মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-২১

কামারখালি ঘাটের যুদ্ধ

রাজবাড়ি জেলার সর্বশেষ সীমানায় গড়াই নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত কামারখালি ঐতিহ্যবাহী রেলস্টেশন ও বন্দর। কামারখালিকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ির দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে (মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিক) পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখী যুদ্ধ সংগঠিত হয়। কামারখালির যুদ্ধ ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় এবং ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিমান ও সম্মুখ যুদ্ধ চলে।

৬ ডিসেম্বরের ২/৪ দিন পূর্বেই মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর (ভারতীয়বাহিনী) যৌথ আক্রমণে যশোহর ক্যান্টনমেন্টের পতন ঘটলে পাকিস্তানবাহিনী পিছু হটে আসতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে ফরিদপুর মুখে গড়াই নদীর উত্তর পাড়ে প্রতিরোধ ব্যূহ নির্মাণ করে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করা। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর বিমান, রকেট ও ভারি অস্ত্রের আক্রমণের মুখে পাকিস্তানবাহিনী পিছু হটে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে গড়াই নদীর দক্ষিণ পাড়ে শত শত গাড়িবহর নিয়ে সমবেত হয়। কিছু কিছু গাড়ি গ্রামের মধ্যে এবং কিছু রাস্তার উপর দাঁড় করিয়ে রাখে। ইতিমধ্যে কিছু সৈন্য কামারখালি ঘাটের নদীর উঁচু পাড় ঘেঁষে ৭/৮ কিলোমিটার দীর্ঘ গভীর বাঙ্কার খুঁড়ে প্রতিরোধব্যূহ গড়ে তোলে। নদী থেকে অর্ধ কিলোমিটার দূরে গড়ে তোলে অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত ক্যাম্প। কামারখালি বাজার ও নদীর উত্তর-দক্ষিণ জুড়ে গড়ে তোলে বিরাট রণক্ষেত্র। ৮ ডিসেম্বর তারা ফেরিযোগে নদী পাড় হতে শুরু করে। এ সময় শুরু হয় বিমান আক্রমণ ও বোমা বর্ষণ। আক্রমনে অনেক সামরিক যান ধবংস হয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রকেট হামলা করতে করতে কামারখালি ঘাটের ওপারে গড়াই নদীর পশ্চিমতীরে অবস্থান নেয়। নদীর তীরবর্তী মাজাইল, সান্দারওলা, রায়নগর ও নাকোলে গড়ে তোলে রণক্ষেত্র। এপাড়ে কামারখালি, আড়পাড়া, গাড়িদহ ও ডুমাইন গ্রামে পাকিস্তানবাহিনী রণক্ষেত্র গড়ে তোলে। ৯ ডিসেম্বর উভয় পক্ষের প্রচণ্ড যু্দ্ধ শুরু হয়। রকেট কামানের গোলাবর্ষণ চলতে থাকে। ২/৩ ঘন্টা পর পরই কলকাতা থেকে বিমান উড়ে এসে বোমাবর্ষণ করে অক্ষত অবস্থায় ফিরে যায়। এমনি ছিল সেদিনের অবস্থা। আর ঐ দিনই আমরা রাজবাড়ি কলেজের তিন অধ্যাপক রোস্তম আলী (দর্শন), আনোয়ারুল কাদির (উদ্ভিদ বিদ্যা) ও আমি এই মৃত্যু ফাঁদে জড়িয়ে পড়ি। সে এক লোমহর্ষক কাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে আমরা ১৫/১৬ জন শিক্ষক কলেজ মেসে অবস্থান করছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা ও বিহারীদের মধ্যে যুদ্ধ, সে সাথে বিহারীরা শিক্ষকদের আটক করে জিম্মি বা হত্যা করতে পারে এ আশঙ্কায় যার যার এলাকায় গমন করার সিদ্ধান্ত নেই। সে মোতাবেক ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর অনেকে পদ্মার পাড় ধরে পশ্চিমের পথে যায়। আর আমরা তিন জন ফরিদপুরের পথ ধরে কামারখালি হয়ে দক্ষিণে যাব বলে রাজবাড়ি থেকৈ একটি স্কুটার নিয়ে ফরিদপুর শহরের পশ্চিমপ্রান্তে এসে উপস্থিত হই। উল্লেখ্য আমাদের মধ্যে যে দলটি পশ্চিম মুখে পদ্মার তীর ধরে যায় বিহারীরা তাদের ধরার জন্য পিছু ধাওয়া করে। যাহোক আমরা ফরিদপুর আসার পরপরই দুটি যুদ্ধ বিমান বিকট শব্দে চক্কর দিতে থাকে। আমরা কামারখালি যাব এ ভাবনায় ফরিদপুর থেকে ভিন্ন আর একটি স্কুটারে কামারখালির পথে যেতে থাকলাম। স্কুটার চালক বা আমরা কেউ জানতাম না যে, কামারখালিতে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কামারখালির পথে যেতে যেতে দেখতে পেলাম ঝাঁকে-ঝাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গাছ পালার আড়ালে বসে আছে, অনেকে আবার ফরিদপুরের দিকে পিছু হটছে। যতই কামারখালির দিকে অগ্রগামী হচ্ছিলাম ততই বেশি বেশি এ দৃশ্য দেখতে পেলাম। সর্বশেষ সেই ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হলাম। কামারখালি ঘাটের কাছাকাছি পাকিস্তানি ক্যাম্পের পাশে আসতেই এক সৈন্য এসে স্কুটার থামিয়ে আমাদের ক্যাম্পের মধ্যে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। যিনি জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন তিনি ৬ ফুটেরও বেশি লম্বা, তাগড়া দেহ, ফর্সা। তিনি ইংরেজিতে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন।

Additional information