অর্থনীতি ক্রমধারা - পৃষ্ঠা নং-১২

রাজবাড়ি ড্রাইআইস ফ্যাক্টরি

রাজবাড়ি সরকারি কলেজের অর্ধকিলোমিটার পশ্চিমে রেললাইনের দক্ষিণ সংলগ্ন ড্রাই-আইস ফ্যাক্টরির স্থাপনা দশবছর পূর্বেও দেখা যেত। বর্তমানে এর অবশিষ্ট বলতে কিছু নেই। কেবল এলাকাটি ‘ডাইস (ড্রাই আইস থেকে মুখে মুখে ডাইস) বলে লোকমুখে প্রচলিত। ড্রাই-আইস ফ্যাক্টরির সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের নানা উপাদান। জনৈক জার্মান সাহেব (ল্যাংড়া সাহেব বলে পরিচিত) ১৯৩৭ সালে উক্ত ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। তিনি কোনো জাহাজ কোম্পানিতে চাকরিরত ছিলেন বলে জানা যায়। ইউরোপে তখন হিটলারের উত্থানের যুগ। উগ্র জাতীয়তাবাদী হিটলার ইউরোপসহ সারা বিশ্বে শক্তি বিস্তারের লক্ষ্যে তৎপর। এ সময় বৃটিশ ভারতে আধিপাত্য বিস্তারের লক্ষ্যে কৌশল হিসেবে ভারতের পশ্চিম প্রান্তের লাহোর এবং পূর্বপ্রান্ত সীমায় পূর্ববাংলার রাজবাড়িতে দুটি ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। বিষয়টি বৃটিশদের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় উৎপাদন শুরুর পূর্বেই ল্যাংড়া ল্যাংড়া সাহেবকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে ফ্যাক্টরি পরিত্যাক্ত অবস্থায় থেকে যায়।

ড্রাই-আইস মূলত শুষ্ক বরফ যা অগ্নি নির্বাপক, সোডা ওয়াটার, কোকাকোলা, ফানটার বুদবুদ সৃষ্টি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। কয়লা পড়িয়ে কার্বন এবং ‍উক্ত কার্বনকে উচ্চ চাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় সিলিন্ডার ভর্তি হল ড্রাই আইস উৎপাদন ক্রিয়া। ১৯৪৮ সালে করম চাঁদ থাপা নামের এক ব্যবসায়ী সরকারের নিকট থেকে ফ্যাক্টরি ক্রয় করে ড্রাই-আইস উৎপাদন শুরু করেন। ১৯৬১ সালে গোলাম ফারুক উক্ত প্রতিষ্ঠান করম চাঁদ থাপার নিকট থেকে ক্রয় করে ইঞ্জিনিয়র সাঈদ উদ্দিন খানকে (দাদশী ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আমবাবুর পিতা) ফ্যাক্টরি পরিচালনার ভার দেন। সে সময় শত শত সিলিন্ডার ভর্তি ড্রাই আইস ভারত পশ্চিমপাকিস্তানসহ বিদেশে রপ্তানি করা হত। স্বাধীনতার পর সরকার ফ্যাক্টরি অধিগ্রহণ করে। উৎপাদন বন্ধ থাকে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ অক্সিজেন কোম্পানির নিকট সরকার ফ্যাক্টরিটি বিক্রি করে। অক্সিজেন কোম্পানি ফ্যাক্টরিটি রাজবাড়ি থেকে স্থানান্তর করে। স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিবাদ ও বাধাসত্ত্বেও স্থানান্তর ঠেকানো সম্ভব হয়নি যেমন সম্ভব হয়নি বিনোদপুর পাওয়ার প্লান্ট স্থানান্তর। জাতীয় অর্থনীতির ধারায় রাজবাড়ি জেলা কতটা পিছিয়ে আছে? এ প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতির জটিল চালকসমূহের বিশ্লেষণে নিহিত। জেলার কৃষি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ (পোলট্রি, হ্যাচারী বেকারি, মৎস্য খামার, বনায়ন, চানাচুর, মিষ্টান্ন উৎপাদন, তাঁতবস্ত্র, রেশম শিল্প, গো-খামার, দুগ্ধ উৎপাদন, ওয়েলডিং আসবাবপত্র উৎপাদন কারখানা, কবিরাজী ঔষধ উৎপাদন ইত্যাদি)। জাতীয় প্রবৃদ্ধির ৬% এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। একমাত্র রাজবাড়ি শহর থেকে প্রতিদিন ২০/২২ মণ চমচম ও অন্যান্য মিষ্টান্ন দ্রব্য দেশের অন্যত্র রপ্তানি হয়। জেলার অবকাঠামোগত উন্নতি আশাপ্রদ। জেলার প্রায় অর্ধেক গ্রাম পাকা সড়ক সংযোগের আওতায় এসেছে। প্রায় ৪০ ভাগ গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। আবাসন অবস্থার অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। জেলাশহরে যেখানে বিশ বছর পূর্বে ২/৪টি দোতলা ভবন ছিল সেখানে পাকা দালান ও দোতলা, তিনতলা ভবন সংখ্যা এক হাজার অতিক্রম করেছে। গ্রামাঞ্চলে খড়োঘর দেখা যায় না। পাকাবাড়ি-সহ সুদৃশ্য ইমারত গড়ে উঠেছে। মানুষ আত্মপত্যায়ী ও পরিশ্রমী হয়ে উঠেছে। চারটি উপজেলার দ্রুত শহর বিস্তৃতি ঘটেছে। জেলার গড়াই ও চন্দনা নদীকে খননের মাধ্যমে সেচ ও মৎস্য চাষের মাধ্যমে এর দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব। শিক্ষার বিস্তার দ্রুত ঘটছে। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি উত্তম। সব মিলিয়ে জেলা আর্থিক বুনিয়াদ শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেনগ্রাম, জৌকুড়া, ধাওয়াপাড়া ঘাট, গোয়ালন্দ বাজার সংলগ্ন পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ। মূল পদ্মা এখন রাজবাড়ি শহর থেকে মাত্র এক কি.মি. দূরে। চার পাঁচ বছরের মধ্যে ছিলিমপুর চর-সহ বিরাটায়তনের চর ভেঙে পদ্মা এখন শহর রক্ষা বাঁধে ঠেকেছে। ভাঙ্গন রোধ করা না গেলে শহর বিলুপ্ত হতে পারে। আমাদের স্বপ্নের শহর পদ্মারগর্ভে বিলীন হবে। শহর রক্ষায় সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও উন্নত প্রযুক্তিতে বাঁধ নির্মাণ শহরবাসীর প্রত্যাশা।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক চেতনায় জেলাটির অবস্থান পশ্চাতে ভাবা যায়। সহনীয় ও অসহনীয় মোট দারিদ্রের হার প্রায় ষাট ভাগ। এরমধ্যে অসহনীয় বা চরম দারিদ্রের মধ্যে ২৫ ভাগ লোকের বাস। বিগত শতকের শেষে শতকগুলোতে দারিদ্র ছিল ভয়াবহ। নব্বই দশক থেকে সরকার এবং বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) উদ্যোগে দারিদ্র হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।

Additional information