মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-২৫

আক্রমণকারী মুক্তিযোদ্ধারা রেললাইন পর্যন্ত পৌছে যায়। মালগাড়ির বেরিকেডের ওপাশ থেকে বিহারীরা গুলি ছুঁড়তে থাকে। ইলিয়াস মিয়া মাথায় গুলির আঘাতে আহত হন। জরুরিভিত্তিতে তাঁকে মাটিপাড়া ‍মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাঠান হয়। শহীদুন্নবী আলমের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে। মু্ক্তিযোদ্ধারা চারিদিক থেকে বিহারীদের কথিত ক্যান্টমেন্ট ঘিরে ফেলে। এরমধ্যে কিছু মুক্তিযোদ্ধা পরামর্শ দিলেন মর্টার শেল ছাড়া বিহারীদের কাবু করা যাবে না। পরামর্শ মোতাবেক আমিনুর রহমান আবি (লেখকের চাচাতো শ্বশুর), এমজি মোস্তফাকে মাগুরায় মর্টার আনতে পাঠানো হয়। তারা নাড়ুয়ায় মুন্সি ইয়ারউদ্দিনের বাড়ি অবস্থান করে গড়াই নদী পার হয়ে জানতে পারেন শত্রু মুক্ত মাগুরায় চেয়ারম্যান আকবর হোসেন তাঁর দুর্ধর্ষবাহিনী নিয়ে রাজবাড়ি মুক্ত করার লক্ষ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। তারা তাদের সাথে দেখা করেন। সাথে মাগুরার মুজিববাহিনীর কমান্ডার সাহেব আলীকে রাজবাড়ির অবস্থা বর্ণনা করেন। আকবরবাহিনী ও সাহেব আলী (পরে ডিআইজি) উভয় বাহিনী ৩″ ইঞ্চি দুটি মর্টার, ১টি এসএমজি ২টি এলএমজি ২৫ বাক্স শেল ও গুলি-সহ উভয় বাহিনীকে পথঘাট চিনিয়ে রাজবাড়ি নিয়ে আসেন। ১৩ ডিসেম্বর বিকাল তিনটায় রোকন উদ্দিন চৌধুরীকে একটি মর্টার পৌরসভার সামনে এবং অপরটি ড্রাইস ফ্যাক্টরিতে বসানোর জন্য দেওয়া হয়। ডিসেম্বর ১৫ তারিখে পাংশা থেকে সকল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডবাহিনী রাজবাড়ি শত্রুমুক্ত করতে যোগ দেয়। জিল্লুল হাকিম (সংসদ সদস্য), আব্দুর রাব (প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ সরকারি ইয়াছিন কলেজ, ফরিদপুর), (আব্দুর রবের বাহিনীতে মোঃ কেরামত আলী-প্রফেসর ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ রাজবাড়ি সরকারি কলেজ সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন)। নাসিরুল হক সাবু (প্রাক্তন সংসদ সদস্য), আব্দুল মালেক (প্রাক্তন জেলা প্রশাসক), মঞ্জুর মোর্শেদ সাচ্চু, আব্দুল মতিন (প্রাক্তন সংসদ সদস্য) আবুল হোসেন কমান্ডবাহিনী নিয়ে রাজবাড়ির পশ্চিমদিকে বিহারী কলোনির অনতিদূরে অবস্থান নেন। উত্তরে কামরুল হাসান লালী, রফিকুল ইসলাম কমান্ডবাহিনী নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। গোলাগুলি শুরু হয়। ১৫ তারিখে শহীদ হন আব্দুর রব বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা দিয়ানত (মৃগীতে তাঁর নামে শহীদ দিয়ানত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে)। দুপুরে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশেদ আলী, শফিক, রফিক ও সাদি। লক্ষীকোলে তাঁদের মাজার অবস্থিত। ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে হাজার হাজার জনতা রাজবাড়ি জমায়েত হয়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করার কাজে লেগে যায়। ১৬ ডিসেম্বর যখন পাকহানাদারবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করছিল তখন রাজবাড়ি যুদ্ধ চলছিল।

ঐদিন একটি হেলিকপ্টার থেকে রাজবাড়ি রেল স্টেশনে শেল নিক্ষেপ করা হয়। সম্ভবত এটি ছিল ভারতীয় হেলিকপ্টার যা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এসেছিল। এভাবে দুইদিন যুদ্ধের পর ১৮ ডিসেম্বর বিহারীদের কথিত ক্যান্টমেন্টের পতন ঘটে। রাজবাড়ি ১৮ ডিসেম্বর শত্রু মুক্ত হয়। ১৮ ডিসেম্বর রাজবাড়ির বিজয় অর্জিত হয়। পরাজয় অনিবার্য হয়ে পড়লে শত শত বিহারী দিকবিদিক পলায়ন করতে থাকে। তাদের সকলেই মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের হাতে নিহত হয়। নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা

রাজবাড়ি সদর

(১) শহীদ আব্দুল আজিজ খুশী (২) শহীদ সাদি (৩) শহীদ আবুল হোসেন। (৪) শহীদ খলিলুর রহমান (৫) শহীদ আব্দুল হাকিম (৬) শহীদ লে. খন্দরকার আবু জাফর নুরুল ইসলাম (৭) শহীদ আব্দুর রশীদ (৮) শহীদ হাসমত আলী (৯) শহীদ সাদেকুর রহমান (১০) শহীদ আব্দুল ওহাব খান (১১) শহীদ লে.ডা. খোন্দকার আবু জাফর মোহাম্মদ নূরুল ইমাম তুর্কী (শহীদ বুদ্ধিজীবী)। তিনি মরহুম খোন্দকার আবু আসাদ নুরুল হাসান রুমি (অ্যাডভোকেট আবুল বাসার) এর ভ্রাতা।

Additional information