মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-৯

কুষ্টিয়ার ওয়ার্লেস যুদ্ধ------রাজবাড়ির সহযোদ্ধা

২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনা মোতায়েন করে। ঐ রাতে যশোর সেনানিবাস থেকে বেলুচরেজিমেন্টের সৈন্যরা কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন দখল করে ওয়ার্লেস এলাকায় অবস্থান নেয়। কুষ্টিয়া থেকে শত্রু মুক্ত করার জন্য কুষ্টিয়া, ঝিনাদহ, মেহেরপুর, রাজবাড়ি এলাকার ইপিআর, পুলিশ, আনসার, প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তুলতে থাকে। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাহিনীকে সংগঠিত করতে থাকেন। সুবেদার জিয়াউল হকের নেতৃত্বে বিকাশখালিতে এক কোম্পানি, ঝিনাইদহের এসডিও মাহবুব উদ্দীনের নেতৃত্বে কালীগঞ্জে এক কোম্পানি এবং সুবেদার আব্দুল মজিদ মো্ল্লার নেতৃত্বে কোর্ট চাঁদপুরে দুই প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা প্রেরণ করা হয়। অন্যদিকে ক্যা্প্টেন এ আর আযম চৌধুরী ও নায়েক সুবেদার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে দুই কোম্পানি চুয়াডাঙ্গা থেকে কুষ্টিয়া অভিমুখে যাত্রা করে। প্রাগপুর থেকৈ সুবেদার মোজাফ্ফর এর নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার অদূরে অবস্থান নেয়। তারা সবাই ওয়ার্লেস স্টেশনে একযোগে আক্রমন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যুদ্ধটি ওয়ার্লেস স্টেশনে সংগঠিত হওয়ায় ইতিহাসে এ যুদ্ধটি ‘কুষ্টিয়ার ওয়ার্লেস যুদ্ধ’ বলে পরিচিত।

কুষ্টিয়া থেকে রেলপথে পাকবাহিনী রাজবাড়ি প্রবেশ করার অপেক্ষায় এ কথা রাজবাড়ি শহরসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ঘন্টা চারেকের মধ্যে বেলগাছি, রামকান্তপুর, গোয়ালন্দ, দ্বাদশী এলাকার হাজার হাজার মানুষ শহরে জমায়েত হয়। খবর আসে কুষ্টিয়া শহর বাঙালিরা ঘেরাও করে রেখেছে এবং সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্ততি চলছে। তারা যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে আওয়ামী লীগ অফিসে আসে।

নেতৃবৃন্দ আলোচনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১০১ জন যোদ্ধাকে কুষ্টিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ তাদের বিশেষ ট্রেনে কুষ্টিয়া প্রেরণ করা হয়। নেপথ্যে নেতৃত্বে থাকেন কাজী হেদায়েত হোসেন, একেএম আসজাদ, আক্কাস আলী মিয়া, রোকন উদ্দিন চৌধুরী, অমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী প্রমুখ। সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন পদ্মার জলকরের মালিক মোঃ হাসানুজ্জামান (বকু চৌধুরী)। মাছপাড়া থেকে ছাত্রনেতা আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে আর একটি কোম্পানি যোগ দেয়। কমান্ডার নুরুন্নবী, আনসার এ্যাডজটেন্ট আকরাম হোসেন, কমান্ডার নুরু, আমজাদ হোসেন, আবুল হাসেম পিপি, আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুর রব, মাস্টার সিদ্দিকুর রহমান, সাংবাদিক সানাউল্লাহ প্রমুখ ট্রেনে সহযাত্রী থাকেন।

৩০ মার্চের বিকাল ৫টা নাগাদ পশ্চিম দিক থেকে নায়েব সুবেদার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে আক্রমণ চালানো হয়। তাতে পাকবাহিনীর মূলঘাঁটি জেলা স্কুল ছাড়া মোহিনী মিল এলাকা, পুলিশ লাইন মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। মনিরুজ্জামান ও তার বাহিনী মোহিনী মিল ও ওয়ারলেস স্টেশনের উপর আক্রমণ বহাল রাখেন। রাজবাড়ি থেকে আগত বাহিনী ট্রেন থেকে নেমে পায়ে হেঁটে কুষ্টিয়ায় মনিরুজ্জামানবাহিনীর সাথে যোগ দেয়। সারারাত গোলাগুলির পর সকাল ৯টা নাগাদ পাকিস্তানি পতাকার সঙ্কেত নিয়ে একটি বিমান উপর থেকে গুলি ও বোমা হামলা করতে থাকে। বোমার আঘাতে আনসার কমান্ডার হাসমত আলী শহীদ হন (সিঙ্গে আলীপুর)। পরদিন রাইফেলবাহিনী ভারি অস্ত্রসহ প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এতে ওয়ার্লেস দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে এবং পাকবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ওদিকে হাজার হাজার লাঠি, দা, বল্লমে সজ্জিত সাধারণ মানুষের আক্রমণে তারা দিগবিদিক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক পাকসেনা পালাবার পথে জনতার লাঠির আঘাতে নিহত হয়। এরপরেও কিছু সংখ্যক সৈন্য জেলা স্কুলে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলে। পরে তীব্র আক্রমণের মুখে ঝিনাইদহের পথে চলে যায়। কিন্ত শৈলকূপায় একটি ব্রিজ ভেঙ্গে তাদের পালাবার পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। দ্রুতগামী জীপ খাদে পড়ে মেজর শোয়েবসহ অনেক পাকসেনা মারা যায়।

Additional information