মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-১৩

খবর এল বিহারীরা গুলি করে আলীকে হত্যা করেছে। ২৪ মে গভীর রাতে রাজবাড়ি পৌরসভার চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান এর বাড়িতে আক্রমণ করে। হাবিবুর রহমান প্রকাশ্যে বাঙালি হত্যার বিচার চেয়েছিলেন। এই অজুহাতে বাড়ি আক্রমণ করে। সে রাতে তিনি বাসায় ছিলেন না। তাকে না পেয়ে তার ভাই আশ্রাফ উদ্দিন, আলাউদ্দিন ও ভাইয়ের ছেলে আতাউর রহমানকে ঘর থেকে বের করে গলি করে হত্যা করে। ৩০ এপ্রিল রাজা সূর্যকুমারের নাতি সৌমেন্দ্র গুহ রায়ের পুত্র সোমেন্দ্র মোহন গুহকে বাজারস্থ নিজ ঘরেই হত্যা করে। তার ঐ দিন জগদ্বন্ধু দত্তকে হত্যা করে। রাজবাড়ি জেলখানা মসজিদের ইমাম কাজী সামসুদ্দিন কয়েকজন বিহারীকে ডেকে এসব হত্যার পরিণতি বিষয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেন। এরপর াতঁকে বিহারীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। ৩০ এপ্রিল তারা মওলানা আবু তাহেরের কিশোরী কন্যাকে অপহরণ করে। একদিন পর তার লাশ পাওয়া যায়। ঐ দিনে আবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। ১৬ মে বিহারীরা বেড়াডাঙ্গার ফিরোজ খান ও আমিনুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে। এভাবে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজবাড়ি শহরের অসংখ্য মানুষ হত্যা করে। রাজবাড়ির তৎকালীন ব্যবসায়ী ও সুধীজন হাকিম মিয়াকেও তারা হত্যা করে।

১১ মে রাজবাড়ি ও খানখানাপুরে বিহারীরা গোয়ালন্দ মোড়ের আহলাদিপুরের ডা. কালীপদ ভট্রাচার্য, তার শিশুপুত্র ও আত্মীয়দের কুপিয়ে হত্যা করে। ২৩ মে বিহারী ও পাকবাহিনী মিলি রামদিয়াতে গণহত্যা চালায়। সেদিনের আক্রমণে রামদিয়ায় ১৩০ জন নিহত হন। নেতৃত্ব দেয় বিহারী চাঁদ খাঁ। জেলার ভিতর এটাই ছিল বিহারী ও পাকবাহিনীর সবচেয়ে নৃশংসতম ও বৃহৎ গণহত্যা। ৩০ মে খানখানাপুর বিহারী কলোনীর বিহারীরা সাহাপাড়ায় হামলা ও লুটপাট করে। তারা লোকনাথ সাহা, কেওরীয়া শীল, জগদীশ শীল, নগেন্দ্র শীলকে হত্যা করে। রামপুর আলাদীপুর কলোনীর বিহারীরা ১জুন রামপুরের আদ্যনাথ শীলের বাড়ি আক্রমণ করে। বিহারীরা আদ্যনাথ-সহ পাঁচজনকে হত্যা করে। ৩ জুন বিহারীরা মূলঘর এলাকায় আক্রমণ চালায় এবং ৫ জনকে হত্যা করে। ৭ জুন বিহারীরা কল্যাণপুরে হামলা চালায়। এ হামলায় অনেক লোক নিহত হয়। নিহতদের সংখ্যা ছিল ২৩। ১৬ জুলাই রাজবাড়ি মুজিব বিল্ডিংয়ের মালিক মোঃ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। জুলাই মাসের শেষে বিহারীরা জৌকুড়া গ্রামে হামলা করে। নিহত হন প্রকাশ কুমার কুণ্ডু, স্বপন কুমার কুণ্ডু, রক্ষণী কুমার কুণ্ডু, শরৎচন্দ্র দাস, নিরোদচন্দ্র কুণ্ডু।

জুলাই মাসের মাঝামাঝি পাকহানাদারবাহিনী বিহারীদের সাহায্য নিয়ে মাছপাড়া গ্রামের শতাধিক বাড়িঘরে আগুন দেয়। মথুরাপুর, রামকোল, মাছপাড়া গ্রামের শতাধিক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। তারা কালুখালি আক্রমণ করে প্রায় দশজনকে হত্যা করে। এভাবে ৯ মাসে বিহারী ও পাকহানাদারবাহিনী রাজবাড়ি শহর ও গ্রাম এলাকার জানা অজানা প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিকল্পনা, ভারত গমন, ট্রেনিং গ্রহণ

প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিরোধ যুদ্ধের পর পাকবাহিনী অত্র অঞ্চলসহ সারাদেশে নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে। তারা চাকরিজীবীদের কাজে যোগদানের ঘোষণা দেয়। স্কুল কলেজ খোলার আদেশ দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে। দু-চারজন এমপি এমএনএ কে তাদের পক্ষে বিবৃতি দেওয়ায়। মৃত্যুর ভয়ে রাজবাড়ির এমএনএ এবিএম নূরুল ইসলাম তাদের পক্ষে রেডিওতে বিবৃতি দেন। তারা শান্তি কমিটি, রাজাকারবাহিনী গঠন করে। মিলিশিয়াবাহিনী গঠন করে স্থানীয় শাসন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু সাধারণ মুক্তিকামী মানুষ এতে মোটেও আস্থা জ্ঞাপন করে না।

Additional information