স্মরণীয় যাঁরা - পৃষ্ঠা নং-২

ছোটখাট গড়নের মানুষটি ছিলেন হালকা পাতলা। কিন্তু চোখের দিপ্তি ছিল প্রখর, ব্যক্তিত্বে অনড়, শব্দ ব্যবহারে সংযত, কর্তব্যে নিষ্ঠাবান। তাঁর তেজস্বীতায় ছাত্র ও শিক্ষক যেমন ভয় পেত তেমনি তাঁর নিরলস কর্তব্যকর্মের নিষ্ঠতায় তাকে ভক্তি করত। তাঁর সামনে বেয়াদবি করে এমন সাহস কোনো ছাত্রের ছিল না। ত্রৈলোক্যনাথ ছিলেন রাজা সূর্যকুমারের অতি স্নেহের ও আদরের পাত্র। সূর্যকুমার তাঁর হাতে গড়া বিদ্যালয়টির সমুদয় ভার ত্রৈলোক্যনাথের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথ রাজবাড়ি জেলায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম উচ্চ বিদ্যালয়টিকে মনের মতো করে গড়ে তোলেন। বিদ্যালয়ের ঘর, দালান, আসবাবপত্র, বোর্ডিং নির্মাণ করেন। এ বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে রাজবাড়িতে উচ্চ শিক্ষার সূচনা হয়। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত। প্রখাত সাহিত্যিক ও কলিকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ ঘোষ, সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী, সাহিত্যিক উপেন্দ্র চন্দ্র দাস, বিখ্যাত ‍উকিল লালন চন্দ্র ঘোষ, হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জীতেন্দ্র নাথ গুহসহ অনেক নামিদামি মানুষ আরএসকে এবং ত্রৈলোক্যনাথের ছাত্র। রাজবাড়ি শহরে অনেক প্রবীণ এ শিক্ষকের গুণের কথা বলেন। শিক্ষাকতার সফলতায় ১৯১১ সালে গভর্নমেন্ট হতে তিনি সার্টিফিকেট অব অনারপ্রাপ্ত হন ‘For good work as a Head Master and Honorary Magistrate'।

তিনি কেবল শিক্ষকই ছিলেন না। রাজবাড়ি শহর ও জনকল্যাণের প্রবাদ পুরুষ রাজা সূর্যকুমারের হাতে গড়া হাসপাতালের সেক্রেটারি, অনারারি ম্যাজিট্রেট, লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান, মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান, রাজবাড়ি জেল ভিজিটর, রাজার স্টেটের একজিকিউটিভ হিসেবে কাজ করেছেন। তখনকার দিনে রাজবাড়িতে ‘অনুশীলন সমিতি’ ‘নামে রাজনৈতিক সমিতি থাকলেও বিনোদন বা সেবামূলক কোনো সংঘ, সমিতি বা ক্লাব ছিল না। ত্রৈলোক্যনাথের উদ্যোগে ‘আমাদের সংঘ’ নামে একটি সংঘ গঠিত হয়। সমিতির মেম্বার ছিলেন ব্রজবন্ধু ভৌমিক (এসডিও গোয়ালন্দ), জীতেন্দ্রনাথ মিত্র (ইঞ্জিনিয়ার), যোগেন্দ্রনাথ দত্ত (সাব ইঞ্জিনিয়র) কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (স্টেশন মাস্টার), কুমুদিনী গাঙ্গুলী (হেড মাস্টার গোয়ালন্দ হাই স্কুল, (বর্তমান জেলা স্কুল), কালীকুমার দাস, (নায়েব জলকর) চন্দ্র বাবু (ডুগি তবলা, হারমোনিয়াম বাজিয়ে) প্রমুখ। রোগীর চিকিৎসা গরিব ছাত্রদের সাহায্য দান, সমাজসেবা কাজ সংঘের মাধ্যম করা হত।

ত্রৈলোক্যনাথ অগ্নিযুগের মানুষ। তখন অনুশীলন, স্বরাজ, অসহযোগ এবং বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের কাল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আন্দোলন তুঙ্গে। ত্রৈলোক্যনাথ কেবল এর সাঙ্গী নন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তা সমর্থন করেছেন, প্রয়োজনে সক্রিয় হয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ফরিদপুরের কংগ্রেস নেতা অম্বিকাচরণ মজুমদার ছিলেন অতি ঘনিষ্ঠজন। রাজনৈতিক মতাদর্শে তাঁরা ছিলেন অভিন্ন হৃদয়। তাঁর লেখা ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থটি অত্র অঞ্চলের নানা ঘটনার প্রামাণ্য দলিল। অনুশীলন, স্বদেশী, স্বরাজ, খেলাফত, অসহযোগ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, রেলপথ স্থাপন, রেল শ্রমিক আন্দোলনসহ নানা ঘটনা এবং ‘লক্ষীকোল রাজবাড়ি আশ্রয়লাভ’ ‘রাজা সূর্যকুমার গুহরায় গ্রীনবোটে সাক্ষাৎ’, ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন’, ‘রতনদিয়া গ্রাম’ আমার রাজবাড়ি স্কুলে শিক্ষকতা কালে’, ‘আমাদের সংঘ’, ‘রাজবাড়ি শহরে একটি মুসলমান সংঘ’, ‘ফেরিফান্ড রোড’, ‘মাদারীপুর রাজরাজেশ্বর’, ‘চাঁদ সওদাগরের ঢিবি’, ‘ভাগ্যবান মালো’, ‘রতনদিয়ার দুর্গোৎসব’, ‘রতনদিয়ার সাহিত্যিক’, ইত্যাদি বিষয়ে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন। শতবছর পরে লেখা রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস গ্রন্থখানা তাঁর লেখার উদ্ধৃতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। এ গ্রন্থটি হাতে না পেলে আমি রাজবাড়িবাসীকে অনেক ঘটনা বিশেষ করে রাজা সূর্যকুমারের বিষয়ে প্রামাণ্য লেখচিত্র তুলে ধরতে পারতাম না। তিনি কেবল ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থটিই লেখেননি তিনি ‘আনান্দবাজার’  ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় শিক্ষা, শিক্ষার অবনতি, শিক্ষকের দায় দায়িত্বের বিষয়ে নিয়মিত লিখতেন। কর্মঠ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কর্মই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। আর ছাত্র হেমচন্দ্র লিখেছেন, ‘তিনি যে কি প্রকার কর্মঠ ছিলেন তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। ক্ষণিকের নিমিত্তে তাকে বসিয়া গল্পগুজব অথবা আমোদ প্রমোদ করিয়া সময় কাটাইতে দেখা যায় নাই। কর্মই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তাঁহাকে প্রকৃতই কর্মবীর বলা যায়। তিনি ১৯৫৮ সালে রাজবাড়ি থেকে পশ্চিমবঙ্গে বরাহনগরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই জামাতা, দুটি কন্যা ও পুত্রবধূর অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি শোকে বিহবল বিদ্ধস্ততার মুখে পতিত হয়। পুত্র ধীরেন্দ্র (এসবি) চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করায় নিষ্ঠাবান পরিবারটি আর্থিক অসচ্ছলতায় পড়ে। সমাজ ও মানুষের জন্য তাঁর অবদান মূল্যায়নের ভাষা নেই। কেবল গ্রন্থের পাতায় তিনি শ্রেষ্ঠতম।

Additional information