে যায়। তাদের বেশ কিছু সৈন্য পদ্মায় ডুবে মারা যায়। তারা ভীতু হয়ে ঐ দিনই পশ্চাৎগামী হয়। ১৫ এপ্রিল পাকিস্তান বিমানবাহিনী গোয়ালন্দ ঘাটে শেল নিক্ষেপ করে। বোমার আঘাতে ঘোষপট্রি সম্পূর্ণ ধবংস হয়ে যায়। শেল নিক্ষেপে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি ফরিদপুর এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে থাকে।

গোয়ালন্দে পাকবাহিনীর সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ হয় ২১ এপ্রিল ভোর রাতে। ঐ রাতটি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাত। সন্ধ্যা থেকেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছিল। নিকষ অন্ধকারে ঢেকে ছিল আকাশ। সাথে ঝড়ো হাওয়া। এমন দুর্যোগকেই পাকবাহিনী বেছে নিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল হিসেবে। ২১ এপ্রিল ভোর রাতে দুটি ফেরি ও দুটি গানশীপের সমস্ত আলো নিভিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের খুব কাছাকাছি চলে আসে। তারা গানশীপে ট্যাংক বহন করে। গানশীপটি গোয়ালন্দ ঘাটের একদম নিকটবর্তী স্থানে চলে আসে। দ্বিতীয় গানশীপটি সৈন্য বহন করে। তারা কয়েক মাইল দুরে কামারডাঙ্গীতে গানশীপ ভিড়ায়। কিছু সংখ্যক সৈন্য কিনারে নেমে গুলিবর্ষণ করতে থাকে এ সময় মুক্তিকামী যোদ্ধারা তাদের অবস্থান ঠিক করে। মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণের জবাবে গুলিবর্ষণ করে। তারা প্রায় এক ঘন্টা প্রতিরোধ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু পাকবাহিনী প্রচণ্ডভাবে মর্টার শেল নিক্ষেপ এবং মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করতে থাকলে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে আসতে থাকে। বেলা আটটার দিকে ট্যাংকবহর ফেরি ঘাটে উঠায় এবং ট্যাংক নিয়ে প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে গোয়ালন্দ বাজারের দিকে অগ্রগামী হয়। এ সময় প্রতিরোধকারী কিছু সৈন্য নিহত হয়। গানশীপ থেকে শত শত সৈন্য নেমে আসে এবং তারা গোয়ালন্দ ঘাটের দখল নিয়ে দোকানপাট লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফকীর মোঃ মহিউদ্দিন শাহাদত বরণ করেণ। গোয়ালন্দ থেকে কয়েক ট্রাক ভর্তি পাকবাহিনী রাজবাড়ি অভিমুখে যাত্রা করে। পথে খানকানাপুর বাজারে প্রবেশ করে।

প্রবেশ পথে আব্দুল গনি গেটু খলিফার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এরপর খানখানাপুর সুরাজমোহিনী বিদ্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর বিদ্যালয়ের শিক্ষক তারাপদ মাস্টারের বাড়ি আগুন দেয়। তারা খানখানাপুরের পাটের গুদামসমূহ আগুনে পুড়িয়ে যগল কুণ্ডু ও রাখাল কুণ্ডু, এই দুই ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের খোঁজ আর মেলেনি।

খানখানাপুর থেকে সরাসরি সিএন্ডবি রোড ধরে পাকবাহিনী রাজবাড়ি শহরে প্রবেশ করে। প্রবেশমুখে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক শাহ মুহম্মদ ফরিদ তাদের মুখোমুখি হন। রাজবাড়ি শহর রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তাদের এই বলে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, ‘রাজবাড়ি শহরে কোনো মুক্তিকামী সৈন্য নেই।’ পাকবাহিনী প্রধান সড়ক ধরে বাজারের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আব্দুর রাজ্জাক তার নিজের বন্দুক দিয়ে ওভার ব্রিজের ওপর থেকে একটি গুলি ছোঁড়ে। হানাদার বাহিনী এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাথাড়ী গুলি ছুঁড়তে থাকে। তারা শহরের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী হাকিম মিয়ার হোটেলটি পুড়িয়ে দেয়।

Additional information