স্মরণীয় যাঁরা - পৃষ্ঠা নং-৩

মুহম্মদ তোফাজ্জল হোসেন

জেলা ও দায়রা জজ মুহম্মদ তোফাজ্জল হোসেন রাজবাড়ি জেলার মানুষের নিকট পরিচিত নাম। তিনি আপন কর্মগুণে রেখে গেছেন নানা স্মৃতি। সুনামের শিখরে তার অবস্থান। পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান। জাতীয় কর্তব্য পালনে সচেতন।

বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও ইসলামী আদর্শের অনুসারী মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন ১৯১৬ সালে রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার মুছিদাহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রাজবাড়ি আরএসকে ইনস্টিটিউট থেকে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পাশ করেন। এরপর কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ ও এলএলবি পাশ করে রাজবাড়ি কোর্টে ওকালতি শুরু করেন। অতঃপর তিনি বিচার বিভাগে চাকরি গ্রহণ করেন। তৎকালীন বিভিন্ন জেলা শহর এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচারিক দায়িত্ব পালনকারীকে সর্বোৎকৃষ্ট মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হতে হয়। তিনি এমন গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর গুণাগুণের পরিধি এতটাই বেশি ছিল যে সাধারণ মানুষের নিকট তিনি ওলিয়ে কামেল, সূফি, মুত্তাকীন, দরবেশ বলে পরিচিত ছিলেন।

তিনি জাতীয় নেতৃত্বের অনুসারী ছিলেন। বৃটিশ ভারতের শাসন, শোষণ, নিপীড়ন থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার মানসে জীবনের প্রথম অধ্যায়ে অসহযোগ, খেলাফত ও ফরায়েজী আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থক ও সহযোগী ছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পাকিস্তানের ভাবাদর্শের প্রতি অনুরক্ত থাকায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গোয়ালন্দ মহকুমা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক জীবনের অনুসারী। ফুরফুরা শরীফের বড়পীর আব্দুল হাই সাহেবের মুরীর। তিনি মুছিদাহ-বনগ্রামে ফুরফুরা সিলসিলা খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে দেশের আলেম সমাজ, বুজুর্গ, পীর, মাশায়েখদের প্রতি বছর ১৫ পৌষ ইছালে ছওয়াবের দিনে আগমন ঘটে। তিনি ছিলেন পুঁইজোর সিদ্দিকীয়া সিনিয়র মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। মুসলিম আইন, বৃটিশ আইন, হিন্দু আইন ও বিবিধ আইন বিষয়ে ছিলেন সুপণ্ডিত। বিভিন্নক্ষেত্রে আইনের অসঙ্গতি তুলে ধরে সংশোধনের সুপারিশ করতেন। তিনি ১৭টি জেলায় বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন। সদালাপী, মিষ্ট অথচ স্বল্পভাষী এই মহৎ ব্যক্তি ১৯৮৬ সালে শাহাদৎ বরণ করেন।

কেতাব উদ্দিন আহমেদ ও বেগম রাবেয়া আহমেদ

আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্র। সূর্যনগর থেকে ট্রেনে এসে কলেজে ক্লাস করতে হয়। একদিনের স্মৃতি এখনো মনে ভাসে। ট্রেন থেকে নেমেছি। সামনে একজন ষাটোর্ধ মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন। ডান হাতে ভারি একটা চটের ব্যাগ। বাম হাতে কয়েক জোড়া নারকেল। ব্যক্তিত্ববান পুরুষের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হল। কিন্তু চিনতে পারলাম না। পরে কে যেন বলল ঐ লোকটি প্রিন্সিপ্যাল কেতাব উদ্দিন। কেতাব উদ্দিন স্যার যে গ্রামের মানুষ সে গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামের দূরত্ব বড়জোর ৮ কিমি। ফলে জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে কতবার যে এ নামটি এলাকার মানুষের মুখে শুনেছি তার অন্ত নেই। কিন্তু তিনি ময়মনসিংহে চাকরি করেন। মাঝেমধ্যে নিজ গ্রাম নিশ্চিন্তপুর আসেন। এছাড়া আমার ঐ বয়সে তাঁর মতো মানুষের সাথে কথা বলাটাও সাহসের ব্যাপার। এখন প্রায় প্রতি গ্রামেই ২/৪ জন এমএ পাস লোক পাওয়া যায়। বেশি দিনের কথা নয়, এই ষাটের দশকেও রাজবাড়ি জেলায় (তখন গোয়ালন্দ মহকুমা) এমএ পাশের সংখ্যা ৪/৫ জনের বেশি ছিল না। বালিয়াকান্দি উপজেলায় কেতাব উদ্দিন স্যার এমএ পাস করেন এরপর প্রায় চল্লিশ বছর ঐ উপজেলায় অন্য কেউ এমএ পাস করেননি। আমি ১৯৬৯-এ এমএ পাশ করি। আমার স্থান ঐ উপজেলায় সম্ভবত চতুর্থ কিম্বা পঞ্চম হবে। কেতাব উদ্দিন আহমেদ বালিয়াকান্দি উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে এক বধিষ্ণু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং প্রতিবাদী। দর্শন শাস্ত্রে তিনি ফার্স্ট ক্লাস পান। তাঁর নীতিবোধ ছিল প্রখর।

Additional information