অর্থনীতি ক্রমধারা

অর্থনীতি ক্রমধারা

বনাশ্রয়ী মানবজাতি একসময় কৃষিকাজে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিল। কৃষিতে লাঙ্গলের ব্যবহার শুরু থেকে মানবসমাজে অর্থনীতির শুরু একথা বলা যায়। কারণ কৃষির পর থেকে আর মানুষকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কৃষিযুগের পর থেকে শ্রম বিভাজন ক্রিয়ায় চাষী, মুজুর, কামার, জেলে, তাঁতী ইত্যাদি শ্রেণিতে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ে। মিশরীয় সভ্যতায় কৃষিকাজ শুরু হয় প্রায় ছয় হাজার বছর পূর্বে। ভারতের সিন্ধু সভ্যতার বিকাশকাল প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্বে হলেও বাংলায় এর শুরু ৩০০০ বছর পূর্বে। অর্থনীতির গতিধারায় বর্তমানকালে উন্নয়ন ধারাকে অর্থনীতিবিদগণ ৫টি স্তরে ভাগ করে প্রতিটি দেশের অবস্থান জানতে চায়। ধারাগুলো প্যাসটোরাল (কৃষিভিত্তিক), ট্রানজিশনাল (প্রস্তুতি পর্ব), টেক অফ (উঠতি পর্ব) ম্যাচুরিটি (পরিপক্ক পর্ব)। অর্থনীতি বিকাশের এ ধারাসমূহের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ

এখন তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ টেক অফ এ (Take off) অবস্থান করছে। অর্থনীতির দ্বিতীয় স্তর প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ দেশ বিভাগের পর। এর পিছনের সময়কাল কেবল ভরণপোষণের মতো আত্মপরিতুষ্টির জন্য কৃষি, মৎস্য, তাঁত, বেত, মাটির আসবাবপত্র, নৌকা, কবিরাজী ঔষধ, টোলের শিক্ষা সংস্কৃতিতে কেটে গেছে। এ দেশে ভূমিনির্ভর সামন্ত অর্থনীতির বিকাশ ঘটে ত্রয়োদশ শতক থেকে যা মোগল ও ইংরেজ শাসনকালে পূর্ণরুপে বিকশিত হয়।

ত্রয়োদশ শতকের শুরু থেকে তুর্কী বিজেতারা ধীরে ধীরে ভারত ভূমিতে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। হিন্দু রাজত্বের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শুরু হয় মুসলিম রাজত্ব। মুসলিম শসকদের রাজত্বকাল ‍দুটি পর্বে বিভক্ত। ১২০৬ থেকে ১৫২৬ সুলতানি শাসন এবং ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর আপাতত ইংরেজদের দ্বারা মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে কিন্ত শাসন কাঠামো পূর্ববত থেকে যায়। মুসলিম শাসনের সুদীর্ঘকালে মুসলিম আইনের আওতায় ভূমি ব্যবহার, বন্টন, মালিকানা, ওয়ারিশ স্বত্ত্ব, খাজনাবিধি স্থাপিত হওয়ায় ভূমি উৎপাদন ক্রিয়ায় মূখ্য উপাদানে পরিণত হয়। বলা যায় সামন্ত অর্থনীতির বিকাশ এখান থেকে শুরু। ইবনে বতুতার বর্ণনায় দেখা যায় (চতুর্দশ শতক) তৎকালীন সময়ে বাংলার কৃষি উৎপাদনের সাথে ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। মঙ্গল কাব্যসমূহে সে সময়ের অনেক সওদাগরের কাহিনী পাওয়া যায় যারা বাংলার পণ্য তাঁত বস্ত্র, মশলা, চিনি তৈল বোঝাই করে সপ্তডিঙ্গা নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমাত। ব্যবসা করত ----- মালয় (মালয়েশিয়া), শ্যাম (থাইল্যান্ড), জাভা (ইন্দোনেশিয়া), লঙ্কায় (শ্রীলঙ্কা)। এরমধ্যে চাঁদ সওদাগরের নাম এলাকায় খুব পরিচিত। সুলতানি আমল থেকেই এলাকার জনপ্রবাহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। মোগল আমলে রাজবাড়ি অপেক্ষাকৃত উন্নত জনপদে পরিণত হয়। বাণীবহ, খানখানাপুর, বসন্তপুর, জামাল পুর, বালিয়াকান্দি, বহরপুর, সোনাপুর, পদমদী, কসবামাঝাইল, নাড়ুয়া, মৃগী, পাংশা, শিকজান, সুলতানপুর অঞ্চলসমূহে জনপদ গড়ে ওঠে। সুলতানি আমল থেকেই রাজবাড়ি জেলার সুতিবস্ত্র গুড়, চিনি, ধান, মশলা, জাফরান, তিল, দুগ্ধ, বাঁশ, বেত, পান, খয়ের শুপারীর আধিক্য ছিল। শ্রেণিগতভাবে কৃষিজীবী মৎস্যজীবী ছাড়াও কামার, কুমার, তাঁতী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। সুলতানি শাসনকালকে এদেশে ফেজিওক্রাট বা ভূমি ব্যবহারের অর্থনীতি বলা যায়। প্রকৃত সামন্ত অর্থনীতির বিকাশ মোগল যুগ থেকে শুরু হলেও এর চরম বিকাশ ঘটে ইংরেজ শাসনকালে। সামন্ত অর্থনীতিতে সম্রাট, সামন্ত রাজা জমিদার মহাপ্রভু। প্রদেশের মালিক সুবেদার, পরগণার মালিক জমিদার। সম্রাট ও তার সহচরবৃন্দ আয় উৎপাদনের প্রবাহ তাদের দিকে ধাবমান রাখে। ফলে মোগল ও নবাব শাসনকালে মোগল হেরেম ও নবাবী দৌলতখানার আড়ালে প্রজা সাধারণের আয় উন্নতি ঢাকা পড়ে যায়। স্থান বিশেষে অট্রালিকা, প্রাসাদ, দুর্গ গড়ে উঠলেও জনমানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, কারখানা উন্নয়ন পরিকল্পনার কোনো নির্দশন ছিল না। এসময় মোগল সৈন্য চলাচলের জন্য কিছু রাস্তা ঘাট তৈরি হয়। রাজবাড়িতে পল্টুনের রাস্তা, ফেরিফান্ড রোড এ সময়ে নির্মিত হয়। স্থান বিশেষে কাচারী, কোর্ট, ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। কসবা মাঝাইল, শিকজান, মেঘচামী, বাগডুল বালিয়াকান্দি, বেলগাছি, খানখানাপুর, বাণীবহ, পাংশা এ সব স্থানে গড়ে ওঠে নানা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। ইংরেজ শাসনকালে ঔপনিবেশিক শাসন কৌশলে যে সামন্ত আর্থিক নীতির বিকাশ ঘটে তা পূর্বধারার সামন্তনীতি থেকে ছিল নির্মম। ইংরেজ শাসনকালের প্রারম্ভ থেকে তারা শাসনের কূটকৌশলে শোষণ নীতিকে কাঠামোভিত্তিক রুপদান করে। ১৭৬৫ সালে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। ১৭৭০ সালে বাংলায় এক মহাদুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়।

Additional information