অর্থনীতি ক্রমধারা - পৃষ্ঠা নং-২

সে দুর্ভিক্ষে প্রায় ১ কোটি লোক মারা যায়। কোম্পানি এসময় দুঃখজনকভাবে ভারতীয় কর্মচারীদের এ জন্য দায়ী করে। ১৭৭১ সালে কোম্পানি দেওয়ানী শাসন নিজ হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং কোম্পানি নিজ কর্মচারী দ্বারা রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করে। রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রতি জেলায় ইংরেজ কালেক্টরেট নিয়োগ করা হয়। এ সময় থেকেই কালেক্টরগণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। কালেক্টরগণ একাধারে প্রশাসক, খাজনা আদায়কারী, দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচারক ছিলেন। প্রশাসনিক কাঠামোতে সামস্ত শাসন সুদৃঢ় হয়। সামস্তশাসনের আড়ালে নতুন জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয়। মুসলমান জমিদারের স্থলে হিন্দু জমিদারের উত্থান ঘটে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারগণ ইংরেজ শাসনের ছত্রছায়ায় মধ্যস্বত্ত্বভোগী সামন্ত শাসকে পরিণত হয়। ইজারাদার, পত্তনিদার, দরপত্তনিদার, পাটনিদার, পাইক, বরকন্দাজ, লাঠিয়াল, কতোয়ালসহ জমিদার শ্রেণি দৃঢ় প্রতিপত্তি লাভ করে। প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজবাড়ি জেলা পূর্ব থেকেই নশরত শাহী, মহিম শাহী, নসিব শাহী, কাশিমনগর, বিরাহিমপুর পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৯৩ সালে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ, ঘাট গোয়ালন্দ হিসেবে যশোরের সাথে সংযুক্ত হয়। ইংরেজ শাসনের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে রাজবাড়ি জেলার ছোট ছোট অনেক জমিদারের উত্থান ঘটে। তাদের মধ্যে ২/৪ জন জমিদারের উত্থান মোগল ও নবাবী আমলে হলেও বেশিরভাগ জমিদারদের উত্থান ঘটে ইংরেজ আমলের মাঝামাঝি সময়ে। ইংরেজ শাসনের শেষকালে জমিদারের সংখ্যা ৫০/৬০ এ দাঁড়ায়। এলাকাটি সমতল ও পলল মাটির উর্বরতায় শস্য উৎপাদনে প্রাচুর্য থাকলেও ভূমি উন্নয়ন বা ‍কৃষি উন্নয়নের কোনো উদ্যোগ জমিদারগণ গ্রহণ করেন নাই। প্রজারা প্রকৃত ভূমির মালিক না-হওয়ায় তারাও ভূমির উন্নয়নে মনোনিবেশ করে না। জমিদারগণ ইচ্ছামত জমি ইজারাদারদের নিকট ইজারা দিত। খাজনা হিসেবে উৎপাদিত শস্যের অংশবিশেষ কেটে নিয়ে যেত। জোরপূর্বক বেশি খাজনা আদায় করত। জমিদারগণ পাকা দালানে বাস করলেও প্রজাদের পরণে কাপড় বা ঘরে খাদ্য থাকত না। বেশির ভাগ জমি পতিত, অনাবাদি, বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন থাকত। অনেক জমি পানি নিস্কাশনের অভাবে চাষ করা যেত না অথবা ফসল ডুবে যেত। জ্যৈষ্ঠ আষাঢ়ে আউশ আর আশ্বিন কার্তিক অগ্রহায়ণে আমন ধান কৃষকেরে ঘরে উঠত। তৎকালীন ধানের বাহারী নাম ছিল যেমন-বাঘা, লেপা, কালিয়াবেত, লক্ষীধীঘা, দাদকালাই, লক্ষীরাজা, ললজ, বাঙ্গীললজ, ঝুল, ধুলাই, বাগবাই, দলকচু, দুধসর, জাপলী, কালামানিক, গন্ধকস্তুরী, বড়দিঘা, বোরো, বাগুনবিচি, খইয়া মটর, মোড়ল, কাজলা, বালাম ইত্যাদি। মোগল শাসনকালে পাট উৎপাদন শুরু হয়। তবে ইংরেজ শাসনকালে বিশেষ করে ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকে শিল্প বিপ্লবের পর এ দেশে পাটের চাষ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ষোড়শ সপ্তদশ শতকে রচিত কবি কিঙ্কনে পট্রবস্ত্রের উল্লেখ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এদেশে পাটের চাষ শুরু হয় ইংরেজ শাসনকালের শুরুতে। স্কটল্যান্ড থেকে আসা উদ্ভিদবিদ ড. উইলিয়াম রক্সবার্গ (১৭৫১-১৮১৫) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চিকিৎসক হিসেবে প্রথমে দক্ষিণ ভারতে এবং পরে কলকাতায় আসেন। সে সময় ভেষজ ঔষধ হিসেবে উদ্ভিদের উপর চিকিৎসকেরা গবেষণা করত। রক্সবার্গ পরে উদ্ভিদ গবেষক হিসেবে কলকাতার নিকট শিবপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের কিউরেটর হিসেবে নিযুক্ত হন। রক্সবার্গ এ সময় পাটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে বৃটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৭৯৩ সালে রক্সবার্গ প্রথম স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহরে তিসির আঁশের কারখানায় পাটের আঁশ পাঠান। বিলেতে এর আগে কেউ পাটের আঁশ ব্যবহার করেননি। সে সময় ডান্ডি শহরে তিসির আঁশ থেকে বস্ত্র, থলি তৈরি করা হত। এদেশেও তখন বস্ত্র তৈরি হত কার্পাস থেকে। বিলাতে তিসির আঁশ আমদানি করা হত রাশিয়া থেকে। ১৮৫৩ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়ার যু্দ্ধ শুরু হলে তিসির আঁশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। ঐ সময় থেকে তিসির আশের বিকল্প হিসেবে ডান্ডিতে পাটের আঁশ ব্যবহার শুরু হয়। ভারত তখন বিলাতের দখলে। এদেশে পাট উৎপাদনে বিপুল সম্ভবনা থাকায় উৎপাদিত পাট ডান্ডিতে পাঠান হয়। এভাবে পাট চাষ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। নীলচাষ বন্ধ হয়ে শুরু হয় পাটের চাষ। আনন্দনাথ, ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৩১----‘পাট চাষ বৃদ্ধির সহিত ধানের চাষ ক্রমশই লয় পাইতেছে, পাটে প্রচুর লাভ পাইয়া মুসলমান ও নমঃশুদ্র সম্প্রদায় বিশেষ উন্নত হইয়া উঠিতেছে। তাহাদের অধিকাংশের অবস্থা ভালো। প্রত্যেকেই টিনের ঘরের ব্যবস্থা করিয়া ও গয়না তৈরি করিয়া উন্নত অবস্থার পরিচয় দান করিতেছে। যাহাদের জমিজমা নাই তাহারাই কেবল মোট বাহিয়া ও কৃষকদের বাড়িতে কার্য করিয়া দিনাতিপাত করিতেছে।’

Additional information