মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-২০

রাজবাড়িতে ১ সেপ্টেম্বর তিনি রামদিয়া এবং ঐ অঞ্চলের ত্রাস বলে পরিচিত চাঁদ খাঁকে নিজে গুলি করে হত্যা করেন। তিনি ইলিয়াস মিয়ার কমান্ডে ২৫জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে রাজবাড়ি থানা আক্রমণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি অপারেশন ছিল চন্দনা নদীর উপর কালিকাপুর ব্রিজ পাহারারত রাজাকারবাহিনীর উপর। ব্রিজে ২০জন রাজাকার পাহারায় ছিল। অতর্কিত আক্রমণে অনেকে আত্মসমর্পণ করে এবং কিছু রাজাকার পালিয়ে যায়। এ অপারেশনে ২০টি রাইফেল ও কিছু গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। এরপর মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনী মাছপাড়া থেকে কালুখালি পর্যন্ত সব রেল ব্রিজ খুলে ফেলে। জিল্লুল হাকিম ও গ্রুপ কমান্ডার আবুল হোসেনের নেতৃত্বে বহরপুর স্কুলে অবস্থানরত প্রায় ১২৫ জন পুলিশ ও রাজাকারের উপর আক্রমণ করা হয়। এ যুদ্ধে পরাজিতবাহিনীর নিকট থেকে ২ হাজার রাউন্ড গুলি, ১২৫ টি বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।

পাংশায় সবচেয়ে বড় যুদ্ধ সংগঠিত হয় ৫ ডিসেম্বর। ঐদিন পাকহানাদারবাহিনী ট্রেনে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে মাছপাড়া পৌছাতেই মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালায়। হানাদার সেনা বোঝাই রেলগাড়ি ব্রিজ পাড় হতে না হতেই দক্ষিণ দিক থেকে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ শুরু করে। রেলগাড়ির চালককে গুলিবিদ্ধ করা হয়। ফলে গাড়ি থামার সাথে সাথে চারদিকে এ্যামবুশরত মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির আঘাতে গাড়ি ঝাঁঝরা হয়ে যায়। বহু পাকহানাদারবাহিনী হতাহত হয়। পরে কুষ্টিয়া থেকে এক গাড়ি আর্মী তাদের উদ্ধারে আসে। ব্যাপক সংঘর্ষ এড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে ফিরে যায়। এরপর ৬ ডিসেম্বর থেকে রাজবাড়ি থেকে কুষ্টিয়ার সকল পাহারারত সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। পাংশায় মুক্তিযোদ্ধদের সর্ববৃহৎ দলটি পরিচালিত হয় মঞ্জুর মোর্শেদ সাচ্চুর নেতৃত্বে। তিনি ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এক বৃহৎ দল নিয়ে সেপ্টেম্বরে পাংশায় প্রবেশ করেন। তিনি ছিলেন পাংশার মুজিববাহিনীর কমান্ডার। তার বাহিনীটি ছিল একটি ব্রিগেড সমতুল্য। প্রথমে সেনগ্রামে পরিত্যাক্ত একটি বাড়িতে ক্যাম্প করেন। এরপর বাহাদুরপুর ও পাটকিয়াবাড়ি ক্যাম্প সম্প্রসারণ করেন। এসব ক্যাম্পে প্রায় ২০০জনকে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অতঃপর কয়েকটি কমান্ড দলে বিভক্ত করেন। কমান্ডারগণ কালুখালির খামার বাড়ি, বেলগাছি, মদাপুর, চরঝিকুড়ি, হাবাসপুর, মৃগীতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। এসব ক্যাম্প থেকে কখনো বিচ্ছিন্নভাবে কখনো সম্মিলিতভাবে অপারেশন পরিচালনা করা হত।

সেপ্টেম্বর মাঝামাঝি একজন সুবেদার মেজর-সহ ৬/৭ জন পাকসেনা পাংশার পারনারায়ণপুর দাওয়াত খেতে যায়। গোলাম মোর্শেদ সাচ্চু সংবাদ পেয়ে দলবল নিয়ে তাদের আক্রমণ করে। তাতে ২জন পাকহানাদার নিহত হয়। আর একটি অপারেশনে কালুখালি পাংশার মাঝামাঝি মাইল দুয়েক রেল উপড়ে ফেলা হয়। বেলগাছি কালুখালির মাঝামাঝি একটি ব্রিজ বিস্ফোরক দ্বারা উড়িয়ে দেওয়া হয়। আবুল হোসেনের নেতৃত্বে বাড়াইজুরিতে ব্রিজ পাহারারত রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ হয়। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চণ্ডীপুর বিশ্বাস বাড়ি ও কুমারডাঙ্গী মণ্ডল বাড়িতে ক্যাম্প করা হয়। এসময় কালুখালির রেল স্টেশনে পাহারারত রাজাকার ও মিলিশিয়াদের যোগাযোগের মাধ্যমে আত্মসমর্পন করানো হয়। এ অভিযানে নাজির হোসেন চৌধুরী (নিলু চৌধুরী) ও দুলু চৌধুরী বিশেষ সহায়তা দেন। কালিকাপুর রেলব্রিজে পাহারারত ৮ জন রাজাকারকে নিহত করা হয়। যুদ্ধের শেষের দিনগুলোতে পাংশা এলাকার মুক্তিযোদ্ধাগণ অসম সাহসিকতায় পাংশা শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনায় সকল মুক্তিযোদ্ধাদল একত্রিত হয়। ইতিমধ্যে ৩ ডিসেম্বর খোকসা থানা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। মিলিশিয়া, রাজাকার পলায়ন করে। পাংশার মুজিববাহিনী ৬ ডিসেম্বর থানা আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরমধ্যে থানাররক্ষীরা পালিয়ে যায়। পাংশা শত্রু মুক্ত হয়।

Additional information