অর্থনীতি ক্রমধারা - পৃষ্ঠা নং-৭

যোগাযোগ সুবিধায় ১৯২৫ সালে দেখা যায় তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় ১৮টি পোস্ট অফিস ছিল। ১৯৬১ সালে ৫০টি সাব অফিস এবং ২৫৮টি ক্যাম্প অফিস থাকে। ১৯৬৮ সালে গোয়ালন্দ টেলিফোন এক্সেচেঞ্জ স্থাপিত হয়। এরমধ্যে পাবলিক কল অফিস থাকে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি ও খানখানাপুর।

আবহমানকালের কৃষি রাজবাড়ি জেলার জীবিকা। ফসলের মধ্যে পিঁয়াজ ও রসুন ও পিয়াজের বীজ (দানা) উৎপাদনে বাংলাদেশে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এরপরই পাট। ১৮৬০ সালে নীলচাষ বন্ধ হবার পর এ অঞ্চলে পাটের চাষ শুরু হয়। তোষাপাট উন্নত জাতের। এ ছাড়া তিল, তিসি, সরিষা, বাদাম, মশুর, খেসারী, ছোলা উৎপাদিত হয়। খাদ্যফসল উৎপাদন আগে আউশ, আমন, বোরো জন্মাত। অঞ্চলটি পূর্ব থেকেই খাদ্যঘাটতি এলাকা। ফলফলাদির মধ্যে ডাব, নারকেল, তরমুজ, আম, জাম, কাঁঠাল প্রচুর ফলে। শাকসবজির মধ্যে ফুলকপি, টমোটো, লাউ, কুমড়া ফলে। এক সময় গোয়ালন্দের ১ মণি, দেড় মণি তরমুজের খুব সুনাম ছিল। কলিকাতা দিল্লীতে তরমুজ রপ্তানি হত। পানশুপারী খয়ের অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ফসল। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক বীজ, লাঙ্গল, জোয়াল, মই, নিরানী, কোদাল, কাঁচি এবং গুরু টানা লাঙ্গল কৃষিকাজের বাহন ছিল। ১৯৬০ এরপর থেকে কৃষিতে যন্ত্রায়ণের ব্যবহার শুরুতে পাংশা এবং গোয়ালন্দ বিএডিসির অধীনে সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফারম স্থাপিত হয়। পাংশা এসএস ফার্মের আয়তন ছিল ১০০,২৬ একর। এরমধ্যে ৪০ একরে ছিল আউশ উৎপাদন যার পরিমাণ ছিল গড়ে একর প্রতি ১৩.৩৬ মণ। ২০ একরে ইরি, একর প্রতি উৎপাদন ছিল ১৭.২৫ মণ। ১৬.৪০ একরে ইরি ১৭৬ উৎপাদন একর প্রতি ১৯.০৫ মণ এবং ১ একর ইরি ও বোরো যা উৎপাদন ছিল ২.৬ মণ। ৫ একরে পাট বীজ উৎপাদন ছিল ৬.৪০ মণ প্রতি একরে। ২ একর ছিল ধনচে বীজ উৎপাদন। উৎপাদন পরিমাণ ৫ মণ প্রতি একর। ৫২ একর ছিল গম উৎপাদন। প্রতি একরে উৎপাদন ১০.৪০ মণ। (ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৭)।

গবাদিপশু হালচাষ, দুধ ও গোস্তের জন্য অতি প্রয়োজন। রাজবাড়ি জেলার চরাঞ্চলসহ বিপুল পরিমাণ বিরাণভূমি গবাদী পশু পালনের উপযুক্ত থাকায় প্রচুর দুগ্ধ উৎপাদন হত। রাজবাড়ি দুগ্ধজাত মিষ্টি চমচমের খ্যাতি রয়েছে সারাদেশে। ১৯১০ সালের তথ্যে দেখা যায় ১৬০৪৪ জন দুগ্ধ উৎপাদন করতো এবং পরিমাণ ছিল ৫০৯ টন। ১৯৬৬ সালে কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ফরিদপুর প্রতিষ্ঠা পায় এবং গোয়ালন্দ সাব সেন্টার স্থাপিত হয়। গোয়ালন্দ মহকুমার রাজবাড়িতে ভেটেনারী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় (১৯৬৪-৬৯)। বর্তমানে রাজবাড়ি জেলার পদ্মা নদী বাহিত অন্যান্য নদনদী খালবিল শুকিয়ে গেলেও অর্ধ শতাব্দী পূর্বেও তা ছিল কানায়-কানায় পূর্ণ। এ সব নদনদী খালবিলে প্রচুর মৎস্য পাওয়া যেত। ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতল, মৃগেল, চিতল, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল, গজার, পুঁটি, বাইন এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য সম্পাদ। পদ্মা, গড়াই, চন্দনা, হড়াই, কাজিয়াল, কুমার, ফুরসুলা, চিত্রা নদী আর চিতালিয়া বিল, গজারিয়া বিল, কাছুমিয়া বিল, মেঘনা বিল, ঘোড়ামারা বিলে প্রচুর মৎস্য সম্পদ ছিল। মৎস্য ধরার প্রধান কেন্দ্র ছিল গোয়ালন্দ ঘাট, রাজবাড়ি, কালুখালি, পাংশার মৃগী, বালিয়াকান্দি, নাড়ুয়া। মৎস্য অধিদপ্তর দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৬০-৬৫) মৎস্য সম্পাদ উন্নয়নে রাজবাড়িতে মৎস্য খামার গড়ে তোলে। এ ফার্মের আয়তন ছিল ১০ একর। মৎস্য প্রতিপালন এবং মাছের পোনা উৎপাদন করা হত। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৬৫-৭০) তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় কেবলমাত্র একটি ফার্ম ও তিনটি মৎস্য প্রতিপালন (নার্সারী) বালিয়াকান্দিতে স্থাপন করা হয়।

 ফরিদপুর জেলা সাধারণত কৃষিপ্রধান জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানে শিল্পের বিকাশ তেমন ঘটেনি। প্রকাশিত ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৭ দেখা যায় ১৯৪০ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় শিল্পের মধ্যে ছিল জুট প্রসেসিং, জুট উইভিং, কটন উইভিং, মাদুর, বাস্কেট,  ইটখোলা এবং চিনি ও গুড় তৈরি কারখানা। LSSB Malley কর্তৃক প্রথম ১৯১৯ সালে ফরিদপুর গেজেটিয়ার প্রকাশিত হয়। তারপূর্বে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ১৮৭৫ ও ১৮৭৭ সালে সকল জেলার তথ্য সম্বলিত ২০টি ভল্যুমে প্রকাশিত হয়। ম্যালের গেজেটিয়ারে দেখা যায়, তৎকালীন রাজবাড়ি অঞ্চলে কুঠির শিল্প হিসেবে বিড়ি শিল্পের বিকাশ ঘটে। মোটামুটি রাজবাড়ি অঞ্চলে শিল্প বিকাশে দেখা যায় বিশ শতকের মাঝামাঝি পূর্ব থেকে খানখানাপুরে জুট প্রসেসিং, সুতিবস্ত্র উৎপাদন, তাঁতশিল্পের বিকাশ ঘটেছে।

Additional information