মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি

  • Print

মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি

রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ অতি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ জেলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। জেলায় সংগঠিত যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সকল বীর মুক্তিযোদ্ধার বীরত্বগাথাসহ সকল সংগঠিত ঘটনার বিবরণ স্বল্পপরিসরের এ গ্রন্থে দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না বলে লেখক ক্ষমা প্রার্থনা জানায়। রাজবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে যতটুকু এ গ্রন্থে আলোকপাত করা হল তা কোনো গবেষকের সাহায্য করবে বলে আমি মনে করি। আমি কেবল রাজবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের একটি রুপরেখা অঙ্কন করলাম। রাষ্ট্রবিকাশ ঐতিহাসিক ধারার ক্রিয়াফল। অধ্যাপক গার্নার রাষ্ট্রীয় কাঠামো বিকাশের অন্ত র্নিহিত উপাদানের মধ্যে জাতি রাষ্ট্রের বিকাশে জাতি তত্ত্বই মুখ্য বিষয় বলে ব্যক্ত করেছেন। দুই হাজারেরও বেশি সময় ধরে গঙ্গা, ভাগিরথী, পদ্মা, মেঘনার উত্থিত সমতলে বাঙ্গাল বলে একটি জাতি আত্মপরিচয়ে পরিচিত হয়ে উঠতে থাকে।

রাজবাড়ির প্রথম শহীদ মুক্তিযোদ্ধা  আব্দুল আজিজ খুশীএ জাতি শারীরিক গঠনে বেঁটে, বর্ণ উজ্জ্বল শ্যাম, স্বভাব নরম কোমল সাদাসিদে, বুদ্ধিতে তিক্ষ্ণতার ছাপ। বাঙালি জাতি হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠলেও তাদের মধ্যে জাতিতত্ত্বের বিকাশ না ঘটায় হাজার বছরের স্বকীয়তায় স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনে সমর্থ হয় নাই। বৃটিশ শাসনের অবসানকালে ১৯৪৭ এ বাংলার এক অংশ (পশ্চিমবাংলা) ভারতের সাথে এবং অন্য অংশ পূর্ববাংলা পাকিস্তানের সাথে অঙ্গীভূত হয়। পশ্চিমবাংলা এখনো ভারতের অঙ্গরাষ্ট্র কিন্তু পূর্ববাংলা জাতিত্বের সুদৃঢ় ভিত্তির উপর স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে পৃথিবীর মানচিত্রে স্থান করে নিয়েছে। পাকিস্তান সৃষ্টির পর থেকে বিশেষ করে ভাষা আন্দোলন, ১১ দফা, ৬ দফা ১৯৬৯ এর গণ-আন্দোলনসহ সকল আন্দোলন ও আত্মপরিচিতির মাধ্যমে পূর্ব-পাকিস্তানিরা যেভাবে জাতিবোধে উজ্জীবিত হয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ী বাঙালি স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্র গঠন করে। জাতিত্বের ভিত্তিতে তারা বাঙালি এবং জাতীয় ভিত্তিতে বাংলাদেশী বলে পরিচিতি লাভ করে।

চরম আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন এবং আক্রোশের কারণে শুরু হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধ। পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টি হওয়ার পর থেকেই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে পূর্ব পাকিস্তান বঞ্চনার শিকারে পরিণত হয়। অর্থনৈতিক সুবিধা অর্জনে রাজনৈতিক অধিকার অত্যাবশ্যক। এ সূত্রেই বাঙালি জাতি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছাতে সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় ইয়াহিয়া ও ভুট্রোর কূটকৌশল, টিক্কা খানের নির্বিচার গণহত্যায় এ যুদ্ধ ছিল অনিবার্য। যুদ্ধের এ অনিবার্যতা মেনে নিলেও বাঙালি জাতির মধ্যে ক্রমে ক্রমে যে আক্রোশ ও স্বাধীকার জমে উঠেছিল ঘটনার প্রবাহে তার বহিঃপ্রকাশও ঘটেছিল। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও তৎকালীন সামরিক শাসক প্রধান ও পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্রোর চক্রান্তে আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণে ব্যর্থ হয়। ক্ষমতা আওয়ামী লীগের হাতে দেওয়া হবে না এ চক্রান্তেই তারা মেতে ওঠে। ‘খো বদেরা বাহনা বেশিয়ার’ প্রবাদটি পশতু ভাষায়, ‘দুর্জনের ছল অনেক রকম।’ প্রায় বাংলার কাছাছাছি, ‘দুর্জনের ছলের অভাব হয় না।’ বলাবাহুল্য সব আলোচনাই ব্যর্থ হল। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাত্রি। বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সামরিকজান্তার হাতে বন্দি হলেন। ২৫ মার্চের সেই রাত্রিতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর নির্বিচারে ভারী অস্ত্রের গুলির আঘাতে শত শত মানুষ নিহত হল। কামান, মর্টার বন্দুকের গুলির শব্দে ঢাকার আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠল। অসহায় মানুষ প্রাণ বাঁচাতে দিগ্বিদিক পালাতে শুরু করল। হতবাক মানুষের বুক ফেটে আর্তনাদ


রাত্রি হল কাল

পূব গগণে সূর্য উঠেছে

রক্ত লাল রক্ত লাল

চৈত্রের খরায় পুড়ছে ফসল, গুলিতে মরছে মানুষ। কেবল মাঝে মাঝে কলিকাতা বেতার থেকে ভেসে আসছে, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি।’ সে এক অভাবনীয় লোমহর্ষক ভয়াল অনুভূতি। কালের যাত্রা কোনো কালেই থেমে থাকে না। যে যাত্রা শুরু হল তার রথ চলতে থাকবে এটাই জাগতিক বিধি।

১৯৭১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি থেকে আওয়ামী লীগের হাতে ক্ষমতা হস্তন্তর বিষয়ে ইয়াহিয়া ও ভুট্রো নানা টালবাহানা শুরু করে। সৃষ্টি হতে থাকে নানা বাদ প্রতিবাদ। অনিশ্চিত হয়ে পড়ে ক্ষমতা হস্তান্তর। ২৮ ফেব্রুয়ার রাজবাড়ি কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের অভিষেক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত প্রধান অতিথি রাজবাড়ি কলেজের প্রতিষ্ঠাতা তৎকালীন যুগ্ন সচিব কাজী আজহার আলী বক্তৃতার শুরুতেই বললেন, ‘আমি দেশের যে অবস্থা দেখতে পাচ্ছি তাতে এ জাতির বঙ্গোপসাগরে ঝাঁপিয়ে পড়া ছাড়া কোনো গতি নেই। উচ্চ পদস্থ এ কর্মকর্তার এমন ভাষণে সমবেত কয়েক হাজার ছাত্র, শিক্ষক, জনতা সচকিত হয়ে উঠেছিল। তাঁর এ ভাষণ ছিল অজানা আশঙ্কার সঙ্কেত এবং সে সাথে কোনো অনিশ্চিত ও ভয়াবহ ঘটনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটমূলে ছাত্রনেতা আসম আব্দুর রব (ডাকসুর ভিপি) স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেন। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাবেশে ঘোষণা দেন, ‘এবারের সংগ্রাম----মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম---স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এ সময় এ জেলার মানুষ একাত্মতা ঘোষণা করে। চলতে থাকে মিছিল, সমাবেশ। এরপর কেন্দ্রীয় ছাত্রসংগ্রাম পরিষদ থেকে ঘোষণা আসে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত পতাকা উত্তোলন করা হবে। ২১ মার্চ এক সভায় সিদ্ধান্ত মোতাবেক রাজবাড়িতে পতাকা উত্তোলন করেন ছাত্রনেতা ফরিদ আহমেদ। ঐদিন বেলা ১১টায় রাজবাড়ি শহর মিছিলের শহরে পরিণত হয়। বেলা ১১টায় জলিলুর রহমান, নাজিবুর রহমান, এটিএম রফিক উদ্দিন, মকসুদ আহমেদ (রাজা ভাই), গণেশ নারায়ণ চৌধুরী, অমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী প্রমুখ নেতৃবৃন্দ বিল্ডিং এর সামনে সমবেত হন। তাঁরা পাকিস্তানের চাঁদ-তারা খচিত পতাকা ছিঁড়ে ফেলেন। বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত পতাকা উত্তোলিত হয়। উক্ত পতাকা তৈরি করেছিলেন মজনু খলিফা এবং আলোকচিত্র ধারণ করেন বলাকা স্টুডিওর মালিক সিরাজুল আলশ। পাংশায় পতাকা উত্তোলনের দায়িত্ব পালন করেন তৎকালীন ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সদস্য আব্দুল হাই এবং মাছপাড়ায় এ দায়িত্ব পালন করেন রাজবাড়ি কলেজের তৎকালীন ছাত্রনেতা আব্দুল মতিন। এ সময় পাংশায় উপস্থিত থাকেন আওয়ামী লীগ নেতা হাসান আলী, ছাত্রইউনিয়ন নেতা আব্দুর রহমান, বর্তমান মাননীয় সংসদ সদস্য জিল্লুল হাকিম, সাবেক মাননীয় সংসদ সদস্য নাসিরুল হক সাবু-সহ নেতৃবৃন্দ। পাংশায় পতাকা উত্তোলিত হয় হামিদ আলী হল ময়দানে। ‘গ্রাম বাংলায় লেগেছে আজ গণজোয়ারের ঢেউ’---শিরোনামে রাজবাড়িতে ‘গোয়ালন্দ মহকুমা ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি’র উদ্যোগে আজাদী ময়দানে এমএ মোমেন বাচ্চু মাস্টারের সভাপতিত্বে পূর্ববাংলার স্বাধীকার ও নির্যাতনের যে সভা অনুষ্ঠিত হয় তা পত্রিকায় প্রকাশ পায়। (১৭ মাচ ১৯৭১, দৈনিক সংবাদ) ২৫ মার্চের কালোরাত্রির পর থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মতো রাজবাড়ির মানুষ অসহায় হতবাক হয়ে পড়েছিল। ইতিমধ্যে রাজবাড়িতে সংবাদ আসে ডা. একেএম আসজাদ সাহেবের ভগ্নিপতি আগরতলা মামলার ২নং আসামী, পাকিস্তান নৌবাহিনীর লে.ক. মোয়াজ্জেম হোসেনকে ভোর রাত্রে পাকিস্তানবাহিনী হত্যা করেছে (দেশ স্বাধীন হলে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর একটি জাহাজের নামকরণ করা হয়েছে বিএনএস শহীদ মোয়াজ্জেম)।


ডা. আসজাদ ছিলেন একজন প্রতিথযশা চিকিৎসক ও রাজনীতিবিদ। ভগ্নীপতির মৃত্যতে তিনি প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন এবং পাকিস্তান সরকারের দেওয়া ‘তমঘায়ে খিদমত’ খেতাব ত্যাগ করার ঘোষণা দেন। তৎকালীন এমপিএ কাজী হেদায়েত হোসেন, এমপিএ মোসলেম উদ্দিন মৃধা, ডা. একেএম আসজাদ, আক্কাস আলী মিয়অ, ডা. এসএ মালেক, ডা. জলিলুর রহমানসহ সকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও জনতা ২৬ মার্চ সকাল ১০টায় আজাদী ময়দানে মিলিত হন এবং পাকবাহিনীর প্রতিরোধকল্পে দৃঢ় সঙ্কল্প ব্যক্ত করেন। ঐ দিনই আওয়ামী লীগ অফিসে সমবেত জনতা ও নেতৃবৃন্দ সংগ্রাম কমিটি গঠন করেন----

রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরিষদ প্রধান

১। কাজী হেদায়েত হোসেন, এমপিএ রাজবাড়ি

২। মসলেম উদ্দিন মৃধা, এমপিএ পাংশা

কাজী হেদায়েদ হোসেন, এমপিএ রাজবাড়ি

প্রতিরক্ষা পরিষদ প্রধান

১। ডা. একেএম আসজাদ

২। ডা. এসএ মালেক

৩। এমএ মোমেন (বাচ্চু মাস্টার)

৪। এটিএম রফিক উদ্দিন

৫। কমলকৃষ্ণ গুহ

ডা. এস এ মালেক


জনসংযোগ প্রধান

১। ডা. জলিলুর রহমান

প্রশাসনিক প্রধান

১। আব্দুল বারি মণ্ডল, সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক

২। আকরাম হোসেন, আনসার এ্যাডজুটেন্ট-তৎকালীন

৩। ও সি (তৎকালীন)

৪। শেখ জামায়েথুল্লা, সিভিল ডিফেন্স অফিসার রেলওয়ে-তৎকালীন

প্রাথমিক পর্যায়ে ডা. আসজাদ ও ডা. এসএ মালেক রাজবাড়ি জেলায় স্থানীয় প্রতিরোধবাহিনী গঠন করেন যা ‘রাজবাড়িবাহিনী’ নামে পরিচিতি হল। ‘রাজবাড়িবাহিনীর’ কমান্ডার ছিলেন ডা. আসজাদ। এ বাহিনীর প্রশিক্ষক ছিলেন আব্দুল বারি মণ্ডল। অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ, আনসার ও স্থানীয় যুবকদের নিয়ে এ বাহিনী গঠন করা হল। কাজী হেদায়েত হোসেন এবং ডা. একেএম আসজাদ ফরিদপুর জেলা প্রশাসন এবং গোয়ালন্দ মহকুমা প্রশাসন (তখন রাজবাড়িই ছিল গোয়ালন্দ মহকুমার সদর দপ্তর) থেকে কিছু অস্ত্র ও গোয়াবারুদ সংগ্রহ করতে সক্ষম হন এবং রাজবাড়িবাহিনীকে ৩০৩ রাইফেল দ্বারা সজ্জিত করেন। আওয়ামী লীগ অফিসে কাজী হেদায়েত হোসেনের নেতৃত্বে সভায় সব মতো পার্থক্য ভুলে তাঁরা ঐক্যবদ্ধ হন।


বয়োজ্যেষ্ঠ ডা. আসজাদ, ডা. এসএ মালেক-এর পরামর্শে পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য তিনটি উপ-কমিটি গঠন করা হয়। এ সভায় উপস্থিত ছিলেন কাজী হেদায়েত হোসেন (এমপিএ) মোসলেম উদ্দিন মৃধা (এমপিএ) ডা.  আসজাদ, ডা. এস এ মালেক, অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ চৌধুরী, ডা. জলিলুর রহমান, অমল কৃষ্ণ চক্রবর্তী, অ্যাডভোকেট রফিকুছ সালেহীন, আব্দুল বারি মণ্ডল, এমএ মোমেন (বাচ্চু মাস্টার), অ্যাডভোকেট আবুল বাসার, আব্দুল লতিফ বিশ্বাস, আমজাদ হোসেন, নাজিবর, এটিএম রফিক উদ্দিন, এটিএম আব্দুর রাজ্জাক (উজির ভাই), ডা. গোলাম মোস্তফা, অ্যাডভোটে চিত্তরঞ্জন গুহ, অ্যাডভোকেট কমলকৃষ্ণ গুহ, অ্যাডভোকেট গণেশ নারায়ণ চৌধুরী, ফরিদ আহমেদ, এমজি মোস্তফা প্রমুখ। উক্ত সভায় প্রশিক্ষণ ও প্রশিক্ষণার্থী নির্বাচন করা হয়। ঐ দিনই বিকেল তিনটায় গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল (বর্তমান জেলা স্কুল) স্থানীয় সূধীবৃন্দের নিকট থেকে পাওয়া বন্দুক দিয়ে সাধারণ একটি প্রশিক্ষণ মহড়া দেওয়া হয়। ডা. আসজাদ---২২ বোরের একটি, ডা. এসএ মালেক--- ২২ বোরের একটি, একেএম নুরুজ্জামান----একনালা একটি, মোঃ শামসুল হক----দোনালা একটি, মোঃ মাকসুদুল হক ---- দোনালা একটি, মোঃ এমদাদুল হক ---- দোনালা একটি বন্দুক দেন। এছাড়া প্রশিক্ষণের সময় আনসার ক্যাম্পের ডামী রাইফেল, ব্যবহার করা হয়। প্রশিক্ষণের আইটেমের মধ্যে ছিল পিটি প্যারেড, রাইফেলের যন্ত্রাংশের নাম ও ব্যবহার, ক্রুলিং, সিগন্যাল, আক্রমণ, প্রতিরোধ, আক্রমণের মহড়া ইত্যাদি। দ্বিতীয় দিন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় রেলওয়ে মাঠে। স্থানটি খোলা মেলা হওয়ায় াত মোল্লা বাড়ির পিছনে জঙ্গলাকীর্ণ স্থান‘ ‘পিততলায়’ সরিয়ে নেওয়া হয়। প্রাথমিক অবস্থায় আব্দুল বারি মণ্ডল প্রশিক্ষণ শুরু করেন। অতঃপর নিম্নরুপ প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণার্থী ছিলেন-----

প্রশিক্ষক

(১) ডা. একেএম আসজাদ (২) মোঃ আব্দুল বারী মণ্ডল, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক (৩) মোঃ খেলাফত হোসেন, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক (৪) মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক (৫) মোঃ আব্দুস শুকুর


 প্রশিক্ষণার্থী

(১) মোঃ আব্দুর রউফ (রাজা ভাই) (২) এটিএম আব্দুর রাজ্জাক (উজির ভাই), (৩) অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, (৪) মোঃ গোলাম মোস্তফা, (৫) শেখ এমএ মাজেদ (৬) মোঃ আবু বক্কর (মোল্লাবাড়ি) (৭) পিন্টু মোল্লা (৮) দুলাল মোল্লা (৯) ফিরোজ খান (টোনা) (১০) মোঃ আমিনুল ইসলাম বাবুল (১১) কমলকৃষ্ণ গুহ (১২) মোঃ লুৎফর রহমান (১৩) মোঃ মুনির (১৪) সন্তোষ কুমার ঘোষ (১৫) আরজু (১৬) সন্টু মোল্লা (১৭) খলিফা আশ্রাফ মানিক (১৮) মোঃ আব্দুস সালাম ও আরো অনেকে। রাজবাড়ি কুটির হাট থেকে পাকিস্তানিসেনা সুবেদার আব্দুল খালেক (ছুটিতে এসেছিলেন) স্থানীয় ছাত্র ও জনগণকে নিয়ে ২০ জনের একটি টিম গঠন করে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ শুরু করেন।


এ প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণকারী ব্যাক্তিবর্গ ছিলেন --- (১) মোঃ আব্দুল হাকিম মণ্ডল, অতিরিক্ত সচিব (২) ডা. মোঃ আজাহার আলী (৩) আব্দুস সামাদ মোল্লা (৪) মোঃ শামসুল হক (৫) আলী ও আরো অনেকে।

পাংশায় মোসলেম উদ্দিন মৃধার (এমপিএ) নেতৃত্বে হাবাসপুর হাইস্কুল মাঠে অস্থায়ী সামরিক ট্রেনিং ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন ছুটিতে থাকা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মোঃ আব্দুল করিম, লে. নায়েক আলীমুজ্জামান খান ও সৈনিক আবুল কালাম আজাদ।


বালিয়াকান্দির রামদিয়া হাইস্কুল মাঠে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়। প্রশিক্ষণের সংগঠক ছিলেন শেখ মোঃ আজিমউদ্দীন ও নিতাইপদ সরকার। প্রশিক্ষক ছিলেন অবসরপ্রাপ্ত পাকসেনা মোঃ আছির উদ্দিন শেখ, অবসরপ্রাপ্ত পাকসেনা আলী হোসেন এবং আনসার কমান্ডার আকবর আলী খান। এ ছাড়া তৎকালীন আওয়ামী লীগের সভাপতি মোঃ সিরাজুল ইসলাম মৃধা, ডা. আফজাল হোসেন, মোশারফ হোসেন, একরামূল হক প্রমুখের নেতৃত্বে বালিয়াকান্দি হাইস্কুল মাঠে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমার সর্বস্তরের মানুষ প্রতিরোধে সংঘবদ্ধ হতে থাকে।

(সূত্র: রাজবাড়ির মুক্তিযুদ্ধ, ড. আব্দুস সাত্তার, (পৃষ্ঠা ৪৭, ৪৮, ৪৯)।


কুষ্টিয়ার ওয়ার্লেস যুদ্ধ------রাজবাড়ির সহযোদ্ধা

২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনী দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সেনা মোতায়েন করে। ঐ রাতে যশোর সেনানিবাস থেকে বেলুচরেজিমেন্টের সৈন্যরা কুষ্টিয়া পুলিশ লাইন দখল করে ওয়ার্লেস এলাকায় অবস্থান নেয়। কুষ্টিয়া থেকে শত্রু মুক্ত করার জন্য কুষ্টিয়া, ঝিনাদহ, মেহেরপুর, রাজবাড়ি এলাকার ইপিআর, পুলিশ, আনসার, প্রতিরোধ ব্যূহ গড়ে তুলতে থাকে। মেজর আবু ওসমান চৌধুরী যুদ্ধের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন বাহিনীকে সংগঠিত করতে থাকেন। সুবেদার জিয়াউল হকের নেতৃত্বে বিকাশখালিতে এক কোম্পানি, ঝিনাইদহের এসডিও মাহবুব উদ্দীনের নেতৃত্বে কালীগঞ্জে এক কোম্পানি এবং সুবেদার আব্দুল মজিদ মো্ল্লার নেতৃত্বে কোর্ট চাঁদপুরে দুই প্লাটুন মুক্তিযোদ্ধা প্রেরণ করা হয়। অন্যদিকে ক্যা্প্টেন এ আর আযম চৌধুরী ও নায়েক সুবেদার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে দুই কোম্পানি চুয়াডাঙ্গা থেকে কুষ্টিয়া অভিমুখে যাত্রা করে। প্রাগপুর থেকৈ সুবেদার মোজাফ্ফর এর নেতৃত্বে কুষ্টিয়ার অদূরে অবস্থান নেয়। তারা সবাই ওয়ার্লেস স্টেশনে একযোগে আক্রমন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। যুদ্ধটি ওয়ার্লেস স্টেশনে সংগঠিত হওয়ায় ইতিহাসে এ যুদ্ধটি ‘কুষ্টিয়ার ওয়ার্লেস যুদ্ধ’ বলে পরিচিত।

কুষ্টিয়া থেকে রেলপথে পাকবাহিনী রাজবাড়ি প্রবেশ করার অপেক্ষায় এ কথা রাজবাড়ি শহরসহ পাশ্ববর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। ঘন্টা চারেকের মধ্যে বেলগাছি, রামকান্তপুর, গোয়ালন্দ, দ্বাদশী এলাকার হাজার হাজার মানুষ শহরে জমায়েত হয়। খবর আসে কুষ্টিয়া শহর বাঙালিরা ঘেরাও করে রেখেছে এবং সর্বাত্মক যুদ্ধের প্রস্ততি চলছে। তারা যুদ্ধে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণে আওয়ামী লীগ অফিসে আসে।

নেতৃবৃন্দ আলোচনার মাধ্যমে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ১০১ জন যোদ্ধাকে কুষ্টিয়ার যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ৩০ এপ্রিল ১৯৭১ তাদের বিশেষ ট্রেনে কুষ্টিয়া প্রেরণ করা হয়। নেপথ্যে নেতৃত্বে থাকেন কাজী হেদায়েত হোসেন, একেএম আসজাদ, আক্কাস আলী মিয়া, রোকন উদ্দিন চৌধুরী, অমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী প্রমুখ। সম্মুখ সমরে নেতৃত্ব দেন পদ্মার জলকরের মালিক মোঃ হাসানুজ্জামান (বকু চৌধুরী)। মাছপাড়া থেকে ছাত্রনেতা আব্দুল মতিনের নেতৃত্বে আর একটি কোম্পানি যোগ দেয়। কমান্ডার নুরুন্নবী, আনসার এ্যাডজটেন্ট আকরাম হোসেন, কমান্ডার নুরু, আমজাদ হোসেন, আবুল হাসেম পিপি, আব্দুল কুদ্দুস, আব্দুর রব, মাস্টার সিদ্দিকুর রহমান, সাংবাদিক সানাউল্লাহ প্রমুখ ট্রেনে সহযাত্রী থাকেন।

৩০ মার্চের বিকাল ৫টা নাগাদ পশ্চিম দিক থেকে নায়েব সুবেদার মনিরুজ্জামানের নেতৃত্বে আক্রমণ চালানো হয়। তাতে পাকবাহিনীর মূলঘাঁটি জেলা স্কুল ছাড়া মোহিনী মিল এলাকা, পুলিশ লাইন মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। মনিরুজ্জামান ও তার বাহিনী মোহিনী মিল ও ওয়ারলেস স্টেশনের উপর আক্রমণ বহাল রাখেন। রাজবাড়ি থেকে আগত বাহিনী ট্রেন থেকে নেমে পায়ে হেঁটে কুষ্টিয়ায় মনিরুজ্জামানবাহিনীর সাথে যোগ দেয়। সারারাত গোলাগুলির পর সকাল ৯টা নাগাদ পাকিস্তানি পতাকার সঙ্কেত নিয়ে একটি বিমান উপর থেকে গুলি ও বোমা হামলা করতে থাকে। বোমার আঘাতে আনসার কমান্ডার হাসমত আলী শহীদ হন (সিঙ্গে আলীপুর)। পরদিন রাইফেলবাহিনী ভারি অস্ত্রসহ প্রচণ্ড আক্রমণ চালায়। এতে ওয়ার্লেস দেয়াল ভেঙ্গে পড়ে এবং পাকবাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। ওদিকে হাজার হাজার লাঠি, দা, বল্লমে সজ্জিত সাধারণ মানুষের আক্রমণে তারা দিগবিদিক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অনেক পাকসেনা পালাবার পথে জনতার লাঠির আঘাতে নিহত হয়। এরপরেও কিছু সংখ্যক সৈন্য জেলা স্কুলে প্রতিরক্ষা ব্যূহ গড়ে তোলে। পরে তীব্র আক্রমণের মুখে ঝিনাইদহের পথে চলে যায়। কিন্ত শৈলকূপায় একটি ব্রিজ ভেঙ্গে তাদের পালাবার পথ রুদ্ধ করা হয়েছিল। দ্রুতগামী জীপ খাদে পড়ে মেজর শোয়েবসহ অনেক পাকসেনা মারা যায়।


দুই রাত ও দুই দিনের যুদ্ধের পর ১ এপ্রিল কুষ্টিয়া মুক্ত হয়। এই যুদ্ধে রাজবাড়ি থেকে শহীদ হন মোঃ আব্দুল কুদ্দুস গ্রাম কোমরপুর, মোঃ সিরাজুল হক গ্রাম রামকোল (মাচপাড়া-পাংশা), মোঃ হাসমত আলী গ্রাম হোসনাবাদ দ্বাদশী। আহত হন আনসার সদস্য মোঃ আব্দুর রব (রামকান্তপুর) ও তার ভাই। কুষ্টিয়ার যুদ্ধে শহীদ ও আহতদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্মরণ করা হয়নি। তিনজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে কুষ্টিয়া হাসপাতাল সংলগ্ন গোরস্থানে কবরস্থ করা হয়। বিজয়ী যোদ্ধাদের পরের দিন গণজমায়েতের মাধ্যমে আজাদী ময়দানে সংবর্ধনা জানানো হয়। স্থানীয় নেতৃবৃন্দসহ উপস্থিত ছিলেন মহকুমা প্রশাসক শাহ মোহাম্মদ ফরিদ।

গোয়ালন্দ ঘাট প্রতিরক্ষা বেষ্টনী, যুদ্ধ ও পাকবাহিনীর রাজবাড়ি প্রবেশ

রাজবাড়ি ও ফরিদপুর অঞ্চলের দখল নিতে হলে ঢাকা থেকে আসা পাকবাহিনীকে গোয়ালন্দ ঘাট পার হতে হবে। ফলে গোয়ালন্দ ঘট পরিচালনার দায়িত্বে স্থানীয় জনগণসহ প্রশিক্ষণরত সেনা, আনসার নিয়োজিত থাকে। ২৭ মার্চ (১৯৭১) লোকমুখে শোনা যায় পাকসেনারা পদ্মা পার হয়ে গোয়ালন্দর দখল নিবে। গুজবটি মুখেমুখে রাজবাড়ি ও ফরিদপুরের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে যায়। ২৭ মার্চ সকালে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি, ফরিদপুর থেকে লক্ষাধিক মানুষ, বন্দুক, ঢাল, সরকী ফলা, যুতি, কেঁচ, বল্লম তলোয়ার, বড় লাঠি, তীর ধনুক, রাম দা, হকিস্টিক, কিরিচ প্রভৃতি দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে গোয়ালন্দে সমবেত হয় এবং মহড়া প্রদর্শন করতে থাকে। মুহুর্মুহু স্লোগান ও হুঙ্কারে এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সকাল আটটা নাগাদ দেওয়ান পাড়া থেকে স্টিমারঘাট পর্যন্ত লোকারণ্যে পরিণত হয়। চলতে থাকে পাকবাহিনীর মোকাবেলার অপেক্ষার পালা। বিকেল নাগাদ কাজী হেদায়েত হোসেনের আগমনরত গাড়ি দেখা যায়। তিনি চলমান মানুষকে গোয়ালন্দের দিকে আসার জন্য হাত নাড়ের। পাকবাহিনীকে দেখা যায় না। সন্ধ্যায় জনগণ খানখানাপুর ব্রিজ ভাঙ্গতে শুরু করলে হেদায়েত হোসেন ও আক্কাস আলী মিয়া ‍উভয়ে বলেন, ‘ব্রিজ ভাঙ্গার সময় এখনো আসেনি।’ তাদের কথায় ব্রিজ ভাঙ্গা বন্ধ হয়। ২৭ মার্চ থেকেই গোয়ালন্দ ঘাট পাহাড়ায় নিয়োজিত থাকে। এসময় থেকেই কয়েক স্তরের বাঙ্কার খনন করে যুদ্ধ প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়। ওদিকে আরিচা ঘাটে অবস্থানরত পাকবাহিনী গোয়ালন্দের উপর নজরদারী বৃদ্ধি করে। পাকবাহিনীর একটি ফেরি অগ্রগামী হতে দেখা যায়।

তারা ফেরি থেকে সার্চলাইটের সাহায্যে অবস্থা পর্যবেক্ষণের মুহুর্তে গোয়ালন্দে অবস্থিত প্রতিরোধবাহিনী গর্জে ওঠে। তারা নানা অস্ত্র উঁচিয়ে তাদের দৃঢ় অবস্থানের জানান দেয়। তারা বাঙ্কার থেকে বেড়িয়ে আসে এবং যুদ্ধের প্রস্তুতি গ্রহণ করে। আসলে পাকবাহিনীর অত্যাধুনিক রাইফেল, মেশিনগান কামান, গোলাবারুদের বিপরীতে সাধারণ অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধের প্রস্তুতি জনমানুষের জাতীয় চেতনায় তা ছিল আত্মহুতির নামান্তর প্রস্তুতি। তা সত্ত্বেও পাকবাহিনী অবস্থা আঁচ করে আরিচা ঘাটে ফিরে যায়। এ সময়ে রেলগাড়িতে আনসার এ্যাডজুটেন্ট আকরাম হোসেন ৪০টি রাইফেলসহ ৪০ জন আনসারের একটি ব্যাটেলিয়ান গোয়ালন্দ পাঠান। তা ছিল এক স্মরণীয় ঘটনা। ফকীর মোঃ মহিউদ্দীনের নেতৃত্বে এ ব্যাটিলিয়ান গোয়ালন্দ ঘাট পাহাড়ায় নিয়োজিত হন। স্থানীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে ডা. জয়নাল আবেদীন এবং ছাত্রনেতা ফকির আব্দুল জব্বার ব্যাটেলিয়ানবাহিনীর আহারের ব্যবস্থা করেন। তৎকালীন ইপিআরবাহিনীর সদস্যগণ ৩ এপ্রিল পর্যন্ত ঘাট পাহাড়ায় নিয়োজিত থাকেন। তাদের অধিকাংশই ছিল সিলেট অঞ্চলের। ৩ এপ্রিল কুষ্টিয়ার ওয়্যার্লেস যুদ্ধ বিজয়ী একদল ইপিআরবাহিনী গোয়ালন্দ ঘাট প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নিলে আগের বাহিনী প্রস্থান করে। এ সময় ৩০ জন প্রশিক্ষিত সৈনিক, ১৫০ জন আনসার এবং রাজবাড়ি পাংশা, গোয়ালন্দ ঘাট রক্ষায় নিয়োজিত থাকে। রাজবাড়ি ও ফরিদপুর অঞ্চলের পাকবাহিনীর প্রবেশ পথ ছিল দুটি যথা গোয়ালন্দ ঘাট ও কামারখালি ঘাট। উভয় পথেই সৃদৃঢ় প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। উভয় স্থানেই প্রায়দিনই হাজার হাজার মানুষ সমবেত হতে থাকে। অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য খুব নিচু দিয়ে বিমান উড়ে যেত।


তারা বিমান থেকে শেল নিক্ষেপ করতে পারে এমন আশংকায় ১০ এপ্রিল থেকে বিমান আসামাত্রই রাইফেলের গুলি ছুঁড়ে। ১২ এপ্রিল পাকিস্তানবাহিনী জেএন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বোমা নিক্ষেপ করে। দ্বিতীয় বোমা ফেলা হয় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থাকা মালগাড়িতে। এতে মালগাড়ির একটি বগী ক্ষতিগ্রস্থ হয়। তৃতীয় বোমা ফেলা হয় গোয়ালন্দের ঘোষপট্রিতে। এখানে ছয়টি শেল নিক্ষেপ করা হয় যা ছয়টি ঘরে আঘাত করে। এতে নিহত হয় শরৎচন্দ্র ঘোষ, নিয়তী রানী ঘোষ, দিলীপ চন্দ্র ঘোষ। আহন হন দশ জন। ঘোষপট্রির অনেকটাই ধ্বংস হয়ে যায়। ১২ এপ্রিল আবু ওসমান চৌধুরীর নির্দেশনায় এক প্লাটুন ইপিআর, ১টি ট্যাংক বিধবংসী কামান, ১টি মেশিনগান, ২টি মেশিনগান ও ৩০৩ বোরের রাইফেলসহ গোয়ালন্দে আসেন। ১৩ এপ্রিল পাকিস্তানি সেনারা আরিচা থেকে ফেরি ও লঞ্চের বহর নিয়ে গোয়ালন্দ মুখে অগ্রগামী হয়। তারা রেঞ্জের মধ্যে এসে গোয়ালন্দে আক্রমণ চালায়। যোদ্ধারা অবিরল ধারায় গুলিবর্ষণ করতে থাকে। পাকসেনাদের একটি লঞ্চ ডুবে যায়। তাদের বেশ কিছু সৈন্য পদ্মায় ডুবে মারা যায়। তারা ভীতু হয়ে ঐ দিনই পশ্চাৎগামী হয়। ১৫ এপ্রিল পাকিস্তান বিমানবাহিনী গোয়ালন্দ ঘাটে শেল নিক্ষেপ করে। বোমার আঘাতে ঘোষপট্রি সম্পূর্ণ ধবংস হয়ে যায়। শেল নিক্ষেপে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি ফরিদপুর এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। সাধারণ মানুষ আতঙ্কে ছোটাছুটি করতে থাকে।

গোয়ালন্দে পাকবাহিনীর সাথে সর্বাত্মক যুদ্ধ হয় ২১ এপ্রিল ভোর রাতে। ঐ রাতটি ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগের রাত। সন্ধ্যা থেকেই অঝোর ধারায় বৃষ্টি নামছিল। নিকষ অন্ধকারে ঢেকে ছিল আকাশ। সাথে ঝড়ো হাওয়া। এমন দুর্যোগকেই পাকবাহিনী বেছে নিয়েছিল যুদ্ধের কৌশল হিসেবে। ২১ এপ্রিল ভোর রাতে দুটি ফেরি ও দুটি গানশীপের সমস্ত আলো নিভিয়ে গোয়ালন্দ ঘাটের খুব কাছাকাছি চলে আসে। তারা গানশীপে ট্যাংক বহন করে। গানশীপটি গোয়ালন্দ ঘাটের একদম নিকটবর্তী স্থানে চলে আসে। দ্বিতীয় গানশীপটি সৈন্য বহন করে। তারা কয়েক মাইল দুরে কামারডাঙ্গীতে গানশীপ ভিড়ায়। কিছু সংখ্যক সৈন্য কিনারে নেমে গুলিবর্ষণ করতে থাকে এ সময় মুক্তিকামী যোদ্ধারা তাদের অবস্থান ঠিক করে। মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণের জবাবে গুলিবর্ষণ করে। তারা প্রায় এক ঘন্টা প্রতিরোধ বজায় রাখতে সক্ষম হয়। কিন্তু পাকবাহিনী প্রচণ্ডভাবে মর্টার শেল নিক্ষেপ এবং মেশিনগানের গুলি বর্ষণ করতে থাকলে মুক্তিবাহিনী পিছু হটে আসতে থাকে। বেলা আটটার দিকে ট্যাংকবহর ফেরি ঘাটে উঠায় এবং ট্যাংক নিয়ে প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে গোয়ালন্দ বাজারের দিকে অগ্রগামী হয়। এ সময় প্রতিরোধকারী কিছু সৈন্য নিহত হয়। গানশীপ থেকে শত শত সৈন্য নেমে আসে এবং তারা গোয়ালন্দ ঘাটের দখল নিয়ে দোকানপাট লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগ করতে থাকে। এ যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফকীর মোঃ মহিউদ্দিন শাহাদত বরণ করেণ। গোয়ালন্দ থেকে কয়েক ট্রাক ভর্তি পাকবাহিনী রাজবাড়ি অভিমুখে যাত্রা করে। পথে খানকানাপুর বাজারে প্রবেশ করে।

প্রবেশ পথে আব্দুল গনি গেটু খলিফার বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এরপর খানখানাপুর সুরাজমোহিনী বিদ্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। এরপর বিদ্যালয়ের শিক্ষক তারাপদ মাস্টারের বাড়ি আগুন দেয়। তারা খানখানাপুরের পাটের গুদামসমূহ আগুনে পুড়িয়ে যগল কুণ্ডু ও রাখাল কুণ্ডু, এই দুই ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে যায়। তাদের খোঁজ আর মেলেনি।

খানখানাপুর থেকে সরাসরি সিএন্ডবি রোড ধরে পাকবাহিনী রাজবাড়ি শহরে প্রবেশ করে। প্রবেশমুখে তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক শাহ মুহম্মদ ফরিদ তাদের মুখোমুখি হন। রাজবাড়ি শহর রক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি তাদের এই বলে বোঝাতে চেষ্টা করেন যে, ‘রাজবাড়ি শহরে কোনো মুক্তিকামী সৈন্য নেই।’ পাকবাহিনী প্রধান সড়ক ধরে বাজারের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক আব্দুর রাজ্জাক তার নিজের বন্দুক দিয়ে ওভার ব্রিজের ওপর থেকে একটি গুলি ছোঁড়ে। হানাদার বাহিনী এতে ক্ষিপ্ত হয়ে এলোপাথাড়ী গুলি ছুঁড়তে থাকে। তারা শহরের একমাত্র ঐতিহ্যবাহী হাকিম মিয়ার হোটেলটি পুড়িয়ে দেয়।


রেলগেট পার হয়ে কাবুলী বিল্ডিং-এ আগুন দেয়। তৎকালীন সময়ে সব দোকানপাটই ছিল টিনের ঘর। স্টেশন রোড ধরে অগ্রসর হতে হতে ডানে বাঁয়ের বেশিরভাগ দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়। তারা একজন পাগলকে গুলি করে হত্যা করে। বেলী আইসক্রীমের মালিককে গুলি করে হত্যা করে হত্যা করে। ওদিকে আর একটি ট্রাক ভর্তি পাকহানাদার মক্তবমোড়ে রাস্তাধরে কাজী হেদায়েত হোসেনের বাড়ির দিকে যেতে ডা. আসজাদের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। কাজী সাহেবের বাড়িতে মর্টার শেল নিক্ষেপ করে। বাচ্চু মাস্টার বাড়িতে আগুন দেয়। তারা অ্যাডভোকেট কালীশংকর মৈত্রীকে গুলি করে হত্যা করে। মহকুমা প্রশাসক শাহ মোঃ ফরিদকে বন্দি করে প্রথমে ঢাকা ক্যান্টমেন্ট ও পরে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রেরণ করে। তাকে নির্মমভাবে নির্যাতন করা হয়। এরপর তারা শহর ও শহর এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে শুরু করে। পলায়নরত মানুষের ওপর তারা গুলি করে। অনেকে নিহত ও আহত হয়। এ সময় মঞ্জুর মোরশেদ বাদশা গুলিতে আহত হন।

বিহারীদের গণহত্যা

মুক্তিযুদ্ধকালে দেশের কয়েকটি স্থানে বিশেষ করে সৈয়দপুর, খুলনা, রাজবাড়িতে বিহারীদের দ্বারা বাঙালি হত্যা এক স্মরণীয় ইতিহাস। এরমধ্যে রাজবাড়িতে বিহারীদের দ্বারা লুটপাট, হত্যা, অগ্নিসংযোগের মাত্রা ছিল অন্যান্য যেকোনো স্থানের চেয়ে তীব্র।

১৯৪৭ এর পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভবের পর ননবেঙ্গলি উর্দুভাষী বিহার থেকে পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। মুসলমান হলেও সম্প্রদায়গত ভাষা ও সংস্কৃতিতে তারা বাঙালিদের থেকে ছিল আলাদা। মুক্তিযুদ্ধকালে এ সম্প্রদায়টি পুরোপুরি পাকসেনাদের সমর্থন দেয় এবং তাদের দোসর হিসেবে কাজ করে। অভিবাসিত হওয়ার পর পরই বিহারীরা রেলের ড্রাইভার, খালাসী, নিম্নমান সরকারি চাকরি, ক্ষুদ্র ব্যসসা, দোকান, হোটেল, কসাই, দর্জি ইত্যাদি কাজে নিয়োজিত হয়। রাজবাড়ি শহরের পূর্ব ও পশ্চিমে সরকারীভাবে তাদের বাসস্থানের জন্য দুটি কলোনী নির্মাণ করে যা আজও বিহারী কলোনী হিসেবে পরিচিত। এসব কলোনীতে প্রায় দশ হাজার বিহারী বাস করত। এছাড়া আলীপুর হাট, শহীদ ওহাবপুর হাট, খানখানাপুর হাট, কলোনী ছিল। গোয়ালন্দ ঘাটে প্রায় দুশ বিহারী বাস করত। বালিয়াকান্দি ও পাংশাতেও কিছু বিহারী ছিল। উল্লেখ্য ৩৬ মার্চ থেকে এপ্রিলের শেষ পর্যন্ত পাকবাহিনী প্রাথমিকভাবে বাঙালিদের দ্বারা প্রতিরোধের সম্মুখীন হয় কিন্তু এপ্রিলের শেষাবধি তারা শান্তিবাহিনী, বিহারী দোসর এবং প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধির মাধ্যমে সারাদেশের নিয়ন্ত্রণ ভার সুদৃঢ় করে। বলা যায় তখন থেকে শুরু হয় প্রকৃত মুক্তিযুদ্ধ। এ সময়কালের সংগঠিত যুদ্ধ এবং বিহারীদের প্রসঙ্গ মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সমৃদ্ধ ইতিহাস। এ গ্রন্থের ক্ষুদ্র পরিসরে তার ব্যাপক আলোচনা সম্ভব না হলেও এর ধারাবাহিক রুপরেখা দেওয়া হল। দীর্ঘদিনের বসবাসে বিহারী ও বাঙালিদের মধ্যে সৌহার্দপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে ওঠলেও ক্র্যাক ডাউনের পর সম্পর্কের দ্রুত অবনতি ঘটে। বাঙালিরা প্রথমে বিহারীদের প্রতি বিরুপ আচারণ করলেও তা ছিল নিতান্তই ঝগড়া ফ্যাসাদের মত। তা কোনো আক্রমণাত্মক বিষয় ছিল না। পাকবাহিনী ২০ এপ্রিল রাজবাড়ি দখল নেওয়ার পর থেকে ১৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজবাড়ি শহর, বাশ্ববর্তী এলাকাসহ গোয়ালন্দ, বালিয়াকান্দি, পাংশায় হত্যা, লুটপাট, অপহরণ, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুরের বিভিষিকা সৃষ্টি করে। রাজবাড়ি শহর ‍প্রকৃত অর্থে বিহারী ভিতির শহরে পরিণত হয়। বিহারীদের ভয়ে অনেক পরিবার ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। শহর বিরাণভূমিতে পরিণত হয়।

মে মাসের ১ম সপ্তাহে রাজবাড়ির অবস্থা জানতে নাড়ুয়া থেকে ১২/১৪ মাইল পায়ে হেঁটে রাজবাড়ি আসি। আমি তখন রাজবাড়ি কলেজের প্রভাষক। কলেজ রোড ধরে যেতে আরএসকে স্কুলের নিকট কলেজ বেয়ারা আলীর সাথে দেখা হতে সে বলল স্যার কলেজে যান, আমি বাজার থেকে আসছি। অধ্যক্ষের কক্ষে বসে থাকা অবস্থায় একটা গুলির শব্দ শুনতে পেলাম।


খবর এল বিহারীরা গুলি করে আলীকে হত্যা করেছে। ২৪ মে গভীর রাতে রাজবাড়ি পৌরসভার চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান এর বাড়িতে আক্রমণ করে। হাবিবুর রহমান প্রকাশ্যে বাঙালি হত্যার বিচার চেয়েছিলেন। এই অজুহাতে বাড়ি আক্রমণ করে। সে রাতে তিনি বাসায় ছিলেন না। তাকে না পেয়ে তার ভাই আশ্রাফ উদ্দিন, আলাউদ্দিন ও ভাইয়ের ছেলে আতাউর রহমানকে ঘর থেকে বের করে গলি করে হত্যা করে। ৩০ এপ্রিল রাজা সূর্যকুমারের নাতি সৌমেন্দ্র গুহ রায়ের পুত্র সোমেন্দ্র মোহন গুহকে বাজারস্থ নিজ ঘরেই হত্যা করে। তার ঐ দিন জগদ্বন্ধু দত্তকে হত্যা করে। রাজবাড়ি জেলখানা মসজিদের ইমাম কাজী সামসুদ্দিন কয়েকজন বিহারীকে ডেকে এসব হত্যার পরিণতি বিষয়ে বোঝাতে চেষ্টা করেন। এরপর াতঁকে বিহারীরা নির্মমভাবে হত্যা করে। ৩০ এপ্রিল তারা মওলানা আবু তাহেরের কিশোরী কন্যাকে অপহরণ করে। একদিন পর তার লাশ পাওয়া যায়। ঐ দিনে আবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে। ১৬ মে বিহারীরা বেড়াডাঙ্গার ফিরোজ খান ও আমিনুল ইসলামকে কুপিয়ে হত্যা করে। এভাবে ডিসেম্বর পর্যন্ত রাজবাড়ি শহরের অসংখ্য মানুষ হত্যা করে। রাজবাড়ির তৎকালীন ব্যবসায়ী ও সুধীজন হাকিম মিয়াকেও তারা হত্যা করে।

১১ মে রাজবাড়ি ও খানখানাপুরে বিহারীরা গোয়ালন্দ মোড়ের আহলাদিপুরের ডা. কালীপদ ভট্রাচার্য, তার শিশুপুত্র ও আত্মীয়দের কুপিয়ে হত্যা করে। ২৩ মে বিহারী ও পাকবাহিনী মিলি রামদিয়াতে গণহত্যা চালায়। সেদিনের আক্রমণে রামদিয়ায় ১৩০ জন নিহত হন। নেতৃত্ব দেয় বিহারী চাঁদ খাঁ। জেলার ভিতর এটাই ছিল বিহারী ও পাকবাহিনীর সবচেয়ে নৃশংসতম ও বৃহৎ গণহত্যা। ৩০ মে খানখানাপুর বিহারী কলোনীর বিহারীরা সাহাপাড়ায় হামলা ও লুটপাট করে। তারা লোকনাথ সাহা, কেওরীয়া শীল, জগদীশ শীল, নগেন্দ্র শীলকে হত্যা করে। রামপুর আলাদীপুর কলোনীর বিহারীরা ১জুন রামপুরের আদ্যনাথ শীলের বাড়ি আক্রমণ করে। বিহারীরা আদ্যনাথ-সহ পাঁচজনকে হত্যা করে। ৩ জুন বিহারীরা মূলঘর এলাকায় আক্রমণ চালায় এবং ৫ জনকে হত্যা করে। ৭ জুন বিহারীরা কল্যাণপুরে হামলা চালায়। এ হামলায় অনেক লোক নিহত হয়। নিহতদের সংখ্যা ছিল ২৩। ১৬ জুলাই রাজবাড়ি মুজিব বিল্ডিংয়ের মালিক মোঃ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। জুলাই মাসের শেষে বিহারীরা জৌকুড়া গ্রামে হামলা করে। নিহত হন প্রকাশ কুমার কুণ্ডু, স্বপন কুমার কুণ্ডু, রক্ষণী কুমার কুণ্ডু, শরৎচন্দ্র দাস, নিরোদচন্দ্র কুণ্ডু।

জুলাই মাসের মাঝামাঝি পাকহানাদারবাহিনী বিহারীদের সাহায্য নিয়ে মাছপাড়া গ্রামের শতাধিক বাড়িঘরে আগুন দেয়। মথুরাপুর, রামকোল, মাছপাড়া গ্রামের শতাধিক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। তারা কালুখালি আক্রমণ করে প্রায় দশজনকে হত্যা করে। এভাবে ৯ মাসে বিহারী ও পাকহানাদারবাহিনী রাজবাড়ি শহর ও গ্রাম এলাকার জানা অজানা প্রায় ১৫ হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করে।

মুক্তিযুদ্ধের সার্বিক পরিকল্পনা, ভারত গমন, ট্রেনিং গ্রহণ

প্রাথমিক অবস্থায় প্রতিরোধ যুদ্ধের পর পাকবাহিনী অত্র অঞ্চলসহ সারাদেশে নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করে। তারা চাকরিজীবীদের কাজে যোগদানের ঘোষণা দেয়। স্কুল কলেজ খোলার আদেশ দেয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা চালু করার জন্য ব্যবস্থা গ্রহণ করে। দু-চারজন এমপি এমএনএ কে তাদের পক্ষে বিবৃতি দেওয়ায়। মৃত্যুর ভয়ে রাজবাড়ির এমএনএ এবিএম নূরুল ইসলাম তাদের পক্ষে রেডিওতে বিবৃতি দেন। তারা শান্তি কমিটি, রাজাকারবাহিনী গঠন করে। মিলিশিয়াবাহিনী গঠন করে স্থানীয় শাসন নিয়ন্ত্রণের প্রচেষ্টা চালায়। কিন্তু সাধারণ মুক্তিকামী মানুষ এতে মোটেও আস্থা জ্ঞাপন করে না।


তারা গোপনে সংগঠিত হতে থাকে এবং সর্বাত্মক যুদ্ধের মাধ্যমেই যে দেশের স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে এ প্রত্যয় তাদের মধ্যে জন্ম নেয়। এ অবস্থায় রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ, পাংশা, বালিয়াকান্দির রাজনীতিবিদ, কর্মী, ছাত্র, যুবক, সাধারণ মানুষ সশস্ত্র যুদ্ধের মোকাবেলায় ভারত ও স্থানীয়ভাবে ট্রেনিং গ্রহণের প্রস্ততি নেয়। তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়ে ভারত গমন করে। এ সময় রাজবাড়ি থেকে পাকহানাদার, বিহারী, রাজাকার, দুর্বৃত্ত, সন্ত্রাসী, চোর ডাকাতের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে প্রায় এক চতুর্থাংশ হিন্দু মুসলমান ঘরবাড়ি, সহায় সম্পাত্তি ফেলে নিরাপদ আশ্রয়ের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে ভারত গমন করে। রাজবাড়ি জেলার সমস্ত হিন্দু বসতি এলাকা জনশূন্য বিরাণভূমিতে পরিণত হয়। তারা কামারখালি, নাড়ুয়া, সমাধিনগর, কশবামাঝাইল, লাঙ্গলবাঁধ গড়াই নদীর ঘাট পাড় হয়ে ভারত গমন করে। তারা কল্যাণপুর ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণের পর কাজী হেদায়েত হোসেনের নেতৃত্বে যোদ্ধাদল গঠন করে। যোদ্ধাদের বিহারের চাকুলিয়া এবং উত্তর প্রদেশের দেরাদুন সেনানিবাসে প্রশিক্ষণ দানের পর গ্রুপ লিডারের নেতৃত্বে বাংলাদেশ প্রেরণ করা হত। সাধারণ মক্তিযোদ্ধাদের গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। এখানে মুজিববাহিনী নামে আর একটি পৃথকবাহিনী তৈরি করে দেরাদুনে প্রশিক্ষণ দেওয়া হত। প্রশিক্ষণের মধ্যে ছিল বিভিন্ন প্রকার বন্দুক, রাইফেল, এসএমজি, এসএলআর, হালকা মেশিনগান, ভারি মেশিনগান চালনা, ডিনামাইট, গ্রেনেড, হাতবোমা ছোঁড়া, বেয়নেট চার্জসহ যুদ্ধের নানা কৌশল।

 ভারত থেকে প্রশিক্ষণের পর মেজর আবুল মঞ্জুর, মেজর নাজমূল হুদা প্রমুখের স্বাক্ষরে প্লাটুন গঠন করে লিখিত নিয়োগপত্রের মাধ্যমে যুদ্ধের জন্য তৎকালীন গোয়ালন্দ মহকুমায় পাঠানো হয়। মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার, প্লাটুন কমান্ডার, মুজিববাহিনী কমান্ডার হিসেবে তাদের নিয়োগ করা হয়। প্লাটুন কমান্ডারের অধীনে মুক্তিকামী সংগঠনের মাধ্যমে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়। একেএম শহীদুন্নবী আলম গোয়ালন্দ মহকুমার মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার নিযুক্ত হন। ক্রাক ডাউনের পরই তিনি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। গোয়ালন্দ যুদ্ধের পরই তিনি নিজ গ্রাম সুলতানপুরে ২০ জন ‍মুক্তিযোদ্ধার ট্রেনিং দান করেন। বিহারীরা তার মাথা লক্ষ টাকা ঘোষণা করে। অতঃপর তিনি বনগাঁ ট্যালী ক্যাম্পে আশ্রয় গ্রহণের পর দেরাদুনে ট্রেনিং গ্রহণ করে ব্যারাকপুর ট্রেনিং ক্যাম্পে ফিরে আসেন। সেখানে তিনি ওয়ার্লেস ও সিগনালের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ৮ নং সেক্টর কমান্ডার আবুল মঞ্জুর তাঁকে গোয়ালন্দ মহকুমার (রাজবাড়ি) কমান্ডার নিযুক্ত করেন। তার অধীন গ্রুপ কমান্ডারসহ ‍মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কাজ করেন------মোঃ আব্দুল জলিল (গ্রুপ কমান্ডার), নিখিল কুমার চক্রবর্তী, অধীর কুমার শীল, পবন মণ্ডল, মোঃ আব্দুর রাজ্জাক, অধ্যাপক আবদুল মান্নান, আব্দুস সাত্তার-সহ অনেকে। শহীদুন্নবী আলম মহকুমা অধিনায়ক হিসেবে সকল গ্রুপকেই তদারকী ও প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন। তার অধীনে মাসলিয়া, বেচখোলা, হমদমপুর তহশীল অফিস ও হমদমপুর প্রাথমিক স্কুলে তিনটি ক্যাম্প প্রতিষ্ঠিত হয়। এসব ক্যাম্পে প্রায় ৩০০ মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ দেওয়া হত এবং অপারেশন পরিচালনা করা হত। রাজবাড়ি মুক্ত হওয়ার শেষে ক্যাম্প ছিল মাটিপাড়ায়। রফিকুল ইসলাম তার গ্রুপ নিয়ে পাঁচুরিয়া, কামরুল হাসান লালী পদ্মার কুলে, আবুল হোসেন বাকাউল (প্লাটুন কমান্ডার) রশড়া এবং অন্যান্য গ্রুপ কমান্ডারগণ  রাজবাড়ির বিভিন্ন স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন।


রাজবাড়ির মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডারদের নাম

রাজবাড়ি সদর

(১) একেএম শহীদুন্নবী আলম, ভবানীপুর রাজবাড়ি (২) ডা. কামরুল হাসান লালী, রাজবাড়ি (৩) অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, বরাট (৪) আবুল হাশেম বাকাউল, সজ্জনকান্দা, রাজবাড়ি (৫) মোঃ ইলিয়াস মিয়া, লক্ষীকোল, রাজবাড়ি (৬) মোঃ খেলাফত হোসেন, নিউকলোনী, রাজবাড়ি (৭) মাস্টার আব্দুল জলিল, লক্ষীকোল, রাজবাড়ি (৮) সিরাজ আহম্মেদ, রাজবাড়ি সদর (মুজিববাহিনী) (৯) আকবর হোসেন মর্জি, রাজবাড়ি সদর (১০) আব্দুর রশীদ, রাজবাড়ি (১১) সুবেদার মেজর মোঃ আব্দুল খালেক সরদার, সাদিপুর, রাজবাড়ি।


পাংশা উপজেলা

(১) মোঃ জিল্লুল হাকিম, পাংশা, রাজবাড়ি (২) মোঃ নাসিরুল হক সাবু, পাংশা, রাজবাড়ি (৩) মোঃ আব্দুল মালেক মিয়া, পাংশা, রাজবাড়ি (৪) মোঃ মঞ্জুর মোর্শেদ (সাচ্চু), পাংশা, রাজবাড়ি (৫) আব্দুল মতিন মিয়া, পাংশা, রাজবাড়ি (৬) আবুল হোসেন সরদার, কালুখালি, রাজবাড়ি (৭) মোঃ এনামুল বারি মজনু, পাংশা, রাজবাড়ি (৮) আব্দুর রব, মৃগী, পাংশা, মুজিববাহিনী (৯) আবুল কালাম আজাদ, পাংশা, মুজিববাহিনী (১০) আমজাদ হোসেন, পাংশা, রাজবাড়ি (১১) আব্দুর রাজ্জাক, পাংশা, রাজবাড়ি (১২) মোঃ শামসুদ্দিন, পাংশা, রাজবাড়ি (১৩) মোঃ মাহবুব হোসেন মিয়া, পাংশা, রাজবাড়ি (১৪) নাদের হোসেন মুন্সি, পাংশা, রাজবাড়ি (১৫) দেবব্রত রায়, পাংশা, রাজবাড়ি (১৬) মোঃ আব্দুল গফুর, পাংশা, রাজবাড়ি।


বালিয়াকান্দি

(১) মোহসীন, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ি (২) মোঃ রোস্তম আলী, নাড়ুয়া, বালিয়াকান্দি  (৩) সুবেদার মেজর জালাল উদ্দিন, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ি (৪) শেখ নজরুল ইসলাম, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ি (৫) মোঃ শামসুল আলম, বালিয়াকান্দি, রাজবাড়ি


গোয়ালন্দ

(১) ফকির আব্দুল জব্বার, গোয়ালন্দ।

নয় মাস যুদ্ধকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাগণ অনেক স্থানে সংগঠিত ও বিচ্ছিন্ন অপারেশ কার্যক্রম পরিচালনা করে। এখানে কয়েকটি অপারেশনচিত্র তুলে ধরা হল------ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর জুলাই মাসের প্রথম দিকে মোঃ রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পাটুরিয়া এলাকায় ট্রেনিং ও অপারেশন কাজ শুরু করে। প্রাথমিক অবস্থায় তারা প্রায় ২০০ শত মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করে। প্রথমেই গোয়ালন্দ হাসপাতাল সংলগ্ন রেলব্রিজ পাহারারত বিহারী, রাজাকার ও মিলিশিয়াকে আক্রমণ করা হয়। এই আক্রমণে অংশগ্রহণ করেন আব্দুস সামাদ মোল্লা, মোঃ সাকির উদ্দিন কুটি, মোঃ আমিনুল ইসলাম শফি ও মোঃ আব্দুল আজিজ খুশী। আক্রমণ করা হয় ভোর ছ’টায়। অতর্কিত আক্রমণে ১৬ জন রাজাকার আত্মসমর্পণ করে, অবশ্য এই রাজাকাররা ১৬টি রাইফেল জমা দিয়ে মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেয়। এরপর ৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল আলাদীপুর ব্রিজ আক্রমণ করে। ব্রিজটি ছিল ফরিদপুর ও রাজবাড়ির যোগাযোগের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তা বোমার আঘাতে ভেঙ্গে দিতে পারলে পাকসেনারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এই লক্ষ্যে তার ব্রিজের কাছাকাছি এসে গুলি ছুঁড়তে থাকে। কিন্তু রাজাকারদের প্রচণ্ড প্রতিরোধের মুখে পড়ে। গুলির শব্দ শুনে বিহারীরা এসে যোগ দেয়। ফরিদপুর থেকে পাকহানাদারবাহিনীও ছুটে আসে। মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই অপারেশনে বিহাররীদের গুলির আঘাতে রাজবাড়ি কলেজের ১ম বর্ষের ছাত্র (লেখকের প্রিয় ছাত্র) আব্দুল আজিজ খুশী শহীদ হন। গ্রুপ কমান্ডার রফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচুরিয়া রেল স্টেশন এবং দুই রেল ব্রিজের পাহারারত প্রায় ৩০ জন রাজাকারকে মোটিভেশন করে আত্মসমর্পন করান।

কামরুল হাসান লালী ক্যাডেট কলেজের ছাত্র (পরে ডাক্তার) ছিলেন। ভারতের চাকুলিয়ায় একমাস প্রশিক্ষণ শেষে সেপ্টেম্বরে শক্তিশালী দল নিয়ে রাজবাড়ি প্রবেশ করেন। গ্রুপ কমান্ডার কামরুল হাসান লালীর অধীনে ছিলেন গোলাম মোস্তফা, আবু বকর সিদ্দিক, মোঃ হোসেন দেওয়ান, মেজেক শেখ, শাহজাহান, হেলাল-সহ আরো অনেকে। তারা প্রথমে পাংশা ও পরে বেলগাছি বকু চৌধুরীর বাড়ি আশ্রয় নেন। অসীম সাহসী মোঃ ইলিয়াস মিয়ার নেতৃত্বে কয়েকজন আলাদা হয়ে যান। কামরুল হাসান লালী শুকুর চেয়ারম্যানের বাড়িতে ৩০/৩৫ জন সদস্য নিয়ে শক্তিশালী মুক্তিযোদ্ধা দল গঠন করেন। তারা সূর্যনগর ও রাজবাড়ির মাঝে কয়েকটি ব্রিজের পাহারারত রাজাকারদের আত্মসমর্পন করান। লেখকের বাড়ি বালিয়াকান্দি ‍উপজেলায় দিগন্ত বিস্তৃত তেঢালা বিলের দক্ষিণ পাড় অবস্থিত নাড়ুয়া ইউনিয়নে বিলমালেঙ্গা গ্রামে। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন বিলগুলিতে অবস্থিত গ্রামটি ছিল বিহারী ও পাকবাহিনীর অনুপ্রবেশ থেকে নিরাপদ। বিলমালেঙ্গা ও তালুকপাড়া পাশাপাশি দুটি গ্রামের কিছুসংখ্যক মুক্তিযোদ্ধা ট্রেনিং গ্রহণ করেন। তবে গ্রামটি নিরাপদ হওয়ায় মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আশ্রয় গ্রহণ করতেন।


লেখকের বাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের সূচনা থেকে শেষ পর্যন্ত কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা নিয়মিত আশ্রয় গ্রহণ করতেন। জুলাইয়ের মাঝামাঝি পাকহানাদারবাহিনী একবার মৃগী ও নাড়ুয়া বাজার লুট করে এবং সাহাদের দোকানপাট পুড়িয়ে দেয়। তারা সাহা পাড়ায় আগুন দেয়, লুটপাট ও হত্যাযজ্ঞ চালায়। বাকসাডাঙ্গীর গ্রামের লোকজন একদিন একরাত পাটক্ষেতে আত্মগোপন করে থাকে। নাড়ুয়া ইউনিয়নে মুক্তিযুদ্ধের একটি দল রোস্তম আলীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে।

৩৬ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল ১৯ সেপ্টেম্বর ভারতে গেরিলা যুদ্ধের প্রশিক্ষণ নিয়ে বালিয়াকান্দি উপজেলার গড়াই নদীর তীরবর্তী অঞ্চল দিয়ে এ্যাম্বুশ গ্রহণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের চলাচলের জন্য এ অঞ্চলটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এখানকার মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই পার্শ্ববর্তী মাগুরার শক্তিশালী কমান্ডার আকবর চেয়ারম্যানের কমান্ডে কাজ করতেন। তারা মেঘচামী, ঢোলজানী, আরকান্দির বাঘুটিয়া, নাড়ুয়ার মৌলবী ইয়ারউদ্দিন মুন্সির বাড়িতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। এ অঞ্চল রাজাকারবাহিনী বিশেষ অত্যাচারে মেতে ওঠে। মুক্তিযোদ্ধারা বালিয়াকান্দি ইউপি চেয়ারম্যান আক্তারুল ইসলাম, গাজনার আজিমুদ্দিন চেয়ারম্যান, বহরপুর ইউপির মেম্বর মতিয়ার রহমান, জামালপুরের আলী আকবর, রাজাকার বাহাউদ্দিনকে গুলি করে হত্যা করে। বালিয়াকান্দি থানা অপারেশন ও দখল ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের অসম সাহসিকতার পরিচয়। জেলার সব অঞ্চলের মুক্তিযোদ্ধাগণ রাজবাড়ি আক্রমণের পরিকল্পনা করে। এমতাবস্থায় প্রচুর অস্ত্রের প্রয়োজন বিধায় তারা বালিয়াকান্দি থানা আক্রমণ করে অস্ত্র সংগ্রহ করবে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।

বালিয়াকান্দি থানাটি ছিল সুরক্ষিত। পুলিশ ও রাজাকার মিলে তাদের সংখ্যা ছিল শতাধিক। তারা বাংকার কেটে প্রতিরোধ ব্যূহ নির্মাণ করেছিল। এখানে বিশজন অস্ত্রধারী  মুক্তিযোদ্ধা ৫ ভাগে বিভক্ত হয়ে আক্রমণ পরিচালনা করে। রাত বারটা নাগাদ থানা আক্রমণ করা হয়। দফায় দফায় সারারাত উভয় পক্ষের গোলাগুলি চলতে থাকে। ভোর রাত পর্যন্ত গোলাগুলি চললেও থানা আয়ত্বে আসে না। এক পর্যায়ে জালাল উদ্দিন খান খেদু (পাকিস্তান ফেরৎ সৈন্য, ঘিকমলা, নাড়ুয়া) চন্দনা নদী পার হয়ে থানার কাছাকাছি এসে কয়েকটি রাইফেল থেকে ক্রমাগত গুলি ছুঁড়তে থাকে। এতে মর্টারের আওয়াজের মতো মনে হয়। মুক্তিযোদ্ধারা এ সময় জোর চিৎকার দিতে শুরু করে। থানার লোকজন তাতে ভীত হয়ে পড়ে। তারপরেও গুলি চালাতে থাকে। গুলির আঘাতে মুজিববাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার শেখ আব্দুল ওহাব আহত হন। এক পর্যায়ে ৩৩ জন পুলিশ রাজাকার, বিহারী আত্মসমর্পণ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের স্লোগান শুনে জনতা ছুটে আসে। সেখানে জাতীয় পতাকা উড়ানো হয়। ৩৩টি রাইফেল, ৩টি শটগানসহ বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদ মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। বালিয়াকান্দি থানা দখলের পর হানাদার মুক্ত হয়। তখন থেকে শর্শাপুর (দেবেন্দ্র শিকদারের বাড়ি) বালিয়াকান্দি আমতলা বাজারের নিকটবর্তী এক পরিত্যাক্ত হিন্দু বাড়ি, চেয়ারম্যান আকবর ফকীরের বাড়ি, রাজধরপুর ভেনলাবাড়ির আব্দুর গফুর মোল্লার খামার বাড়ি, ইলিশখোলা ডিডি লাহিড়ীর পরিত্যাক্ত বাড়ি, জামালপুরের সাঙ্গুরা, নাড়ুয়া বাজারের নিকটবর্তী কমান্ডার রস্তম আলীর বাড়ি, জঙ্গল ইউপির ক্ষিদির বাবুর পরিত্যক্ষ বাড়ি, বাকাইডাঙ্গা (বাকসা ডাঙ্গী) তারাপদ সাহার পরিত্যক্ত বাড়ি, বারইগ্রাম ফাঁকা বিলের ধারে ক্যাম্প করে শত শত মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দান করা হয়। মুক্তিযু্দ্ধকালীন পাংশার বিভিন্ন স্থানে অপারেশন চালানো হয়। জিল্লুল হাকিমের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি ব্রিগেডে ভাগ করা হয়। ৯ আগস্ট ১৯৭১ জিল্লুল হাকিমের কমান্ডে মাছপাড়া রেলস্টেশনে পাহারারত ১৫ জন রাজাকারকে আক্রমণ করা হয়। রাজাকার ও মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে হাতাহাতির পর গোলাগুলি শুরু হয়। এতে আটজন রাজাকার নিহত হয়। মোঃ মোশারফ হোসেন স্ব-উদ্যোগে ইসলামপুর ইউনিয়নবাহিনী গড়ে তোলেন। তিনি শ্রীপুর থানার যুদ্ধ থেকে যুদ্ধ সরঞ্জাম যোগাড় করেন।


রাজবাড়িতে ১ সেপ্টেম্বর তিনি রামদিয়া এবং ঐ অঞ্চলের ত্রাস বলে পরিচিত চাঁদ খাঁকে নিজে গুলি করে হত্যা করেন। তিনি ইলিয়াস মিয়ার কমান্ডে ২৫জনের একটি মুক্তিযোদ্ধা দল নিয়ে রাজবাড়ি থানা আক্রমণ করেন। মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি অপারেশন ছিল চন্দনা নদীর উপর কালিকাপুর ব্রিজ পাহারারত রাজাকারবাহিনীর উপর। ব্রিজে ২০জন রাজাকার পাহারায় ছিল। অতর্কিত আক্রমণে অনেকে আত্মসমর্পণ করে এবং কিছু রাজাকার পালিয়ে যায়। এ অপারেশনে ২০টি রাইফেল ও কিছু গুলি মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়। এরপর মুক্তিবাহিনী ও মুজিববাহিনী মাছপাড়া থেকে কালুখালি পর্যন্ত সব রেল ব্রিজ খুলে ফেলে। জিল্লুল হাকিম ও গ্রুপ কমান্ডার আবুল হোসেনের নেতৃত্বে বহরপুর স্কুলে অবস্থানরত প্রায় ১২৫ জন পুলিশ ও রাজাকারের উপর আক্রমণ করা হয়। এ যুদ্ধে পরাজিতবাহিনীর নিকট থেকে ২ হাজার রাউন্ড গুলি, ১২৫ টি বিভিন্ন ধরণের অস্ত্র মুক্তিযোদ্ধাদের হস্তগত হয়।

পাংশায় সবচেয়ে বড় যুদ্ধ সংগঠিত হয় ৫ ডিসেম্বর। ঐদিন পাকহানাদারবাহিনী ট্রেনে কুষ্টিয়া যাওয়ার পথে মাছপাড়া পৌছাতেই মুক্তিযোদ্ধারা আক্রমণ চালায়। হানাদার সেনা বোঝাই রেলগাড়ি ব্রিজ পাড় হতে না হতেই দক্ষিণ দিক থেকে বৃষ্টির মতো গোলাবর্ষণ শুরু করে। রেলগাড়ির চালককে গুলিবিদ্ধ করা হয়। ফলে গাড়ি থামার সাথে সাথে চারদিকে এ্যামবুশরত মুক্তিযোদ্ধাদের গুলির আঘাতে গাড়ি ঝাঁঝরা হয়ে যায়। বহু পাকহানাদারবাহিনী হতাহত হয়। পরে কুষ্টিয়া থেকে এক গাড়ি আর্মী তাদের উদ্ধারে আসে। ব্যাপক সংঘর্ষ এড়িয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ক্যাম্পে ফিরে যায়। এরপর ৬ ডিসেম্বর থেকে রাজবাড়ি থেকে কুষ্টিয়ার সকল পাহারারত সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। পাংশায় মুক্তিযোদ্ধদের সর্ববৃহৎ দলটি পরিচালিত হয় মঞ্জুর মোর্শেদ সাচ্চুর নেতৃত্বে। তিনি ভারতে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে এক বৃহৎ দল নিয়ে সেপ্টেম্বরে পাংশায় প্রবেশ করেন। তিনি ছিলেন পাংশার মুজিববাহিনীর কমান্ডার। তার বাহিনীটি ছিল একটি ব্রিগেড সমতুল্য। প্রথমে সেনগ্রামে পরিত্যাক্ত একটি বাড়িতে ক্যাম্প করেন। এরপর বাহাদুরপুর ও পাটকিয়াবাড়ি ক্যাম্প সম্প্রসারণ করেন। এসব ক্যাম্পে প্রায় ২০০জনকে গেরিলা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। অতঃপর কয়েকটি কমান্ড দলে বিভক্ত করেন। কমান্ডারগণ কালুখালির খামার বাড়ি, বেলগাছি, মদাপুর, চরঝিকুড়ি, হাবাসপুর, মৃগীতে ক্যাম্প স্থাপন করেন। এসব ক্যাম্প থেকে কখনো বিচ্ছিন্নভাবে কখনো সম্মিলিতভাবে অপারেশন পরিচালনা করা হত।

সেপ্টেম্বর মাঝামাঝি একজন সুবেদার মেজর-সহ ৬/৭ জন পাকসেনা পাংশার পারনারায়ণপুর দাওয়াত খেতে যায়। গোলাম মোর্শেদ সাচ্চু সংবাদ পেয়ে দলবল নিয়ে তাদের আক্রমণ করে। তাতে ২জন পাকহানাদার নিহত হয়। আর একটি অপারেশনে কালুখালি পাংশার মাঝামাঝি মাইল দুয়েক রেল উপড়ে ফেলা হয়। বেলগাছি কালুখালির মাঝামাঝি একটি ব্রিজ বিস্ফোরক দ্বারা উড়িয়ে দেওয়া হয়। আবুল হোসেনের নেতৃত্বে বাড়াইজুরিতে ব্রিজ পাহারারত রাজাকারদের সাথে যুদ্ধ হয়। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চণ্ডীপুর বিশ্বাস বাড়ি ও কুমারডাঙ্গী মণ্ডল বাড়িতে ক্যাম্প করা হয়। এসময় কালুখালির রেল স্টেশনে পাহারারত রাজাকার ও মিলিশিয়াদের যোগাযোগের মাধ্যমে আত্মসমর্পন করানো হয়। এ অভিযানে নাজির হোসেন চৌধুরী (নিলু চৌধুরী) ও দুলু চৌধুরী বিশেষ সহায়তা দেন। কালিকাপুর রেলব্রিজে পাহারারত ৮ জন রাজাকারকে নিহত করা হয়। যুদ্ধের শেষের দিনগুলোতে পাংশা এলাকার মুক্তিযোদ্ধাগণ অসম সাহসিকতায় পাংশা শত্রুমুক্ত করার পরিকল্পনায় সকল মুক্তিযোদ্ধাদল একত্রিত হয়। ইতিমধ্যে ৩ ডিসেম্বর খোকসা থানা মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে। মিলিশিয়া, রাজাকার পলায়ন করে। পাংশার মুজিববাহিনী ৬ ডিসেম্বর থানা আক্রমণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করে। এরমধ্যে থানাররক্ষীরা পালিয়ে যায়। পাংশা শত্রু মুক্ত হয়।


কামারখালি ঘাটের যুদ্ধ

রাজবাড়ি জেলার সর্বশেষ সীমানায় গড়াই নদীর উত্তর তীরে অবস্থিত কামারখালি ঐতিহ্যবাহী রেলস্টেশন ও বন্দর। কামারখালিকে কেন্দ্র করে রাজবাড়ির দক্ষিণ অঞ্চল জুড়ে (মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিক) পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মিত্রবাহিনী ও মুক্তিযোদ্ধাদের মুখোমুখী যুদ্ধ সংগঠিত হয়। কামারখালির যুদ্ধ ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় এবং ১৫ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিমান ও সম্মুখ যুদ্ধ চলে।

৬ ডিসেম্বরের ২/৪ দিন পূর্বেই মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর (ভারতীয়বাহিনী) যৌথ আক্রমণে যশোহর ক্যান্টনমেন্টের পতন ঘটলে পাকিস্তানবাহিনী পিছু হটে আসতে থাকে। তাদের উদ্দেশ্য থাকে ফরিদপুর মুখে গড়াই নদীর উত্তর পাড়ে প্রতিরোধ ব্যূহ নির্মাণ করে প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা করা। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনীর বিমান, রকেট ও ভারি অস্ত্রের আক্রমণের মুখে পাকিস্তানবাহিনী পিছু হটে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে গড়াই নদীর দক্ষিণ পাড়ে শত শত গাড়িবহর নিয়ে সমবেত হয়। কিছু কিছু গাড়ি গ্রামের মধ্যে এবং কিছু রাস্তার উপর দাঁড় করিয়ে রাখে। ইতিমধ্যে কিছু সৈন্য কামারখালি ঘাটের নদীর উঁচু পাড় ঘেঁষে ৭/৮ কিলোমিটার দীর্ঘ গভীর বাঙ্কার খুঁড়ে প্রতিরোধব্যূহ গড়ে তোলে। নদী থেকে অর্ধ কিলোমিটার দূরে গড়ে তোলে অস্ত্রশস্ত্র সজ্জিত ক্যাম্প। কামারখালি বাজার ও নদীর উত্তর-দক্ষিণ জুড়ে গড়ে তোলে বিরাট রণক্ষেত্র। ৮ ডিসেম্বর তারা ফেরিযোগে নদী পাড় হতে শুরু করে। এ সময় শুরু হয় বিমান আক্রমণ ও বোমা বর্ষণ। আক্রমনে অনেক সামরিক যান ধবংস হয়। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী রকেট হামলা করতে করতে কামারখালি ঘাটের ওপারে গড়াই নদীর পশ্চিমতীরে অবস্থান নেয়। নদীর তীরবর্তী মাজাইল, সান্দারওলা, রায়নগর ও নাকোলে গড়ে তোলে রণক্ষেত্র। এপাড়ে কামারখালি, আড়পাড়া, গাড়িদহ ও ডুমাইন গ্রামে পাকিস্তানবাহিনী রণক্ষেত্র গড়ে তোলে। ৯ ডিসেম্বর উভয় পক্ষের প্রচণ্ড যু্দ্ধ শুরু হয়। রকেট কামানের গোলাবর্ষণ চলতে থাকে। ২/৩ ঘন্টা পর পরই কলকাতা থেকে বিমান উড়ে এসে বোমাবর্ষণ করে অক্ষত অবস্থায় ফিরে যায়। এমনি ছিল সেদিনের অবস্থা। আর ঐ দিনই আমরা রাজবাড়ি কলেজের তিন অধ্যাপক রোস্তম আলী (দর্শন), আনোয়ারুল কাদির (উদ্ভিদ বিদ্যা) ও আমি এই মৃত্যু ফাঁদে জড়িয়ে পড়ি। সে এক লোমহর্ষক কাহিনী। মুক্তিযুদ্ধের শেষের দিকে আমরা ১৫/১৬ জন শিক্ষক কলেজ মেসে অবস্থান করছিলাম। মুক্তিযোদ্ধা ও বিহারীদের মধ্যে যুদ্ধ, সে সাথে বিহারীরা শিক্ষকদের আটক করে জিম্মি বা হত্যা করতে পারে এ আশঙ্কায় যার যার এলাকায় গমন করার সিদ্ধান্ত নেই। সে মোতাবেক ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর অনেকে পদ্মার পাড় ধরে পশ্চিমের পথে যায়। আর আমরা তিন জন ফরিদপুরের পথ ধরে কামারখালি হয়ে দক্ষিণে যাব বলে রাজবাড়ি থেকৈ একটি স্কুটার নিয়ে ফরিদপুর শহরের পশ্চিমপ্রান্তে এসে উপস্থিত হই। উল্লেখ্য আমাদের মধ্যে যে দলটি পশ্চিম মুখে পদ্মার তীর ধরে যায় বিহারীরা তাদের ধরার জন্য পিছু ধাওয়া করে। যাহোক আমরা ফরিদপুর আসার পরপরই দুটি যুদ্ধ বিমান বিকট শব্দে চক্কর দিতে থাকে। আমরা কামারখালি যাব এ ভাবনায় ফরিদপুর থেকে ভিন্ন আর একটি স্কুটারে কামারখালির পথে যেতে থাকলাম। স্কুটার চালক বা আমরা কেউ জানতাম না যে, কামারখালিতে যুদ্ধ শুরু হয়েছে। কামারখালির পথে যেতে যেতে দেখতে পেলাম ঝাঁকে-ঝাকে পাকিস্তানি সৈন্যরা গাছ পালার আড়ালে বসে আছে, অনেকে আবার ফরিদপুরের দিকে পিছু হটছে। যতই কামারখালির দিকে অগ্রগামী হচ্ছিলাম ততই বেশি বেশি এ দৃশ্য দেখতে পেলাম। সর্বশেষ সেই ভয়াবহ অবস্থার সম্মুখীন হলাম। কামারখালি ঘাটের কাছাকাছি পাকিস্তানি ক্যাম্পের পাশে আসতেই এক সৈন্য এসে স্কুটার থামিয়ে আমাদের ক্যাম্পের মধ্যে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করল। যিনি জিজ্ঞাসাবাদ করছিলেন তিনি ৬ ফুটেরও বেশি লম্বা, তাগড়া দেহ, ফর্সা। তিনি ইংরেজিতে আমাদের পরিচয় জিজ্ঞেস করলেন।


রোস্তম আলী স্যার বললেন we are teacher of Rajbari college. শিক্ষকের পরিচিতি শুনে তার রাগত ভাব স্তিমিত হল বলে মনে হল। তবে আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে বললো ----‘ He is no Teacher, He is Mukti'। আমি তখন যুবক আর ভয়ে আমার চাহুনি তখন ছিল অনেকটা এলোমেলো। আমি আমার পরিচয় পত্র তুলে ধরলাম এবং বললাম I was the Student of Dhaka University এ কথা বলতেই তার মুখে মৃদু হাসি বের হল। বোধ হয় অতীত স্মৃতি মনে করে সে বললো ------‘I was also the student of Dhaka University'। ৪/৫ মিনিট কথাবার্তায় সে আমাদের বিশ্বাস করল এবং ইংরেজিতে বললো ---- we are not afraid of the Indian Soldiers but we are very much afraid of the people of this country.' এরপর সে আমাদের নদী পার হতে নিষেধ করল এবং পশ্চিমমুখে গ্রামের দিকে যেতে বলল। আমরা পশ্চিমমুখে প্রায় আধা মাইল এসে ভাবলাম এবার হয়ত নদী পাড় হতে পারব।

এ উদ্দেশ্যে নদীর পাড়ে এসে উপস্থিত হতেই ২০/২৫ গজ দূর থেকে কালো মাকড়ানী এক সৈন্য বন্দুক উঁচিয়ে আমাদের দিকে তেড়ে আসতে লাগলো। সে আমাদের নিকটে এসে বলল, ‘হট যাও।’ আমরা জড়সড়ো হয়ে দাঁড়ালাম। সে আমাদের ব্যাগের দিকে আঙ্গল দেখিয়ে বলল, ‘উসমে ক্যায়া হায়, খোল দো।’ রুস্তম স্যার এসে আমার ব্যাগটি খুলতেই একটি কাগজের পোটলা দেখে সৈন্যটি ২/৩ হাত সরে যেয়ে পুনরায় জিজ্ঞাসা করল ‘উসমে ক্যায়া হায়? আমি বাড়িতে ভাগ্নীর জন্য আধাসের বিস্কুট কিনেছিলাম। রস্তম স্যার পোটলাটা খুলে তা থেকে বিস্কুট বের করে তাকে খেতে বলে। সৈনিকটির মুখে ঈষৎ হাসি দেখা গেল। সে প্রায় ১৫ মিনিট ধরে প্যাকেটের সমস্ত বিস্কুট খেয়ে নিল। আমরা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম। খাওয়া শেষে সে পশ্চিমের গ্রামের দিকে চলে যাওয়ার ইশারা করল। আমি ভাবলাম পিছন ফিরে যেতে থাকলেই সে গুলি করবে। আল্লাহর অপার মহিমা। সে গুলি করে নাই। আমরা বেঁচে গেলাম। এরপর গ্রামে ঢুকতেই আমাদের এক মুক্তিযোদ্ধা ছাত্র বিস্ময়ে বলল স্যার আপনারা কীভাবে এই রণক্ষেত্রের মধ্য দিয়ে আসলেন এবং জীবন নিয়ে ফিরে এলেন? সত্যিই জীবন নিয়ে ফিরে আসার কথা নয়। রস্তম স্যার বলল তোমার ব্যাগ বুদ্ধি করে খুলেছিলাম সে কারণেই বেঁচে গেছি। সৈনিকটি যদি আমার ব্যাগ খুলতো তাহলে আর রক্ষা ছিল না। আমার ব্যাগে দুটি ধারালো ড্যাগার আছে, এই দেখ। আমরা বেঁচে গেলাম। আমি আজও পৃথিবীর আলো বাতাসে নিঃশ্বাস নেই। মাঝে মাঝে ভাবি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে কত শত? কত হাজার? কত লক্ষ? নিরাপরাধ মানুষ মারা গেছে। কত রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীনতা? এ স্বাধীনতার মূল্য কত?

কামারখালির যুদ্ধে মক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী জনমানুষের সাহায্য সহযোগিতায় অগ্রগামী হয় আর সহযোগিতা বঞ্চিত পাকিস্তানি সেনারা দিশেহারা হয়ে ফরিদপুর শহরের দিকে পিছু হটতে থাকে। যু্দ্ধ চলে উভয় বাহিনীর মধ্যে মাঝে মাঝে বিরতি দিয়ে। মুক্তিবাহিনী ও মিত্রবাহিনী গড়াই নদী পার হওয়ার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়। শেষে ট্যাংকের চাকায় রাবার লাগিয়ে রাজবাড়ির দক্ষিণে জঙ্গল ইউনিয়নের সমাধিনগর ঘাট দিয়ে নদী পার হয়। তারা উম্মুক্ত প্রান্তরে ঢুকে পড়ে গোলাবর্ষণ করতে করতে খোলা মাঠ দিয়ে পূর্বদিক অগ্রসর হতে থাকে। হাজার হাজার সৈন্য এগিয়ে আসে ট্যাংকের পিছনে পিছনে। রাজবাড়ির মোহসীন উদ্দিন বতু ভাই এর কমান্ডে অনেক মুক্তিযোদ্ধা অংশগ্রহণ করে। বিল্লাল হোসেন, নজরুল ইসলাম, ইদ্রিস মিয়া (ময়না ভাই) এনামুল হক, আনোয়ার-সহ আরো অনেকে রাজবাড়ি থেকে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। ডুমাইন, গড়িয়াদহ, আড়পাড়া, ঢোলজানি গ্রামে অবস্থানরত পাকবাহিনী মুক্তিবাহিনীর গতিরোধ করতে মর্টার চালিয়ে ব্যর্থ হয়ে পিছু হটতে থাকে। এ যুদ্ধে ১০ জন পাকসেনা নিহত হয়। ডিসেম্বর ১৫ অপরাহ্নে পাকবাহিনী গোলাবারুদ, সামরিক সাজসরঞ্জাম এবং সামরিক যানবাহন ফেলে রেখে চলে যায় পূর্ব দিকে। কামারখালি অঞ্চলে যুদ্ধের মুক্তিযোদ্ধা মহসিন উদ্দিন বতু ভাই (এ পরিবারের সাত ভাই এবং তাঁরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা)।


তিনি ১৯৭১ সালে পাকহানাদার রাডারবাহিনীতে কর্মরত থাকা অবস্থায় দেশমাতৃকার টানে পলায়ন করেন। ধরা পড়ায় সামরিক ট্রাইবুন্যালে ২ বছরের কারাদণ্ড হয়। পাকিস্তানের স্বাধীনতা দিবসে সাধারণ ক্ষমায় মুক্ত হয়ে ভারতে গমন করেন। (তার ভাই ফরিদ আহম্মেদ প্রবাসী সরকারের ছাত্র-যুবকের সমন্বকারী ছিলেন। পরে মেজর আবুল মঞ্জুর ফরিদপুরের ক্যাপ্টেন ইনচার্জ নিযুক্ত করেন)। বয়রা ক্যাম্পে ক্যাপ্টেন হুদার অধীনে তিনি কাজ শুরু করেন। ১৫০ জনের একটি বৃহৎ দল নিয়ে বয়রা ক্যাম্প ত্যাগ করেন। বয়রা থেকে ফরিদপুর আসার পথে যশোরে বুনোগাতি এলাকায় রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণ করে ১০ জন রাজাকারকে আত্মসমর্পন করান। এ যুদ্ধে একটি এসএমজিসহ ২১টি রাইফেল হস্তগত করেন। ১৯ নভেম্বর ভাটিয়াপাড়ায় সসস্ত্র যুদ্ধে অবতীর্ণ হন। এতে ৩ জন পাক হানাদার নিহত হয়। ৮ ডিসেম্বর নড়াইলের লোহাগড়া থানা আক্রমণ করেন। এখানে ১০০ জনেরও বেশি রাজাকার আত্মসমর্পন করে। ডিসেম্বর ১১ তারিখে কানাইপুরের অদূরে চাঁদপুর হাটের নিকটবর্তী স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করেন। এখানে কামারখালি থেকে ফরিদপুরগাম ভ্যান আক্রমণ করে মেজর সাদেক-সহ ৮জন পাকহানাদার বন্দি করেন। বন্দিদের নিয়ে ভারতীয় কর্নেল ট্রপীর সাথে দেখা করেন। সাহসীকতার জন্য কর্নেল ট্রপী তাকে প্রশসংসা করেন। ১৬ ডিসেম্বর ফরিদপুর থেকে ৬ মাইল দূরে কামারখালির পথে ২০০ পাকহানাদার এক অনুষ্ঠানে আত্মসমর্পন করে। এ অনুষ্ঠানে পক্ষে ছিলেন মেজর জেনারেল , ভারতের পক্ষে একজন ব্রিগেডিয়ার এবং মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষে থাকেন মহসীন উদ্দিন বতু।

রাজবাড়িতে তিনি মুক্তিযোদ্ধা মিলিশিয়া ক্যাম্পের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হন। ১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের সাথে সাথে কামারখালি ঘাটের পাকসেনারা বাগাট নামক স্থানে মিত্রবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে এবং যুদ্ধের অবসান ঘটে। এ সময়ের আর এক সাহসী যোদ্ধা মোঃ নুরুজ্জামান বিশ্বাস, গ্রাম--রঘুনাথপুর। তিনি ক্যাপ্টেন বাবুল আক্তারের নেতৃত্বে (ফরিদপুর সাবসেক্টর কমান্ডার) মাদারতলা, বড়ইচারা, ভাটিয়াপাড়া, ভেদরগঞ্জ, কোটালীপাড়া, তারাইল ফোকরা, গোপালগঞ্জ পর্যন্ত স্থানে পাকবাহিনীর সাথে সম্মুখযুদ্ধে অবতীর্ন হন।

রাজবাড়ি মু্ক্ত

১৬ ডিসেম্বর পাকবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে বিজয় অর্জিত হয়। কিন্তু তখন পর্যন্ত রাজবাড়ি যুদ্ধ চলছিল। রাজবাড়ি শত্রুমুক্ত হয় ১৮ ডিসেম্বর। রাজবাড়িতে মহকুমা শহর, বিহারীদের প্রাধান্য এবং ফরিদপুরের পাকবাহিনীর অবস্থানের কারণে রাজবাড়ি মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। রাজবাড়ি, খানখানাপুর, গোয়ালন্দ, কল্যাণপুর সকল বিহারী মিলিশিয়া ও রাজাকার সম্মিলিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলে। রাজবাড়ি শহরের উত্তরে বিহারী কলোনীকে দুর্গ হিসেবে তারা ব্যবহার করে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা প্রচুর আধুনিক অস্ত্র ও গোলাবারুদ মজুদ করে। রাজবাড়ি শহরসহ উত্তরে পদ্মা নদী, পশ্চিমে চরনারায়ণপুর, দক্ষিণে রামকান্তপুর, আহলাদীপুর, পূর্বে খানখানাপুর সতর্ক পাহারা বসায়। নেতৃত্ব দেন সৈয়দ কমর (প্রচলিত নাম সৈয়দ খামার), রব মাস্টার, শামীম-সহ আরো অনেকে। এছাড়া মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, আলমডাঙ্গা, পোড়াদহ, কুষ্টিয়া থেকে সকল বিহারী যোদ্ধাবেশে রাজবাড়িতে সংঘবদ্ধ হয়। তারা ইতিপূর্বে রাজবাড়িকে সাব ক্যান্টমেন্ট ঘোষণা করে আসছিল। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের নিকট রাজবাড়ি গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ যুদ্ধক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। রাজবাড়ির প্রায় সকল মুক্তিযোদ্ধা দল সমবেত হতে থাকে এবং কৌশলগত স্থানসমূহে অবস্থান গ্রহণ করে। শহীদুন্নবী আলমের নেতৃত্বে মাটিপাড়ায় শক্তিশালী ক্যাম্প স্থাপন করা হয়।


আবুল হাসেম বাকাউল, কামরুল হাসান লালী, খেলাফত হোসেন, ইলিয়াস মিয়া, রফিকুল ইসলাম, আব্দুল খালেক, সিরাজ আহম্মেদ স্ব-স্ব বাহিনী নিয়ে শহীদুন্নবী আলমের কমান্ডে বিভিন্ন স্থানে অবস্থান গ্রহণ করে নভেম্বরের শেষের দিকে ধুলদি গেটে পাকবাহিনীর সাথে বাকাউলবাহিনীর সম্মুখ যুদ্ধ সংঘঠিত হয়। এ যুদ্ধে পাকবাহিনীর ২ সৈন্য আহত হয় এবং তারা পিছু হটে ফরিদপুর যায়। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে বাণীবহতে মিলিশিয়া ও বিহারীদের সাথে যুদ্ধে বাকাউলবাহিনীর হাতে ৪/৫ জন বিহারী নিহত হয়। ডিসেম্বর ৯ তারিখে ইলিয়াস মিয়া ও আব্দুল খালেকের কমান্ডবাহিনী গোয়ালন্দ মোড়ে উপস্থিত হয়। একটি ফায়ারের মাধ্যমে তারা আগমন বার্তা জানায়। কিছুক্ষণ পর বিহারী রাজাকার কমান্ডার সাহেবজানকে মেরে ৭টি রাইফেল নিয়ে ইলিয়াসবাহিনীর নিকট জমা দেয়। উল্লেখ্য যুদ্ধকালীন বহু বাঙালি রাজাকার পাতানো যু্দ্ধ দেখিয়ে আত্মসমর্পণের মাধ্যমে অস্ত্র নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পক্ষ অবলম্বন করে। সাহেবজানের মৃত্যুর পর বিহারীরা বাঙালি রাজাকারদের আর বিশ্বাস করে না। তখন প্রায় অর্ধশত বিহারী ফরিদপুরে অবস্থানরত পাকবাহিনীর সহায়তায় খানখানাপুরে তাণ্ডলীলা চালায়। অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। সেক্টর কমান্ডার আবু সওমান চৌধুরীর বাড়িসহ অনেকের বাড়িঘর জ্বালিয়ে দেয়। ১০ ডিসেম্বর ইলিয়াসবাহিনী, বাকাউলবাহিনী, আব্দুল খালেকবাহিনীর তীব্র আক্রমণে খানখানাপুর থেকে বিহারীরা রাজবাড়ি চলে যায়।

১১ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা আলাদিপুর এক ও দুই নম্বর কলোনী ঘিরে ফেলে। শহীদুন্নবী আলমের নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা কলোনীতে প্রবেশ করে। মুক্তিযোদ্ধাদের আগমন টের পেয়ে আগেই পালিয়ে যায়। বিহারীদের খোঁড়া বাংকারে মুক্তিযোদ্ধারা আশ্রয় নেয়। শহীদুন্নবী ব্যাজখোলা, রশোড়া ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে মাটিপাড়ায় তার নির্দেশে শক্তিশালী ঘাঁটি সৃষ্টি করে সেখানে যু্দ্ধ নিয়ন্ত্রণ কৌশল-সহ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। রাজবাড়ি হাসপাতালে কর্মরত ডা. চৌধুরী হুমাউন কবির, ডা. গোলাম মোস্তফা ডা. তারিকুল ইসলাম চিকিৎসা সেবা দান করেন।

৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ ভারত বাংলাদেশের স্বীকৃতি দানের পর থেকে ‍মুক্তিযোদ্ধা ও ভারতীয়বাহিনী সম্মিলিত মিত্রবাহিনী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের বিজয় অত্যাসন্ন মনে করে রাজবাড়ির প্রতিপক্ষবাহীনী শহরের লোকোশেড কলোনি উত্তর দিকে সমবেত হয়। ১২ ডিসেম্বর শহীদুন্নবী আলমের নির্দেশে ইলিয়াস মিয়া, আব্দুল মান্নান, আবুল হাশেম বাকাউল, আব্দুল জলিল মাস্টার , নিখিল কুমার, আব্দুস সাত্তার, আবুল হোসেন, নুরমোহাম্মদ ভূঁইয়া ভকেশনাল ও হাসপাতাল রাস্তা ধরে লোকোশেডের দিকে অগ্রগামী হতে থাকে। উত্তর দিক থেকে কামরুল হাসান লালী, পশ্চিম দিক থেকে খেলাফত হোসেন তাদের কমান্ড নিয়ে চারপাশ ঘিরে ফেলে। ওদিকে পাকবাহিনীর প্রবেশরোধে রাস্তা কেটে দেওয়া হল।

১৪ ডিসেম্বর সকাল ১০টায় খেলাফত হোসেন ও আরো অনেকের নেতৃত্বে কয়েক শত মুক্তিযোদ্ধা মাটিপাড়া ক্যাম্পে রিপোর্ট করেন। তাদের রাজবাড়ির পশ্চিমে ভবানীপুর স্কুলে পাঠানো হয়। থানার অবস্থান জানতে শহীদুন্নবী আলম, আমিনুর রহমান আবি, এমজি মোস্তফা অতি সন্তর্পণে ন্যাশনাল ব্যাংক (বর্তমানে যেখানে সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ) পর্যন্ত আসেন। ব্যাংকের গার্ডের নিকট থেকে বিহারীদের সংখ্যা এবং প্রকৃত অবস্থা সম্বন্ধে তথ্য নেন। সেখান থেকেই তারা থানা আক্রমণ করার সিদ্ধান্ত নেন। এরপর মুক্তিযোদ্ধা দুটি ভাগে ভাগ হয়ে একদল দক্ষিণ পশ্চিম এবং অন্যদল উত্তর পশ্চিম দিক থেকে থানা আক্রমণ করে। প্রচণ্ড গোলাগুলির মধ্যে বিহারীরা থানা ছেড়ে পালিয়ে কলোনিতে জমায়েত হয়। তখন থেকেই রাজবাড়ির বেড়াডাঙ্গা বরাবর তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়। এদিকে বিহারীরা রাজবাড়ি কলেজ থেকে লোকোসেড পর্যন্ত মালবাহী ট্রেন দিয়ে বেরিকেড সৃষ্টি করে। ইতিমধ্যে পূর্ব দিক থেকে অধ্যাপক রফিকুল ইসলাম, উত্তর দিক থেকে ডা. কামরুল হাসান লালীবাহিনী, পশ্চিমদিক থেকে খেলাফত হোসেন স্ব-স্ব বাহিনী নিয়ে আক্রমণ শুরু করে।


আক্রমণকারী মুক্তিযোদ্ধারা রেললাইন পর্যন্ত পৌছে যায়। মালগাড়ির বেরিকেডের ওপাশ থেকে বিহারীরা গুলি ছুঁড়তে থাকে। ইলিয়াস মিয়া মাথায় গুলির আঘাতে আহত হন। জরুরিভিত্তিতে তাঁকে মাটিপাড়া ‍মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে পাঠান হয়। শহীদুন্নবী আলমের নেতৃত্বে যুদ্ধ পরিচালিত হতে থাকে। মু্ক্তিযোদ্ধারা চারিদিক থেকে বিহারীদের কথিত ক্যান্টমেন্ট ঘিরে ফেলে। এরমধ্যে কিছু মুক্তিযোদ্ধা পরামর্শ দিলেন মর্টার শেল ছাড়া বিহারীদের কাবু করা যাবে না। পরামর্শ মোতাবেক আমিনুর রহমান আবি (লেখকের চাচাতো শ্বশুর), এমজি মোস্তফাকে মাগুরায় মর্টার আনতে পাঠানো হয়। তারা নাড়ুয়ায় মুন্সি ইয়ারউদ্দিনের বাড়ি অবস্থান করে গড়াই নদী পার হয়ে জানতে পারেন শত্রু মুক্ত মাগুরায় চেয়ারম্যান আকবর হোসেন তাঁর দুর্ধর্ষবাহিনী নিয়ে রাজবাড়ি মুক্ত করার লক্ষ্যে রওয়ানা দিয়েছেন। তারা তাদের সাথে দেখা করেন। সাথে মাগুরার মুজিববাহিনীর কমান্ডার সাহেব আলীকে রাজবাড়ির অবস্থা বর্ণনা করেন। আকবরবাহিনী ও সাহেব আলী (পরে ডিআইজি) উভয় বাহিনী ৩″ ইঞ্চি দুটি মর্টার, ১টি এসএমজি ২টি এলএমজি ২৫ বাক্স শেল ও গুলি-সহ উভয় বাহিনীকে পথঘাট চিনিয়ে রাজবাড়ি নিয়ে আসেন। ১৩ ডিসেম্বর বিকাল তিনটায় রোকন উদ্দিন চৌধুরীকে একটি মর্টার পৌরসভার সামনে এবং অপরটি ড্রাইস ফ্যাক্টরিতে বসানোর জন্য দেওয়া হয়। ডিসেম্বর ১৫ তারিখে পাংশা থেকে সকল মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডবাহিনী রাজবাড়ি শত্রুমুক্ত করতে যোগ দেয়। জিল্লুল হাকিম (সংসদ সদস্য), আব্দুর রাব (প্রাক্তন উপাধ্যক্ষ সরকারি ইয়াছিন কলেজ, ফরিদপুর), (আব্দুর রবের বাহিনীতে মোঃ কেরামত আলী-প্রফেসর ও প্রাক্তন অধ্যক্ষ রাজবাড়ি সরকারি কলেজ সাহসিকতার সাথে যুদ্ধ করেন)। নাসিরুল হক সাবু (প্রাক্তন সংসদ সদস্য), আব্দুল মালেক (প্রাক্তন জেলা প্রশাসক), মঞ্জুর মোর্শেদ সাচ্চু, আব্দুল মতিন (প্রাক্তন সংসদ সদস্য) আবুল হোসেন কমান্ডবাহিনী নিয়ে রাজবাড়ির পশ্চিমদিকে বিহারী কলোনির অনতিদূরে অবস্থান নেন। উত্তরে কামরুল হাসান লালী, রফিকুল ইসলাম কমান্ডবাহিনী নিয়ে অবস্থান গ্রহণ করে। গোলাগুলি শুরু হয়। ১৫ তারিখে শহীদ হন আব্দুর রব বাহিনীর বীর মুক্তিযোদ্ধা দিয়ানত (মৃগীতে তাঁর নামে শহীদ দিয়ানত কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে)। দুপুরে শহীদ হন বীর মুক্তিযোদ্ধা আরশেদ আলী, শফিক, রফিক ও সাদি। লক্ষীকোলে তাঁদের মাজার অবস্থিত। ভয়াবহ যুদ্ধের মধ্যে হাজার হাজার জনতা রাজবাড়ি জমায়েত হয়। তারা মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য খাদ্য সংগ্রহ করার কাজে লেগে যায়। ১৬ ডিসেম্বর যখন পাকহানাদারবাহিনী ঢাকায় আত্মসমর্পণ করছিল তখন রাজবাড়ি যুদ্ধ চলছিল।

ঐদিন একটি হেলিকপ্টার থেকে রাজবাড়ি রেল স্টেশনে শেল নিক্ষেপ করা হয়। সম্ভবত এটি ছিল ভারতীয় হেলিকপ্টার যা মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে এসেছিল। এভাবে দুইদিন যুদ্ধের পর ১৮ ডিসেম্বর বিহারীদের কথিত ক্যান্টমেন্টের পতন ঘটে। রাজবাড়ি ১৮ ডিসেম্বর শত্রু মুক্ত হয়। ১৮ ডিসেম্বর রাজবাড়ির বিজয় অর্জিত হয়। পরাজয় অনিবার্য হয়ে পড়লে শত শত বিহারী দিকবিদিক পলায়ন করতে থাকে। তাদের সকলেই মুক্তিযোদ্ধা ও সাধারণ মানুষের হাতে নিহত হয়। নিহতের সংখ্যা ছিল প্রায় ৩ হাজার।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধা

রাজবাড়ি সদর

(১) শহীদ আব্দুল আজিজ খুশী (২) শহীদ সাদি (৩) শহীদ আবুল হোসেন। (৪) শহীদ খলিলুর রহমান (৫) শহীদ আব্দুল হাকিম (৬) শহীদ লে. খন্দরকার আবু জাফর নুরুল ইসলাম (৭) শহীদ আব্দুর রশীদ (৮) শহীদ হাসমত আলী (৯) শহীদ সাদেকুর রহমান (১০) শহীদ আব্দুল ওহাব খান (১১) শহীদ লে.ডা. খোন্দকার আবু জাফর মোহাম্মদ নূরুল ইমাম তুর্কী (শহীদ বুদ্ধিজীবী)। তিনি মরহুম খোন্দকার আবু আসাদ নুরুল হাসান রুমি (অ্যাডভোকেট আবুল বাসার) এর ভ্রাতা।


শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল আজিজ খুশি

পাংশা উপজেলা

(১) শহীদ দিয়ানত আলী (২) শহীদ আরশেদ আলী (৩)শহীদ মোঃ রফিকুল ইসলাম (৪) শহীদ শফিকুল ইসলাম (৫) শহীদ আব্দুল কাদের (৬) শহীদ মোঃ হাসান আলী (৭) শহীদ খবিরুজ্জামান (৮) শহীদ মোঃ কায়েম উদ্দিন (৯) শহীদ গৌরচন্দ্র বিশ্বাস (১০) শহীদ এএম জাহাঙ্গীর (১১) শহীদ আতাহার আলী (১২) শহীদ অধীর চন্দ্র বাড়ই (১৩) শহীদ জিন্নত আলী (১৪) শহীদ আজগর আলী (১৫) শহীদ আব্দুল কুদ্দুস (১৬) শহীদ রুহুল ইসলাম মিয়া।



গোয়ালন্দ

(১) শহীদ নায়েক আমির আলী শেখ (২) শহীদ আবুল কাশেম (৩) শহীদ সেকেন্দর আলী (৪) শহীদ ফকীর মোঃ মহিউদ্দিন।

বালিয়াকান্দি

(১) শহীদ মোঃ  হাসবীর উল্লাহ (২) শহীদ আবুল হোসেন মোল্লা (৩) শহীদ খলিলুর রহমান (৪) শহীদ রফিকুল ইসলাম (৫) শহীদ হারুনর রশীদ (৬) শহীদ আজমল হোসেন।

শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের স্মরণে রাজবাড়ি বাস স্টান্ডের নিকট শ্রীপুরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক নির্মাণ করা হয়েছে। রেলগেটে নির্মাণ করা হয়েছে মুক্তিযু্দ্ধ স্মৃতিসৌধ।


শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলক শ্রীপুর বাসস্টান্ডমুক্তিযোদ্ধা স্মৃতি সৌধ রেলগেট রাজবাড়ি বৌদ্ধভুমি লোকোশেড রাজবাড়ি

লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী

মহান মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের মধ্যে একজন রাজবাড়ি জেলার পিতৃপুরুষের সহায় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী, এ কথা জানার পর স্বভাবতই জেলার যে কোনো মানুষ গর্বিত হবেন। এ প্রজন্মের একজন যুবক গর্বভরে সে নাম উচ্চারণ করবেন। আগামী প্রজন্মের একজন শিশু তাঁর বীরত্বগাথা মন দিয়ে শ্রবণ করবে। সেই সফল নায়ক লে. কর্নেল (অব.) আবু ওসমান চৌধুরী।

তাঁর জন্ম চাঁদপুরে। শৈশবও কেটেছে চাঁদপুরে। কিন্তু তাঁর পিতা আব্দুল আজিজ চৌধুরী (শিক্ষক) একসময় রাজবাড়ির শ্যামল ও সুন্দর পরিবেশে আকৃষ্ট হয়ে খানখানাপুর গ্রামে অনেক সম্পত্তি ক্রয় করেন এবং এখানেই শেষ জীবনের আশ্রয় খুঁজে নেন। পিতার স্থায়ী বসতির কারণে আবু ওসমান চৌধুরী খানখানাপুরে কাটাতেন এবং রাজবাড়ির মাটি ও মানুষের সাথে তাঁর গভীর আত্মীয়তা গড়ে ওঠে। আমরা তাঁকে রাজবাড়ির মানুষ বলে পরিচয় দেই।

আবু ওসমান চৌধুরী ১৯৩৫ সালে ১ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। সে সময়ে পূর্ব পাকিস্তানের বঞ্চনা তাঁকে ব্যথিত করত। ২৬ মার্চের পূর্বের ঘটনাবলীর উপর তিনি তীক্ষ্ণ নজর রেখে আসছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে হয়ত তাঁর মনে নানা আশঙ্কা জেগেছিল। যে কারণে তিনি ১৯৭০ এর নির্বাচনের পর ডেপুটেশনে ইপিআর এ যোগ দেন। উদ্দেশ্য সেনাবাহিনীর কঠিন নিগঢ় থেকে বেরিয়ে আসা এবং সুযোগমত পাকিস্তানবাহিনীর মোকাবেলা করা। পূর্বাপর ঘটনার পরিণতি সেদিকেই যাচ্ছিল। ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ তাঁর কর্মস্থল চুয়াডাঙ্গা থেকে কুষ্টিয়া আসেন এবং কুষ্টিয়া ডাকবাংলোয় অবস্থান নেন। ইতিমধ্যে ২৫ মার্চ শেষ রাতে যশোর ক্যান্টমেন্ট থেকে একবহর সৈন্য এসে কুষ্টিয়া শহরে কার্ফু জারী করে। কার্ফ্যুজারী বিষয়টি তাঁকে ভাবিয়ে তোলে। আবু ওসমান চৌধুরী কৌশলে কুষ্টিয়া ত্যাগ করে চুয়াডাঙ্গা পৌঁছেন। ইতিমধ্যে পাকিস্তানবাহিনী নারকীয় হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। তিনি চুয়াডাঙ্গায় স্থানীয় রাজনীতিবিদ, ছাত্র-জনতা সকলের সম্মতিতে তাৎক্ষণিক সর্বাধিনায়ক মনোনীত হন। সেখানে তিনি সবুজ কাপড়ের উপর বাংলাদেশের মানচিত্র অঙ্কিত পতাকা উত্তোলন করে সবার মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা সঞ্চারীত করেন। তিনি এলাকাটিকে দক্ষিণ পশ্চিম রনাঙ্গন বলে ঘোষণা দেন। তিনি আরো ঘোষণা করেন ‘স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশকে মেনে নিয়ে আমরা পাকিস্তানি সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলাম’ (রাজবাড়ির মুক্তিযু্দ্ধ ড. মুহম্মদ আব্দুস সাত্তার পৃষ্ঠা-২০৩)।

২৬ মার্চ পাকিস্তানি সামরিক জান্তার অতর্কিত আক্রমণে দেশের মানুষের উপর নির্মম নির্যাতন শুরু হলে মানুষ দিশাহীন হয়ে পড়ে। এ পরিস্থিতিতে আবু ওসমান চৌধুরী অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে পদ্মার এপারের দক্ষিণ অঞ্চলকে হানাদার মুক্ত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।


তিনি প্রথমেই কুষ্টিয়া শহরকে মুক্ত করার পরিকল্পনায় স্থানীয় ইপিআর, আনসার, মুজাহিদ, ছাত্রজনতাকে ঐক্যবদ্ধ করার পরিকল্পনা করেন। সকল স্তরের মানুষ ও যোদ্ধাদের ঐক্যবদ্ধ করে ১ এপ্রিল কুষ্টিয়া আক্রমণ করেন। কুষ্টিয়ার যুদ্ধে পাকিস্তানবাহিনী ছিন্নভিন্ন হয়ে পড়ে। তারা পলায়নপর হলে যত্রতত্র সাধারণ মানুষ তাদের পিটিয়ে মারে।

যুদ্ধের শুরুতেই তাঁর বিশেষ কৃতিত্ব হল তিনি ১ এপ্রিলের মধ্যে কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, ঝিনাইদহ, মাগুরা হানাদার মুক্ত রাখেন। কেবল তাই নয় পাকিস্তানবাহিনীর দ্বারা নির্মম হত্যাযজ্ঞ, বিমানবাহিনীর নির্বিচার বোমা বর্ষণ, গণহত্যা, লুটপাট, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগের চিত্র তুলে সারা বিশ্বের টিভি চ্যানেলে প্রেরণ করে পাকিস্তানবাহিনীর পৈশাচিক কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। ফলে বাংলাদেশ সারা বিশ্ব থেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নৈতিক সমর্থন লাভ করে। তিনি টেলিফোন বিভাগের কর্মচারীদের নিয়ে পোড়াদাহে একটি টেলিফোন এক্সচেঞ্জ স্থাপন করে কুষ্টিয়াসহ অত্র এলাকায় মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। এদিকে রাজবাড়ি ফরিদপুর অঞ্চলে ঢাকা থেকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রবেশপথ গোয়ালন্দের ওপর সতর্ক দৃষ্টি রাখেন। তাদের প্রবেশ প্রতিরোধে অস্ত্রসহ সৈন্য পাঠান। ২১ এপ্রিল পর্যন্ত হানাদারবাহিনী গোয়ালন্দ অতিক্রম করে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি ও ফরিদপুরে পৌঁছাতে পারেনি। তাঁর অভূতপূর্ব সাফল্য ৫ এপ্রিল শেখ মুজিবের অবর্তমানে কমান্ডার ইনচার্জ তাজউদ্দিন আহমদ এবং ৭৬ তম বিএসএফ ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক লে. কর্নেল এইচআর চক্রবর্তী তাঁকে সীমান্তে স্বাগত জানান। এ সময় তিনি যশোর ব্যুহ ভেঙ্গে দেওয়ার পরিকল্পনায় দর্শনা বর্ডারে ভারতীয় রেললাইনের সাথে বাংলাদেশ রেল লাইনের সংযোগ স্থাপন কাজ সম্পন্ন করেন। তবে  সে সময় ভারত থেকে প্রয়োজনীয় অস্ত্রসস্ত্র না আসায় যশোর মুক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাসত্ত্বেও হত্যা ও লুটপাটের উদ্দেশ্যে যশোর ক্যান্টমেন্ট থেকে আগত সৈন্যদের প্রতিহত করতে সমর্থ হন।

এ সময় যশোরের আট মাইল উত্তরে লেবুতলায় হানাদারেরা পৌঁছালে মুক্তিযোদ্ধাদের অতর্কিত আক্রমণে হানাদারবাহিনীর অনেক সৈন্য নিহত হয়। মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে এ বীর যোদ্ধার নেতৃত্বে ও পরিকল্পনায় অত্র অঞ্চল হানাদারবাহিনীর প্রাথমিক আক্রমণ থেকে মুক্ত থাকে। পরবর্তীতে সর্বাত্মক মুক্তিযু্দ্ধ শুরু হলে তাঁকে ৮নং সেক্টরের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। তার অধীনে ছিল ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, যশোর ও খুলনা অঞ্চল। সেক্টর কমান্ডার হিসাবে তাঁর সাহসিকতা, কুশলতা, সফলতা কিংবদন্তিস্বরুপ। তিনি আমাদের তথা বাংলাদেশের মানুষের অহঙ্কার, জাতির গৌরব। তাঁর লেখা ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ একটি প্রামাণ্য দলিল। তিনি সাহিত্যকর্মের জন্য বাংলাদেশ ইতিহাস পরিষদ ও ফরিদপুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি উন্নয়ন সংস্থা কর্তৃক ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’ লাভ করেন।


 ওয়েবে বিজয়ের দলিল

নতুন প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ দেখেনি। তাদের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সময়ের ভয়াবহ চিত্র আর হানাদারদের বর্বতার বিভিন্ন তথ্য রয়েছে ওয়েবে ও বল্লগে। এসব সাইটের খবরাখবর জানাচ্ছেন আল-আমিন কবির

যুদ্ধাপরাধের দলিলপত্র

যুদ্ধের ভয়াবহতা ও বিভিন্ন অপরাধের প্রমাণ রয়েছে কিছু সাইটে। www.genocidebangladesh.org - এ ডেইলি টেলিগ্রাফ, নিউ ইয়র্ক টাইমস, দ্য সিডনি মর্নিং হেরাল্ড, দ্য গার্ডিয়ান, নিউজউইক, ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ওয়াশিংটন পোষ্ট এবং টাইম, ম্যাগাজিনের বিভিন্ন সংবাদের নমুনা রয়েছে। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রনালয়ের তৈরী ১৯৭১ সালের ইতিহাস ও নারীর অবদান নিয়ে একটি প্রকাশনা পাওয়া যাবে www. bharat-rakshak.com  ঠিকানায়। www. drishtipat.org/1971 সাইটে নারীর অবদান নিয়ে বেশ কয়েকটি লেখা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস নিয়ে একটি উইকিয়া সাইট (muktijuddho.wikia.com) রয়েছে।  এখানে ভুক্তি যোগ করার সুযোগ রয়েছে। www. muktomona.com - এর আর্কাইভের ইংরেজি অংশে রয়েছে ভিডিও মুক্তিযুদ্ধ ও গণহত্যাবিষয়ক ওয়েবসাইটের সংযুক্তি, গণহত্যার তথ্য ও ছবি প্রবন্ধ, সাক্ষাৎকার, একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা, চলচ্চিত্র প্রামাণ্যচিত্র ইত্যাদি। আন্তর্জাতিক ক্রাইম স্ট্রাটেজি ফোরামের সাইট http://icsforum.org - এতেও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের অনকে তথ্য।

অনলাইন প্রকাশনা ‘সামইয়্যারইন ব্লগ ‘ফিরে দেখা ৭১’ নামে একটি মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ই-বুক প্রকাশ করেছে। http://www.mediafire.com?wn1n2po29xs থেকে বইটি ডাউনলোড করা যাবে। বেসরকারি চ্যানেল এটিএন বাংলা নির্মাণ করেছে মুক্তিযুদ্ধের দুর্লভ ভিডিওচিত্র নিয়ে বিশেষ তথ্যচিত্র ‘মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’। এ প্রামাণ্যচিত্রে নবাব সিরাদ্দৌলা থেকে শুরু করে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন, ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান এবং একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক অজানা ছবি এবং ঘটনার বিবরণ পাওয়া যাবে। ভিডিওচিত্রটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের ওয়েবসাইট www. pmo.gov.ffvideo.php থেকে দেখা ও ডাউনলোড করা যাবে।

আরো কিছু সাইট 

মুক্তিযুদ্ধের ওপর দুর্লভ ভিডিওচিত্রও রয়েছে ইন্টারনেটে। ভিডিও শেয়ারিং সাইট ইউটিউবে গিয়ে Bangladesh 1971 লিখলেই এসব ভিডিও মিলবে। এছাড়া Liberation war

bangladesh, Bangladesh War ইত্যাদি কিওয়ার্ড লিখেও তথ্য পাওয়া যাবে।

এছাড়া নিচের সাইটগুলোতেও মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যাবে

www.virtualbangladesh.com

www.nybangla.com

www.tajuddinahmad.com

www. storyofpakistan.com/articletext.asp?artid=A070&pg=1


www.muktadhara.net/page23.html

www. bd71.blogspot.com

www. drishtipat.org/1971

www. col-taher.com

www.pictureworldbd.com/liberation_war1.htm

হতাশ করবে সরকারি উদ্যোগ

 বেসরকারি আর ব্যক্তি-উদ্যোগে সমৃদ্ধ ওয়েব থাকলেও সরকারি উদ্যোগ সবাইকে হতাশ করবে। নিয়মিত আপডেট করা হয় না মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট www.molwa.gov.bd । তবে এ সাইটে পাওয়া যাবে সরকারের গেজেটে প্রকাশিত মুক্তিযোদ্ধাদের থানা, জেলা ও বিভাগভিত্তিক তালিকা। আলাদাভাবে বীরশ্রেষ্ঠ, বীর-উত্তম, ও বীর-বিক্রম খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকাও রয়েছে এতে। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস সংরক্ষণ করতে সরকার বেশ কিছু বই প্রকাশ করলেও এখানে সেগুলো নেই। নেই যুদ্ধে নারীর অবদানের কথা। মুক্তিযুদ্ধের একটি অসম্পূর্ণ আর্কাভস রয়েছে, যেখানে শুধু ৭ মার্চের ভাষণের ভিডিওটি রয়েছে। জেলাভিত্তিক ওয়েবসাইটে ‘জেলা সম্পর্কিত’ কলামে ‘মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধা’ নামে একটি পাতা রয়েছে। তবে অনেক জেলার ওয়েবসাইটে দায়সারাভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে।

চলছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রচারণাও

নতুন প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার সুযোগ করে দিয়েছে ইন্টারনেট। এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে মুক্তিযুদ্ধবিরোধীরা। তারা ব্লগসাইটগুলোর মাধ্যমে অপপ্রচার চালাচ্ছে। বিশেষ করে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পর থেকে এ ধরনের প্রচারণার পরিমাণ বেড়েছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী প্রোপাগান্ডা চালানোর জন্য খোলা হয়েছে বেশ কিছু ওয়েবসাইট। ফেইসবুকেও গ্রুপ খুলে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কিছু গ্রুপে বিভ্রান্তিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। তবে এসব ওয়েবসাইট ও বিভ্রান্তিকর তথ্যের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো উদ্যোগ নেই।

সূত্র কালেরকন্ঠ ১২ ডিসেম্বর ২০১২, বুধবার