মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-১২

রেলগেট পার হয়ে কাবুলী বিল্ডিং-এ আগুন দেয়। তৎকালীন সময়ে সব দোকানপাটই ছিল টিনের ঘর। স্টেশন রোড ধরে অগ্রসর হতে হতে ডানে বাঁয়ের বেশিরভাগ দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়। তারা একজন পাগলকে গুলি করে হত্যা করে। বেলী আইসক্রীমের মালিককে গুলি করে হত্যা করে হত্যা করে। ওদিকে আর একটি ট্রাক ভর্তি পাকহানাদার মক্তবমোড়ে রাস্তাধরে কাজী হেদায়েত হোসেনের বাড়ির দিকে যেতে ডা. আসজাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। কাজী সাহেবের বাড়িতে মর্টার শেল নিক্ষেপ করে। বাচ্চু মাস্টার বাড়িতে আগুন দেয়। তারা অ্যাডভোকেট কালীশংকর মৈত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। মহকুমা প্রশাসক শাহ মোঃ ফরিদকে বন্দি করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টমেন্ট ও পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করে। তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর তারা শহর ও শহর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে। পলায়নরত মানুষের ওপর তারা গুলি করে। অনেকে নিহত ও আহত হয়। এ সময় মঞ্জুর মোরশেদ বাদশা গুলিতে আহত হন।

বিহারীদের গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের কয়েকটি স্থানে বিশেষ করে সৈয়দপুর, খুলনা, রাজবাড়িতে বিহারীদের দ্বারা বাঙালি হত্যা এক স্মরণীয় ইতিহাস। এরমধ্যে রাজবাড়িতে বিহারীদের দ্বারা লুটপাট, হত্যা, অগ্নিসংযোগের মাত্রা ছিল অন্যান্য যেকোনো স্থানের চেয়ে তীব্র।

১৯৪৭ এর পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর ননবেঙ্গলি উর্দুভাষী বিহার থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। মুসলমান হলেও সম্প্রদায়গত ভাষা ও সংস্কৃতিতে তারা বাঙালিদের থেকে ছিল আলাদা। মুক্তিযুদ্ধকালে এ সম্প্রদায়টি পুরোপুরি পাকসেনাদের সমর্থন দেয় এবং তাদের দোসর হিসেবে কাজ করে। অভিবাসিত হওয়ার পর পরই বিহারীরা রেলের ড্রাইভার, খালাসী, নিম্নমান সরকারি চাকরি, ক্ষুদ্র ব্যসসা, দোকান, হোটেল, কসাই, দর্জি ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত হয়। রাজবাড়ি শহরের পূর্ব ও পশ্চিমে সরকারীভাবে তাদের বাসস্থানের জন্য দুটি কলোনী নির্মাণ করে যা আজও বিহারী কলোনী হিসেবে পরিচিত। এসব কলোনীতে প্রায় দশ হাজার বিহারী বাস করত। এছাড়া আলীপুর হাট, শহীদ ওহাবপুর হাট, খানখানাপুর হাট, কলোনী ছিল। গোয়ালন্দ ঘাটে প্রায় দুশ বিহারী বাস করত। বালিয়াকান্দি ও পাংশাতেও কিছু বিহারী ছিল। উল্লেখ্য ৩৬ মার্চ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত পাকবাহিনী প্রাথমিকভাবে বাঙালিদের দ্বারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় কিন্তু এপ্রিলের শেষাবধি তারা শান্তিবাহিনী, বিহারী দোসর এবং প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে সারাদেশের নিয়ন্ত্রণ ভার সুদৃঢ় করে। বলা যায় তখন থেকে শুরু হয় প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ। এ সময়কালের সংগঠিত যুদ্ধ এবং বিহারীদের প্রসঙ্গ মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সমৃদ্ধ ইতিহাস। এ গ্রন্থের ক্ষুদ্র পরিসরে তার ব্যাপক আলোচনা সম্ভব না হলেও এর ধারাবাহিক রুপরেখা দেওয়া হল। দীর্ঘদিনের বসবাসে বিহারী ও বাঙালিদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠলেও ক্র্যাক ডাউনের পর সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। বাঙালিরা প্রথমে বিহারীদের প্রতি বিরুপ আচারণ করলেও তা ছিল নিতান্তই ঝগড়া ফ্যাসাদের মত। তা কোনো আক্রমণাত্মক বিষয় ছিল না। পাকবাহিনী ২০ এপ্রিল রাজবাড়ি দখল নেওয়ার পর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজবাড়ি শহর, বাশ্ববর্তী এলাকাসহ গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি, পাংশায় হত্যা, লুটপাট, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের বিভিষিকা সৃষ্টি করে। রাজবাড়ি শহর ‍প্রকৃত অর্থে বিহারী ভিতির শহরে পরিণত হয়। বিহারীদের ভয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। শহর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়।

মে মাসের ১ম সপ্তাহে রাজবাড়ির অবস্থা জানতে নাড়ুয়া থেকে ১২/১৪ মাইল পায়ে হেঁটে রাজবাড়ি আসি। আমি তখন রাজবাড়ি কলেজের প্রভাষক। কলেজ রোড ধরে যেতে আরএসকে স্কুলের নিকট কলেজ বেয়ারা আলীর সাথে দেখা হতে সে বলল স্যার কলেজে যান, আমি বাজার থেকে আসছি। অধ্যক্ষের কক্ষে বসে থাকা অবস্থায় একটা গুলির শব্দ শুনতে পেলাম।

Additional information