মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-১৪

তারা গোপনে সংগঠিত হতে থাকে এবং সর্বাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমেই যে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে এ প্রত্যয় তাদের মধ্যে জন্ম নেয়। এ অবস্থায় রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, পাংশা, বালিয়াকান্দির রাজনীতিবিদ, কর্মী, ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ সশস্ত্র যুদ্ধের মোকাবেলায় ভারত ও স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং গ্রহণের প্রস্ততি নেয়। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে ভারত গমন করে। এ সময় রাজবাড়ি থেকে পাকহানাদার, বিহারী, রাজাকার, দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, চোর ডাকাতের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক চতুর্থাংশ হিন্দু মুসলমান ঘরবাড়ি, সহায় সম্পাত্তি ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে ভারত গমন করে। রাজবাড়ি জেলার সমস্ত হিন্দু বসতি এলাকা জনশূন্য বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। তারা কামারখালি, নাড়ুয়া, সমাধিনগর, কশবামাঝাইল, লাঙ্গলবাঁধ গড়াই নদীর ঘাট পাড় হয়ে ভারত গমন করে। তারা কল্যাণপুর ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণের পর কাজী হেদায়েত হোসেনের নেতৃত্বে যোদ্ধাদল গঠন করে। যোদ্ধাদের বিহারের চাকুলিয়া এবং উত্তর প্রদেশের দেরাদুন সেনানিবাসে প্রশিক্ষণ দানের পর গ্রুপ লিডারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রেরণ করা হত। সাধারণ মক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। এখানে মুজিববাহিনী নামে আর একটি পৃথকবাহিনী তৈরি করে দেরাদুনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রকার বন্দুক, রাইফেল, এসএমজি, এসএলআর, হালকা মেশিনগান, ভারি মেশিনগান চালনা, ডিনামাইট, গ্রেনেড, হাতবোমা ছোঁড়া, বেয়নেট চার্জসহ যুদ্ধের নানা কৌশল।

 ভারত থেকে প্রশিক্ষণের পর মেজর আবুল মঞ্জুর, মেজর নাজমূল হুদা প্রমুখের স্বাক্ষরে প্লাটুন গঠন করে লিখিত নিয়োগপত্রের মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমায় পাঠানো হয়। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার, মুজিববাহিনী কমান্ডার হিসেবে তাদের নিয়োগ করা হয়। প্লাটুন কমান্ডারের অধীনে মুক্তিকামী সংগঠনের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। একেএম শহীদুন্নবী আলম গোয়ালন্দ মহকুমার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিযুক্ত হন। ক্রাক ডাউনের পরই তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। গোয়ালন্দ যুদ্ধের পরই তিনি নিজ গ্রাম সুলতানপুরে ২০ জন ‍মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং দান করেন। বিহারীরা তার মাথা লক্ষ টাকা ঘোষণা করে। অতঃপর তিনি বনগাঁ ট্যালী ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণের পর দেরাদুনে ট্রেনিং গ্রহণ করে ব্যারাকপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি ওয়ার্লেস ও সিগনালের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ৮ নং সেক্টর কমান্ডার আবুল মঞ্জুর তাঁকে গোয়ালন্দ মহকুমার (রাজবাড়ি) কমান্ডার নিযুক্ত করেন। তার অধীন গ্রুপ কমান্ডারসহ ‍মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন------মোঃ আব্দুল জলিল (গ্রুপ কমান্ডার), নিখিল কুমার চক্রবর্তী, অধীর কুমার শীল, পবন মণ্ডল, মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক আবদুল মান্নান, আব্দুস সাত্তার-সহ অনেকে। শহীদুন্নবী আলম মহকুমা অধিনায়ক হিসেবে সকল গ্রুপকেই তদারকী ও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন। তার অধীনে মাসলিয়া, বেচখোলা, হমদমপুর তহশীল অফিস ও হমদমপুর প্রাথমিক স্কুলে তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব ক্যাম্পে প্রায় ৩০০ মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ দেওয়া হত এবং অপারেশন পরিচালনা করা হত। রাজবাড়ি মুক্ত হওয়ার শেষে ক্যাম্প ছিল মাটিপাড়ায়। রফিকুল ইসলাম তার গ্রুপ নিয়ে পাঁচুরিয়া, কামরুল হাসান লালী পদ্মার কুলে, আবুল হোসেন বাকাউল (প্লাটুন কমান্ডার) রশড়া এবং অন্যান্য গ্রুপ কমান্ডারগণ  রাজবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন।

Additional information