স্মরণীয় যাঁরা

সপ্তদশ অধ্যায়

স্মরণীয় যাঁরা

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য

মনে পড়ে কোনো এক উপন্যাসে পড়েছিলাম শিক্ষক হল মানুষ গড়ার কারিগর। যখন স্নাতক শ্রেণিতে পড়ি, ইংরেজি পাঠে বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘Function of a teacher' এ পড়েছিলাম, Teacher is the guardian of civilization, archiect of nation. শিক্ষককে মানুষ গড়ার কারিগর (Technician- যান্ত্রিক, কুশল প্রকর্মী) বলে সবাই সম্বোধন করে কিন্তু জাতি গঠনের স্থপতি বলতে নারাজ। যে শিক্ষক অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে আলোর নেশায় মাতিয়ে তোলেন, জাতি গঠনের ভিত রচনা করেন, মানুষকে অগ্রচিন্তার নায়কে পরিণত করেন, তিনি কি কেবলিই একজন সাধারণ কুশলী? নাকি জাতির শ্রেষ্ঠতম উপাধি ধারণের অধিকর্তা? ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য তো নয়ই আমি কোনো শিক্ষককে মানুষ গড়ার কারিগর বলতে নারাজ। শব্দমানে তাঁদের ‘মানুষ গড়ার শিল্পী’ বলা যায়।

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ কেবল মানুষ গড়ার শিল্পী ছিলেন না, তিনি জাতি গঠনের স্থপতির দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন। অন্ধকারে জ্ঞানের আলো জ্বেলে উপনিবেশিক শাসন, শোষণ, বঞ্চনার মুক্তির পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন। সে সময় রাজবাড়ি জেলায় কোনো উচ্চ বিদ্যালয় ছিল না। রাজা সূর্যকুমারের হাতে গড়া আরএসকে ইনস্টিটিউশনের ছাত্র হিসেবে পাঁচ আর সহকারী ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে ৪২ বছর শিক্ষক হিসেবে এ জেলাতে বটেই তৎকালীন গোটা ভারতবর্ষে শিক্ষার আলো দান করেছেন। শিক্ষার ভিত রচনা করেছেন, জাতি ও জাতিত্ব বোধের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। কেবল বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা নয়, রাজা সূর্যকুমারের পরামর্শে নিজ উদ্যোগে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠানটির ভিত রচনা করেছেন, কলেবর বৃদ্ধি করেছেন, দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেব গড়ে তুলেছেন। কেবল আর এসকে ইনস্টিটিউশনই নয় প্রতিষ্ঠা করেছেন পাবনার সাড়া হাই স্কুল, রতনদিয়া হাই স্কুল। সে সব বিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৪ ও ১০ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর শিক্ষকতাকাল মোট ৫৮ বছর।

ত্রৈলোক্যনাথ ১৮৭৫ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার (বর্তমান রাজবাড়ি জেলা) বহরকালুখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রাণনাথ ভট্রাচর্য পরে রতনদিয়া এসে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। ১৮৮৫ সালে বোয়ালিয়া নিম্ন প্রাইমারি স্কুল হতে উত্তীর্ণ হয়ে ২ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এরপর উচ্চ প্রাইমারি ছাত্রবৃত্তি পরিক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজা সূর্যকুমার (আর এসকে) ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন এবং ১৮৯৪ সালে ঐ স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ঐ বছর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৫,৫০০ ছাত্র এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেয় যার মধ্যে ৩৯৩ জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয় (আমার স্মৃতিকথা পৃষ্ঠা-২)। উল্লেখ্য তিনি রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি থেকে উক্ত বিদ্যালয়ে পড়তেন। এন্ট্রান্স পাস করার পর তিনি কলিকাতা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানেও রাজা সূর্যকুমারের বাসায় থেকে তাঁর সাহচার্যে লেখাপড়া করেন। কলিকাতার মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) থেকে বিএ পাস করেন। অতঃপর জেনারেল এসেমব্লিজ (বর্তমান স্কটিশ চার্চস কলেজ) থেকে ইংলিশে এমএ পরীক্ষা দেওয়ার সময় গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখানেই শিক্ষা-জীবন শেষ হয়। ১৯০০ সালে তিনি প্রথমে ২৫০ টাকা বর্তমান মূল্যস্তরের তুলনায় অনেক টাকা। পঁচিশ পয়সায় এক হালি ইলিশ বা ৩ টাকায় ১ মণ চাল পাওয়া যেত। কিন্তু অর্থের চেয়ে সেবাই যার ব্রত, মানুষ তৈরির স্বপ্ন যার মনে, জাতি গঠনের ইচ্ছায় যিনি সদাতৎপর তিনি টাকার অঙ্কের চেয়ে সেবার মানের দাম বেশি ভেবে চাকরি ইস্তফা দিয়ে ৫০ টাকা বেতনে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ব্রতচারী শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেছেন, প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রায় ৫০ বছর ধরে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে দিকে দিকে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখেছেন।

Additional information