স্মরণীয় যাঁরা - পৃষ্ঠা নং-১৫

অধ্যাপক আব্দুল গফুর ১৯২৯ সালে রাজবাড়ি জেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের দাদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোঃ হাবিল উদ্দিন মুন্সী ও মাতা শুকুরুন্নেসা খাতুন। পাবনা জেলার তামিলনগর জুনিয়র মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ফরিদপুর ময়েজ উদ্দিন হাই মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ফরিদপুর মাদ্রাসা থেকে ১৯৪৫ সালে বোর্ডের পরীক্ষায় ২য় স্থান অধিকার করেন। অতঃপর ঢাকা গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় নবম স্থান অধিকার করেন। এসময় তিনি পাকিস্তান আন্দোলন, সাংবাদিকতাসহ রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬২ সালে সমাজকল্যাণে কৃতিত্বের সাথে এমএ ডিগ্রি গ্রহণ করে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। অতঃপর ঢাকা আবুজর গিফারী কলেজে সমাজকল্যাণের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয়, কলামিস্ট হিসেবে অধ্যাপক আব্দুল গফুর অত্যন্ত পরিচিত নাম। সাংবাদিকতা দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু। ১৯৪৭ সালে পাক্ষিক ‘জেন্দেগী’ তে তিনি কাজ শুরু করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি সাপ্তাহিক সৈনিকে প্রথম সহ-সম্পাদক ও পরে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে মিল্লাত ও ১৯৪৮ সালে ‘দৈনিক নাজাত’ পত্রিকাতেও সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে দৈনিক আজাদের বার্তা সম্পাদক। ১৯৭২ সালে দৈনিক পিপলসের সহকারী সম্পাদক। ১৯৭৯-৯০ দৈনিক দেশ এর সহ-সম্পাদক। ১৯৮৬ সালে দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে উক্ত পত্রিকার ফিচার সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। তিনি এক সময় চট্রগ্রাম যুবকল্যাণ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯-৬০ পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সুপারিনটেনডেন্ট এর দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৮০-১৯৮৯ পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর প্রকাশনা পরিচালক ছিলেন।

অধ্যাপক আব্দুল গফুর ছাত্রজীবন থেকেই স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ। দেশের প্রতি অনুরক্ততায় মানুষ, শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি উজ্জীবন তাঁর আরাধ্য কাজ। তাই পাকিস্তানিরা যখন  এদেশের মানুষের সংস্কৃতি আর মাতৃভাষার প্রতি আঘাত হেনেছিল, অধ্যাপক গফুর তখন কেবল প্রতিবাদই করেননি, প্রত্যক্ষভাবে সে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, আন্দোলনকে বেগবান করেছেন, জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি সে পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্ট হন। মাতৃভাষার দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তুমদ্দুন মজলিশ গঠিত হলে তিনি দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তমুদ্দন মজলিশের সদস্য হিসেবে সার্বক্ষণিক নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। তমুদ্দন মজলিশেল মুখপত্র হিসেবে ১৫ নভেম্বর ১৯৪৮ এ সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হলে আব্দুল গফুরসহ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের একুশ ফেব্রুয়ারির মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে তিনমাস আত্মগোপনে কাটাতে হয়। ভাষা আন্দোলনসহ বাংলা ভাষার সাহিত্যচর্চা ও ভাষার উৎকর্ষতা সাধনে তাঁকে ২০০৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

তাঁর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশেরও বেশি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো-----

‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ইসলাম’, ‘বিপ্লবী ও ঘর’, ‘পাকিস্তানে ইসলামী আন্দোলন’, ‘কর্মবীর সোলায়মান’, ‘সমাজকল্যাণ পরিক্রমা’, ‘খোদার রাজ্য’, ‘কুরআনী সমাজের রুপরেখা’, ‘ইসলামের জীবন সৃষ্টি’, ‘শ্বাশত নবী’, ‘আসমান জমিনের মালিক’, ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম’, ‘স্বাধীনতার গল্প শোন’, ‘বাংলাদেশ ও আমার স্বাধীনতা’, ‘আমার কালের কথা’, ইত্যাদি।

তাঁর লেখা আমার কালের কথা গ্রন্থে রাজবাড়ি জেলার অনেক প্রামাণ্য চিত্র উঠে এসেছে। অধ্যাপক আব্দুল গফুর রাজবাড়ি জেলাবাসীর এক প্রিয় নাম।

Additional information