মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-১৯

লেখকের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়মিত আশ্রয় গ্রহণ করতেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি পাকহানাদারবাহিনী একবার মৃগী ও নাড়ুয়া বাজার লুট করে এবং সাহাদের দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়। তারা সাহা পাড়ায় আগুন দেয়, লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাকসাডাঙ্গীর গ্রামের লোকজন একদিন একরাত পাটক্ষেতে আত্মগোপন করে থাকে। নাড়ুয়া ইউনিয়নে মুক্তিযুদ্ধের একটি দল রোস্তম আলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে।

৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল ১৯ সেপ্টেম্বর ভারতে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে বালিয়াকান্দি উপজেলার গড়াই নদীর তীরবর্তী অঞ্চল দিয়ে এ্যাম্বুশ গ্রহণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের জন্য এ অঞ্চলটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই পার্শ্ববর্তী মাগুরার শক্তিশালী কমান্ডার আকবর চেয়ারম্যানের কমান্ডে কাজ করতেন। তারা মেঘচামী, ঢোলজানী, আরকান্দির বাঘুটিয়া, নাড়ুয়ার মৌলবী ইয়ারউদ্দিন মুন্সির বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। এ অঞ্চল রাজাকারবাহিনী বিশেষ অত্যাচারে মেতে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধারা বালিয়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান আক্তারুল ইসলাম, গাজনার আজিমুদ্দিন চেয়ারম্যান, বহরপুর ইউপির মেম্বর মতিয়ার রহমান, জামালপুরের আলী আকবর, রাজাকার বাহাউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে। বালিয়াকান্দি থানা অপারেশন ও দখল ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসিকতার পরিচয়। জেলার সব অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাগণ রাজবাড়ি আক্রমণের পরিকল্পনা করে। এমতাবস্থায় প্রচুর অস্ত্রের প্রয়োজন বিধায় তারা বালিয়াকান্দি থানা আক্রমণ করে অস্ত্র সংগ্রহ করবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বালিয়াকান্দি থানাটি ছিল সুরক্ষিত। পুলিশ ও রাজাকার মিলে তাদের সংখ্যা ছিল শতাধিক। তারা বাংকার কেটে প্রতিরোধ ব্যূহ নির্মাণ করেছিল। এখানে বিশজন অস্ত্রধারী  মুক্তিযোদ্ধা ৫ ভাগে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ পরিচালনা করে। রাত বারটা নাগাদ থানা আক্রমণ করা হয়। দফায় দফায় সারারাত উভয় পক্ষের গোলাগুলি চলতে থাকে। ভোর রাত পর্যন্ত গোলাগুলি চললেও থানা আয়ত্বে আসে না। এক পর্যায়ে জালাল উদ্দিন খান খেদু (পাকিস্তান ফেরৎ সৈন্য, ঘিকমলা, নাড়ুয়া) চন্দনা নদী পার হয়ে থানার কাছাকাছি এসে কয়েকটি রাইফেল থেকে ক্রমাগত গুলি ছুঁড়তে থাকে। এতে মর্টারের আওয়াজের মতো মনে হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এ সময় জোর চিৎকার দিতে শুরু করে। থানার লোকজন তাতে ভীত হয়ে পড়ে। তারপরেও গুলি চালাতে থাকে। গুলির আঘাতে মুজিববাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার শেখ আব্দুল ওহাব আহত হন। এক পর্যায়ে ৩৩ জন পুলিশ রাজাকার, বিহারী আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান শুনে জনতা ছুটে আসে। সেখানে জাতীয় পতাকা উড়ানো হয়। ৩৩টি রাইফেল, ৩টি শটগানসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। বালিয়াকান্দি থানা দখলের পর হানাদার মুক্ত হয়। তখন থেকে শর্শাপুর (দেবেন্দ্র শিকদারের বাড়ি) বালিয়াকান্দি আমতলা বাজারের নিকটবর্তী এক পরিত্যাক্ত হিন্দু বাড়ি, চেয়ারম্যান আকবর ফকীরের বাড়ি, রাজধরপুর ভেনলাবাড়ির আব্দুর গফুর মোল্লার খামার বাড়ি, ইলিশখোলা ডিডি লাহিড়ীর পরিত্যাক্ত বাড়ি, জামালপুরের সাঙ্গুরা, নাড়ুয়া বাজারের নিকটবর্তী কমান্ডার রস্তম আলীর বাড়ি, জঙ্গল ইউপির ক্ষিদির বাবুর পরিত্যক্ষ বাড়ি, বাকাইডাঙ্গা (বাকসা ডাঙ্গী) তারাপদ সাহার পরিত্যক্ত বাড়ি, বারইগ্রাম ফাঁকা বিলের ধারে ক্যাম্প করে শত শত মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দান করা হয়। মুক্তিযু্দ্ধকালীন পাংশার বিভিন্ন স্থানে অপারেশন চালানো হয়। জিল্লুল হাকিমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ব্রিগেডে ভাগ করা হয়। ৯ আগস্ট ১৯৭১ জিল্লুল হাকিমের কমান্ডে মাছপাড়া রেলস্টেশনে পাহারারত ১৫ জন রাজাকারকে আক্রমণ করা হয়। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে হাতাহাতির পর গোলাগুলি শুরু হয়। এতে আটজন রাজাকার নিহত হয়। মোঃ মোশারফ হোসেন স্ব-উদ্যোগে ইসলামপুর ইউনিয়নবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি শ্রীপুর থানার যুদ্ধ থেকে যুদ্ধ সরঞ্জাম যোগাড় করেন।

Additional information