ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান

 চতুর্দশ অধ্যায়

কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও লাইব্রেরি

একটি জাতি শক্ত শিরদাঁড়ায় দাঁড়াতে পারে একমাত্র শিক্ষাকে ভর করে। তাই শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড। উন্নয়নের সকল পূর্বশর্তের মধ্যে শিক্ষা অন্যতম। অরণ্যানীর যুগ থেকে যখন মানুষ মৃত্তিকার যুগে প্রবেশ করেছে তখন থেকেই উন্নয়ন কৌশল আয়ত্ত রাখার প্রয়োজনে অক্ষরজ্ঞানের অনুশীলনের প্রতি অগ্রগামী হয় এবং নগরায়নের যুগে এসে শিক্ষার প্রতি তীব্র আকাঙ্খা অনুভব করে। শিক্ষা ব্যতীত উন্নয়নের পথে অগ্রগামী হওয়া সম্ভব না, তা সকল জাতির মধ্যে সঞ্চারিত হয়। শিক্ষা থেকে যে জাতি যত দূরে রয়েছে সে জাতির উন্নয়ন তত শ্লথ। উন্নত জীবন বিকাশে শিক্ষার অত্যাবশ্যকতায় নিয়ন্ত্রিত, সুশৃংখল, প্রয়োজনীয় শিক্ষার নিমিত্তে গড়ে ওঠে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। তাই শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের গুরুত্ব অপরিসীম।

রাজবাড়ি সরকারি কলেজ

রাজবাড়ি সরকারি কলেজ রাজবাড়ি সরকারি কলেজ লাইব্রেরিরাজবাড়ি সরকারি কলেজ ভবনবৃটিশ শাসনের প্রায় ১০০ বৎসর পর থেকে এদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা কাঠামোগত রুপ নেয়। উচ্চ শিক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়টি কলকাতাকেন্দ্রীক থাকলেও সিপাহী বিদ্রোহের পর জমিদার শ্রেণির ‍পৃষ্ঠপোষকতায় উচ্চ শিক্ষার নিমিত্তে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে। রাজবাড়ি জেলার তৎকালীন জমিদার রাজা সূর্যকুমার ১৮৮৮ সালে স্থাপন করেন রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন (RSK)। পরবর্তীতে গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল, খানখানাপুর সুরাজ মোহিনী হাই স্কুল, পাংশা জর্জ হাই স্কুল, হাবাসপুর উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পায়। এ পর্যায়ে বিগত শতকের পঞ্চাশ দশকের শেষ পর্যন্ত বালিয়াকান্দি, মৃগী, সমাধিনগর, নাড়ুয়া, নলিয়া জামালপুর, রামদিয়া, বেলগাছি, রতনদিয়া, মাছপাড়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় গড়ে উঠলেও ১৯৬১ সালের পূর্ব পর্যন্ত জেলায় উচ্চ শিক্ষার নিমিত্তে কোনো কলেজ গড়ে ওঠেনি। রাজবাড়ি জেলা অবহেলিত অনুন্নত এলাকা বলে চিহ্নিত হলেও শিক্ষার প্রতি মানুষের আকঙক্ষা সকল সময়েই প্রবল ছিল। আর উচ্চ শিক্ষার তীব্র আকাঙক্ষায় তখন এ এলাকার বহু মেধাবী ছাত্র পার্শ্ববর্তী ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ, কুষ্টিয়া কলেজ, মাগুরা সোহরাওয়ার্দী কলেজ-সহ দেশের দূর-দুরান্তের কলেজে পড়তে যেত। বিষয়টি এলাকার মানুষের মনে তীব্রভাবে নাড়া দেয়। এ নিয়ে ভাবতে থাকেন এলাকার অনেক গণ্যমান্য ও বিত্তশালী ব্যক্তি। এ বিষয়ে কাজী হেদায়েত হোসেন, ডা. একেএম আসজাদ, ডা, এসএম ইয়াহিয়া, অমলকৃষ্ণ চক্রবর্তী, বৃন্দাবন দাস, ফজলুল হক মুক্তার, অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম মৃধা, অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল মিয়া, ডা. জলিলুর রহমান, মরগুব আহম্মেদ, ডা. আজাহার উদ্দিন, আঃ হানিফ মোল্লা (গোয়ালন্দ) বিশেষভাবে স্থানীয় পর্যায়ে কলেজ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এরমধ্যে রাজবাড়িতে মহকুমা প্রশাসক নিযুক্ত হয়ে আসেন কাজী আজহার আলী। কাজী আজহার আলী এমন একজন কর্মকর্তা যার ভাবনা যেন মানুষের কল্যাণ আর উন্নয়নকে নিয়ে। কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তিনি বিপুল উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসেন। উল্লেখ্য তখন কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ, সম্পত্তি, ছাত্র থেকে শুরু করে অনুমোদন পাওয়া ছিল এক দুরুহ ব্যাপার। তা সত্ত্বেও কাজী আজহার আলী স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিদের নিয়ে এগিয়ে আসেন কলেজ প্রতিষ্ঠাকল্পে। এ উদ্দেশ্যে কমিটি গঠিত হয়। কমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন কাজী আজহার আলী, সম্পাদক মামুনুর রশিদ (সেকেন্ড অফিসার), যুগ্ন সম্পাদক ডা. একেএম আসাজাদ, সদস্য ছিলেন কাজী হেদায়েত হোসেন, অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল মিয়া, অ্যাডভোকেট আবু হেনা, ফজলুল মুক্তার।


রাজবাড়ি সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রথম কমিটি

রাজবাড়ি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এলাকার জনগণের ভূমিকা স্মরণযোগ্য। যে যেভাবে পেরেছেন সে সেভাবেই কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এগিয়ে এসেছিলেন। অর্থ, জমি, জায়গীর, অনারারী সার্ভিস এমন কি মুষ্ঠি চাল দিয়েও কলেজ প্রতিষ্ঠা ক্ষেত্রে এলাকার জনগণ অবদান রেখে গেছেন।

রাজবাড়ি স্টেশন থেকে আধা কিলোমিটার পশ্চিমে ব্যাপ্টিস্ট মিশনের শত বৎসরের ঐতিহ্যবাহী দোতালা বিল্ডিং ৪৭ শতাংশ জমি-সহ ব্যাপ্টিস্ট মিশনের পক্ষে শিমশন চৌধুরী আতাইকোলা, গভর্নিং বোর্ডের পক্ষে রেজিস্ট্রি করে দেন। পরবর্তীতে আশে পাশের অনেক জমি ক্রয় ও দানের মাধ্যম বর্তমান কলেজের জমির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৪ একরের উপর। ১৯৬১ সালে ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর আযম খান। ১৯৬১ সালের ২৩ জুন কলেজ উদ্বোধন করেন তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক কাজী আজাহার আলী। প্রথম বৎসরে বর্তমান লাইব্রেরির সামনের চৌ-চালা টিনের ঘরটি ক্লাশ রুম হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং বর্তমান অধ্যাক্ষের কক্ষ এবং অফিস ভবনটিই অধ্যক্ষের কক্ষ এবং অফিস কক্ষ ছিল।

১৯৬১ সালে মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ খোলা হয় এবং ১৯৬২ সালে বিজ্ঞান বিভাগ খোলা হয়। ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত ক্লাস বিল্ডিং নির্মাণ না হওয়ায় এবং ছাত্র-ছাত্রীর চাপ বৃদ্ধি পাওয়ায় ১৯৬৩ সালে বর্তমান জেলা স্কুলে (তখন গোয়লন্দ মডেল হাই স্কুল) ক্লাস নেওয়া হত। কলেজ প্রতিষ্ঠালগ্নে বর্তমান সজ্জনকান্দা (কাজী বাড়ির পার্শে)। অধ্যাক্ষের জন্য বাসা হিসেবে প্রশাসন কর্তৃক গৃহীত হয়। এরমধ্যে অধ্যক্ষ নিযুক্ত হয়ে আসেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ওসমান গণি। বাংলাদেশে রয়েছে ছাত্র আন্দোলনের ঐতিহ্য। কলেজ প্রতিষ্ঠার পরপরই ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা পায়। ছাত্রলীগের নেতৃত্বে ছিলেন চিত্তরঞ্জন গুহ, লতিফ বিশ্বাস, নজিবর রহমান, আমজাদ হোসেন প্রমুখ। তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত ছিল। কলেজ প্রতিষ্ঠার পরে ছাত্র সংগঠনের পক্ষ থেকে শহীদ মিনার নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়।


এতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন চিত্তরঞ্জন গুহ, নজিবর রহমান, লতিফ বিশ্বাস, আমজাদ হোসেন-সহ রাজবাড়ি কলেজের অনেক ছাত্র-ছাত্রী। অনেক প্রতিবাদের মুখে ১৯৬২ সালে কলেজের সম্মুখে শহীদ মিনার নির্মাণ করা হয়। উল্লেখ্য উক্ত শহীদ মিনারই অতিতে  রাজবাড়ির কেন্দ্রী শহীদ মিনার। বর্তমানে শহীদ খুশী রেলওয়ে ময়দান রাজবাড়ির কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার। কলেজ প্রতিষ্ঠা লগ্ন থেকেই ছাত্র সংগঠনগুলি শক্তিশালী হতে থাকে। ১৯৬৩ সালের প্রথম নির্বাচনে ছাত্রলীগের পক্ষে চিত্তরঞ্জন গুহ ভিপি এবং আব্দুল লতিফ বিশ্বাস সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। পরবর্তীতে লতিফ বিশ্বাস, কাজী ইকবাল ফারুক, আনোয়ার হোসেন, গণেশ নারায়ণ চৌধুরী ষাটের দশকে ভিপি নির্বাচিত হন এবং নজিবর রহমান, ফকির আব্দুল জব্বার, রেজাউল হক রেজা সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ষাটের দশকেই ছাত্রলীগের পাশাপাশি ছাত্র ইউনিয়নের সংগঠন গড়ে ওঠে। ছাত্রইউনিয়নের নেতৃত্বে ছিলেন আমিনুর রহমান (পানু ভাই), আব্দুস সাত্তার, আবুল ফালা, আবুল হোসেন-সহ আরো অনেকে।

কলেজ প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই মেধাবী ছাত্র-ছাত্রী কলেজে ভর্তি হতে থাকে। তাদের মধ্যে আবুল কাশেম, আজাহার আলী শেখ, আমিনুর রহমান আবি, রাবেয়া খাতুন, মতিয়র রহমান, কাজী ইকবাল ফারুক, আবুল কালাম, নিত্যরঞ্জন ভট্রাচার্য, সুশিল কুমার বাড়ই, সত্যজিৎ ভদ্র-সহ আরো অনেকে। তৎকালীন সময়ে অধ্যক্ষ ওসমান গণি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সদ্য পাস করা মেধাবী ছাত্রদের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করতেন। তাদের মধ্যে আমিনুল ইসলাম পরবর্তীতে প্রেসিডেন্টের সেক্রেটারী, দীপক কুমার সাহা (অতিরিক্ত সচিব), মজিবর রহমান (নারকোটিস বিভাগে উচ্চপদে আসিন), প্রফেসর মজির উদ্দিন (রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক) প্রফেসর লুৎফর রহমান (অধ্যক্ষ অব.), প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান (অধ্যক্ষ অব.), প্রফেসর শংকর চন্দ্র সিনহা (অধ্যক্ষ অব.), প্রফেসর ড. ফকীর আব্দুর রশিদ (অধ্যক্ষ অব.), প্রফেসর নুরুল ইসলাম, প্রফেসর রস্তম আলী শিকদার (অধ্যক্ষ অব.), মোঃ নাসির হোসেন চৌধুরী বিশেষভাবে স্মরণীয়।

কলেজের ভালো ফলাফলের জন্য অল্প সময়ের মধ্যে ছাত্র-ছাত্রী সংখ্যা প্রায় (দুই) হাজারে পৌঁছায়। ১৯৬৬ সালে ওসমান গণি অধ্যক্ষের পদ থেকে ইস্তফা দিলে মিয়া মোহাম্মদ কায়েম উদ্দিন অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। তিনি ০১/০৩/৮০ সালে কলেজ সরকারিকরণ পর্যন্ত অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি স্নাতক বিজ্ঞান বিভাগ চালুসহ কলেজের সার্বিক উন্নয়নের মাধ্যমে কলেজটিকে শক্ত ভিতের উপর দাঁড় করান। এ কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ওসমান গণি, মোঃ মজিবর রহমান (ভারপ্রাপ্ত), মিয়া মোঃ কায়েম উদ্দিন, মোঃ মোতাহার হোসেন, বিধু ভুষণ চন্দ, প্রফেসর মোঃ এহিয়া ইসলাম মিয়া, প্রফেসর লুৎফর রহমান, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান, প্রফেসর ড. ফকীর আব্দুর রশীদ, মোঃ সাবদার হোসেন, প্রফেসর সাহ মুহম্মদ ফরহাদ, প্রফেসর মাহতাবুল ইসলাম, প্রফেসর হাফিজুর রহমান, প্রফেসর কেরামত আলী। উপাধ্যক্ষ হিসেবে কর্মরত ছিলেন অধ্যাপক লুৎফুর রহমান, অধ্যাপক হেদায়েত হোসেন, অধ্যাপক আকবর আলী মিয়া, অধ্যাপক সাবদার হোসেন, অধ্যাপক আকবর হোসেন। প্রফেসর আমানউল্লাহ বর্তমান অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োজিত আছেন। উপাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োজিত আছেন মোঃ ফকরুজ্জামান (সহযোগী অধ্যাপক)।

এ কলেজ থেকে জাতীয় শিক্ষা সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষকের মর্যাদা পেয়েছেন প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান (দুইবার), প্রফেসর তেজেন্দ্র কুমার চন্দ, সহযোগী অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র বসাক, প্রফেসর মতিয়র রহমান (তিনবার), প্রফেসর আকবর হোসেন, প্রফেসর নিত্যরঞ্জন ভট্রাচার্য। শ্রেষ্ঠ প্রতিষ্ঠান প্রধান (কলেজ) প্রফেসর এহিয়া ইসলাম মিয়া, প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান, প্রফেসর ড. ফকীর আব্দুর রশীদ, প্রফেসর সাবদার হোসেন। কলেজের সৃষ্টিলগ্ন থেকে আজ পর্যন্ত হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। কলেজের অগ্রগামী কর্মকাণ্ডের জন্য ১৯৯৬-৯৭ শিক্ষাবর্ষ হতে ক্রমান্বয়ে ১২টি বিষয়ে অনার্স খোলা হয়েছে এবং বর্তমানে কলেজটি মাস্টার্স কোর্স খোলা হয়েছে। আশা করা যায় অচিরেই কয়েকটি বিষয়ে মাস্টার্স কোর্স খোলা সম্ভব হবে। রাজবাড়ি কলেজটি জেলার একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান।


রাজবাড়ি সরকারি কলেজ ছাত্রসংসদে ভিপি, জিএস এবং বার্ষিকীসম্পাদক

 শিক্ষাবর্ষ                         ভিপি                          জিএস                    বার্ষিকী সম্পাদক

১৯৬৩-৬৪                  চিত্তরঞ্জন গুহ                  নাজিবর রহমান

১৯৬৪-৬৫                   আব্দুল লতিফ বিশ্বাস          নাজিবর রহমান

১৯৬৪-৬৬                  আব্দুল লতিফ বিশ্বাস          কাজি ইকবাল ফারুক

১৯৬৬-৬৭                  কাজী ইকবাল ফারুক         মোকছেদ আহম্মেদ

১৯৬৭-৬৮                  আনোয়ার হোসেন             ফকীর আঃ জব্বার

১৯৬৮-৬৯                 গনেশ নারায়ণ চৌধুরী         সহিদুল হক

১৯৬৯-৭০                  ফকির আঃ জব্বার             রেজাউল হক

১৯৭২-৭৩                   রেজাউল হক                    মোকছেদ আলী মণ্ডল

১৯৭৩-৭৪                  মোঃ মনিরুজ্জামান                আজিজুল হক

১৯৭৯-৮০                  কাজী আব্দুল মতিন              আব্দুল হামিদ

ভিপি ১৯৬৩-৬৪ হইতে ১৯৭৯-৮০

 


 

জি এস ১৯৬৩-৬৪ হইতে ১৯৭৯-৮০

ভিপি - জিএস

১৯৮০-৮১        আব্দুল হামিদ                   প্রভাত কুমার দাস

১৯৮৬-৮৭       আলতাব মাহমুদ পিয়াল        আইয়ুব আলী খান       আব্দুল কাদের মিয়া

১৯৮৮-৮৯       রেজাউল করিম রেজা         কামাল উ্দ্দিন মিয়া     কাজী আব্দুল জাহিদ লিপন

১৯৮৯-৯০       মোয়াজ্জেম হোসেন স্বপন        আশীষ কুমার সাহা

১৯৯০-৯১        গাজী আহসান হাবীব          মোঃ রফিকুল ইসলাম       কুদরত আলী খান জাকির

                                                                             (ভারপ্রাপ্ত), তুষার (নির্বাচিত)

১৯৯১-৯২        মোঃ রফিকুল ইসলাম         মোঃ আরব আলী মণ্ডল     নজরুল ইসলাম শিমুল

১৯৯৩-৯৪        সিরাজুল আলম চৌধুরী        নজরুল ইসলাম শিমুল     মোঃ শহিদুল ইসলাম শিমুল

১৯৯৪-৯৫        আব্দুল মালেক সিকদার        ভবতোষ চন্দ্র সরকার অভি মোঃ মোস্তফা কামাল সুমন


১৯৯৫-৯৬       মোঃ মহিউদ্দিন                 আব্দুর রাজ্জাক সরদার            আসাদুজ্জামান শামীম

১৯৯৭-৯৮       ফরিদুল ইসলাম ফরিদ          মোঃ কামরুজ্জামান দোলন           গোলাম মস্তফা

১৯৯৮-৯৯       মোঃ খায়রুল আনাম বকুল     জায়েদ আল কাউসার            মোঃ কামরুল হাসান

২০০১-০২         মোঃ রকিবুল হাসান পিয়াল     মোঃ নাসির উদ্দিন নাসির       গোলাম মোর্শেদ উজ্জল

২০০৪-০৫     মোঃ নাসির উদ্দিন নাসির     মোঃ আশরাফুল হাসান আশা    মোঃ আশরাফুজ্জামান (অনু)

 

ভিপি ১৯৮০-৮১ হইতে

সিরাজুল আলম চৌধুরী ভিপি ১৯৯৩-৯৪ রাজবাড়ি সরকারী কলেজ খায়রুল আনাম বকুল ভিপি ১৯৯৮-৯৯ রাজবাড়ি সরকারি কলেজ রাকিবুল হাসান পিয়াল ভিপি ২০০১-০২ রাজবাড়ি সরকারি কলেজ

 জি এস ১৯৮০-৮১ হইতে


জায়েদ আল কাউসার জি এস ১৯৯৮-৯৯ রাজবাড়ি সরকারি কলেজ আশরাফুল হাসান আশা জি এস ২০০৪-০৫ রাজবাড়ি সরকারি কলেজ

বার্ষিকী সম্পাদক ১৯৮০-৮১ হইতে


রাজা সূর্যকুমার ইনস্টটিউশন

রাজা সূর্য্যকুমার ই্নস্টেটিউশন ‘বেশ তো স্কুল কলেজে তালা লাগাইয়া চলিয়া যাও। আমি স্কুল করিয়াছিলাম যখন রাজবাড়ির চর্তুদিকে ২০ মাইলের মধ্যে কোনো স্কুল ছিল না একমাত্র ফুরিদপুর জেলা স্কুল ছাড়া। রাজবাড়তে মাত্র ঈশ্বর পণ্ডিতের পাঠশালা ছিল তাহাও ভালোরুপে চলিত না। আমি স্কুল করিবার ৫ বৎসর পর বাণীবহের বাবুরা স্কুল করিলেন গোয়ালন্দ হাইস্কুল। এখন আর আমার স্কুল করিবার কী প্রয়োজন ছিল? একথা স্বয়ং রাজা সূর্য কামারের যা ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য রচিত আমার স্মৃতিকথা গ্রন্থের ১৭ পৃষ্ঠায় লেখা আছে। ত্রৈলোক্যনাথ ১৯০২ সালে যখন আরএসকে স্কুলের প্রধান শিক্ষকের পদ ছেড়ে দিয়ে কানুনগো চাকরি নিতে মনস্থির করেন তখন একদিন পদ্মায় গ্রীনকেটে রাজার সাথে এভাবেই কথা হয়। এর পর ত্রৈলোক্যনাথ বিদ্যালয় ছেড়ে যাননি।

রাজা সূর্যকুমার অত্র অঞ্চলে উচ্চ শিক্ষা বিস্তারে ১৮৮৮ সালে রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন প্রতিষ্ঠা করেন। বর্তমান মূল ভবনের পশ্চিমপার্শে (নতুন ভবন যেখানে) টিন শেড নির্মিত স্কুল শুরু হয়। রাজা ৫,০০০ টাকায় মূল ভবনের কাজ শুরু করেন। তিনি জীবিত অবস্থায় মূল ভবনের প্লিন্থ গড়ে তোলেন। ১৯২৪ সালে প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথের উদ্যোগে স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র, উকিল, মোক্তার, জনসাধারণ বিশেষ করে রেলওয়ে কর্মীদের সাহায্য পান। ‘এসডিও সাহেবের সহিত ট্রলিতে গোয়ালন্দ ঘাট খানখানাপুর, পাঁচুরিয়া যাইয়া কিছু টাকা সংগ্রহ করা গেল (স্মৃতিকথা), পিডব্লিউ আই (রেলওয়ে) সম্পূরণ সিং লেবার ও ম্যাটেরিয়াল দেন। শিক্ষকগণ বেতনের টাকা থেকে চাঁদা ও ডোনেশনের ৫০০০.০০ টাকা সংগৃহীত হয়। এভাবে বিল্ডিং তৈরি হয়। কলিকাতা থেকে শ্বেত পাথর এনে দাতাদের নাম দেয়া হয়। আলহাজ্ব হাফিজ উদ্দিন আহমদ ১৯৬৫ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়ের অবকাঠামোর প্রভৃতি উন্নতি সাধিত হয়। হাফিজ উদ্দিন অবসরে গেলে আলহাজ্ব মোসলেম উদ্দিন খান প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। মোঃ মোসলেম উদ্দীন সাহেবের উদ্যোগে এবং সরকারি অনুদানে বিদ্যালয়টি মেরামত করা হয়। প্রাচীন মডেলের বিদ্যালয়টি জেলার ঐতিহ্য ধারণ করে আছে। বিদ্যালয়ের এককালের প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্যের নামসহ সকল প্রধান শিক্ষক এবং অন্যান্য শিক্ষকবৃন্দের প্রচেষ্টায় ফলাফল সব সময়েই ভালো। এ বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ করছেন বিখ্যাত সাহিত্যিক সন্তোষ কুমার, মেধাবী ছাত্র নেহাল উদ্দীন। শিক্ষকতা করেছেন এয়াকুব আলী চৌধুরীর মতো দেশের বিশিষ্ট সাহিত্যিক। বর্তমান প্রধান শিক্ষক মোঃ আমিনুল ইসলাম বিদ্যালয়ের সার্বিক উন্নয়নে নিবেদিত প্রাণ শিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন।

পাংশা কলেজ

রাজবাড়ি জেলায় বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, ভূগোল, সমাজবিজ্ঞান বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি পড়ার সুযোগ পাওয়া যায়। এ সুযোগটি কয়েক বৎসর পূর্বেও ছিল না। পাংশার কয়েকজন বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তির দ্বারা তা সম্ভব হয়েছে। ১৯৬৯ সালে ডা. একেএম আসজাদ, ডা. রহমত আলী, ডা. গহর উদ্দিন মণ্ডল, ডা. খোন্দকার নুরুল ইসলাম, ডা. মৃধা আব্দুল জলিল, ডা. রহমত আলী, ডা. হীরালাল আগারওয়ালা-সহ স্থানীয় বিদ্যোৎসাহী ব্যক্তিবর্গ ও জনগণের প্রচেষ্টায় গড়ে ওঠে পাংশা কলেজ। পরবর্তীতে ডা. একেএম আসজাদ, মোঃ জিল্লুল হাকিম, নাসিরুল হক সাবু, আব্দুল মতিন-সহ অনেকের প্রচেষ্টায় কলেজটি অগ্রগামী হতে থাকে।


প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই কলেজের অধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন মোঃ আরশাদ আলী। তিনি একাধারে ২০ বৎসর প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ হিসেবে স্থানীয় জনগণের সহায়তায় কলেজটিকে উন্নয়নের পথে এগিয়ে নেন। পরবর্তী অধ্যক্ষবৃন্দ অল্প সময়ের জন্য থাকেন। পাংশা কলেজের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক এবং উপাধ্যক্ষ এটিএম রফিকউদ্দিন বেশ কছিুকাল যাবৎ ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের পদে থেকে এর উন্নয়নকে অগ্রগামী করেছেন। পাংশা রাজবাড়ি জেলার বৃহত্তম উপজেলা এবং যাতায়াত উন্নত। কলেজটিতে মাস্টার্স খোলার ব্যাপারে অনেকেই উৎসাহী হন এবং এদের মধ্যে ডা. আসজাদ অন্যতম।

১৯৯৩ সাল থেকে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, সমাজ বিজ্ঞান, ভূগোল বিষয়ে মাস্টার্স খোলার কয়েক বৎসর পরই অনার্স খোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মোঃ জিল্লুল হাকিম, অধ্যক্ষ এটিএম রফিক উদ্দিন, কলেজের অন্যান্য শিক্ষকসহ সকলের প্রচেষ্টায় কলেজটিতে ১৯৯৮-৯৯ সেশন থেকে বাংলা, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, ব্যবস্থাপনা, গণিত, সমাজ বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্স খোলা হয়েছে। ছাত্র-ছাত্রীদের সংখ্যা আশানুরুপ এবং কলেজটির বোর্ড/বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষার ফলাফল সন্তোষজনক। কলেজটির অবকাঠামোগত অবস্থা, ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা, পরীক্ষার ফলাফল শিক্ষকবৃন্দের দক্ষতা সব মিলিয়ে তা সরকারি হওয়ার দাবিদার হলেও এ পর্যন্ত কলেজটিকে সরকারিকরণ করা হয় নাই। বেসরকারি কলেজ হয়েও অনেক বাধা বিপত্তিকে অতিক্রম করে পাংশা কলেজ এ জেলার উচ্চ শিক্ষার প্রসার ঘটিয়ে চলেছেন।

রাজবাড়ি সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় (জেলা স্কুল)

রাজবাড়ি জেলা স্কুলরাজবাড়ি সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয়ের পুরাতন বিল্ডিংটির গায়ে লেখা থেকে জানা যায় বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৯২ সাল। বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে মতভেদ রয়েছে। বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত চরিতাভিধানে ১৬৭ পৃষ্ঠায় দেখা যায় বিখ্যাত সাহিত্যিক ও সাংবাদিক জলধর সেন ১৮৮১ সালে গোয়ালন্দ হাই স্কুলে শিক্ষক নিযুক্ত হয়ে আসেন। শিক্ষকতাকালে স্ত্রী, কন্যা, মাতাকে হারিয়ে মনের প্রশান্তি লাভের জন্য তিনি হিমালয়ে যাত্রা করেন। তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে বর্তমান যেখানে রাজবাড়ি জেলা স্কুলের পুরনো দালান রয়েছে, সেখানে ছনের গৃহে গোয়ালন্দ এমই বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত ছিল। দোতলা পাকা দালান হওয়ার পর এর নামকরণ হয় গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল এবং এসময় দালানের গায়ে লেখা হয় এর প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৯২। প্রকৃত পক্ষে বিদ্যালয়টির সূচনা হয়েছিল অনেক পূর্বে সম্ভবত ১৮৭০ সালে। তখনও রাজবাড়ি নামটি মুখে মুখে থাকলেও লিখিতভাবে সবকিছু পরিচয় ছিল গোয়ালন্দ। সে হিসেবে বিদ্যালয়টির নামকরণ হয় গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুল। যা বাণীবহের জমিদার গিরিজাশংকর মজুমদার কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত। বিদ্যালয়টিতে শতবর্ষ পূর্তি অনুষ্ঠান অত্যন্ত জাঁকজমকের সাথে পালিত হয়। বিদ্যালয়টি এ অঞ্চলের অতি পুরাতন এবং ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এ বিদ্যালয়ে পাঠ গ্রহণ করেছেন দেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তি। ড. কাজী মোতাহার হোসেন এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন। তার জেষ্ঠ্য কন্যা তার নামে কয়েকবৎসর একটি বৃত্তি চালু রেখেছিলেন। এ বিদ্যালয় থেকে অনেক ছাত্র বোর্ডে বিভিন্ন সময়ে স্ট্যান্ড করে। ১৯৬৮ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ করা হয়। তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নূরুল হক সাহেবের নাম বিশেষভাবে স্মরণীয়। বিদ্যালয়ের পুরাতন ভবনটি এখন রাজবাড়ির কেবলই প্রাচীন ঐতিহ্যের বাহন। কালের বিবর্তনে হয়ত একদিন তাও বিলীন হয়ে যাবে, সে স্থানে নির্মিত হবে আগামী ইতিহাস রচনার নতুন ভবন। কালের গতিতে এমন করেই ইতিহাস বদলায়। ইতিহাস তার সিঁড়ি ভেঙ্গে ওপরে উঠতে থাকে। বর্তমান সৈয়দ সিদ্দিকুর রহমান বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত আছেন।

নাড়ুয়া লিয়াকত আলী মেমোরিয়াল হাই স্কুল

সে সময়ের খরস্রোতা গড়াই আর উত্তরপূর্ব থেকে প্রবাহিত চত্রা নদীর মিলনস্থল নাড়ুয়া বাজার। পশ্চিমে বাদশাডাঙ্গী, দক্ষিণে মদনডাঙ্গি, ডাঙ্গি, বিল এসব গ্রামের উৎপত্তি ইতিপূর্বে লেখা হয়েছে। অনুরুপ নাড়ুয়া নাওয়াড়া থেকে। নাওয়াড়া বিষয়েও বলা হয়েছে। এলাকাটি গড়াই, চত্রার পলিমাটির উর্বর জনপদ। এ অঞ্চলে উৎপাদিত পাট, পিঁয়াজ, রসুন, গুড় ব্যবসায়ের প্রধান কেন্দ্র নাড়ুয়া। উৎপাদিত পন্য গড়াই নদী পথে কামারখালি, খুলনা, কুষ্টিয়া, লাঙ্গলবাধ রপ্তানি হত। এলাকাটির আর্থিক সচ্ছলতা থাকা সত্ত্বেও বৃটিশ শাসনকালে উচ্চ শিক্ষার বিকাশ ঘটেনি। এলাকাটি রানী হর্ষমুখীর জমিদারীভুক্ত ছিল।


তিনি কলিকাতায় অবস্থান করায় এলাকার উন্নয়নের জন্য স্থানীয়ভাবে কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। বৃটিশ শাসন এবং জমিদারী প্রথার অবসানকালে ইসমাইল হোসেন মৃধা, আমির আলী মণ্ডল, ইয়ারউদ্দিন মুন্সী শাহাদত হোসেন, ডা. মমতাজ উদ্দিন, মোঃ মুনসুর আলী, পঞ্চানন সাহা, সূর্য সাহা অজিত কুমার সাহা (অপূর্ব কুমার এর বাবা) প্রমুখ ব্যক্তিবৃন্দের উদ্যোগে ১৯৫১ সালে নাড়ুয়া লিয়াকত আলী মেমোরিয়ল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয়ের নামকরণ বিষয়ে আলোচনা শেষে সদ্য প্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খানের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে নাড়ুয়া লিয়াকত আলী মেমোরিয়াল হাই স্কুল’ রাখার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। উল্লেখ্য লিয়াকত আলী খান ঐ বছরই মৃত্যুবরণ করেন। সুষ্ঠু পরিচালনা এবং শিক্ষকবৃন্দের আন্তরিক প্রচেষ্টায় স্বল্পসময়ের মধ্যে বিদ্যালয়টি সুনাম অর্জন করে। গোপীনাথ সাহা, আবদুল ওয়াজেদ একেএম শামসুদ্দোহা (বাবু স্যার), আজিজুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, প্রশান্ত কুমার প্রমুখ প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। মোঃ ফয়জুল্লাহ (প্রাক্তন সচিব), ডা. প্রশান্ত কুমার, প্রফেসর মতিয়র রহমান, তোফাজ্জল হোসেন (প্রকৌশলী ও সমাজসেবক), আকতারুজ্জামান খান (সমাজসেবক) ডা. আজিজুল ইসলাম, মোতাহার হোসেন (প্রকৌশলী), আবুল কাশেম প্রকৌশলীসহ অনেক উচ্চপদস্থ সরকারি, বেসরকারি কর্মকর্তা এ বিদ্যালয়ের ছাত্র। বিদ্যালয়টি বর্তমানে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে উন্নিত হয়েছে।

শিক্ষার হার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান একনজরে--------

২০০১ এর সেনসান অনুযায়ী রাজবাড়ি জেলার শিক্ষার হার (সাত বছরের উর্ধে) শতকরা ৪০-৪১। তবে শিক্ষার হার বৃদ্ধি শতকরা ২% ধরে বিগত দশ বছরের বৃদ্ধিতে বর্তমান প্রায় ৬০% যা জাতীয় ৬৭% এর সাথে সঙ্গতি পূর্ণ।

শিক্ষা প্রশিক্ষণ

সরকারি কলেজ----রাজবাড়ি সরকারি কলেজ, সরকারি আদর্শ মহিলা কলেজ। বেসরকারি কলেজ------২০টি, স্কুল এন্ড কলেজ ২টি, মাধ্যমিক বিদ্যালয় ১৪৪টি, কামিল মাদ্রাসা ৩টি, ফাজিল মাদ্রাসা ৮টি, আলিম মাদ্রাসা ৯টি, দাখিল মাদ্রাসা ৪৪টি, সরকারি ভোকেশনাল ১টি, বেসরকারি ভোকেশনাল ১টি, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ২৬৩টি, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ১৫৬টি, কিন্ডার গার্টেন ইংলিশ মিডিয়াম ২টি কিন্ডার গার্টেন সাধারণ প্রায় অর্ধশতাধিক।

উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি

গ্রন্থাগার সম্পর্কিত ধারণাটি অত্যন্ত প্রাচীন। প্রকৃতপক্ষে সভ্যতার জন্মলগ্ন থেকে গ্রন্থাগারের ভূমিকা অসামান্য। গ্রন্থাগার না থাকলে অতীতের অভিজ্ঞাতা ও জ্ঞানের ধারাবাহিকতা রক্ষিত হয় না। ফলে যখনই কোনো দেশে গ্রন্থগার বিলুপ্ত বা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তখনি সে দেশ শতবর্ষ পিছিয়ে গিয়েছে। বিভাগপূর্ব বাংলাদেশে সর্বপ্রথম মেদিনীপুরে ১৮৫১ সালে একটি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। মেদিনীপুর কালেক্ট্রয়েট বার্ষিক রিপোর্টের উপর তদানীন্তন বাংলার গভর্নর মন্তব্য করেন।’ মেদিনীপুরের সাধারণ গ্রন্থগার স্থাপনের উপকারিতা ২৩২-২৩৯ অনুচ্ছেদ হতে আভাস পাওয়া যায়। এই প্রস্তাব করা হইতেছে যে বড় বড় শহরে গ্রন্থাগার স্থাপনের প্রচেষ্ঠা করা হউক। উক্ত প্রস্তাব ১৮৫৪ সালে করা হয় যে কারণে, ঐ সালটি ইতিহাসের স্মরণীয় বছর।

ঐ বছরে বাংলাদেশের যশোর পাবলিক লাইব্রেরি, রংপুর পাবলিক লাইব্রেরি, বগুড়া উডবার্ণ পাবলিক লাইব্রেরি ও বরিশাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এ সময়ে গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেন স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ ও ইংরেজ সিভিল সার্ভেন্ট। লন্ডনে পাবলিক লাইব্রেরি এ্যাক্ট পাস হওয়ার পর তার প্রভাবে বিভাগপূর্ব বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলে ১৮৫১ সাল থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে অবিভক্ত বাংলায় প্রায় ৪০টি গণগ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠিত হয়।


এরমধ্যে পূর্ববাংলায় ১৩টি। এ অঞ্চলে ১৮৯১ সালে পাবনা পাবলিক লাইব্রেরি, ১৯০৭ সালে রামনারায়ণ সরকারি পাবলিক লাইব্রেরি (লোহাগড়া নড়াইল), ১৯১৪ সালে উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি, রাজবাড়ি। ১৯২০ সালে করোনেশান পাবলিক লাইব্রেরি, গোপালগঞ্জ প্রতিষ্ঠিত হয় (বাংলা সংস্কৃতির শতবর্ষ পৃষ্ঠা-৬৩৩)। উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি স্থানীয় সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিবর্গ এবং তৎকালীন ফরিদপুরের ম্যাজিস্ট্রেট স্যার জন শেফার্ড উডহেড এর উদ্যোগে গড়ে ওঠে এবং এর নামকরণ হয় উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি। টিনের চালাঘরে উডহেড লাইব্রেরির সাইনবোর্ড দেখা যেত। লাইব্রেরিটিতে অতি দুর্লভ পুস্তক--------The Historian's History of the world Eddited by Henry Smith Williums, published in 1907, পুস্তকের ৩০টি ভলিউম সযত্নে তাকে রক্ষিত আছে। মুকুন্দিয়ার জমিদার দ্বারকানাথ ঠাকুরের বাড়ির অনেক আসবাবপত্র মুক্তিযুদ্ধের সময়ে এখানে দেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালের দিকে একে ফজলুল হক উক্ত লাইব্রেরিটি পরিদর্শন করেন এবং পুস্তকের সংখ্যা সন্তোষজনক বলে মন্তব্য করেন। বর্তমানে পুস্তকের সংখ্যা ৭/৮ হাজার। উটহেড লাইব্রেরির চালাঘর পরিবর্তন হয়ে দোতালা বিল্ডিং হয়েছে। বদলে গেছে তার নাম। বর্তমানে তা ‘রাজবাড়ি পাবলিক লাইব্রেরি’ । আমাদের মন থেকে উডহেড লাইব্রেরির নাম মুছে গেলেও ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে যায় যায়নি। করুণাময় গোস্বামী সম্পাদিত বাংলা সংস্কৃতির শতবর্ষ গ্রন্থে ৬৩৩ পৃষ্ঠায় উজ্জ্বল অক্ষরে লেখা রয়েছে, ‘১৯১৪ উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি রাজবাড়ি, ফরিদপুর।’ বিগত ২৮/০৭/২০০৭ তারিখ পাবলিক লাইব্রেরিতে সোলার এনারজী বা সৌরশক্তিচালিত বিদ্যুৎ বাল্ব প্রজ্জ্বলন করেন সুফিয়া কামালের ছেলে ড. সাজিদ কামাল। শহরে সৌরশক্তির ব্যবহার এই প্রথম। প্লান্টের সমুদয় ব্যয়ভার বহন করেন ড. সাজিদ কামাল ও ড. সুলতানা আলম। বর্তমানে রাজবাড়িতে জেলা সরকারি গণগ্রন্থগার বিপুল আয়তনে গড়ে ওঠলেও প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী উডহেড লাইব্রেরি বর্তমানে পাবলিক লাইব্রেরি হিসেবে এর গুরুত্ব কম নয়। লাইব্রেরিটি নিম্নলিখিত কমিটি কর্তৃক কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি নীতিমালায় পরিচালিত হয়। লাইব্রেরিটি পূর্বে বৃটিশ কাউন্সিলের আওতাভুক্ত ছিল।

কমিটি

সভাপতি--------জেলা প্রশাসক (পদাধিকার বলে)

সহ-সভাপতি ----- অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুছ সালেহীন

সহ-সম্পাদক------- অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াজেদ বিশ্বাস

বর্তমান কর্মচারী সংখ্যা ৪ (চার) জন। এমদাদুল হক লাইব্রেরিয়ান, মোঃ বদিউল আলম বুলবুল সহকারী লাইব্রেরিয়ান। এর অর্থ বরাদ্দ আশানুরুপ নয়। কর্মচারীদের বেতন নাম মাত্র। শহরের কেন্দ্রস্থলে প্রশস্ত পাকা সড়কের পাশে অবস্থিত লাইব্রেরিটির পাঠকের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঐতিহ্যবাহী উডহেড পাবলিক লাইব্রেরিটিকে রাজবাড়ির ঐতিহ্য ভেবে এর কাঠামোগত ও গুণগত মান উন্নয়নে সচেষ্ট হওয়া সকলের কর্তব্য।

জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার

রাজবাড়ি শহরের ঈদগাহ ময়দানের পশ্চিমে রেলের ঐতিহ্যবাহী এইন সাহেবের বাংলোর দক্ষিণ পার্শে কোলাহল মুক্ত পরিবেশে রাজবাড়ি জেলা সরকারি গণগ্রন্থগার। ১৯৫৮ সালের ২২ মার্চ ঢাকায় এক বিশেষ সমাবেশে বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি উদ্বোধন করা হয়। তৎকালীন শিক্ষা কমিশনার বলেন ‘এই লাইব্রেরি কেবলমাত্র ঢাকার নাগরিকদের অধ্যয়নের সুযোগ দান করবে না বরং ইহা হইবে দেশের সকল লাইব্রেরির প্রাণকেন্দ্র।’ এরপর কিছু সংখ্যক বেসরকারি লাইব্রেরির পত্তন হয় মহকুমা ও থানা পর্যায়ে। পরবর্তীতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় লাইব্রেরি, ঢাকার কারিগরী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি, বাংলা একাডেমী, আনবিক শক্তি কেন্দ্র লাইব্রেরি, বরেন্দ্র রিসার্স লাইব্রেরি ও অন্যান্য লাইব্রেরি গড়ে ওঠে।


এই লাইব্রেরিগুলিকে কেন্দ্র করে গ্রন্থাগার আন্দোলন গড়ে উঠতে দেখা যায়। তবে তদানিন্তন পাকিস্তান আমলে লাইব্রেরি উন্নয়নের জন্য তেমন কিছু করা হয় নাই। ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ সরকার দেশের গ্রন্থাগার উন্নয়নের জন্য চিন্তা ভাবনা শুরু করে। লাইব্রেরি উন্নয়নের জন্য জরীপ পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ জন্য মিঃ স্টিফেন পার্কনর নামে জনৈক বৃটিশ লাইব্রেরিয়ানকে উপদেষ্টা নিয়োগ করা হয়। তিনি ১৯৭৮ ও ১৯৭৯ সালে প্রধানতঃ বৃটিশ কাউন্সিলের লাইব্রেরিয়ানদের সহায়তায় দেশের ১৭৬টি সাধারণ গ্রন্থাগার জরীপ করে সরকারের কাছে এর উন্নয়নের সুপারিশ পেশ করেন। রাজবাড়িতে উডহেড পাবলিক লাইব্রেরি পূর্বে বৃটিশ কাউন্সিলের আওতাভুক্ত থাকে। ১৯৮২ সালে রাজবাড়ি উডহেড লাইব্রেরির অস্তিত্ব ঠিক রেখে নতুনভাবে পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং উডহেড লাইব্রেরির দোতলায় কার্যক্রম শুরু হয়। ১৯৮২ সালের ১ সেপ্টম্বর সকল পাবলিক লাইব্রেরি কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরির সাথে অন্তর্লীন হয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে আসে। সারাদেশে ১০টি মডেল লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনায় এ অঞ্চলে রাজবাড়ি, শরিয়তপুর, মাগুরায় জেলা সরকারি গণগ্রন্থগার প্রতিষ্ঠা হয়। ১৩ মার্চ ১৯৯৫ সালে তৎকালীন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। অতপর ১৬ মার্চ ১৯৯৭ যুব ও সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গণগ্রন্থাগারের শুভ উদ্বোধন করেন। এ যাবতকালে লাইব্রেরি পরিচালনার ডিগ্রিধারী প্রফেশনাল লাইব্রেরিয়ান ছিল না। ১৯৯৮ সালের ১ মার্চ মোহাম্মদ হামিদুর রহমান বিএ অনার্স, এমএ (লাইব্রেরি এন্ড ইনফরমেশন সায়েন্স) লাইব্রেরিয়ান হিসেবে যোগদান করেন। বর্তমানে পুস্তকের সংখ্যা প্রায় ১৬ হাজার। ১৯৯৯/২০০০ অর্থবৎসরে অত্র গ্রন্থাগারে ৮ লক্ষ ২৫ হাজার টাকার পুস্তক ক্রয় করা হয়। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিং সকল স্তরের ছাত্রদের জন্য পাঠ্যপুস্তকের সুবিধা রয়েছে। প্রতিদিন (ছুটির দিনে বাদে) সকাল ১১টা থেকে গ্রন্থাগার খোলা থাকে। পাঠ্যপুস্তক ছাড়াও দৈনিক ১০টি, সাপ্তাহিক ৮টি, পাক্ষিক ৪টি, মাসিক ৮টি ত্রৈমাসিক ৩টি সাময়িক রাখা হয়। গ্রন্থাগারে ইতিমধ্যে কম্পিউটার নেটওয়ার্ক শুরু হয়েছে। গ্র্ন্থাগারটি জ্ঞান ভাণ্ডার হিসাবে রাজবাড়ি জেলার মানুষের অমূল্য সম্পদ।

 

 

 

 

Additional information