অর্থনীতি ক্রমধারা - পৃষ্ঠা নং-৪

হায়রে টাকা। কাটা মুণ্ডু ছাপাযুক্ত রুপার ক্ষুদ্র টাকা-তুমিই টাকা। ও টাকা তোমার মহিমা অপার অনন্ত। তুমিই ধর্ম, তুমিই কর্ম, তুমিই স্বর্গ, তুমিই নরক, তুমিই অপমান, তোমাতেই দয়া, মায়া, শত্রুতা, মিত্রতা, প্রণয়, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা।

অর্থনীতি বিকাশে টাকার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও টাকা জমানোর সুযোগ থাকায় ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ে। ধনী ব্যক্তি মানসম্মানে সহায়সম্পদে সম্পদশালী ও সমাজে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তার সময় এ অঞ্চলের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সম্পদশালী হয়ে ওঠার চিত্র এবং তাদের শ্রেণি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। পদমদির নবাব মীর মোহাম্মদ আলীর বিলাসবহুল জীবনের চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। মীরের লেখা থেকে এ অঞ্চলের অর্থনীতির আরো ধারণা জন্মে যখন দেখি তিনি নিপুণ শিল্পীর মতো জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন আমার জীবনী গ্রন্থে। মীরের জন্মস্থান কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া। সেখান থেকে কুষ্টিয়ার রাজবাড়ির পদমদির দূরত্ব বড়জোর ২০/২৫ মাইল। পদমদির অদূরে সোনাপুর, বহরপুর, রামদিয়া, সেকাড়া প্রাচীন প্রসিদ্ধ এলাকা। লাহিনীপাড়ার অদূরে সাঁওতা, সাঁওতার পাশেই গড়াই। গড়াই পাড় হয়ে পাংশা এলে চন্দনা নদী এবং আরও পূর্বে এলে হড়াই নদী। আর এ সকল নদী প্রমত্ত পদ্মার পূর্বধারায় প্রবাহিত। এলাকাটির প্রাচীন নাম ‘গড় শ্রীখণ্ড’। এই গড় শ্রীখণ্ডের ধান, পাট, কাঠ, বাঁশ, বেত, খয়ের, পান, সুপারি, চিনি, কলাই, তিল, তিসি, কার্পাস, জাফরান, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, শাক সবজী উৎপন্ন ফসল। বর্তমানেও সোনাপুরে অনেক খয়ের উৎপাদন কারখানা আছে।

 ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি থেকে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝিকালে কুষ্টিয়া, কুমারখালি, পদমদি, গোয়ালন্দকে কেন্দ্র করে অত্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানুষের চেতনার একটি চিত্র অঙ্কন করা যায়। এ সময়কালের মধ্যে ইংরেজ পরিচালিত রেশমকুঠি ও ৫১টি নীলকুঠির হেড অফিস ছিল কুমারখালিতে। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশগামী রেললাইন গড়াই নদী পাড় হয়ে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। রাজবাড়ি অঞ্চলের রেলকে কেন্দ্র করে জীবনধারার পরিবর্তন শুরু হয়। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার উদ্দেশ্যে তাদের ধর্ম, কর্ম, পাপ, পূণ্য, শিক্ষা, সংসার, সংঘাত, সংঘর্ষ বর্ণিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্ম থেকে নদনদী, ভূমি, প্রাকৃতিক পরিবেশের উন্নয়ন সম্ভবনার নির্দেশনা পাওয়া যায়। মীরের লেখায়-----

মহামতি লর্ডসেও বড় লাট বাহাদুর গৌড়ী সেতু, গড়াই সেতু খুলিয়াছেন (১৮৭১) গৌড়ী সেতুবন্ধের সময়ে হিন্দু মুসলমান কেরানী, ড্রাপটসম্যান, ক্যাশিয়ার, বড়বাবু সাজিয়া রেলওয়ে কোম্পানির অধীনে কার্য করিতেন।। খাশ ইউরোপীয়ান অতি কম হইলেও ২০/২৫ জন দেশী, ফিরিঙ্গীও প্রায় ঐ পরিমাণ, নিগ্রহাবাস ১০/১২ জন/করনীদল ৭০/৮০ জন। অল্প অল্প ইংরেজি জানা লোকও ২০/২৫ জন। হাতি, ঘোড়া, বোট,  নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার প্রচুর ছিল চট্রগ্রাম শ্রীহট্র প্রভৃতি স্থানের এবং দেশীয় কুলি, হিন্দু ও মুসলমান নির্ণয় করা কঠিন।

গড়াই সেতু নির্মাণ এবং গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেলপথ স্থাপরেনর ফলে এ অঞ্চলের সাথে রাজধানী কলিকাতার যাতায়াত, পণ্য বহন, শিক্ষা সংস্কৃতির সম্পর্ক গড়ে ওঠায় মানুষের চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটতে থাকে। এ অঞ্চলের পাট, বেত, মাছ, গুড় ও অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পায়।

তার ‘লেখা টালা’ অভিনয় এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক অবস্থার বিবরণ পাই ‘কাহারো পরনে ছেঁড়া তবন (লুঙ্গী), কাহারোও উলঙ্গ শরীর, কাহারও পরনে ছেঁড়া পাজামা, মলিন পিরহান (পোশাক), কাহারও ধুতি মলিন, ছেঁড়া ধুতি, খালি পা, কেহ অর্দ্ধ উলঙ্গ।’ মীর মশারফ হোসেনের সমকালীন আর এক তেজোদ্দীপ্ত পুরুষ কাঙ্গাল হরিনাথ। দরিদ্র বঞ্চনা আর আঘাতের কাছে মাথা নত করেননি। রাজবাড়ি, পাংশা, কুমারখালির সমতলে নির্ভিক বলিষ্ঠ পুরুষ। গ্রামবার্তা পত্রিকার সম্পাদক। ১৮৭২ সালে তিনি গ্রাম বার্তায় লিখেছেন---- জমিদারদের দ্বারা যত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাজদ্বারে সম্মান লাভেচ্ছাই তার অধিকাংশের কারণ। মফস্বলের এক একজন দাতব্য ডিসপেনসারী ও বিদ্যালয় দিয়া আয়োজিত দেশের ভ্যাস্পাইয়ার বাদুরের ন্যায় রক্ত পান করেন।’

Additional information