মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-২৪

আবুল হাসেম বাকাউল, কামরুল হাসান লালী, খেলাফত হোসেন, ইলিয়াস মিয়া, রফিকুল ইসলাম, আব্দুল খালেক, সিরাজ আহম্মেদ স্ব-স্ব বাহিনী নিয়ে শহীদুন্নবী আলমের কমান্ডে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে নভেম্বরের শেষের দিকে ধুলদি গেটে পাকবাহিনীর সাথে বাকাউলবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর ২ সৈন্য আহত হয় এবং তারা পিছু হটে ফরিদপুর যায়। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে বাণীবহতে মিলিশিয়া ও বিহারীদের সাথে যুদ্ধে বাকাউলবাহিনীর হাতে ৪/৫ জন বিহারী নিহত হয়। ডিসেম্বর ৯ তারিখে ইলিয়াস মিয়া ও আব্দুল খালেকের কমান্ডবাহিনী গোয়ালন্দ মোড়ে উপস্থিত হয়। একটি ফায়ারের মাধ্যমে তারা আগমন বার্তা জানায়। কিছুক্ষণ পর বিহারী রাজাকার কমান্ডার সাহেবজানকে মেরে ৭টি রাইফেল নিয়ে ইলিয়াসবাহিনীর নিকট জমা দেয়। উল্লেখ্য যুদ্ধকালীন বহু বাঙালি রাজাকার পাতানো যু্দ্ধ দেখিয়ে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ অবলম্বন করে। সাহেবজানের মৃত্যুর পর বিহারীরা বাঙালি রাজাকারদের আর বিশ্বাস করে না। তখন প্রায় অর্ধশত বিহারী ফরিদপুরে অবস্থানরত পাকবাহিনীর সহায়তায় খানখানাপুরে তাণ্ডলীলা চালায়। অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সেক্টর কমান্ডার আবু সওমান চৌধুরীর বাড়িসহ অনেকের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। ১০ ডিসেম্বর ইলিয়াসবাহিনী, বাকাউলবাহিনী, আব্দুল খালেকবাহিনীর তীব্র আক্রমণে খানখানাপুর থেকে বিহারীরা রাজবাড়ি চলে যায়।

১১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা আলাদিপুর এক ও দুই নম্বর কলোনী ঘিরে ফেলে। শহীদুন্নবী আলমের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা কলোনীতে প্রবেশ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আগমন টের পেয়ে আগেই পালিয়ে যায়। বিহারীদের খোঁড়া বাংকারে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেয়। শহীদুন্নবী ব্যাজখোলা, রশোড়া ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে মাটিপাড়ায় তার নির্দেশে শক্তিশালী ঘাঁটি সৃষ্টি করে সেখানে যু্দ্ধ নিয়ন্ত্রণ কৌশল-সহ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। রাজবাড়ি হাসপাতালে কর্মরত ডা. চৌধুরী হুমাউন কবির, ডা. গোলাম মোস্তফা ডা. তারিকুল ইসলাম চিকিৎসা সেবা দান করেন।

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশের স্বীকৃতি দানের পর থেকে ‍মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয়বাহিনী সম্মিলিত মিত্রবাহিনী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অত্যাসন্ন মনে করে রাজবাড়ির প্রতিপক্ষবাহীনী শহরের লোকোশেড কলোনি উত্তর দিকে সমবেত হয়। ১২ ডিসেম্বর শহীদুন্নবী আলমের নির্দেশে ইলিয়াস মিয়া, আব্দুল মান্নান, আবুল হাশেম বাকাউল, আব্দুল জলিল মাস্টার , নিখিল কুমার, আব্দুস সাত্তার, আবুল হোসেন, নুরমোহাম্মদ ভূঁইয়া ভকেশনাল ও হাসপাতাল রাস্তা ধরে লোকোশেডের দিকে অগ্রগামী হতে থাকে। উত্তর দিক থেকে কামরুল হাসান লালী, পশ্চিম দিক থেকে খেলাফত হোসেন তাদের কমান্ড নিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলে। ওদিকে পাকবাহিনীর প্রবেশরোধে রাস্তা কেটে দেওয়া হল।

১৪ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় খেলাফত হোসেন ও আরো অনেকের নেতৃত্বে কয়েক শত মুক্তিযোদ্ধা মাটিপাড়া ক্যাম্পে রিপোর্ট করেন। তাদের রাজবাড়ির পশ্চিমে ভবানীপুর স্কুলে পাঠানো হয়। থানার অবস্থান জানতে শহীদুন্নবী আলম, আমিনুর রহমান আবি, এমজি মোস্তফা অতি সন্তর্পণে ন্যাশনাল ব্যাংক (বর্তমানে যেখানে সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ) পর্যন্ত আসেন। ব্যাংকের গার্ডের নিকট থেকে বিহারীদের সংখ্যা এবং প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে তথ্য নেন। সেখান থেকেই তারা থানা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে একদল দক্ষিণ পশ্চিম এবং অন্যদল উত্তর পশ্চিম দিক থেকে থানা আক্রমণ করে। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে বিহারীরা থানা ছেড়ে পালিয়ে কলোনিতে জমায়েত হয়। তখন থেকেই রাজবাড়ির বেড়াডাঙ্গা বরাবর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এদিকে বিহারীরা রাজবাড়ি কলেজ থেকে লোকোসেড পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন দিয়ে বেরিকেড সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে পূর্ব দিক থেকে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, উত্তর দিক থেকে ডা. কামরুল হাসান লালীবাহিনী, পশ্চিমদিক থেকে খেলাফত হোসেন স্ব-স্ব বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শুরু করে।

Additional information