অর্থনীতি ক্রমধারা

অর্থনীতি ক্রমধারা

বনাশ্রয়ী মানবজাতি একসময় কৃষিকাজে অভ্যস্থ হয়ে পড়েছিল। কৃষিতে লাঙ্গলের ব্যবহার শুরু থেকে মানবসমাজে অর্থনীতির শুরু একথা বলা যায়। কারণ কৃষির পর থেকে আর মানুষকে পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। কৃষিযুগের পর থেকে শ্রম বিভাজন ক্রিয়ায় চাষী, মুজুর, কামার, জেলে, তাঁতী ইত্যাদি শ্রেণিতে মানুষ বিভক্ত হয়ে পড়ে। মিশরীয় সভ্যতায় কৃষিকাজ শুরু হয় প্রায় ছয় হাজার বছর পূর্বে। ভারতের সিন্ধু সভ্যতার বিকাশকাল প্রায় ৫ হাজার বছর পূর্বে হলেও বাংলায় এর শুরু ৩০০০ বছর পূর্বে। অর্থনীতির গতিধারায় বর্তমানকালে উন্নয়ন ধারাকে অর্থনীতিবিদগণ ৫টি স্তরে ভাগ করে প্রতিটি দেশের অবস্থান জানতে চায়। ধারাগুলো প্যাসটোরাল (কৃষিভিত্তিক), ট্রানজিশনাল (প্রস্তুতি পর্ব), টেক অফ (উঠতি পর্ব) ম্যাচুরিটি (পরিপক্ক পর্ব)। অর্থনীতি বিকাশের এ ধারাসমূহের দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে বাংলাদেশ

এখন তৃতীয় ধাপে অর্থাৎ টেক অফ এ (Take off) অবস্থান করছে। অর্থনীতির দ্বিতীয় স্তর প্রস্তুতি পর্ব শুরু হয়েছিল ১৯৪৭ দেশ বিভাগের পর। এর পিছনের সময়কাল কেবল ভরণপোষণের মতো আত্মপরিতুষ্টির জন্য কৃষি, মৎস্য, তাঁত, বেত, মাটির আসবাবপত্র, নৌকা, কবিরাজী ঔষধ, টোলের শিক্ষা সংস্কৃতিতে কেটে গেছে। এ দেশে ভূমিনির্ভর সামন্ত অর্থনীতির বিকাশ ঘটে ত্রয়োদশ শতক থেকে যা মোগল ও ইংরেজ শাসনকালে পূর্ণরুপে বিকশিত হয়।

ত্রয়োদশ শতকের শুরু থেকে তুর্কী বিজেতারা ধীরে ধীরে ভারত ভূমিতে আধিপত্য বিস্তার শুরু করে। হিন্দু রাজত্বের পরিবর্তন ঘটতে থাকে। শুরু হয় মুসলিম রাজত্ব। মুসলিম শসকদের রাজত্বকাল ‍দুটি পর্বে বিভক্ত। ১২০৬ থেকে ১৫২৬ সুলতানি শাসন এবং ১৫২৬ থেকে ১৮৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধের পর আপাতত ইংরেজদের দ্বারা মুসলিম শাসনের অবসান ঘটে কিন্ত শাসন কাঠামো পূর্ববত থেকে যায়। মুসলিম শাসনের সুদীর্ঘকালে মুসলিম আইনের আওতায় ভূমি ব্যবহার, বন্টন, মালিকানা, ওয়ারিশ স্বত্ত্ব, খাজনাবিধি স্থাপিত হওয়ায় ভূমি উৎপাদন ক্রিয়ায় মূখ্য উপাদানে পরিণত হয়। বলা যায় সামন্ত অর্থনীতির বিকাশ এখান থেকে শুরু। ইবনে বতুতার বর্ণনায় দেখা যায় (চতুর্দশ শতক) তৎকালীন সময়ে বাংলার কৃষি উৎপাদনের সাথে ব্যবসা বানিজ্যের প্রসার ঘটেছিল। মঙ্গল কাব্যসমূহে সে সময়ের অনেক সওদাগরের কাহিনী পাওয়া যায় যারা বাংলার পণ্য তাঁত বস্ত্র, মশলা, চিনি তৈল বোঝাই করে সপ্তডিঙ্গা নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমাত। ব্যবসা করত ----- মালয় (মালয়েশিয়া), শ্যাম (থাইল্যান্ড), জাভা (ইন্দোনেশিয়া), লঙ্কায় (শ্রীলঙ্কা)। এরমধ্যে চাঁদ সওদাগরের নাম এলাকায় খুব পরিচিত। সুলতানি আমল থেকেই এলাকার জনপ্রবাহ বৃদ্ধি পেতে থাকে। মোগল আমলে রাজবাড়ি অপেক্ষাকৃত উন্নত জনপদে পরিণত হয়। বাণীবহ, খানখানাপুর, বসন্তপুর, জামাল পুর, বালিয়াকান্দি, বহরপুর, সোনাপুর, পদমদী, কসবামাঝাইল, নাড়ুয়া, মৃগী, পাংশা, শিকজান, সুলতানপুর অঞ্চলসমূহে জনপদ গড়ে ওঠে। সুলতানি আমল থেকেই রাজবাড়ি জেলার সুতিবস্ত্র গুড়, চিনি, ধান, মশলা, জাফরান, তিল, দুগ্ধ, বাঁশ, বেত, পান, খয়ের শুপারীর আধিক্য ছিল। শ্রেণিগতভাবে কৃষিজীবী মৎস্যজীবী ছাড়াও কামার, কুমার, তাঁতী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে। সুলতানি শাসনকালকে এদেশে ফেজিওক্রাট বা ভূমি ব্যবহারের অর্থনীতি বলা যায়। প্রকৃত সামন্ত অর্থনীতির বিকাশ মোগল যুগ থেকে শুরু হলেও এর চরম বিকাশ ঘটে ইংরেজ শাসনকালে। সামন্ত অর্থনীতিতে সম্রাট, সামন্ত রাজা জমিদার মহাপ্রভু। প্রদেশের মালিক সুবেদার, পরগণার মালিক জমিদার। সম্রাট ও তার সহচরবৃন্দ আয় উৎপাদনের প্রবাহ তাদের দিকে ধাবমান রাখে। ফলে মোগল ও নবাব শাসনকালে মোগল হেরেম ও নবাবী দৌলতখানার আড়ালে প্রজা সাধারণের আয় উন্নতি ঢাকা পড়ে যায়। স্থান বিশেষে অট্রালিকা, প্রাসাদ, দুর্গ গড়ে উঠলেও জনমানুষের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রাস্তাঘাট, কারখানা উন্নয়ন পরিকল্পনার কোনো নির্দশন ছিল না। এসময় মোগল সৈন্য চলাচলের জন্য কিছু রাস্তা ঘাট তৈরি হয়। রাজবাড়িতে পল্টুনের রাস্তা, ফেরিফান্ড রোড এ সময়ে নির্মিত হয়। স্থান বিশেষে কাচারী, কোর্ট, ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। কসবা মাঝাইল, শিকজান, মেঘচামী, বাগডুল বালিয়াকান্দি, বেলগাছি, খানখানাপুর, বাণীবহ, পাংশা এ সব স্থানে গড়ে ওঠে নানা প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। ইংরেজ শাসনকালে ঔপনিবেশিক শাসন কৌশলে যে সামন্ত আর্থিক নীতির বিকাশ ঘটে তা পূর্বধারার সামন্তনীতি থেকে ছিল নির্মম। ইংরেজ শাসনকালের প্রারম্ভ থেকে তারা শাসনের কূটকৌশলে শোষণ নীতিকে কাঠামোভিত্তিক রুপদান করে। ১৭৬৫ সালে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার দেওয়ানী লাভ করে। ১৭৭০ সালে বাংলায় এক মহাদুর্ভিক্ষ সংগঠিত হয়।


সে দুর্ভিক্ষে প্রায় ১ কোটি লোক মারা যায়। কোম্পানি এসময় দুঃখজনকভাবে ভারতীয় কর্মচারীদের এ জন্য দায়ী করে। ১৭৭১ সালে কোম্পানি দেওয়ানী শাসন নিজ হাতে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং কোম্পানি নিজ কর্মচারী দ্বারা রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা করে। রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রতি জেলায় ইংরেজ কালেক্টরেট নিয়োগ করা হয়। এ সময় থেকেই কালেক্টরগণের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। কালেক্টরগণ একাধারে প্রশাসক, খাজনা আদায়কারী, দেওয়ানী ও ফৌজদারী বিচারক ছিলেন। প্রশাসনিক কাঠামোতে সামস্ত শাসন সুদৃঢ় হয়। সামস্তশাসনের আড়ালে নতুন জমিদার শ্রেণির উদ্ভব হয়। মুসলমান জমিদারের স্থলে হিন্দু জমিদারের উত্থান ঘটে। ১৭৯৩ সালে লর্ড কর্নওয়ালিশের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদারগণ ইংরেজ শাসনের ছত্রছায়ায় মধ্যস্বত্ত্বভোগী সামন্ত শাসকে পরিণত হয়। ইজারাদার, পত্তনিদার, দরপত্তনিদার, পাটনিদার, পাইক, বরকন্দাজ, লাঠিয়াল, কতোয়ালসহ জমিদার শ্রেণি দৃঢ় প্রতিপত্তি লাভ করে। প্রশাসনিক কাঠামোতে রাজবাড়ি জেলা পূর্ব থেকেই নশরত শাহী, মহিম শাহী, নসিব শাহী, কাশিমনগর, বিরাহিমপুর পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৭৯৩ সালে রাজবাড়ি জেলার গোয়ালন্দ, ঘাট গোয়ালন্দ হিসেবে যশোরের সাথে সংযুক্ত হয়। ইংরেজ শাসনের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে রাজবাড়ি জেলার ছোট ছোট অনেক জমিদারের উত্থান ঘটে। তাদের মধ্যে ২/৪ জন জমিদারের উত্থান মোগল ও নবাবী আমলে হলেও বেশিরভাগ জমিদারদের উত্থান ঘটে ইংরেজ আমলের মাঝামাঝি সময়ে। ইংরেজ শাসনের শেষকালে জমিদারের সংখ্যা ৫০/৬০ এ দাঁড়ায়। এলাকাটি সমতল ও পলল মাটির উর্বরতায় শস্য উৎপাদনে প্রাচুর্য থাকলেও ভূমি উন্নয়ন বা ‍কৃষি উন্নয়নের কোনো উদ্যোগ জমিদারগণ গ্রহণ করেন নাই। প্রজারা প্রকৃত ভূমির মালিক না-হওয়ায় তারাও ভূমির উন্নয়নে মনোনিবেশ করে না। জমিদারগণ ইচ্ছামত জমি ইজারাদারদের নিকট ইজারা দিত। খাজনা হিসেবে উৎপাদিত শস্যের অংশবিশেষ কেটে নিয়ে যেত। জোরপূর্বক বেশি খাজনা আদায় করত। জমিদারগণ পাকা দালানে বাস করলেও প্রজাদের পরণে কাপড় বা ঘরে খাদ্য থাকত না। বেশির ভাগ জমি পতিত, অনাবাদি, বন জঙ্গলে আচ্ছন্ন থাকত। অনেক জমি পানি নিস্কাশনের অভাবে চাষ করা যেত না অথবা ফসল ডুবে যেত। জ্যৈষ্ঠ আষাঢ়ে আউশ আর আশ্বিন কার্তিক অগ্রহায়ণে আমন ধান কৃষকেরে ঘরে উঠত। তৎকালীন ধানের বাহারী নাম ছিল যেমন-বাঘা, লেপা, কালিয়াবেত, লক্ষীধীঘা, দাদকালাই, লক্ষীরাজা, ললজ, বাঙ্গীললজ, ঝুল, ধুলাই, বাগবাই, দলকচু, দুধসর, জাপলী, কালামানিক, গন্ধকস্তুরী, বড়দিঘা, বোরো, বাগুনবিচি, খইয়া মটর, মোড়ল, কাজলা, বালাম ইত্যাদি। মোগল শাসনকালে পাট উৎপাদন শুরু হয়। তবে ইংরেজ শাসনকালে বিশেষ করে ইংল্যান্ডে অষ্টাদশ শতকে শিল্প বিপ্লবের পর এ দেশে পাটের চাষ বৃদ্ধি পেতে থাকে।

ষোড়শ সপ্তদশ শতকে রচিত কবি কিঙ্কনে পট্রবস্ত্রের উল্লেখ থাকলেও প্রকৃতপক্ষে এদেশে পাটের চাষ শুরু হয় ইংরেজ শাসনকালের শুরুতে। স্কটল্যান্ড থেকে আসা উদ্ভিদবিদ ড. উইলিয়াম রক্সবার্গ (১৭৫১-১৮১৫) ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিতে চিকিৎসক হিসেবে প্রথমে দক্ষিণ ভারতে এবং পরে কলকাতায় আসেন। সে সময় ভেষজ ঔষধ হিসেবে উদ্ভিদের উপর চিকিৎসকেরা গবেষণা করত। রক্সবার্গ পরে উদ্ভিদ গবেষক হিসেবে কলকাতার নিকট শিবপুরে বোটানিক্যাল গার্ডেনের কিউরেটর হিসেবে নিযুক্ত হন। রক্সবার্গ এ সময় পাটের বাণিজ্যিক সম্ভাবনা নিয়ে বৃটিশ সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। ১৭৯৩ সালে রক্সবার্গ প্রথম স্কটল্যান্ডের ডান্ডি শহরে তিসির আঁশের কারখানায় পাটের আঁশ পাঠান। বিলেতে এর আগে কেউ পাটের আঁশ ব্যবহার করেননি। সে সময় ডান্ডি শহরে তিসির আঁশ থেকে বস্ত্র, থলি তৈরি করা হত। এদেশেও তখন বস্ত্র তৈরি হত কার্পাস থেকে। বিলাতে তিসির আঁশ আমদানি করা হত রাশিয়া থেকে। ১৮৫৩ সালে রাশিয়া ক্রিমিয়ার যু্দ্ধ শুরু হলে তিসির আঁশ আসা বন্ধ হয়ে যায়। ঐ সময় থেকে তিসির আশের বিকল্প হিসেবে ডান্ডিতে পাটের আঁশ ব্যবহার শুরু হয়। ভারত তখন বিলাতের দখলে। এদেশে পাট উৎপাদনে বিপুল সম্ভবনা থাকায় উৎপাদিত পাট ডান্ডিতে পাঠান হয়। এভাবে পাট চাষ ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পায়। নীলচাষ বন্ধ হয়ে শুরু হয় পাটের চাষ। আনন্দনাথ, ফরিদপুরের ইতিহাস, পৃষ্ঠা-৩১----‘পাট চাষ বৃদ্ধির সহিত ধানের চাষ ক্রমশই লয় পাইতেছে, পাটে প্রচুর লাভ পাইয়া মুসলমান ও নমঃশুদ্র সম্প্রদায় বিশেষ উন্নত হইয়া উঠিতেছে। তাহাদের অধিকাংশের অবস্থা ভালো। প্রত্যেকেই টিনের ঘরের ব্যবস্থা করিয়া ও গয়না তৈরি করিয়া উন্নত অবস্থার পরিচয় দান করিতেছে। যাহাদের জমিজমা নাই তাহারাই কেবল মোট বাহিয়া ও কৃষকদের বাড়িতে কার্য করিয়া দিনাতিপাত করিতেছে।’


পাট উৎপাদনের ধারা অব্যহত আছে। রাজবাড়ি জেলায় উন্নতমানের পাট উৎপাদিত হয়। তবে পলিথিন উদ্ভাবনের পর থেকে সারা পৃথিবীতে পাটের চাহিদা ব্যাপক হারে হ্রাস পাওয়ায় পাটের দরও কমে যায়। বর্তমানে পলিথিনের ক্ষতিকর দিক বিবেচনায় পাটের চাহিদা বৃদ্ধি পেয়েছে। দরও ভালো। বর্তমানে ভালো পাট প্রতি মণ দুই হাজার টাকার উপর বিক্রি হচ্ছে। রাজবাড়িতে ২০০৯ সালে আহলাদীপুর মোড়ে একটি জুট মিল স্থাপিত হয়েছে। এ মিলে উন্নত মানের পাট দ্বারা সুতা প্রস্তুত করা হবে যা কেবল বিদেশে রপ্তানিযোগ্য।

ধানের সাথে পাট, পিঁয়াজ, রসুন প্রচুর জন্মাত। বৃটিশ শাসনকালে এ অঞ্চলের অর্থনীতি ছিল নিতান্তই কোনোভাবে বেঁচে থাকার অর্থনীতি। রাস্তাঘাট বলতে কর্দমাক্ত মেঠোপথ। বাহন বলতে গরু ও ঘোড়ায় টানা গাড়ি, শিক্ষা বলতে দশ গ্রাম খুঁজেও কোনো শিক্ষিত লোক পাওয়া যেত না।

বৃটিশ শাসনের শুরু থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত রাজবাড়িসহ তৎকালীন বাংলার আর্থিক বিকাশের ধারায় নীলচাষ একটি কালো অধ্যায়। ইতিপূর্বে নীলচাষ অধ্যায়ে তা আলোচনা করা হয়েছে। রাজবাড়ি জেলার প্রায় সকল অঞ্চলেই নীলচাষ হত। নীলচাষের ফলে খাদ্য উৎপাদন হ্রাস পায় কারণ ভালো ভালো জমিতে নীলচাষ করতে বাধ্য করা হত। চাষীরা নীলের ন্যায্য মূল্যও পেত না। ফলে কৃষকদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পড়ে।

১৮৭১ সালে রাজবাড়ি জেলায় রেললাইন স্থাপনের পর থেকে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক বিকাশের ধারা বদলাতে থাকে। এ সময়কালের একটি প্রামণ্য লেখচিত্র আমরা পাই আনন্দনাথ রায়, মীর মশাররফ হোসেন, কাঙ্গাল হরিনাথ, জলধর সেন, অক্ষয় কুমার মৈত্র, জগদীশ গুপ্ত, অমীয় ভূষণ মজুমদার, রওশন আলী, নজীরুদ্দিন, ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্যের লেখা থেকে।

আনন্দনাথ রায় ফরিদপুরের ইতিহাস গ্রন্থের ২৯ পৃষ্ঠায়---‘মধুখালি চন্দনা তীরে তামাক, লবণ, কামারখালি চন্দনা তীরে চাউল, সরিষা, খেসারী, জামালপুর চন্দনা তীরে তামাক। সেলিমাপুর, ধুনচি, আমবাড়িয়া, পাঁচুরিয়া, কানাইপুর প্রভৃতি অঞ্চলে বহু পরিমাণে বাণিজ্য দ্রব্য ক্রয়-বিক্রয় হয়। ফরিদপুর গুড় ও দেশী কাপড়ের জন্য; পাংশা ও বেলগাছি দেশী কাপড়, গামছা, ছিট প্রভৃতির জন্য প্রসিদ্ধ। গোয়ালন্দ পূর্ববঙ্গের বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থল, নানা স্থান হইতেই স্টিমারও নৌকা যোগে নানাবিধ জিনিষ এখানে উপস্থিত হইয়া বহু দূর দূরান্তে প্রেরিত হইয়া থাকে।

মীর মশাররফ হোসেনের সত্যকহন ও সত্যভাষণ তাঁর সাহিত্যের প্রধান উপাদান। দৈনন্দিন জীবনের কর্মঘটনা, আর্থিক ও সামাজিক অবস্থা থেকে শুরু করে জমিদার, ভাগদার, পত্তনিদার, দরপত্তনিদারের বলয়ে সমাজের নিপীড়ন, কলহ বিবাদসহ তৎকালীন সমাজ মানুষের বিশেষ করে মুসলিম সমাজের অধপতন, জীবনচার তাঁর সাহিত্যকর্মের দলিল হিসেবে স্বাক্ষ্য বহন করে। তাঁর জীবনকাল ১৮৪৮-১৯১১ খ্রি.। তার রচিত জমিদার দর্পণ, উদাসীন পথিকের মনের কথা, গৌড়ী সেতু, গাজী মিয়ার বস্তানী, টালা অভিনয়, আমার জীবন প্রভৃতি গ্রন্থে এ চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে এবং পূর্বাপর ঘটনাসমূহ বিবৃত হয়েছে তার গ্রন্থসমূহে।

সে সময় উন্নয়নের কোনো ছোঁয়া লাগেনি। অনাবাদী পতিত জমি ও বিল হাওড় পরিপূর্ণ ছিল অত্র এলাকা। নীলচাষের দৌরাত্বে মানুষের মেরুদন্ড ভেঙ্গে গেছে। নীলচাষের নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় নীল সাহেব, জমিদার লাঠিয়াল, দালাল ফড়িয়ার প্রভাবে কৃষক শ্রেণি সর্বশান্ত হয়ে পড়েছে। যাতায়াত শিক্ষা বলতে কিছুই ছিল না। মানুষ ছিল অশিক্ষিত, মূর্খ গোঁড়া, বিবেকবর্জিত। সাম্প্রদায়িকতার বেড়াজালে আটকে পড়েছে মানুষ। মুসলিম সম্প্রদায় বিশেষভাবে পিছিয়ে পড়েছে। ক্ষুধা, অনাহার দুর্ভিক্ষ, মহামারী, তাদের দৈনন্দিন  জীবনের সঙ্গী হয়ে ওঠে।

অর্থনীতি বিকাশের ক্ষেত্রে টাকার ব্যবহার অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আদিকালে টাকার ব্যবহার ছিল না। পণ্যের সাথে পণ্যের বিনিময় হত। মীরের সাহিত্যে টাকা ব্যবহারের উল্লেখ রয়েছে। টাকার অভাবের কথায় ফুটে উঠেছে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক জীবনের হাহাকার। গাজী মিয়ার বস্তানিতে তিনি বলেছেন------


হায়রে টাকা। কাটা মুণ্ডু ছাপাযুক্ত রুপার ক্ষুদ্র টাকা-তুমিই টাকা। ও টাকা তোমার মহিমা অপার অনন্ত। তুমিই ধর্ম, তুমিই কর্ম, তুমিই স্বর্গ, তুমিই নরক, তুমিই অপমান, তোমাতেই দয়া, মায়া, শত্রুতা, মিত্রতা, প্রণয়, বিচ্ছেদ, ভালোবাসা।

অর্থনীতি বিকাশে টাকার ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করলেও টাকা জমানোর সুযোগ থাকায় ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ে। ধনী ব্যক্তি মানসম্মানে সহায়সম্পদে সম্পদশালী ও সমাজে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তার সময় এ অঞ্চলের মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের সম্পদশালী হয়ে ওঠার চিত্র এবং তাদের শ্রেণি চরিত্রের বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। পদমদির নবাব মীর মোহাম্মদ আলীর বিলাসবহুল জীবনের চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। মীরের লেখা থেকে এ অঞ্চলের অর্থনীতির আরো ধারণা জন্মে যখন দেখি তিনি নিপুণ শিল্পীর মতো জীবনচিত্র তুলে ধরেছেন আমার জীবনী গ্রন্থে। মীরের জন্মস্থান কুষ্টিয়ার লাহিনীপাড়া। সেখান থেকে কুষ্টিয়ার রাজবাড়ির পদমদির দূরত্ব বড়জোর ২০/২৫ মাইল। পদমদির অদূরে সোনাপুর, বহরপুর, রামদিয়া, সেকাড়া প্রাচীন প্রসিদ্ধ এলাকা। লাহিনীপাড়ার অদূরে সাঁওতা, সাঁওতার পাশেই গড়াই। গড়াই পাড় হয়ে পাংশা এলে চন্দনা নদী এবং আরও পূর্বে এলে হড়াই নদী। আর এ সকল নদী প্রমত্ত পদ্মার পূর্বধারায় প্রবাহিত। এলাকাটির প্রাচীন নাম ‘গড় শ্রীখণ্ড’। এই গড় শ্রীখণ্ডের ধান, পাট, কাঠ, বাঁশ, বেত, খয়ের, পান, সুপারি, চিনি, কলাই, তিল, তিসি, কার্পাস, জাফরান, পিঁয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, শাক সবজী উৎপন্ন ফসল। বর্তমানেও সোনাপুরে অনেক খয়ের উৎপাদন কারখানা আছে।

 ১৮০০ শতকের মাঝামাঝি থেকে ঊনিশ শতকের মাঝামাঝিকালে কুষ্টিয়া, কুমারখালি, পদমদি, গোয়ালন্দকে কেন্দ্র করে অত্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও মানুষের চেতনার একটি চিত্র অঙ্কন করা যায়। এ সময়কালের মধ্যে ইংরেজ পরিচালিত রেশমকুঠি ও ৫১টি নীলকুঠির হেড অফিস ছিল কুমারখালিতে। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশগামী রেললাইন গড়াই নদী পাড় হয়ে গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। রাজবাড়ি অঞ্চলের রেলকে কেন্দ্র করে জীবনধারার পরিবর্তন শুরু হয়। এ অঞ্চলের মানুষের জীবন ও জীবিকার উদ্দেশ্যে তাদের ধর্ম, কর্ম, পাপ, পূণ্য, শিক্ষা, সংসার, সংঘাত, সংঘর্ষ বর্ণিত হয়েছে। তাঁর সাহিত্যকর্ম থেকে নদনদী, ভূমি, প্রাকৃতিক পরিবেশের উন্নয়ন সম্ভবনার নির্দেশনা পাওয়া যায়। মীরের লেখায়-----

মহামতি লর্ডসেও বড় লাট বাহাদুর গৌড়ী সেতু, গড়াই সেতু খুলিয়াছেন (১৮৭১) গৌড়ী সেতুবন্ধের সময়ে হিন্দু মুসলমান কেরানী, ড্রাপটসম্যান, ক্যাশিয়ার, বড়বাবু সাজিয়া রেলওয়ে কোম্পানির অধীনে কার্য করিতেন।। খাশ ইউরোপীয়ান অতি কম হইলেও ২০/২৫ জন দেশী, ফিরিঙ্গীও প্রায় ঐ পরিমাণ, নিগ্রহাবাস ১০/১২ জন/করনীদল ৭০/৮০ জন। অল্প অল্প ইংরেজি জানা লোকও ২০/২৫ জন। হাতি, ঘোড়া, বোট,  নৌকা, লঞ্চ, স্টিমার প্রচুর ছিল চট্রগ্রাম শ্রীহট্র প্রভৃতি স্থানের এবং দেশীয় কুলি, হিন্দু ও মুসলমান নির্ণয় করা কঠিন।

গড়াই সেতু নির্মাণ এবং গোয়ালন্দ পর্যন্ত রেলপথ স্থাপরেনর ফলে এ অঞ্চলের সাথে রাজধানী কলিকাতার যাতায়াত, পণ্য বহন, শিক্ষা সংস্কৃতির সম্পর্ক গড়ে ওঠায় মানুষের চিন্তা চেতনার বিকাশ ঘটতে থাকে। এ অঞ্চলের পাট, বেত, মাছ, গুড় ও অন্যান্য পণ্যের রপ্তানি বৃদ্ধি পায়।

তার ‘লেখা টালা’ অভিনয় এ অঞ্চলের মানুষের সামাজিক অবস্থার বিবরণ পাই ‘কাহারো পরনে ছেঁড়া তবন (লুঙ্গী), কাহারোও উলঙ্গ শরীর, কাহারও পরনে ছেঁড়া পাজামা, মলিন পিরহান (পোশাক), কাহারও ধুতি মলিন, ছেঁড়া ধুতি, খালি পা, কেহ অর্দ্ধ উলঙ্গ।’ মীর মশারফ হোসেনের সমকালীন আর এক তেজোদ্দীপ্ত পুরুষ কাঙ্গাল হরিনাথ। দরিদ্র বঞ্চনা আর আঘাতের কাছে মাথা নত করেননি। রাজবাড়ি, পাংশা, কুমারখালির সমতলে নির্ভিক বলিষ্ঠ পুরুষ। গ্রামবার্তা পত্রিকার সম্পাদক। ১৮৭২ সালে তিনি গ্রাম বার্তায় লিখেছেন---- জমিদারদের দ্বারা যত বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে রাজদ্বারে সম্মান লাভেচ্ছাই তার অধিকাংশের কারণ। মফস্বলের এক একজন দাতব্য ডিসপেনসারী ও বিদ্যালয় দিয়া আয়োজিত দেশের ভ্যাস্পাইয়ার বাদুরের ন্যায় রক্ত পান করেন।’


তাঁর সমকালীন অক্ষয় কুমার মৈত্র ও জলধর সেনের লেখাতেও এ অঞ্চলের আর্থ-সামাজিক অবস্থার বিষয় পাওয়া যায়। তৎকালীন সময়ে পাংশা থেকে প্রকাশিত কোহিনুর পত্রিকা সম্পাদনা করতেন রওশন আলী চৌধুরী। কোহিনুর পত্রিকাকে অবলম্বন করে যে লেখক সংঘ গড়ে ওঠে, তাদের লেখা থেকেও এ অঞ্চলের আর্থ সামাজিক অবস্থা বিবৃত হয়েছে।

পূর্বদেশগামী রেলপথ গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তৃত হওয়ার ফলে কুমারখালি, পাংশা, রাজবাড়ি, গোয়ালন্দ এলাকার মানুষের আর্থিক ও সামাজিক পরিবর্তন ঘটতে থাকে। গোয়ালন্দ ঘাটের স্টিমার, লঞ্চ, রেলগাড়ি তথা যাতায়াত কল্যাণে কয়লার ব্যবসাসহ মাছ, গুড় ও পাটের ব্যবসআর প্রসার ঘটে। নব্য ধনিক শ্রেণির উদ্ভব হয়। শ্রেণি বিশেষে তাদের নৈতিক স্খলনের বিষয় সাহিত্যিক জগদীশ গুপ্তের লেখাতেও পাওয়া যায়। রাজবাড়ি গোয়ালন্দের নিষিদ্ধপল্লীর বিস্তার এ সময়ের বিশেষ দৃষ্টান্ত। শ্রেণি বিশেষের ভোগবাদী চিত্র তার লেখা থেকে পাই। অন্যদিকে বেশির ভাগ মানুষের অনাহার, দারিদ্র, দুর্ভিক্ষের চিত্র তিনি এঁকেছেন। কলেরা, ম্যালেরিয়া, বসন্তের মতো মহামারীর অভিশাপ তার লেখায় ফুটে উঠেছে। ১৯২০-এর পর থেকে এ অঞ্চলের মানুষের কিছুটা হলেও চেতনায় সাড়া জেগেছে। এ প্রভাব গ্রামজীবনে লক্ষ্য করা গেছে। তাঁর পল্লীসমাজ উপন্যাসে দেখা যায়----‘গ্রামের নাম বেতডাঙ্গা (বেতেঙ্গা) নদীর নাম চন্দনা, হাটের নাম চম্মনার হাট। নদী ছোট, হাটে যারা আসে তারাও বৃহৎ নয়।’ তার পল্লীসমাজের এ কাহিনী বেতেঙ্গার মুদি দোকানের মালিক রামপ্রসাদের সংসারকে নিয়ে। যন্ত্রণার মধ্যেও বেঁচে থাকার যে কূটকৌশল মানুষ গ্রহণ করে তারেই প্রতিচ্ছবি যা তৎকালীন এ জেলার মানুষের দুঃখকষ্টের জীবনচিত্র। অমীয়ভূষণ মজুমদার বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের একজন শক্তিমান লেখক। গড় শ্রীখণ্ড তার বিখ্যাত উপন্যাস। গড় শ্রীখণ্ডের চিহ্নিত এলাকা গ্রন্থে নেই। তবে ভাষারীতিতে অনেকটাই বোঝা যায় উপন্যাসের পটভূমি অত্র এলাকা। ‘চাল আনবো পুলিশের তাড়া খেয়ে পালাইছি’ ‘কবনে এখন খাওয়া দাওয়া কর’। ‘কিছু একটা ব্যবস্থা হবি’ ‘কাল সকালে আসবি বোধ হয়’। ‘আনবো’ ‘আনবি’ ‘পালাইচি’ ‘কবনে’ ‘হবি’ এ অঞ্চলের কথ্যভাষা। প্রাচীনকালের ভূ-উত্থানগত বৈশিষ্টে কুমারখালি কুষ্টিয়া তথা পদ্মা গড়াইয়ের তটভূমির মধ্যবর্তী এলাকা শ্রীখণ্ড বলে পরিচিত। অমীয়ভূষণের লেখায় এ অঞ্চলেরই জেলে তাঁতী কৃষকের জীবনচিত্র পাওয়া যায়। ‘সেকালেই সেই ধনী কারিগর আর কুঠিয়াল দালাল থেকে নীলকর হয়ে পাটের সাহেবদের স্তর পর্যন্ত ক্রমশ ঋণ বেশি করে বাইরে গিয়েছে তাতে সন্দেহ নেই।’ তার এ লেখায় তথকালীন পুঁজি সঞ্চরণের চিত্র পাওয়া যায়। ‘এ দেশের চাষিরা রেড ইন্ডিয়ান নয় যে তাদের তাড়িয়ে নিয়ে গিয়ে খোঁয়াড়ে পুরে রেখে এসে শূন্য জমিতে কলের মই টানবে। ‘তার উদ্ধৃতি থেকে বুঝতে পারি এ দেশের মানুষের হাজার বছরের জীবন জীবিকার সংস্কৃতির ধারা রুখবার শক্তি কারো নেই। খণ্ডিতকালে তা সম্ভব হলেও দীর্ঘকালীন সময়ে তা স্থায়ী হবে না।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি কালজয়ী উপন্যাস। পদ্মা নদীর তীরবর্তী হয় দরিদ্র ও নিন্ম মধ্যবিত্তদের জীবন চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন। প্রথম মহাযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) এবং দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের (১৯৩৯-১৯৪৫) মধ্যবর্তীকাল বাংলায় নানা রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের কাল। এ সময়ে মানুষের ঔপনিবেশিক মুক্তিসহ সমাজকাঠামোর পরিবর্তনের ধারায় সমাজতান্ত্রিক তথা কমিউনিস্ট আন্দোলন সংগঠন গড়ে ওঠে। তৎকালীন সময়ে গোয়ালন্দ বাংলার দ্বারপথ। স্টিমার, রেল, লঞ্চ এবং ব্যবসায়িক কারণে গোয়ালন্দ কলিকাতা এবং ঢাকার সংযোগ দ্বারপথ হিসেবে সাহিত্যিক, লেখক, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের সমাবেশ ঘটে। গোয়ালন্দের পটভূমিতে অনেক ঘটনাই সংগঠিত হয়। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মানদীর মাঝি এ পটভুমিতে রচিত।

আবহমানকালের পদ্মার ঐতিহ্য ইলিশ বলতে পদ্মা যমুনার সঙ্গমস্থল গোয়ালন্দ ও আরিচা ঘাটের ইলিশকেই বোঝানো হয়। উপন্যাসের শুরুটাই গোয়ালন্দের ইলিশের কথা-------

দ্মার ইলিশ মাছ ধরার মরসুম চলিয়াছে। দিবারাত্রি কোনো সময়ই মাছ ধরার কামাই নেই। সন্ধ্যার সময় জাহাজ ঘাটে দাঁড়ালে দেখা যায় নদীর বুকে শত শত আলো অণির্বান জোনাকির মতো ঘুরিয়া বেড়াইতেছে। শহরে গ্রামে রেলস্টেশন ও জাহাজ ঘাটে শ্রান্ত মানুষ চোখ বুজিয়া ঘুমাইয়া পড়ে। নৌকার খোল ভরিয়া জমিতে থাকে মৃত সাদা ইলিশ মাছ।


এ উপন্যাসের প্রকাশকালে (১৯৩৬) কেতুপুর, দেবীগঞ্জ এ অঞ্চলের অবস্থিত স্থান যদিও বর্তমান নামকরণ ভিন্ন যেমন দেবীগঞ্জ ‘দেবগ্রাম’----

পদ্মা, পদ্মার খালগুলি ইহাদের অধিকাংশের উপজীবিকা। কেহ মাছ ধরে, কেহ মাঝিগিরি করে। কুবেরের মতো কেহ জাল ফেলিয়া বেড়ায় পদ্মার বুকে, কুড়োজাল লইয়া কেহ খালে দিন কাটায়। নৌকায় যাহারা মাঝি যাত্রী লইয়া মাছ বোঝাই দিয়া পদ্মায় তাহারা সুদীর্ঘ পাড়ি জমায়। ঋতুচক্রে সময় পাক খায়। পদ্মার ভাঙ্গন ধরা তীঁরে মাটি জমিতে থাকে। পদ্মার বুকে জল ভেদ করিয়া ওঠে চর। অর্ধ শতাব্দীর বিস্তীর্ণ চর পাথার জলে আবার বিলীন বিলীন হইয়া যায়। জেলে পাড়ার ঘরে শিশুর ক্রন্দন কোনো দিন বন্ধ হয়ে নাই।

পদ্মানদীর মাঝিতে পদ্মার পটভূমির জেলেদের কান্নাই কেবল তৎকালীন সমাজচিত্র নয়। এ চিত্র রাজবাড়ি জেলার সকল নিম্নবিত্ত দুঃখ দারিদ্রের চিত্র। চর অঞ্চলের মাঝি, চাষা, কুলি, মজুর যেমন, তেমনি অবস্থা রাজবাড়ির ভর অঞ্চলের ভাষা, মজুর, কুলি, কামার, কুমার, চামার, বাগদীদের।

বৃটিশ শাসনকালের মাঝামাঝি থেকে রেলপথ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, দাতব্য চিকিৎসালয় এবং নীলচাষের বন্ধের ফলে মানুষের আর্থিক সংগতির কিছুটা উন্নতি হতে থাকে। এ প্রসঙ্গে উইলিয়াম হান্টার এবং জেসি জ্যাকস তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় যে আর্থিক প্রসঙ্গ তুলে ধরেন তা থেকে এ অঞ্চলের আর্থিক অবস্থার কিছুটা আভাস পাওয়া যায়।

The cultivating classes who formed great much of the population are visibly are better off them informed year, and they are gradually acquiring as a last for the middle class of people however who live on fads salaries do not for well. The increased price of prosier Straitened their circumstance so that they are now said to live in hand and mouth (W.W. Hunter receded the malarial of the people of the Faridpur District in 1875)

১৯৪২-৪৩ এর টেস্ট ইনকুয়ারিতে দেখা যায় প্রতি কৃষক পরিবারের গড় সদস্য সংখ্যা ছিল ৮ জন। প্রতিটি কৃষক পরিবারের গড় ভূমির পরিমাণ ছিল ৩.৭ একর। মূল্য তালিকায় দেখা যায় ১৮৬৭ সালে প্রতি মণ ধানের দাম ছিল ২ টাকা যা ১৯৬৭ সালে হয় ৪০টাকা। ১০০ বছরে ২০ গুন দাম বেড়েছে। কৃষি ফসলের উৎপাদন কম। শতকরা ৯০% মানুষ কৃষক। পাট, ধান, সরিষা, আখ, অর্থকরী ও লাভজনক উৎপাদন। ঘর বাড়ি ছিল বাঁশের খুটিতে উপরে খড় ও ছনের ছাউনি। সাধারণ কৃষক পরিবার মাটিতে বিছানা পেতে শয়ন করে। অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল কৃষক পরিবার চৌকিতে শয়ন করে।

উৎপাদনমুখী কার্যক্রমে কৃষিখৃণ সহায়তায় ১৯০৬ সাল থেকে সমবায় আন্দোলন (Co-oparative monement) ওঠে। এ সময় ফরিদপুর জেলায় Co-operative Society গড়ে ওঠে। এরমধ্যে ‘কুরশী গ্রাম্য বায়তুল মাল’ এবং পাচুরিয়া গ্রাম্য বায়তুল মাল গোয়ালন্দ মহকুমায় স্থাপিত হয়। আর কেন্দ্র্রীয় সমবায় ব্যাংক (Central Co-operative Bank) হয় ফরিদপুর। গোয়ালন্দ, মাদারীপুর, এরমধ্যে গোয়ালন্দ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংক তুলনামূলক অগ্রগতি লাভ করে। সমবায় আন্দোলন পরবর্তীতে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ বিশেষ করে ষাটের দশকে সমবায় সমিতি ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তার লাভ করে। ১৯৭১ এর স্বাধীনতার পর থেকে সমবায় আন্দোলনটির গুরুত্ব হ্রাস পেতে থাকে। ধীরে ধীরে ঋণ প্রকল্পের স্থান করে নেয় ক্ষুদ্র ঋণ প্রতিষ্ঠান, কৃষি ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক এবং এনজিওসমূহ। বৃটিশ শাসনের মাঝামাঝি থেকে এ অঞ্চলের যাতায়াত ব্যাবস্থার উন্নতি ঘটতে থাকে। ১৮৭১ সালে পূর্বদেশগামী রেলপথ জগতি থেকে গোয়ালন্দ পর্যন্ত সম্প্রসারিত হয়। পদ্মায় গোয়ালন্দ থেকে নারায়নগঞ্জ সারাবছর স্টিমার সার্ভিস চালু থাকে। গোয়ালন্দ রেল সংযোগ থাকায় রাজধানী কলিকাতার সাথে সহজ যোগাযোগ বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া মটর লঞ্চে গোয়ালন্দ ঢাকা, গোয়ালন্দ দাউদকান্দি, গোয়ালন্দ চাঁদপুর যাতায়াত করে। গড়াই নদীতে কামারখালি লাঙ্গলবন্দ, কামারখালি কুষ্টিয়া চলাচল করে। জেলাটি নদীবেষ্টিত হওয়ায় নৌকা, বোট, পানশীতে চন্দনা নদীতে বালিয়াকান্দি পাংশা যাতায়াত করে।


যোগাযোগ সুবিধায় ১৯২৫ সালে দেখা যায় তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় ১৮টি পোস্ট অফিস ছিল। ১৯৬১ সালে ৫০টি সাব অফিস এবং ২৫৮টি ক্যাম্প অফিস থাকে। ১৯৬৮ সালে গোয়ালন্দ টেলিফোন এক্সেচেঞ্জ স্থাপিত হয়। এরমধ্যে পাবলিক কল অফিস থাকে গোয়ালন্দ, রাজবাড়ি ও খানখানাপুর।

আবহমানকালের কৃষি রাজবাড়ি জেলার জীবিকা। ফসলের মধ্যে পিঁয়াজ ও রসুন ও পিয়াজের বীজ (দানা) উৎপাদনে বাংলাদেশে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। এরপরই পাট। ১৮৬০ সালে নীলচাষ বন্ধ হবার পর এ অঞ্চলে পাটের চাষ শুরু হয়। তোষাপাট উন্নত জাতের। এ ছাড়া তিল, তিসি, সরিষা, বাদাম, মশুর, খেসারী, ছোলা উৎপাদিত হয়। খাদ্যফসল উৎপাদন আগে আউশ, আমন, বোরো জন্মাত। অঞ্চলটি পূর্ব থেকেই খাদ্যঘাটতি এলাকা। ফলফলাদির মধ্যে ডাব, নারকেল, তরমুজ, আম, জাম, কাঁঠাল প্রচুর ফলে। শাকসবজির মধ্যে ফুলকপি, টমোটো, লাউ, কুমড়া ফলে। এক সময় গোয়ালন্দের ১ মণি, দেড় মণি তরমুজের খুব সুনাম ছিল। কলিকাতা দিল্লীতে তরমুজ রপ্তানি হত। পানশুপারী খয়ের অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী ফসল। প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রাকৃতিক বীজ, লাঙ্গল, জোয়াল, মই, নিরানী, কোদাল, কাঁচি এবং গুরু টানা লাঙ্গল কৃষিকাজের বাহন ছিল। ১৯৬০ এরপর থেকে কৃষিতে যন্ত্রায়ণের ব্যবহার শুরুতে পাংশা এবং গোয়ালন্দ বিএডিসির অধীনে সিড মাল্টিপ্লিকেশন ফারম স্থাপিত হয়। পাংশা এসএস ফার্মের আয়তন ছিল ১০০,২৬ একর। এরমধ্যে ৪০ একরে ছিল আউশ উৎপাদন যার পরিমাণ ছিল গড়ে একর প্রতি ১৩.৩৬ মণ। ২০ একরে ইরি, একর প্রতি উৎপাদন ছিল ১৭.২৫ মণ। ১৬.৪০ একরে ইরি ১৭৬ উৎপাদন একর প্রতি ১৯.০৫ মণ এবং ১ একর ইরি ও বোরো যা উৎপাদন ছিল ২.৬ মণ। ৫ একরে পাট বীজ উৎপাদন ছিল ৬.৪০ মণ প্রতি একরে। ২ একর ছিল ধনচে বীজ উৎপাদন। উৎপাদন পরিমাণ ৫ মণ প্রতি একর। ৫২ একর ছিল গম উৎপাদন। প্রতি একরে উৎপাদন ১০.৪০ মণ। (ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৭)।

গবাদিপশু হালচাষ, দুধ ও গোস্তের জন্য অতি প্রয়োজন। রাজবাড়ি জেলার চরাঞ্চলসহ বিপুল পরিমাণ বিরাণভূমি গবাদী পশু পালনের উপযুক্ত থাকায় প্রচুর দুগ্ধ উৎপাদন হত। রাজবাড়ি দুগ্ধজাত মিষ্টি চমচমের খ্যাতি রয়েছে সারাদেশে। ১৯১০ সালের তথ্যে দেখা যায় ১৬০৪৪ জন দুগ্ধ উৎপাদন করতো এবং পরিমাণ ছিল ৫০৯ টন। ১৯৬৬ সালে কৃত্রিম প্রজনন কেন্দ্র ফরিদপুর প্রতিষ্ঠা পায় এবং গোয়ালন্দ সাব সেন্টার স্থাপিত হয়। গোয়ালন্দ মহকুমার রাজবাড়িতে ভেটেনারী হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় (১৯৬৪-৬৯)। বর্তমানে রাজবাড়ি জেলার পদ্মা নদী বাহিত অন্যান্য নদনদী খালবিল শুকিয়ে গেলেও অর্ধ শতাব্দী পূর্বেও তা ছিল কানায়-কানায় পূর্ণ। এ সব নদনদী খালবিলে প্রচুর মৎস্য পাওয়া যেত। ইলিশ, পাঙ্গাস, রুই, কাতল, মৃগেল, চিতল, কৈ, মাগুর, শোল, বোয়াল, গজার, পুঁটি, বাইন এ অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী মৎস্য সম্পাদ। পদ্মা, গড়াই, চন্দনা, হড়াই, কাজিয়াল, কুমার, ফুরসুলা, চিত্রা নদী আর চিতালিয়া বিল, গজারিয়া বিল, কাছুমিয়া বিল, মেঘনা বিল, ঘোড়ামারা বিলে প্রচুর মৎস্য সম্পদ ছিল। মৎস্য ধরার প্রধান কেন্দ্র ছিল গোয়ালন্দ ঘাট, রাজবাড়ি, কালুখালি, পাংশার মৃগী, বালিয়াকান্দি, নাড়ুয়া। মৎস্য অধিদপ্তর দ্বিতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৬০-৬৫) মৎস্য সম্পাদ উন্নয়নে রাজবাড়িতে মৎস্য খামার গড়ে তোলে। এ ফার্মের আয়তন ছিল ১০ একর। মৎস্য প্রতিপালন এবং মাছের পোনা উৎপাদন করা হত। তৃতীয় পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় (১৯৬৫-৭০) তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় কেবলমাত্র একটি ফার্ম ও তিনটি মৎস্য প্রতিপালন (নার্সারী) বালিয়াকান্দিতে স্থাপন করা হয়।

 ফরিদপুর জেলা সাধারণত কৃষিপ্রধান জেলা হিসেবে পরিচিত। এখানে শিল্পের বিকাশ তেমন ঘটেনি। প্রকাশিত ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৭ দেখা যায় ১৯৪০ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলায় শিল্পের মধ্যে ছিল জুট প্রসেসিং, জুট উইভিং, কটন উইভিং, মাদুর, বাস্কেট,  ইটখোলা এবং চিনি ও গুড় তৈরি কারখানা। LSSB Malley কর্তৃক প্রথম ১৯১৯ সালে ফরিদপুর গেজেটিয়ার প্রকাশিত হয়। তারপূর্বে ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টার ১৮৭৫ ও ১৮৭৭ সালে সকল জেলার তথ্য সম্বলিত ২০টি ভল্যুমে প্রকাশিত হয়। ম্যালের গেজেটিয়ারে দেখা যায়, তৎকালীন রাজবাড়ি অঞ্চলে কুঠির শিল্প হিসেবে বিড়ি শিল্পের বিকাশ ঘটে। মোটামুটি রাজবাড়ি অঞ্চলে শিল্প বিকাশে দেখা যায় বিশ শতকের মাঝামাঝি পূর্ব থেকে খানখানাপুরে জুট প্রসেসিং, সুতিবস্ত্র উৎপাদন, তাঁতশিল্পের বিকাশ ঘটেছে।


এ সব তাঁতে লুঙ্গী, গামছা, মশারি কাপড় তৈরি হত। তাঁতশিল্পীদের সাধারণভাবে কারিগর বলা হত। বর্তমানে তারা তাঁতী শিল্পী বলে পরিচিত। বালিয়াকান্দি রাজবাড়ি শহর-সহ রাজবাড়ির প্রত্যন্ত অঞ্চলে  এ শিল্পের বিকাশ ঘটে। এলাকায় বাঁশের আধিক্য থাকায় গ্রামাঞ্চলে ঝুড়ি, কুলা, চালুন, মাছ শিকারের যন্ত্র উৎপাদিত হতে থাকে। বেতের দ্বারা নানা ব্যবহার্য দ্রব্য যেমন ধামা, কাঠা, চেয়ার, মোড়া ইত্যাদি তৈরি হয়। পাংশায় ও বালিয়াকান্দিতে  এ শিল্পের স্থানীয়করণ ঘটে। রাজবাড়ি জেলার গুড়ের খ্যাতি রয়েছে। ‘নামে খায় বেলগাছির গুড়’ রাজবাড়ি জেলার প্রবাদ বাক্য। জেলায় প্রচুর পরিমাণে আখ উৎপাদিত হত। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের ১৮৭০ সালে A statistical Account of Bengal  থেকে জানা যায় রাজবাড়ি ও ফরিদপুরের গুড় দেশ বিখ্যাত।

জেলায় কামার দা, খুন্তা, কুড়াল, বিরানী, কাস্তে তৈরি করত। কুমারেরা মাটির বাসন শানকি, ঘট, বদনা, হাঁড়ি পাতিল বানাত। এ শিল্পটি এখন মৃতপ্রায়। নিন্মে রাজবাড়ি জেলায় গড়ে ওঠা শিল্পগুলি উল্লেখ করা হল।

এমএসআইস কোম্পানি লিঃ স্থাপিত ১৯৩০, উৎপাদন পরিমাণ ২৯০০ মণ। এসমএস পদ্মা আইসফ্যাক্টরি- স্থাপনকাল ১৯৩৬ মোট উৎপাদন ৩২৮৫০ মণ। ড্রাই আইস এন্ড কার্বলিক গ্যাস- স্থাপিত ১৯৩৭ উৎপাদন কার্বন গ্যাস ৩৬০ মণ। এমএস রাজবাড়ি ওয়েল মিল, স্থাপনকাল ১৯৫৭, তেল উৎপাদন ১৯৭০০ মণ। এমএস আনোয়ার সোপ ফ্যাক্টরি স্থাপনকাল ১৯৫৫ উৎপাদনে পাওয়ার স্টেশন বিনোদপুর ১৯৫৩।

ষাটের দশক থেকে রাজবাড়ি জেলায় বেকারী, আইসক্রীম, জুট বেইলিং, রাইস মিল, স-মিল, কাঠের আসবাবপত্র কারখানা, ইটভাটা, জুয়েলারি (পূর্ব থেকে), ঘড়ি মেরামত, বুক বাইডিং, হ্যান্ডলুম, টেইলারিং, ফটোগ্রাফি ইত্যাদি ক্ষুদ্রশিল্পের বিকাশ ঘটে।

 স্যার উইলিয়াম হান্টারের Statistical Account of Bengal ১৮৭৩ থেকে জানা যায়, গোয়ালন্দ মহকুমায় ১৮৬৭ সালে পদমদিতে ডিসপেন্সারি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং এটাই ছিল তৎকালীন ফরিদপুর জেলার একমাত্র দাতব্য চিকিৎসালয়। ১৯২০ সালে দুটি ক্যাম্প হাসপাতালে চিকিৎসা দেয়া হত। একটি ছিল গোয়ালন্দ ঘাটের ৫৪ বেডের এবং রাজবাড়ি ২১ বেডের। ম্যালেরিয়া, কলেরা, কালাজ্বর, টিবি, পক্সের প্রার্দুভাব ছিল বেশি। সে সময় ক্যান্সা রোগ দেখা যেত না। ১৯৪১ সালে ফরিদপুর জেলায় ক্যান্সারে মৃত্যুর রিপোর্ট নেই। তবে ১৯৬৩ সালে ৩০ জন মারা যায়। এ সময় থেকে ক্যান্সার বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে।

ম্যালেরিয়া রোগ নির্মূলের জন্য ম্যালরিয়া কন্ট্রোল স্কীমের আওতায় DDT ছিটানো কার্যক্রম চলে ১৯৪৯ পর্যন্ত। এরপরই এই Malaria Eradication Scheme বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগিতায় পরিচালিত হয়। কলেরা মহামারী আকারে দেখা দিত। ১৯৫৯-৬০ সালে ফরিদপুর জেলার ৭৪৪টি গ্রামে মহামারী দেখা দেয়। কলেরা নিরাময়ে নানা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

চিকিৎসাসেবা রাজবাড়িতে ১৮৭২ সালে মহকুমা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয় (বর্তমান এসপি সাহেবের বাসা) ১৯৬৯ সালে শহরের দক্ষিণে আধুনিক হাসপাতাল হিসেবে স্থানান্তর করা হয়। এ হাসপাতালে বেড সংখ্যা ছিল ৫০। ৩২ পুরুষ ১৮ মহিলা। বর্তমানে তা ১০০ শয্যায় উন্নীত হয়েছে। জেলার তৎকালীন স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানসমূহ----

(১) রাজবাড়ি মহকুমা হাসপাতাল স্থাপন ১ সেপ্টেম্বর ১৮৭২ (২) নলিয়াগ্রাম সরকারি আউটডোর ডিসপেনসারি, ১৯৪৯ (৩) রামদিয়া সরকারি আউটডোর ডিসপেনসারি,, ১৯৪৯ (৪) মৃগী সরকারি আউটডোর ডিসপেনসারি, ১৮৯৫ (৫) বসন্তপুর আউটডোর ডিসপেনসারি, ১৯৪৯ (৬) হাবাসপুর আউটডোর ডিসপেনসারি,  ১ ডিসেম্বর ১৯৬৪ (৭) পাংশা আউটডোর ডিসপেনসারি, ১৮৯৫ (৮) কসবামাঝাইল DECH, ১৯২১ (৯)  খানখানাপুর, ১৯২৬ (১০) শ্যামনগর, ১৯৪৬ (১১) আড়কান্দি, ১৯৪০ (১২) খানগঞ্জ, ১৯৪২ (১৩) বাণীবহ, ১৯২৩ (১৪) বরাট, ১৯২৬ (১৫) বহরপুর, ১৯৩৯ (১৬) চন্দনী, ১৯৪০ (১৭) মথুরাপুর, (১৮) রাজাপুর, ১৯৪০ (১৯) উজানচর, ১৯৪০ (২০) মুকুন্দিয়া, ১৯৩৮ (২১) জসাই, ১৯২৫ (২২) গোপালপুর, ১৯২৫ (২৩) বরাট, ১৯২৬ (২৪) সেনগ্রাম ১৯৪৯।


এছাড়া পাংশার গোপালপুরে জেলার একমাত্র সরকার পরিচালিত হোমিওপ্যাথী ডিসপেন্সারি ছিল। (তথ্যসূত্র ফরিদপুর গেজেটিয়ার ১৯৭৭ পৃষ্ঠা ২৫৭ ও ২৫৮) এই ডিসপেনসারির প্রথম হোমিও চিকিৎসক ছিলেন আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এর পিতা মরহুম ডা, একেএম ওয়াহেদ।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধে দেশের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙ্গে পড়ে। সরকারি নীতির আওতায় জেলার একমাত্র গোয়ালন্দ টেক্সটাইল মিলটি জাতীয়করণ করা হয়। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের প্রভাব রাজবাড়িতে প্রকটতর ছিল না। ১৯৮০ দশকের মাঝামাঝি থেকে জেলার উন্নয়নের ছাপ লক্ষ্য করা যায়। কৃষি অর্থনীতিতে আধুনিকায়ন ঘটে। ১৯৯০ সালের পর থেকে পোলট্রি শিল্পের বিকাশ ঘটে। বিসিক শিল্প নগরীতে রেশম শিল্প ব্যাপক সাড়া জাগায়। গ্রামীণ জীবনে আধুনিকতার ছোয়া লাগে। প্রায় ৪০% গ্রামে বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনা হয়। ফ্রিজ, টিভি অনেকের ঘরে পৌছে যায়। গড়ে উঠতে থাকে পাকা বাড়ি। জেলায় এখন ছনের ছাউনীর ঘরের দেখা যায় না। বিল বাওড় নেই বললেই চলে। প্রায় সর্বত্রই উচ্চ ফলনশীল শস্যের আবাদ। তবে খাদ্য ঘাটতি রয়েছে। রাজবাড়ি শহরের আমূল পরিবর্তন ঘটেছে। ১৯৮০ সালে যেখানে ২/৪টি বিল্ডিং ছিল এখন তার পরিমাণ কয়েক হাজার ছাড়িয়ে গেছে। সব মিলিয়ে জেলাটির আর্থিক বুনিয়াদ শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। রাজবাড়ি শহরের চমচম দেশ বিখ্যাত। নির্ম্মল সা (ভাদু সা), শংকর, কাদেরীয়া, লালমোহন তেওয়ারী ও আরো ১০/১২টি মিষ্টির দোকান থেকে প্রতিদিন ২৫/৩০ মণ চমচম ও অন্যান্য মিষ্টি ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রপ্তানি হয়। শত বছর পূর্বে পশ্চিম থেকে আগত একজন লালমোহন তেওয়ারী যে চমচম প্রস্তুত শুরু করেছিলেন তা আজ রাজবাড়ির ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। ড. দীনেশচন্দ্র সেনের বৃহৎবঙ্গ গ্রন্থটিতে নলিয়া জামালপুরে এক মণ/দেড় মণ ওজনের মিশ্রির রথ খাজা এবং রামদিয়ার রামের মটকার উল্লেখ আছে। পাংশার চানাচুর ঐতিহ্য বজায় রেখে চলেছে।

রাজবাড়ি জেলায় কয়েকটি পণ্যের মূল্যতালিকা-----

চাউল মোটা ২৮ টাকা থেকে ৩০ টাকা, চাউল চিকন ৩৮ টাকা থেকে ৪২ টাকা, ডাল মসুর ৯০ টাকা থেকে ১০৮ টাকা, তেল সোয়াবিন ৯০ টাকা, মাংস গরু ২৫০ টাকা কেজি প্রতি, মাংস খাসি ৩৫০ টাকা, মুরগি ব্রয়লার ১৩০ টাকা, মুরগি দেশী ২৬০ টাকা, চিনি ৬০ টাকা, মাছ----ইলিশ ৪০০ টাকা কেজি, রুই বড় ২৫০ টাকা পাঙ্গাস ৮৫ টাকা, লবণ ১৫ টাকা, আলু ১০ টাকা ১২ টাকা, পিঁয়াজ ২০ টাকা চমচম ১৬০ টাকা।

সুভাষ চন্দ্র কটন মিল

বৃটিশ ভারতের ক্ষণজন্মা পুরুষ নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু। রাজনৈতিক দর্শন রাজনীতির ব্যাখ্যা, রাজনীতির চর্চায় তিনি ভারতীয় উপ-মহাদেশের প্রবাদ পুরুষ। রাজনীতিতে নিজ দর্শনের আলোকে গড়ে তোলেন স্বরাজ আন্দোলন। ভারতবাসীর মুক্তির লক্ষ্যে রাজনৈতিক অধিকারের সাথে অর্থনৈতিক কাঠামো সৃষ্টি ছিল তার লক্ষ্য। নেতৃত্ব দেন রাজনীতিতে, নেতৃত্ব দেন অর্থনৈতিক সুবিধা লাভের। তাই সকলের নিকট পরিচিত হন নেতাজী হিসেবে। তার রাজনৈতিক দর্শনের আলোকে এবং স্বরাজ আন্দোলন বিস্তার লক্ষ্যে ১৯২৯/৩০ সালের দিকে সুভাষ চন্দ্র কটন মিল নামে একটি মিল রাজবাড়ি জেলার সূর্যনগরে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেন। রাজা সূর্যকুমারের পুত্র কুমার বাহাদুরের জমিদারীর সম্পত্তির উপর স্টেশনের উত্তর দিকে মিলটি উদ্ভোধন করা হয়। উদ্ভোধনকালে সেখানে উপস্থিত ছিলেন হুমায়ুন কবির, অম্বিকাচরণ মজুমদার, তমিজ উদ্দীন খান-সহ অনেক বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ। মিলটির স্থাপনা কাজ দীর্ঘদিন চলে কারণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে বৃটিশ ভারতে একাজ কঠিন ছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ আরম্ভ হলে মিলটির স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়া হয়। নেতাজীরও কোনো সংবাদ এরপরে পাওয়া যায়নি। মিলের ধবংসাবশেষ বিশ বছর পূর্বেও দেখা যেত।


গোয়ালন্দ টেক্সটাইল মিল

গোয়ালন্দ বিভিন্ন কারণে ঐতিহ্যবাহী স্থান। অনেক পূর্বে গোয়ালন্দের নিকটে কুশাহাটায় চিনি উৎপাদিত হত। গোয়ালন্দ এশিয়া মহাসড়কে ঢাকার মুখে অবস্থিত এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে ষাটের দশকের মাঝামাঝি গোয়ালন্দের ধনাঢ্য ব্যক্তি নিজামউদ্দিন আহম্মেদ গোয়ালন্দের মোড় বলে পরিচিত স্থানের দক্ষিণ পার্শে টেক্সটাইল মিল স্থাপনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা মাফিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। ইতিমধ্যে মুক্তিযু্দ্ধ শুরু হলে মিলটি উৎপাদনে যেতে পারে না। স্বাধীনতার পর মিলটিতে উৎপাদন শুরু হলে তৎকালীন সরকারের কলকারখানা রাষ্ট্রয়ত্ব করার নীতিতে মিলটি রাষ্ট্রয়ত্ব করা হয় এবং তা সরকারের নিয়ন্ত্রণধীন হয়। আশির দশকের প্রথম থেকে বিরাষ্ট্রীয়করণে প্রক্রিয়া শুরু হলে আশির দশকের মাঝামাঝি তা মূল মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। মিলটির উৎপাদিত সুতা উন্নতমানের। মিলটির আরম্ভকালে উৎপাদিত সুতা মিলগেটে ও স্থানীয়ভাবে বিক্রয় করা হত। বর্তমানে তা ঢাকা-নারায়ণগঞ্জে বিক্রয় করা হয়। এ কাঁচামাল হিসেবে তুলা পাকিস্তান ও মিশর থেকে আমদানী করা হয়। মিলটির কর্মচারীর সংখ্যা ছয়শতের উপর। মিলটি বর্তমানে সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হচ্ছে।

রাজবাড়ি ওয়েল মিল

রাজবাড়ি ওয়েল মিল স্থাপনসহ (১৯৫৫) রাজবাড়ি শহরভিত্তিক শিল্প বিকাশে একজন সফল উদ্যোক্তা হাজী গোলজার হোসেন। কুষ্টিয়ার অতিসাধারণ পরিবার থেকে আসা উদ্যোগী যুবক রেলের কয়লার ব্যবসার সুত্র ধরে রাজবাড়িতে আসেন। উল্লেখ্য রাজবাড়ি অনেক পূর্ব থেকেই মৎস্য ব্যবসার কারণে কিছু বরফকল স্থাপিত হয়। এরমধ্যে লোকোশেড বরফকল, পদ্মা আইস গোয়ালন্দ আইস, গোয়ালন্দ আইস ফ্যাক্টরি উল্লেখযোগ্য। এ সমস্ত বরফকলের, স্থাপনা ছিল লোকোসেড, হাজী মার্কেটে, হাজী গোলজার হোসেনের বাসার পাশে। উক্ত বরফকলগুলি ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৫০ সালের মধ্যে গড়ে ওঠে এবং এর পরিচালনায় থাকেন এছেম আলী বিশ্বাস, কাজী মোকারম হোসেন, মনমথনাথ সেন, হাজী গোলজার হোসেন প্রমুখ। হাজী গোলজার হোসেন নিজ উদ্যোগে একটি বরফকল স্থাপন করেন এবং মনমথনাথ পরিচালিত বরফকলটি ক্রয় করেন। হাজী গোলজার হোসেন পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগে স্থাপন করেন রাজবাড়ি শহরভিত্তিক বৃহত্তম শিল্প প্রতিষ্ঠান কাজলি ওয়েল মিল (১৯৫৫)। পরবর্তীতে এর নামকরণ হয়----রাজবাড়ি ওয়েল মিল। রাজবাড়ি, ফরিদপুর, কুষ্টিয়ার মধ্যে এ মিলটি উন্নত তৈল উৎপাদন প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পর এ মিলের উৎপাদিত সরিষা, তিল, তিষি, বাদাম তেল ফরিদপুর, কুষ্টিয়াসহ সারাদেশে রপ্তানি হয়। তাঁর পুত্র আলহাজ্ব দেলোয়ার হোসেন বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক।

রাজবাড়ির পোলট্রি শিল্প

পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত-সহ চীন, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে অনেক পূর্ব থেকেই ক্ষুদ্র শিল্প হিসেবে পোল্ট্রি শিল্পের বিকাশ ঘটলেও বাংলাদেশে এ শিল্পের প্রসার ঘটেছে অনেক পর বিশেষ করে ১৯৯০ সালের পর থেকে। রাজবাড়ি অবকাঠামোগত ভাবে শিল্প বিকাশের দাবিদার। রাজধানী ঢাকা শহর থেকে মাত্র আড়াই ঘন্টার পথ অতিক্রমণে প্রশস্ত পদ্মার খোলা বাতাসে রাজবাড়ির প্রবেশ পথ গোয়ালন্দ। রাজবাড়ির অবস্থান ঢাকার অদূরে উন্নত সড়ক সংযোগে অবস্থিত। দক্ষিণ বাংলার সাথে রয়েছে উন্নত সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা। রেলপথ, স্থলপথ, বিদ্যুতায়ন দক্ষ শ্রমিকের প্রাচুর্য ইত্যাদি কারণে রাজবাড়িকে শিল্প স্থাপনের স্পট হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সাভার, গাজীপুরে আশির দশক থেকে পোল্ট্র্রি শিল্পের বিকাশ ঘটে।


রাজবাড়িতে এ শিল্প স্থাপনে যারা বিশেষভাবে ভূমিকা রাখেন তাদের মধ্যে গোয়ালন্দের শেখ ইদ্রিস আলী অন্যতম। একটি দেশের শিল্পদোক্তা শ্রেণি দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখেন। এ শ্রেণি দেশের শাসন ও পরিকল্পনা প্রণয়নে সক্রীয় অংশগ্রহণ না করলেও শ্রম, মেধা আর অর্থ দিয়ে উৎপাদন, কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করে দেশ গড়ার উজ্জ্বল স্বপ্ন দেখায়। ইদ্রিস আলী শেখ রাজবাড়ি জেলার এমন এক স্বাপ্নিক যিনি আজীবন সাধনায় নিজের ভাগ্য খোলার চেষ্টায় খুলে দিয়েছেন রাজবাড়ির উন্নয়নের দ্বার। তার নিরলস প্রচেষ্টায় স্থাপন করেছেন দেশের বৃহত্তম পোল্ট্রি শিল্প গোয়ালন্দ হ্যাচারীজ। গোয়ালন্দ হ্যাচারীজের উৎপাদন ক্ষমতা ব্যাপক। সপ্তাহান্তে বাচ্চা বিক্রির পরিমাণ প্রায় ২০ হাজার যার আনুমানিক মূল্য ২৫,০০,০০০.০০ টাকা। এ শিল্পের উন্নতি দেখে অর্থনীতির ডিমোস্ট্রেশনের সূত্র ধরে গোয়ালন্দে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশ হ্যাচারীজ, পদ্মা হ্যাচারীজ, মডার্ন হ্যাচারীজ। জেলার অন্যান্য স্থানে তা ছড়িয়ে যাচ্ছে। ব্যাপকভাবে পোল্ট্রি শিল্প গড়ে উঠলেও স্থানীয়ভাবে বা বাংলাদেশে এর খাদ্য উৎপাদন না হওয়ায় খরচ বেশি হচ্ছে। মানুষের খাদ্যাভাস পরিবর্তন হয়েছে। ক্রয় ক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ স্বাস্থ্য সচেতন হওয়ায় ডিম ও গোশতের প্রতি তাদের ঝোঁক বেশি দেখা যাচ্ছে। এ শিল্পটির প্রতি সকল স্তরের মানুষের পৃষ্ঠপোষকতা থাকা উচিত। শুধু এর উপর ভিত্তি করেই রাজবাড়ির মানুষ ভাগ্যের আমূল পরিবর্তন করে দিতে পারবে। প্রয়োজন শুধু এর বিকাশ ও টিকিয়ে রাখার জন্য সকল স্তরের মানুষের নির্ভেজাল আন্তরিকতা।

ভিপিকেএ

রাজবাড়ি পূর্ব থেকেই অর্থনৈতিকভাবে অপেক্ষাকৃত পশ্চাৎপদ এলাকা। নদনদী পরিবেষ্টিত পলিমাটির প্রভাবে এলাকাটি উর্বর হলেও নদী ভাঙ্গন, বন্যা, খরা, সেচের অভাব শিক্ষার অভাব, অসচেতনতা এলাকাটিকে পিছিয়ে রাখে। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে এলাকার অবস্থার পরিবর্তন হতে থাকে। ক্ষুদ্র ঋণ ব্যবস্থার মাধ্যমে মানুষের অবস্থার পরিবর্তনে স্থানীয়ভিত্তিতে গড়ে ওঠে ভিপিকেএ বেসরকারি সংস্থা। এ সংস্থা প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান পর্যন্ত যিনি তার মেধা, শ্রম, অধ্যাবসায় এবং নিবেদিত প্রাণ কর্মি হিসেবে দেশের সেবা করে চলেছেন তিনি আঃ ছাত্তার। ২০/১২/৮১ তে জাহানারা বেগমের বাসায় আহম্মদ আলীর মৃধার পুত্র আহম্মেদ মর্তফার পৃষ্ঠৃপোষকতায় এ সংস্থাটি গড়ে ওঠে। বর্তমানে এ সংস্থা রাজবাড়ি জেলা ছাড়াও ফরিদপুর, শরিয়তপুর, ঢাকা, মাগুরা, দৌলতপুর প্রভৃতি স্থানে কাজ করছে। সংস্থাটি কর্মসংস্থানসহ উন্নয়ন চেতনায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

কেকেএস

মানবসেবার কৌশল বিভিন্নমুখী। রাজনীতিক, শিক্ষক, উদ্যোগক্তা বা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী মানবসেবার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। রাজবাড়ির বিশেষ এক ব্যক্তিত্ব ফকীর আব্দুল জব্বার। একাধারে রাজনীতিক, মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক ও উদ্যোক্তা হিসেবে মানব সেবায় উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তার অন্যান্য কর্মকাণ্ডসহ কেকেএস সংগঠনটি দেশের বর্তমান আর্থসামাজিক উন্নয়নে প্রশসংসার দাবিদার। দেশের আর্থসামাজিক উন্নয়নের স্বপ্নদ্রষ্টা নোবেল বিজয়ী মুহাম্মদ ইউনুসের মডেল আজ দেশ-বিদেশে খ্যাত। এমনি একটি মডেলের অনুসরণে ফকীর আব্দুল জব্বার তিলে তিলে নিজের শ্রম আর মেধা দিয়ে গড়ে তুলেছেন রাজবাড়ি কেকেএস প্রতিষ্ঠান। স্থানীয় ভিত্তিতে ১৯৮৫ সালে রাজবাড়ি জেলার ভূমিহীন, বিত্তহীন, নিম্ন আয়ের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নকল্পে সংস্থাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তিনি যেমন সৃষ্টি করেছেন শত শত কর্মহীন যুবকের কর্মসংস্থান তেমনি ঘুরিয়ে দিয়েছেন ভাগ্যহীন দরিদ্র মানুষের ভাগ্যের চাকা। প্রতিষ্ঠানটি জেলার আর্থিক উন্নয়নে আরো অনেককে উদ্বুদ্ধ করেছে এবং উন্নত প্রশাসনিক কাঠামোতে এর আকার আয়তন বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। ‘কর্মই মানুষের জীবন’------এ ব্রতই ফকীর আব্দুল জব্বারের।


রাজবাড়ি ড্রাইআইস ফ্যাক্টরি

রাজবাড়ি সরকারি কলেজের অর্ধকিলোমিটার পশ্চিমে রেললাইনের দক্ষিণ সংলগ্ন ড্রাই-আইস ফ্যাক্টরির স্থাপনা দশবছর পূর্বেও দেখা যেত। বর্তমানে এর অবশিষ্ট বলতে কিছু নেই। কেবল এলাকাটি ‘ডাইস (ড্রাই আইস থেকে মুখে মুখে ডাইস) বলে লোকমুখে প্রচলিত। ড্রাই-আইস ফ্যাক্টরির সাথে জড়িয়ে আছে ইতিহাসের নানা উপাদান। জনৈক জার্মান সাহেব (ল্যাংড়া সাহেব বলে পরিচিত) ১৯৩৭ সালে উক্ত ফ্যাক্টরি স্থাপন করেন। তিনি কোনো জাহাজ কোম্পানিতে চাকরিরত ছিলেন বলে জানা যায়। ইউরোপে তখন হিটলারের উত্থানের যুগ। উগ্র জাতীয়তাবাদী হিটলার ইউরোপসহ সারা বিশ্বে শক্তি বিস্তারের লক্ষ্যে তৎপর। এ সময় বৃটিশ ভারতে আধিপাত্য বিস্তারের লক্ষ্যে কৌশল হিসেবে ভারতের পশ্চিম প্রান্তের লাহোর এবং পূর্বপ্রান্ত সীমায় পূর্ববাংলার রাজবাড়িতে দুটি ফ্যাক্টরি স্থাপন করে। বিষয়টি বৃটিশদের দৃষ্টিগোচর হওয়ায় উৎপাদন শুরুর পূর্বেই ল্যাংড়া ল্যাংড়া সাহেবকে গ্রেপ্তার করা হয়। ১৯৩৯ সালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হলে ফ্যাক্টরি পরিত্যাক্ত অবস্থায় থেকে যায়।

ড্রাই-আইস মূলত শুষ্ক বরফ যা অগ্নি নির্বাপক, সোডা ওয়াটার, কোকাকোলা, ফানটার বুদবুদ সৃষ্টি ইত্যাদিতে ব্যবহার করা হয়। কয়লা পড়িয়ে কার্বন এবং ‍উক্ত কার্বনকে উচ্চ চাপ ও নিম্ন তাপমাত্রায় সিলিন্ডার ভর্তি হল ড্রাই আইস উৎপাদন ক্রিয়া। ১৯৪৮ সালে করম চাঁদ থাপা নামের এক ব্যবসায়ী সরকারের নিকট থেকে ফ্যাক্টরি ক্রয় করে ড্রাই-আইস উৎপাদন শুরু করেন। ১৯৬১ সালে গোলাম ফারুক উক্ত প্রতিষ্ঠান করম চাঁদ থাপার নিকট থেকে ক্রয় করে ইঞ্জিনিয়র সাঈদ উদ্দিন খানকে (দাদশী ইউনিয়নের প্রাক্তন চেয়ারম্যান আমবাবুর পিতা) ফ্যাক্টরি পরিচালনার ভার দেন। সে সময় শত শত সিলিন্ডার ভর্তি ড্রাই আইস ভারত পশ্চিমপাকিস্তানসহ বিদেশে রপ্তানি করা হত। স্বাধীনতার পর সরকার ফ্যাক্টরি অধিগ্রহণ করে। উৎপাদন বন্ধ থাকে। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশ অক্সিজেন কোম্পানির নিকট সরকার ফ্যাক্টরিটি বিক্রি করে। অক্সিজেন কোম্পানি ফ্যাক্টরিটি রাজবাড়ি থেকে স্থানান্তর করে। স্থানীয় অধিবাসীদের প্রতিবাদ ও বাধাসত্ত্বেও স্থানান্তর ঠেকানো সম্ভব হয়নি যেমন সম্ভব হয়নি বিনোদপুর পাওয়ার প্লান্ট স্থানান্তর। জাতীয় অর্থনীতির ধারায় রাজবাড়ি জেলা কতটা পিছিয়ে আছে? এ প্রশ্নের উত্তর অর্থনীতির জটিল চালকসমূহের বিশ্লেষণে নিহিত। জেলার কৃষি এবং ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ (পোলট্রি, হ্যাচারী বেকারি, মৎস্য খামার, বনায়ন, চানাচুর, মিষ্টান্ন উৎপাদন, তাঁতবস্ত্র, রেশম শিল্প, গো-খামার, দুগ্ধ উৎপাদন, ওয়েলডিং আসবাবপত্র উৎপাদন কারখানা, কবিরাজী ঔষধ উৎপাদন ইত্যাদি)। জাতীয় প্রবৃদ্ধির ৬% এর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। একমাত্র রাজবাড়ি শহর থেকে প্রতিদিন ২০/২২ মণ চমচম ও অন্যান্য মিষ্টান্ন দ্রব্য দেশের অন্যত্র রপ্তানি হয়। জেলার অবকাঠামোগত উন্নতি আশাপ্রদ। জেলার প্রায় অর্ধেক গ্রাম পাকা সড়ক সংযোগের আওতায় এসেছে। প্রায় ৪০ ভাগ গ্রামে বিদ্যুৎ সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। আবাসন অবস্থার অভাবনীয় উন্নতি ঘটেছে। জেলাশহরে যেখানে বিশ বছর পূর্বে ২/৪টি দোতলা ভবন ছিল সেখানে পাকা দালান ও দোতলা, তিনতলা ভবন সংখ্যা এক হাজার অতিক্রম করেছে। গ্রামাঞ্চলে খড়োঘর দেখা যায় না। পাকাবাড়ি-সহ সুদৃশ্য ইমারত গড়ে উঠেছে। মানুষ আত্মপত্যায়ী ও পরিশ্রমী হয়ে উঠেছে। চারটি উপজেলার দ্রুত শহর বিস্তৃতি ঘটেছে। জেলার গড়াই ও চন্দনা নদীকে খননের মাধ্যমে সেচ ও মৎস্য চাষের মাধ্যমে এর দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব। শিক্ষার বিস্তার দ্রুত ঘটছে। ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার ঘটছে। সাংস্কৃতিক সমৃদ্ধি উত্তম। সব মিলিয়ে জেলা আর্থিক বুনিয়াদ শক্ত অবস্থান গ্রহণ করেছে। সেনগ্রাম, জৌকুড়া, ধাওয়াপাড়া ঘাট, গোয়ালন্দ বাজার সংলগ্ন পদ্মার ভাঙন ভয়াবহ। মূল পদ্মা এখন রাজবাড়ি শহর থেকে মাত্র এক কি.মি. দূরে। চার পাঁচ বছরের মধ্যে ছিলিমপুর চর-সহ বিরাটায়তনের চর ভেঙে পদ্মা এখন শহর রক্ষা বাঁধে ঠেকেছে। ভাঙ্গন রোধ করা না গেলে শহর বিলুপ্ত হতে পারে। আমাদের স্বপ্নের শহর পদ্মারগর্ভে বিলীন হবে। শহর রক্ষায় সরকার নানা পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তবে সঠিক পরিকল্পনা ও উন্নত প্রযুক্তিতে বাঁধ নির্মাণ শহরবাসীর প্রত্যাশা।

সামষ্টিক অর্থনৈতিক চেতনায় জেলাটির অবস্থান পশ্চাতে ভাবা যায়। সহনীয় ও অসহনীয় মোট দারিদ্রের হার প্রায় ষাট ভাগ। এরমধ্যে অসহনীয় বা চরম দারিদ্রের মধ্যে ২৫ ভাগ লোকের বাস। বিগত শতকের শেষে শতকগুলোতে দারিদ্র ছিল ভয়াবহ। নব্বই দশক থেকে সরকার এবং বেসরকারি সংস্থার (এনজিও) উদ্যোগে দারিদ্র হার অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।


বর্তমানে জেলা ২৫ এর অধিক এনজিও দারিদ্র নিরসনে কাজ করছে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল-----ভলান্টারী কল্যাণ এ্যাসোসিয়েশন, (ভিপিকেএ), কর্মজীবী কল্যাণ সংস্থা (কেকেএস), রাজবাড়ি উন্নয়ন সংস্থা (রাস), সংযোগ, এনকেএস, ভোর্ড, ভিপি, এসডি, ধরনী, ভিএফডিএ আরপিভিএস প্রভা, পল্লীবাসী, টাস, নাসা, স্বচ্ছলতা, ব্রাস, প্রভৃতি।

ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসারসহ আর্থিক বুনিয়াদ গঠনে ব্যাংক ও বীমা পূর্বশর্ত হিসেবে কাজ করে। স্বাধীনতা উত্তরকালে, ন্যাশনাল ব্যাংক, মুসলিম কমার্শিয়াল ব্যাংক, ইউবিএল, কৃষি ব্যাংক কো-অপারেটিভ ব্যাংক নামে হাতেগোনা কয়েকটি ব্যাংক কাজ করত। বর্তমানে সোনালী, রুপালী, পূবালী, অগ্রণী, জনতা, উত্তরা, কৃষি ব্যাংক, ইসলামী ব্যাংক, গ্রামীণ ব্যাংক, ব্র্যক ব্যাংক-সহ জেলা-উপজেলা এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের হাটবাজারে অর্ধশতাধিক ব্যাংক কাজ করছে।

পণ্যের উৎপাদন ও বিপণন আর্থিক কর্মকাণ্ড প্রসারের শর্ত। এরজন্য গঞ্জ, বন্দর, হাটবাজার বিশেষ ভূমিকা পালন করে। তৎকালীন সময়ে গোয়ালন্দ সমগ্র বঙ্গের অন্যতম বন্দর বলে বিখ্যাত ছিল। গড়াই তীরে নাড়ুয়া, সমাধিনগর, কশবা মাঝাইল বন্দর হিসেবে বিবেচিত ছিল।

উল্লেখযোগ্য হাটবাজার

হাটের নাম                                    পণ্যের বেচাকেনা                          হাট বসে

রাজবাড়ি                     ধান, চাউল, পাট, তৈলবীজ, বাদাম, গরু, ছাগল        রবি ও বৃহস্পতিবার

কুটি পাঁচুরিয়া                পাট, ধান, ডাল, তৈলবীজ, পান-সুপারী, হলুদ, বাঁশ         মঙ্গল  ও শুক্রবার

খানখানাপুর                      পাট, ধান, ডাল, হাস-মুরগী, তৈলবীজ                    মঙ্গল ও শুক্রবার

বসন্তপুর                              ডাল, ধান, শাকসবজী                                 মঙ্গল ও শুক্রবার

রাজাপুর                              ডাল, তৈলবীজ, ধান, মাছ                            সোম ও বৃহস্পতিবার

বরাট                                 পাট, আখ, ধান, তরকারি                           সোম ও বৃহস্পতিবার

উড়াকান্দা                            ধান, মশুর, কলাই                                    মঙ্গল ও শুক্রবার

মাটিপাড়া                             ধান, মশুর, ছোলা, তরকারি                         শনি ও মঙ্গলবার

বাণীবহ                               তৈলবীজ, মশুর, কলাই, মাছ                         সোম ও শুক্রবার

কোলার হাট                          তৈলবীজ, ধান, মশুর, ছোলা                         শনি ও সোমবার

কুটির হাট                            ধান, চাউল, পাট, তৈলবীজ, বাঁশ                     শনি ও বুধবার

পাঁচুরিয়া হাট                         বাঁশ, ডাব-নারকেল, মশুর, কলাই                    মঙ্গল ও শুক্রবা


গোয়ালন্দ উপজেলা

গোয়ালন্দ                            ধান, পাট, ডাল, মাছ, পিঁয়াজ, রসুন, তৈলবীজ      প্রতিদিন 

উজানচর হাট                        ধান, পাট, ডাল, মাছ, পিঁয়াজ, রসুন                 শনি ও বুধবার

পাংশা উপজেলা

পাংশা হাট                           ধান, চাউল, পাট, তৈলবীজ, গুড়, গরু, ছাগল        রবি ও বুধবার

সেনগ্রাম                               ধান, চাউল, পাট, গুড় (আখ), ঘি                  সোম ও শুক্রবার

হাবাসপুর                              চাল, ডাল, গুড়                                       প্রতিদিন

বাগদুল হাট                            হাট ধান, পাট, গরু, ছাগল                          শনি ও মঙ্গলবার

মাছপাড়া                               ধান, পাট, গুড়, তৈলবীজ                            সোম ও শুক্রবার

নাড়িবাড়ি                              হাট ধান, পাট, গুরু, ছাগল                          শনি ও মঙ্গলবার

মেঘনা হাট                             ধান, চাউল, গুড়, সবজী                             শনি ও মঙ্গলবার

সাওরাইল হাট                          ধান, চাউল, গুড়, সবজী                          রবি ও বৃহস্পতিবার

বাংলাদেশ হাট                          ধান, পাট, পিঁয়াজ, রসুন                          সোম ও শুক্রবার

মৃগী হাট                                ধান, চাউল, পিঁয়াজ, রসুন, গুড়                  রবি ও বৃহস্পতিবার

বৃত্তিডাঙ্গা হাট                           পাট, ধান, তৈলবীজ                               সোম ও বৃহস্পতিবার

কালুখালি হাট                          গরু, ছাগল, পাট, ধান, পিঁয়াজ, রসুন, গুড়       বুধবার

বেলগাছি                              পাট, ধান, তৈলবীজ, গুড়, পিঁয়াজ               সোম ও শুক্রবার

বালিয়াকান্দি উপজেলা

বালিয়াকান্দি হাট                        ধান, পাট, গুড়, ডাউল                       রবি ও বৃহস্পতিবার

নাড়ুয়া হাট                             ধান, পাট, গুড়, পিঁয়াজ, রসুন, তৈলবীজ       সোম ও শুক্রবার

গাজনা হাট                             পাট, পাট, ধান, চাউল, তৈলবীজ               রবি ও বৃহস্পতিবার

বহরপুর হাট                           ধান, পাট, গুড়, পিঁয়াজ, রসুন, তৈলবীজ        রবি ও বৃহস্পতিবার

সমাধিনগর                               চাউল, ধান, পাট, ডাউল, বাঁশ                শনি ও বুধবার

জামালপুর হাট                            পাট, ধান, গুড়, মরিচ                         রবি ও বুধবার


সোনাপুর                                ধান, পাট, পিঁয়াজ, রসুন, গরু, ছাগল        রবি ও বৃহস্পতিবার

নটাপাড়া হাট                             ধান, পাট, গুড়, মাছ, তৈলবীজ               শনি ও সোমবার

বেরুলী হাট                               ধান, পাট, পিঁয়াজ, রসুন                     শুক্র ও সোমবার

নির্দিষ্ট দিনে হাটবার ছাড়াও এসব হাটে প্রতিদিন বাজার বসে।

জাতীয় অর্থনীতির প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় রাজবাড়ি জেলা খুব একটা পিছিয়ে আছে একথার বলার অবকাশ নেই। কৃষির আধুনিকায়ন, ক্ষুদ্র শিল্পের বিকাশ, স্বাস্থ্য, যাতায়াত,ব্যবসা, আবাসন প্রতিটি ক্ষেত্রে এর অগ্রগামীতা লক্ষণীয়। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে। দিনমজুর হার প্রতিদিন দুইশত টাকা। কাঠমিস্ত্রী, রাজমিস্ত্রী, রিকসা ভ্যানচালক, দৈনিক মজুর, গৃহপরিচারিকা প্রতিদিনই কাজে নিয়োজিত থাকে। সকল স্তরের মানুষের মধ্যে কর্মস্পৃহা লক্ষ্য করা যায়। তারা অলস জীবনযাপন করে না। তবে মধ্যবিত্ত শিক্ষিত শ্রেণির বেকারত্ব হতাশাব্যঞ্জক। তারাও এখন চাকরির পিছনে না ছুটে যে কোনো কাজে নিজেদের নিয়োজিত করছে। এটি ভালো লক্ষণ। মানুষই অর্থনীতির চালিকাশক্তি। মানুষ কর্মমূখর হলে উন্নয়ন তরান্বিত হয়। এগারলাখ মানুষ নিয়ে জেলাটির উন্নয়ন সেদিকেই ধাবিত হচ্ছে।

Additional information