অর্থনীতি ক্রমধারা - পৃষ্ঠা নং-৫

তাঁর সমকালীন অক্ষয় কুমার মৈত্র ও জলধর সেনের লেখাতেও এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিষয় পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে পাংশা থেকে প্রকাশিত কোহিনুর পত্রিকা সম্পাদনা করতেন রওশন আলী চৌধুরী। কোহিনুর পত্রিকাকে অবলম্বন করে যে লেখক সংঘ গড়ে ওঠে, তাদের লেখা থেকেও এ অঞ্চলের আর্থ সামাজিক অবস্থা বিবৃত হয়েছে।

পূর্বদেশগামী রেলপথ গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার ফলে কুমারখালি, পাংশা, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ এলাকার মানুষের আর্থিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। গোয়ালন্দ ঘাটের স্টিমার, লঞ্চ, রেলগাড়ি তথা যাতায়াত কল্যাণে কয়লার ব্যবসাসহ মাছ, গুড় ও পাটের ব্যবসআর প্রসার ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণির উদ্ভব হয়। শ্রেণি বিশেষে তাদের নৈতিক স্খলনের বিষয় সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের লেখাতেও পাওয়া যায়। রাজবাড়ি গোয়ালন্দের নিষিদ্ধপল্লীর বিস্তার এ সময়ের বিশেষ দৃষ্টান্ত। শ্রেণি বিশেষের ভোগবাদী চিত্র তার লেখা থেকে পাই। অন্যদিকে বেশির ভাগ মানুষের অনাহার, দারিদ্র, দুর্ভিক্ষের চিত্র তিনি এঁকেছেন। কলেরা, ম্যালেরিয়া, বসন্তের মতো মহামারীর অভিশাপ তার লেখায় ফুটে উঠেছে। ১৯২০-এর পর থেকে এ অঞ্চলের মানুষের কিছুটা হলেও চেতনায় সাড়া জেগেছে। এ প্রভাব গ্রামজীবনে লক্ষ্য করা গেছে। তাঁর পল্লীসমাজ উপন্যাসে দেখা যায়----‘গ্রামের নাম বেতডাঙ্গা (বেতেঙ্গা) নদীর নাম চন্দনা, হাটের নাম চম্মনার হাট। নদী ছোট, হাটে যারা আসে তারাও বৃহৎ নয়।’ তার পল্লীসমাজের এ কাহিনী বেতেঙ্গার মুদি দোকানের মালিক রামপ্রসাদের সংসারকে নিয়ে। যন্ত্রণার মধ্যেও বেঁচে থাকার যে কূটকৌশল মানুষ গ্রহণ করে তারেই প্রতিচ্ছবি যা তৎকালীন এ জেলার মানুষের দুঃখকষ্টের জীবনচিত্র। অমীয়ভূষণ মজুমদার বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের একজন শক্তিমান লেখক। গড় শ্রীখণ্ড তার বিখ্যাত উপন্যাস। গড় শ্রীখণ্ডের চিহ্নিত এলাকা গ্রন্থে নেই। তবে ভাষারীতিতে অনেকটাই বোঝা যায় উপন্যাসের পটভূমি অত্র এলাকা। ‘চাল আনবো পুলিশের তাড়া খেয়ে পালাইছি’ ‘কবনে এখন খাওয়া দাওয়া কর’। ‘কিছু একটা ব্যবস্থা হবি’ ‘কাল সকালে আসবি বোধ হয়’। ‘আনবো’ ‘আনবি’ ‘পালাইচি’ ‘কবনে’ ‘হবি’ এ অঞ্চলের কথ্যভাষা। প্রাচীনকালের ভূ-উত্থানগত বৈশিষ্টে কুমারখালি কুষ্টিয়া তথা পদ্মা গড়াইয়ের তটভূমির মধ্যবর্তী এলাকা শ্রীখণ্ড বলে পরিচিত। অমীয়ভূষণের লেখায় এ অঞ্চলেরই জেলে তাঁতী কৃষকের জীবনচিত্র পাওয়া যায়। ‘সেকালেই সেই ধনী কারিগর আর কুঠিয়াল দালাল থেকে নীলকর হয়ে পাটের সাহেবদের স্তর পর্যন্ত ক্রমশ ঋণ বেশি করে বাইরে গিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।’ তার এ লেখায় তথকালীন পুঁজি সঞ্চরণের চিত্র পাওয়া যায়। ‘এ দেশের চাষিরা রেড ইন্ডিয়ান নয় যে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে খোঁয়াড়ে পুরে রেখে এসে শূন্য জমিতে কলের মই টানবে। ‘তার উদ্ধৃতি থেকে বুঝতে পারি এ দেশের মানুষের হাজার বছরের জীবন জীবিকার সংস্কৃতির ধারা রুখবার শক্তি কারো নেই। খণ্ডিতকালে তা সম্ভব হলেও দীর্ঘকালীন সময়ে তা স্থায়ী হবে না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি কালজয়ী উপন্যাস। পদ্মা নদীর তীরবর্তী হয় দরিদ্র ও নিন্ম মধ্যবিত্তদের জীবন চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। প্রথম মহাযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) মধ্যবর্তীকাল বাংলায় নানা রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের কাল। এ সময়ে মানুষের ঔপনিবেশিক মুক্তিসহ সমাজকাঠামোর পরিবর্তনের ধারায় সমাজতান্ত্রিক তথা কমিউনিস্ট আন্দোলন সংগঠন গড়ে ওঠে। তৎকালীন সময়ে গোয়ালন্দ বাংলার দ্বারপথ। স্টিমার, রেল, লঞ্চ এবং ব্যবসায়িক কারণে গোয়ালন্দ কলিকাতা এবং ঢাকার সংযোগ দ্বারপথ হিসেবে সাহিত্যিক, লেখক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সমাবেশ ঘটে। গোয়ালন্দের পটভূমিতে অনেক ঘটনাই সংগঠিত হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি এ পটভুমিতে রচিত।

আবহমানকালের পদ্মার ঐতিহ্য ইলিশ বলতে পদ্মা যমুনার সঙ্গমস্থল গোয়ালন্দ ও আরিচা ঘাটের ইলিশকেই বোঝানো হয়। উপন্যাসের শুরুটাই গোয়ালন্দের ইলিশের কথা-------

দ্মার ইলিশ মাছ ধরার মরসুম চলিয়াছে। দিবারাত্রি কোনো সময়ই মাছ ধরার কামাই নেই। সন্ধ্যার সময় জাহাজ ঘাটে দাঁড়ালে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অণির্বান জোনাকির মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। শহরে গ্রামে রেলস্টেশন ও জাহাজ ঘাটে শ্রান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ।

Additional information