অর্থনীতি ক্রমধারা - পৃষ্ঠা নং-৩

পাট উৎপাদনের ধারা অব্যহত আছে। রাজবাড়ি জেলায় উন্নতমানের পাট উৎপাদিত হয়। তবে পলিথিন উদ্ভাবনের পর থেকে সারা পৃথিবীতে পাটের চাহিদা ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ায় পাটের দরও কমে যায়। বর্তমানে পলিথিনের ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। দরও ভালো। বর্তমানে ভালো পাট প্রতি মণ দুই হাজার টাকার উপর বিক্রি হচ্ছে। রাজবাড়িতে ২০০৯ সালে আহলাদীপুর মোড়ে একটি জুট মিল স্থাপিত হয়েছে। এ মিলে উন্নত মানের পাট দ্বারা সুতা প্রস্তুত করা হবে যা কেবল বিদেশে রপ্তানিযোগ্য।

ধানের সাথে পাট, পিঁয়াজ, রসুন প্রচুর জন্মাত। বৃটিশ শাসনকালে এ অঞ্চলের অর্থনীতি ছিল নিতান্তই কোনোভাবে বেঁচে থাকার অর্থনীতি। রাস্তাঘাট বলতে কর্দমাক্ত মেঠোপথ। বাহন বলতে গরু ও ঘোড়ায় টানা গাড়ি, শিক্ষা বলতে দশ গ্রাম খুঁজেও কোনো শিক্ষিত লোক পাওয়া যেত না।

বৃটিশ শাসনের শুরু থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত রাজবাড়িসহ তৎকালীন বাংলার আর্থিক বিকাশের ধারায় নীলচাষ একটি কালো অধ্যায়। ইতিপূর্বে নীলচাষ অধ্যায়ে তা আলোচনা করা হয়েছে। রাজবাড়ি জেলার প্রায় সকল অঞ্চলেই নীলচাষ হত। নীলচাষের ফলে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পায় কারণ ভালো ভালো জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য করা হত। চাষীরা নীলের ন্যায্য মূল্যও পেত না। ফলে কৃষকদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পড়ে।

১৮৭১ সালে রাজবাড়ি জেলায় রেললাইন স্থাপনের পর থেকে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা বদলাতে থাকে। এ সময়কালের একটি প্রামণ্য লেখচিত্র আমরা পাই আনন্দনাথ রায়, মীর মশাররফ হোসেন, কাঙ্গাল হরিনাথ, জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র, জগদীশ গুপ্ত, অমীয় ভূষণ মজুমদার, রওশন আলী, নজীরুদ্দিন, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্যের লেখা থেকে।

আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থের ২৯ পৃষ্ঠায়---‘মধুখালি চন্দনা তীরে তামাক, লবণ, কামারখালি চন্দনা তীরে চাউল, সরিষা, খেসারী, জামালপুর চন্দনা তীরে তামাক। সেলিমাপুর, ধুনচি, আমবাড়িয়া, পাঁচুরিয়া, কানাইপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বহু পরিমাণে বাণিজ্য দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় হয়। ফরিদপুর গুড় ও দেশী কাপড়ের জন্য; পাংশা ও বেলগাছি দেশী কাপড়, গামছা, ছিট প্রভৃতির জন্য প্রসিদ্ধ। গোয়ালন্দ পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল, নানা স্থান হইতেই স্টিমারও নৌকা যোগে নানাবিধ জিনিষ এখানে উপস্থিত হইয়া বহু দূর দূরান্তে প্রেরিত হইয়া থাকে।

মীর মশাররফ হোসেনের সত্যকহন ও সত্যভাষণ তাঁর সাহিত্যের প্রধান উপাদান। দৈনন্দিন জীবনের কর্মঘটনা, আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা থেকে শুরু করে জমিদার, ভাগদার, পত্তনিদার, দরপত্তনিদারের বলয়ে সমাজের নিপীড়ন, কলহ বিবাদসহ তৎকালীন সমাজ মানুষের বিশেষ করে মুসলিম সমাজের অধপতন, জীবনচার তাঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হিসেবে স্বাক্ষ্য বহন করে। তাঁর জীবনকাল ১৮৪৮-১৯১১ খ্রি.। তার রচিত জমিদার দর্পণ, উদাসীন পথিকের মনের কথা, গৌড়ী সেতু, গাজী মিয়ার বস্তানী, টালা অভিনয়, আমার জীবন প্রভৃতি গ্রন্থে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এবং পূর্বাপর ঘটনাসমূহ বিবৃত হয়েছে তার গ্রন্থসমূহে।

সে সময় উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। অনাবাদী পতিত জমি ও বিল হাওড় পরিপূর্ণ ছিল অত্র এলাকা। নীলচাষের দৌরাত্বে মানুষের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেছে। নীলচাষের নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় নীল সাহেব, জমিদার লাঠিয়াল, দালাল ফড়িয়ার প্রভাবে কৃষক শ্রেণি সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে। যাতায়াত শিক্ষা বলতে কিছুই ছিল না। মানুষ ছিল অশিক্ষিত, মূর্খ গোঁড়া, বিবেকবর্জিত। সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে আটকে পড়েছে মানুষ। মুসলিম সম্প্রদায় বিশেষভাবে পিছিয়ে পড়েছে। ক্ষুধা, অনাহার দুর্ভিক্ষ, মহামারী, তাদের দৈনন্দিন  জীবনের সঙ্গী হয়ে ওঠে।

অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে টাকার ব্যবহার অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদিকালে টাকার ব্যবহার ছিল না। পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময় হত। মীরের সাহিত্যে টাকা ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। টাকার অভাবের কথায় ফুটে উঠেছে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবনের হাহাকার। গাজী মিয়ার বস্তানিতে তিনি বলেছেন------

Additional information