সংবাদ পত্র

ষোড়শ অধ্যায়

সংবাদ পত্র

তথ্যের আদান-প্রদান সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকাশের বাহন। সভ্যতা বিকাশের লক্ষ্যে তথ্যের আদান-প্রদান শুরু হয়েছিল হাঁটাপথে। এরপর পালের জাহাজ, ইঞ্জিনের গতি এর মাত্রা বৃদ্ধি করে। এখন আলোর গতির সমান দ্রুততায় তথ্যের আদান-প্রদান ঘটেছে। এক্ষেত্রে সুবিন্যস্ত তথ্যবিকাশে সংবাদপত্র অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছে। এ যুগেও এর গুরুত্ব কমেনি। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় জাতি রাষ্ট্রের রাজনীতি, অর্থনীতি, সাহিত্য, শিল্পের চালিকাশক্তি সংবাদপত্র। সংবাদপত্র প্রকাশের কাল সুপ্রাচীন। খ্রিস্টপূর্বের নিকটবর্তী ডাইআরনা (Acta Diurna) নামে জুলিয়াস সীজারের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রথম সংবাদ প্রকাশিত হয়। এ্যাকটা ডাইআরনা অর্থ দৈনিক ঘটনাপঞ্জি। এরপর অষ্টম শতকে তাও বংশের শাসনামলে চীন থেকে সংবাদপত্র প্রকাশিত হয়। সংবাদপত্রের দ্রুত বিকাশ বিকাশ ঘটে ১৪৪০ সালে গুটেনবার্গের মুদ্রাযন্ত্র আবিস্কারের পর থেকে। ইউরোপের আঁধার যুগের শেষে ১৬৬১ খ্রিস্টাব্দে দৈনিক ডুরান্ট সংবাদপত্র বিকাশের মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। বাংলাভাষায় মার্শম্যান ও কেরী সাহেবের উদ্যোগে ‘দর্পণ’ ও ‘দিকদর্শন’ ১৮১৮ সালে প্রকাশিত হয়।

১৮৩১ সালে ঈশ্বর গুপ্তের ‘সংবাদ প্রভাকর’ এবং ১৮৩৯ সালে তত্ত্ববোধিনী প্রকাশিত হয়। ১৮৩১ সালে শেখ অলিমউল্লা সম্পাদিত সমাচার সভা এবং মৌলবী রজব আলী সম্পাদিত ১৮৪৬ সালে ‘জগদুদ্দীপক’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

অঞ্চলভিত্তিক ১৮৫০ সালে কুমারখালি থেকে কাঙ্গাল হরিনাথ কতৃক ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’, ১৮৬১ সালে এলহাজ দাদ খান সম্পাদিত ফরিদপুর থেকে ‘ফরিদপুর দর্পণ’ ১৮৯০ সালে মীর মশাররফ হোসেন ও রওশন আলী চৌধুরীর সম্পদনায় কুষ্টিয়া থেকে ‘হিতকারী’ এবং ১৮৯৮ সালে পাংশা থেকে রওশন আলী চৌধুরী মাসিক ‘কোহিনূর’ পত্রিকা প্রকাশ করেন। ১৯৩৯ সালে খোন্দকার নাজির ‍উদ্দিন আহমেদের সম্পাদনায় পাংশা থেকে প্রকাশিত হয় খাতক। এরপূর্বে তিনি গুর্খা, কাঙ্গাল ও রায়ত নামে আরো তিনটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। রাজবাড়ি থেকে উনবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগে ‘সংসার’ ও ‘রাজবাড়ি পত্রিকা’ নামে দুটি পত্রিকা প্রকাশিত হয়।

`Saugsar and Rajbari Patrika both weekly Jounal appeared in the early part of the nineteenth century.' (Faridpur Gazatteer page-264)। ১৯৬৫ সালে রাজবাড়ি শহর থেকে মাসিক চন্দনা নামে একটি পত্রিকা প্রকাশিত হত। এসব প্রাচীন পত্রিকার মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য কোহিনুর খাতক ও চন্দনার পরিচয় তুলে ধরা হল।

কোহিনূর

বৃটিশ ভারতের প্রতিবাদী কংগ্রেস নেতা, অসহযোগ আন্দোলনের সংগঠক, অসাম্প্রদায়িক  চেতনার পৃষ্ঠপোষক, সমাজসেবক, পশ্চাৎপদ মুসলমান সমাজ জাগরণের প্রথম প্রকাশনা শুরু হয় ১৮৯৮ সালে জুন মাসে। এর প্রথম সংখ্যা কুমারখালির মথুরানাথ প্রেস থেকে প্রকাশিত হয়। এর প্রচার সংখ্যা ছিল তিনহাজার (সংবাদ পত্র ও সাংবাদিকতায় রাজবাড়ি জেলার অবদান-অধ্যাপক মোহাম্মদ আবুল হোসেন মল্লিক পৃষ্ঠা-২২)। কোহিনূর পত্রিকা তিন পর্যায়ে ১১ বছর প্রকাশিত হয়েছিল। বার্ষিক মূল্য ছিল দুই টাকা। এ পত্রিকার পরিচালনা পর্যদের পরিচালনা পর্যদের সদস্য ছিলেন তৎকালীন সমাজের বিবেক বলে পরিচিত মুন্সী মেহের উল্লা, কবি কায়কোবাদ, স্কুল পরিদর্শক আব্দুল করিম, আহমদী পত্রিকার সম্পাদক আব্দুল হামিদ ইউসুফী এবং ঐতিহাসিক নিখিলনাথ রায়। ৩০ থেকে ৪০ পৃষ্ঠার মধ্যে এ পত্রিকায় লিখতেন শ্রীযুক্ত গোপাল চন্দ্র সাহিত্যবিশারদ, কৃষ্ণগোপাল চক্রবর্তী, শশীভূষণ মজুমদার, শ্রীকান্ত মজুমদার, মুন্সি মোহাম্মদ রিয়াজ উদ্দিন আহম্মেদ, কবি কায়কোবাদ, কবি মোজাম্মেল হক, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ, শেখ ফজলুল করিম, সৈয়দ এমদাদ আলী, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, সতেন্দ্রনাথ দত্ত, মীর মশাররফ হোসেন, রওশন আলী চৌধুরী, এয়াকুব আলী চৌধুরী প্রমুখ। কোহিনুর ছিল মূলত সাহিত্য পত্রিকা। রওশন আলীর পর এ পত্রিকা প্রকাশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন অনুজ এয়াকুব আলী চৌ্ধুরী। তৎকালীন সময়ের সমাজচিন্তা, ইংরেজ শাসন, শোষণ, নির্যাতন, রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার, মুসলমান সমাজের পশ্চাৎদতা ইত্যাদি বিষয় প্রতিফলিত হত।

Additional information