মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি - পৃষ্ঠা নং-১০

দুই রাত ও দুই দিনের যুদ্ধের পর ১ এপ্রিল কুষ্টিয়া মুক্ত হয়। এই যুদ্ধে রাজবাড়ি থেকে শহীদ হন মোঃ আব্দুল কুদ্দুস গ্রাম কোমরপুর, মোঃ সিরাজুল হক গ্রাম রামকোল (মাচপাড়া-পাংশা), মোঃ হাসমত আলী গ্রাম হোসনাবাদ দ্বাদশী। আহত হন আনসার সদস্য মোঃ আব্দুর রব (রামকান্তপুর) ও তার ভাই। কুষ্টিয়ার যুদ্ধে শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হয়নি। তিনজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে কুষ্টিয়া হাসপাতাল সংলগ্ন গোরস্থানে কবরস্থ করা হয়। বিজয়ী যোদ্ধাদের পরের দিন গণজমায়েতের মাধ্যমে আজাদী ময়দানে সংবর্ধনা জানানো হয়। স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ উপস্থিত ছিলেন মহকুমা প্রশাসক শাহ মোহাম্মদ ফরিদ।

গোয়ালন্দ ঘাট প্রতিরক্ষা বেষ্টনী, যুদ্ধ ও পাকবাহিনীর রাজবাড়ি প্রবেশ

রাজবাড়ি ও ফরিদপুর অঞ্চলের দখল নিতে হলে ঢাকা থেকে আসা পাকবাহিনীকে গোয়ালন্দ ঘাট পার হতে হবে। ফলে গোয়ালন্দ ঘট পরিচালনার দায়িত্বে স্থানীয় জনগণসহ প্রশিক্ষণরত সেনা, আনসার নিয়োজিত থাকে। ২৭ মার্চ (১৯৭১) লোকমুখে শোনা যায় পাকসেনারা পদ্মা পার হয়ে গোয়ালন্দর দখল নিবে। গুজবটি মুখেমুখে রাজবাড়ি ও ফরিদপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায়। ২৭ মার্চ সকালে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি, ফরিদপুর থেকে লক্ষাধিক মানুষ, বন্দুক, ঢাল, সরকী ফলা, যুতি, কেঁচ, বল্লম তলোয়ার, বড় লাঠি, তীর ধনুক, রাম দা, হকিস্টিক, কিরিচ প্রভৃতি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গোয়ালন্দে সমবেত হয় এবং মহড়া প্রদর্শন করতে থাকে। মুহুর্মুহু স্লোগান ও হুঙ্কারে এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সকাল আটটা নাগাদ দেওয়ান পাড়া থেকে স্টিমারঘাট পর্যন্ত লোকারণ্যে পরিণত হয়। চলতে থাকে পাকবাহিনীর মোকাবেলার অপেক্ষার পালা। বিকেল নাগাদ কাজী হেদায়েত হোসেনের আগমনরত গাড়ি দেখা যায়। তিনি চলমান মানুষকে গোয়ালন্দের দিকে আসার জন্য হাত নাড়ের। পাকবাহিনীকে দেখা যায় না। সন্ধ্যায় জনগণ খানখানাপুর ব্রিজ ভাঙ্গতে শুরু করলে হেদায়েত হোসেন ও আক্কাস আলী মিয়া ‍উভয়ে বলেন, ‘ব্রিজ ভাঙ্গার সময় এখনো আসেনি।’ তাদের কথায় ব্রিজ ভাঙ্গা বন্ধ হয়। ২৭ মার্চ থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট পাহাড়ায় নিয়োজিত থাকে। এসময় থেকেই কয়েক স্তরের বাঙ্কার খনন করে যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। ওদিকে আরিচা ঘাটে অবস্থানরত পাকবাহিনী গোয়ালন্দের উপর নজরদারী বৃদ্ধি করে। পাকবাহিনীর একটি ফেরি অগ্রগামী হতে দেখা যায়।

তারা ফেরি থেকে সার্চলাইটের সাহায্যে অবস্থা পর্যবেক্ষণের মুহুর্তে গোয়ালন্দে অবস্থিত প্রতিরোধবাহিনী গর্জে ওঠে। তারা নানা অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের দৃঢ় অবস্থানের জানান দেয়। তারা বাঙ্কার থেকে বেড়িয়ে আসে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আসলে পাকবাহিনীর অত্যাধুনিক রাইফেল, মেশিনগান কামান, গোলাবারুদের বিপরীতে সাধারণ অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি জনমানুষের জাতীয় চেতনায় তা ছিল আত্মহুতির নামান্তর প্রস্তুতি। তা সত্ত্বেও পাকবাহিনী অবস্থা আঁচ করে আরিচা ঘাটে ফিরে যায়। এ সময়ে রেলগাড়িতে আনসার এ্যাডজুটেন্ট আকরাম হোসেন ৪০টি রাইফেলসহ ৪০ জন আনসারের একটি ব্যাটেলিয়ান গোয়ালন্দ পাঠান। তা ছিল এক স্মরণীয় ঘটনা। ফকীর মোঃ মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে এ ব্যাটিলিয়ান গোয়ালন্দ ঘাট পাহাড়ায় নিয়োজিত হন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে ডা. জয়নাল আবেদীন এবং ছাত্রনেতা ফকির আব্দুল জব্বার ব্যাটেলিয়ানবাহিনীর আহারের ব্যবস্থা করেন। তৎকালীন ইপিআরবাহিনীর সদস্যগণ ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ঘাট পাহাড়ায় নিয়োজিত থাকেন। তাদের অধিকাংশই ছিল সিলেট অঞ্চলের। ৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার ওয়্যার্লেস যুদ্ধ বিজয়ী একদল ইপিআরবাহিনী গোয়ালন্দ ঘাট প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিলে আগের বাহিনী প্রস্থান করে। এ সময় ৩০ জন প্রশিক্ষিত সৈনিক, ১৫০ জন আনসার এবং রাজবাড়ি পাংশা, গোয়ালন্দ ঘাট রক্ষায় নিয়োজিত থাকে। রাজবাড়ি ও ফরিদপুর অঞ্চলের পাকবাহিনীর প্রবেশ পথ ছিল দুটি যথা গোয়ালন্দ ঘাট ও কামারখালি ঘাট। উভয় পথেই সৃদৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। উভয় স্থানেই প্রায়দিনই হাজার হাজার মানুষ সমবেত হতে থাকে। অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য খুব নিচু দিয়ে বিমান উড়ে যেত।

Additional information