মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-২৩

তিনি ১৯৭১ সালে পাকহানাদার রাডারবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় দেশমাতৃকার টানে পলায়ন করেন। ধরা পড়ায় সামরিক ট্রাইবুন্যালে ২ বছরের কারাদণ্ড হয়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে সাধারণ ক্ষমায় মুক্ত হয়ে ভারতে গমন করেন। (তার ভাই ফরিদ আহম্মেদ প্রবাসী সরকারের ছাত্র-যুবকের সমন্বকারী ছিলেন। পরে মেজর আবুল মঞ্জুর ফরিদপুরের ক্যাপ্টেন ইনচার্জ নিযুক্ত করেন)। বয়রা ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন হুদার অধীনে তিনি কাজ শুরু করেন। ১৫০ জনের একটি বৃহৎ দল নিয়ে বয়রা ক্যাম্প ত্যাগ করেন। বয়রা থেকে ফরিদপুর আসার পথে যশোরে বুনোগাতি এলাকায় রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করে ১০ জন রাজাকারকে আত্মসমর্পন করান। এ যুদ্ধে একটি এসএমজিসহ ২১টি রাইফেল হস্তগত করেন। ১৯ নভেম্বর ভাটিয়াপাড়ায় সসস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এতে ৩ জন পাক হানাদার নিহত হয়। ৮ ডিসেম্বর নড়াইলের লোহাগড়া থানা আক্রমণ করেন। এখানে ১০০ জনেরও বেশি রাজাকার আত্মসমর্পন করে। ডিসেম্বর ১১ তারিখে কানাইপুরের অদূরে চাঁদপুর হাটের নিকটবর্তী স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করেন। এখানে কামারখালি থেকে ফরিদপুরগাম ভ্যান আক্রমণ করে মেজর সাদেক-সহ ৮জন পাকহানাদার বন্দি করেন। বন্দিদের নিয়ে ভারতীয় কর্নেল ট্রপীর সাথে দেখা করেন। সাহসীকতার জন্য কর্নেল ট্রপী তাকে প্রশসংসা করেন। ১৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর থেকে ৬ মাইল দূরে কামারখালির পথে ২০০ পাকহানাদার এক অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পন করে। এ অনুষ্ঠানে পক্ষে ছিলেন মেজর জেনারেল , ভারতের পক্ষে একজন ব্রিগেডিয়ার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে থাকেন মহসীন উদ্দিন বতু।

রাজবাড়িতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা মিলিশিয়া ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হন। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথে কামারখালি ঘাটের পাকসেনারা বাগাট নামক স্থানে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটে। এ সময়ের আর এক সাহসী যোদ্ধা মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস, গ্রাম--রঘুনাথপুর। তিনি ক্যাপ্টেন বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে (ফরিদপুর সাবসেক্টর কমান্ডার) মাদারতলা, বড়ইচারা, ভাটিয়াপাড়া, ভেদরগঞ্জ, কোটালীপাড়া, তারাইল ফোকরা, গোপালগঞ্জ পর্যন্ত স্থানে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ন হন।

রাজবাড়ি মু্ক্ত

১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু তখন পর্যন্ত রাজবাড়ি যুদ্ধ চলছিল। রাজবাড়ি শত্রুমুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর। রাজবাড়িতে মহকুমা শহর, বিহারীদের প্রাধান্য এবং ফরিদপুরের পাকবাহিনীর অবস্থানের কারণে রাজবাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজবাড়ি, খানখানাপুর, গোয়ালন্দ, কল্যাণপুর সকল বিহারী মিলিশিয়া ও রাজাকার সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাজবাড়ি শহরের উত্তরে বিহারী কলোনীকে দুর্গ হিসেবে তারা ব্যবহার করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা প্রচুর আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ করে। রাজবাড়ি শহরসহ উত্তরে পদ্মা নদী, পশ্চিমে চরনারায়ণপুর, দক্ষিণে রামকান্তপুর, আহলাদীপুর, পূর্বে খানখানাপুর সতর্ক পাহারা বসায়। নেতৃত্ব দেন সৈয়দ কমর (প্রচলিত নাম সৈয়দ খামার), রব মাস্টার, শামীম-সহ আরো অনেকে। এছাড়া মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, পোড়াদহ, কুষ্টিয়া থেকে সকল বিহারী যোদ্ধাবেশে রাজবাড়িতে সংঘবদ্ধ হয়। তারা ইতিপূর্বে রাজবাড়িকে সাব ক্যান্টমেন্ট ঘোষণা করে আসছিল। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট রাজবাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজবাড়ির প্রায় সকল মুক্তিযোদ্ধা দল সমবেত হতে থাকে এবং কৌশলগত স্থানসমূহে অবস্থান গ্রহণ করে। শহীদুন্নবী আলমের নেতৃত্বে মাটিপাড়ায় শক্তিশালী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।

Additional information