মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-২২

রোস্তম আলী স্যার বললেন we are teacher of Rajbari college. শিক্ষকের পরিচিতি শুনে তার রাগত ভাব স্তিমিত হল বলে মনে হল। তবে আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো ----‘ He is no Teacher, He is Mukti'। আমি তখন যুবক আর ভয়ে আমার চাহুনি তখন ছিল অনেকটা এলোমেলো। আমি আমার পরিচয় পত্র তুলে ধরলাম এবং বললাম I was the Student of Dhaka University এ কথা বলতেই তার মুখে মৃদু হাসি বের হল। বোধ হয় অতীত স্মৃতি মনে করে সে বললো ------‘I was also the student of Dhaka University'। ৪/৫ মিনিট কথাবার্তায় সে আমাদের বিশ্বাস করল এবং ইংরেজিতে বললো ---- we are not afraid of the Indian Soldiers but we are very much afraid of the people of this country.' এরপর সে আমাদের নদী পার হতে নিষেধ করল এবং পশ্চিমমুখে গ্রামের দিকে যেতে বলল। আমরা পশ্চিমমুখে প্রায় আধা মাইল এসে ভাবলাম এবার হয়ত নদী পাড় হতে পারব।

এ উদ্দেশ্যে নদীর পাড়ে এসে উপস্থিত হতেই ২০/২৫ গজ দূর থেকে কালো মাকড়ানী এক সৈন্য বন্দুক উঁচিয়ে আমাদের দিকে তেড়ে আসতে লাগলো। সে আমাদের নিকটে এসে বলল, ‘হট যাও।’ আমরা জড়সড়ো হয়ে দাঁড়ালাম। সে আমাদের ব্যাগের দিকে আঙ্গল দেখিয়ে বলল, ‘উসমে ক্যায়া হায়, খোল দো।’ রুস্তম স্যার এসে আমার ব্যাগটি খুলতেই একটি কাগজের পোটলা দেখে সৈন্যটি ২/৩ হাত সরে যেয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল ‘উসমে ক্যায়া হায়? আমি বাড়িতে ভাগ্নীর জন্য আধাসের বিস্কুট কিনেছিলাম। রস্তম স্যার পোটলাটা খুলে তা থেকে বিস্কুট বের করে তাকে খেতে বলে। সৈনিকটির মুখে ঈষৎ হাসি দেখা গেল। সে প্রায় ১৫ মিনিট ধরে প্যাকেটের সমস্ত বিস্কুট খেয়ে নিল। আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। খাওয়া শেষে সে পশ্চিমের গ্রামের দিকে চলে যাওয়ার ইশারা করল। আমি ভাবলাম পিছন ফিরে যেতে থাকলেই সে গুলি করবে। আল্লাহর অপার মহিমা। সে গুলি করে নাই। আমরা বেঁচে গেলাম। এরপর গ্রামে ঢুকতেই আমাদের এক মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র বিস্ময়ে বলল স্যার আপনারা কীভাবে এই রণক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে আসলেন এবং জীবন নিয়ে ফিরে এলেন? সত্যিই জীবন নিয়ে ফিরে আসার কথা নয়। রস্তম স্যার বলল তোমার ব্যাগ বুদ্ধি করে খুলেছিলাম সে কারণেই বেঁচে গেছি। সৈনিকটি যদি আমার ব্যাগ খুলতো তাহলে আর রক্ষা ছিল না। আমার ব্যাগে দুটি ধারালো ড্যাগার আছে, এই দেখ। আমরা বেঁচে গেলাম। আমি আজও পৃথিবীর আলো বাতাসে নিঃশ্বাস নেই। মাঝে মাঝে ভাবি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কত শত? কত হাজার? কত লক্ষ? নিরাপরাধ মানুষ মারা গেছে। কত রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা? এ স্বাধীনতার মূল্য কত?

কামারখালির যুদ্ধে মক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী জনমানুষের সাহায্য সহযোগিতায় অগ্রগামী হয় আর সহযোগিতা বঞ্চিত পাকিস্তানি সেনারা দিশেহারা হয়ে ফরিদপুর শহরের দিকে পিছু হটতে থাকে। যু্দ্ধ চলে উভয় বাহিনীর মধ্যে মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী গড়াই নদী পার হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শেষে ট্যাংকের চাকায় রাবার লাগিয়ে রাজবাড়ির দক্ষিণে জঙ্গল ইউনিয়নের সমাধিনগর ঘাট দিয়ে নদী পার হয়। তারা উম্মুক্ত প্রান্তরে ঢুকে পড়ে গোলাবর্ষণ করতে করতে খোলা মাঠ দিয়ে পূর্বদিক অগ্রসর হতে থাকে। হাজার হাজার সৈন্য এগিয়ে আসে ট্যাংকের পিছনে পিছনে। রাজবাড়ির মোহসীন উদ্দিন বতু ভাই এর কমান্ডে অনেক মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করে। বিল্লাল হোসেন, নজরুল ইসলাম, ইদ্রিস মিয়া (ময়না ভাই) এনামুল হক, আনোয়ার-সহ আরো অনেকে রাজবাড়ি থেকে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ডুমাইন, গড়িয়াদহ, আড়পাড়া, ঢোলজানি গ্রামে অবস্থানরত পাকবাহিনী মুক্তিবাহিনীর গতিরোধ করতে মর্টার চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে পিছু হটতে থাকে। এ যুদ্ধে ১০ জন পাকসেনা নিহত হয়। ডিসেম্বর ১৫ অপরাহ্নে পাকবাহিনী গোলাবারুদ, সামরিক সাজসরঞ্জাম এবং সামরিক যানবাহন ফেলে রেখে চলে যায় পূর্ব দিকে। কামারখালি অঞ্চলে যুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধা মহসিন উদ্দিন বতু ভাই (এ পরিবারের সাত ভাই এবং তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা)।

Additional information