স্মরণীয় যাঁরা

সপ্তদশ অধ্যায়

স্মরণীয় যাঁরা

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য

মনে পড়ে কোনো এক উপন্যাসে পড়েছিলাম শিক্ষক হল মানুষ গড়ার কারিগর। যখন স্নাতক শ্রেণিতে পড়ি, ইংরেজি পাঠে বার্ট্রান্ড রাসেলের ‘Function of a teacher' এ পড়েছিলাম, Teacher is the guardian of civilization, archiect of nation. শিক্ষককে মানুষ গড়ার কারিগর (Technician- যান্ত্রিক, কুশল প্রকর্মী) বলে সবাই সম্বোধন করে কিন্তু জাতি গঠনের স্থপতি বলতে নারাজ। যে শিক্ষক অজ্ঞানতার অন্ধকার দূর করে আলোর নেশায় মাতিয়ে তোলেন, জাতি গঠনের ভিত রচনা করেন, মানুষকে অগ্রচিন্তার নায়কে পরিণত করেন, তিনি কি কেবলিই একজন সাধারণ কুশলী? নাকি জাতির শ্রেষ্ঠতম উপাধি ধারণের অধিকর্তা? ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য তো নয়ই আমি কোনো শিক্ষককে মানুষ গড়ার কারিগর বলতে নারাজ। শব্দমানে তাঁদের ‘মানুষ গড়ার শিল্পী’ বলা যায়।

শ্রী ত্রৈলোক্যনাথ কেবল মানুষ গড়ার শিল্পী ছিলেন না, তিনি জাতি গঠনের স্থপতির দায়িত্ব কাঁধে নিয়েছিলেন। অন্ধকারে জ্ঞানের আলো জ্বেলে উপনিবেশিক শাসন, শোষণ, বঞ্চনার মুক্তির পথের সন্ধান দিয়ে গেছেন। সে সময় রাজবাড়ি জেলায় কোনো উচ্চ বিদ্যালয় ছিল না। রাজা সূর্যকুমারের হাতে গড়া আরএসকে ইনস্টিটিউশনের ছাত্র হিসেবে পাঁচ আর সহকারী ও প্রধান শিক্ষক হিসেবে ৪২ বছর শিক্ষক হিসেবে এ জেলাতে বটেই তৎকালীন গোটা ভারতবর্ষে শিক্ষার আলো দান করেছেন। শিক্ষার ভিত রচনা করেছেন, জাতি ও জাতিত্ব বোধের উন্মেষ ঘটিয়েছেন। কেবল বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা নয়, রাজা সূর্যকুমারের পরামর্শে নিজ উদ্যোগে নিজ হাতে প্রতিষ্ঠানটির ভিত রচনা করেছেন, কলেবর বৃদ্ধি করেছেন, দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান হিসেব গড়ে তুলেছেন। কেবল আর এসকে ইনস্টিটিউশনই নয় প্রতিষ্ঠা করেছেন পাবনার সাড়া হাই স্কুল, রতনদিয়া হাই স্কুল। সে সব বিদ্যালয়ে যথাক্রমে ৪ ও ১০ বছর প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর শিক্ষকতাকাল মোট ৫৮ বছর।

ত্রৈলোক্যনাথ ১৮৭৫ সালে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার গোয়ালন্দ মহকুমার (বর্তমান রাজবাড়ি জেলা) বহরকালুখালি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রাণনাথ ভট্রাচর্য পরে রতনদিয়া এসে স্থায়ী বসতি গড়ে তোলেন। ১৮৮৫ সালে বোয়ালিয়া নিম্ন প্রাইমারি স্কুল হতে উত্তীর্ণ হয়ে ২ টাকা বৃত্তি লাভ করেন। এরপর উচ্চ প্রাইমারি ছাত্রবৃত্তি পরিক্ষায় কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়ে বৃত্তি পান। ১৮৮৮ সালে প্রতিষ্ঠিত রাজা সূর্যকুমার (আর এসকে) ইনস্টিটিউশনে ভর্তি হন এবং ১৮৯৪ সালে ঐ স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে এন্ট্রান্স (প্রবেশিকা) পরীক্ষায় উত্তীর্ণ। ঐ বছর কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ৫,৫০০ ছাত্র এন্ট্রান্স পরীক্ষা দেয় যার মধ্যে ৩৯৩ জন প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হয় (আমার স্মৃতিকথা পৃষ্ঠা-২)। উল্লেখ্য তিনি রাজা সূর্যকুমারের বাড়ি থেকে উক্ত বিদ্যালয়ে পড়তেন। এন্ট্রান্স পাস করার পর তিনি কলিকাতা কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানেও রাজা সূর্যকুমারের বাসায় থেকে তাঁর সাহচার্যে লেখাপড়া করেন। কলিকাতার মেট্রোপলিটান ইনস্টিটিউশন (বর্তমান বিদ্যাসাগর কলেজ) থেকে বিএ পাস করেন। অতঃপর জেনারেল এসেমব্লিজ (বর্তমান স্কটিশ চার্চস কলেজ) থেকে ইংলিশে এমএ পরীক্ষা দেওয়ার সময় গুরতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। এখানেই শিক্ষা-জীবন শেষ হয়। ১৯০০ সালে তিনি প্রথমে ২৫০ টাকা বর্তমান মূল্যস্তরের তুলনায় অনেক টাকা। পঁচিশ পয়সায় এক হালি ইলিশ বা ৩ টাকায় ১ মণ চাল পাওয়া যেত। কিন্তু অর্থের চেয়ে সেবাই যার ব্রত, মানুষ তৈরির স্বপ্ন যার মনে, জাতি গঠনের ইচ্ছায় যিনি সদাতৎপর তিনি টাকার অঙ্কের চেয়ে সেবার মানের দাম বেশি ভেবে চাকরি ইস্তফা দিয়ে ৫০ টাকা বেতনে আরএসকে ইনস্টিটিউশনে সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে যোগদান করেন। ব্রতচারী শিক্ষক হিসেবে পাঠদান করেছেন, প্রধান শিক্ষক হিসেবে প্রায় ৫০ বছর ধরে কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করে দিকে দিকে শিক্ষা বিস্তারে অসামান্য অবদান রেখেছেন।


ছোটখাট গড়নের মানুষটি ছিলেন হালকা পাতলা। কিন্তু চোখের দিপ্তি ছিল প্রখর, ব্যক্তিত্বে অনড়, শব্দ ব্যবহারে সংযত, কর্তব্যে নিষ্ঠাবান। তাঁর তেজস্বীতায় ছাত্র ও শিক্ষক যেমন ভয় পেত তেমনি তাঁর নিরলস কর্তব্যকর্মের নিষ্ঠতায় তাকে ভক্তি করত। তাঁর সামনে বেয়াদবি করে এমন সাহস কোনো ছাত্রের ছিল না। ত্রৈলোক্যনাথ ছিলেন রাজা সূর্যকুমারের অতি স্নেহের ও আদরের পাত্র। সূর্যকুমার তাঁর হাতে গড়া বিদ্যালয়টির সমুদয় ভার ত্রৈলোক্যনাথের উপর ছেড়ে দিয়েছিলেন। ত্রৈলোক্যনাথ রাজবাড়ি জেলায় প্রতিষ্ঠিত প্রথম উচ্চ বিদ্যালয়টিকে মনের মতো করে গড়ে তোলেন। বিদ্যালয়ের ঘর, দালান, আসবাবপত্র, বোর্ডিং নির্মাণ করেন। এ বিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে রাজবাড়িতে উচ্চ শিক্ষার সূচনা হয়। দূর দূরান্ত থেকে ছাত্ররা এখানে পড়তে আসত। প্রখাত সাহিত্যিক ও কলিকাতার স্টেটসম্যান পত্রিকার সম্পাদক সন্তোষ ঘোষ, সাহিত্যিক এয়াকুব আলী চৌধুরী, সাহিত্যিক উপেন্দ্র চন্দ্র দাস, বিখ্যাত ‍উকিল লালন চন্দ্র ঘোষ, হাইকোর্টের অ্যাডভোকেট জীতেন্দ্র নাথ গুহসহ অনেক নামিদামি মানুষ আরএসকে এবং ত্রৈলোক্যনাথের ছাত্র। রাজবাড়ি শহরে অনেক প্রবীণ এ শিক্ষকের গুণের কথা বলেন। শিক্ষাকতার সফলতায় ১৯১১ সালে গভর্নমেন্ট হতে তিনি সার্টিফিকেট অব অনারপ্রাপ্ত হন ‘For good work as a Head Master and Honorary Magistrate'।

তিনি কেবল শিক্ষকই ছিলেন না। রাজবাড়ি শহর ও জনকল্যাণের প্রবাদ পুরুষ রাজা সূর্যকুমারের হাতে গড়া হাসপাতালের সেক্রেটারি, অনারারি ম্যাজিট্রেট, লোকাল বোর্ডের চেয়ারম্যান, মিউনিসিপ্যালিটির ভাইস চেয়ারম্যান, রাজবাড়ি জেল ভিজিটর, রাজার স্টেটের একজিকিউটিভ হিসেবে কাজ করেছেন। তখনকার দিনে রাজবাড়িতে ‘অনুশীলন সমিতি’ ‘নামে রাজনৈতিক সমিতি থাকলেও বিনোদন বা সেবামূলক কোনো সংঘ, সমিতি বা ক্লাব ছিল না। ত্রৈলোক্যনাথের উদ্যোগে ‘আমাদের সংঘ’ নামে একটি সংঘ গঠিত হয়। সমিতির মেম্বার ছিলেন ব্রজবন্ধু ভৌমিক (এসডিও গোয়ালন্দ), জীতেন্দ্রনাথ মিত্র (ইঞ্জিনিয়ার), যোগেন্দ্রনাথ দত্ত (সাব ইঞ্জিনিয়র) কালী বন্দ্যোপাধ্যায় (স্টেশন মাস্টার), কুমুদিনী গাঙ্গুলী (হেড মাস্টার গোয়ালন্দ হাই স্কুল, (বর্তমান জেলা স্কুল), কালীকুমার দাস, (নায়েব জলকর) চন্দ্র বাবু (ডুগি তবলা, হারমোনিয়াম বাজিয়ে) প্রমুখ। রোগীর চিকিৎসা গরিব ছাত্রদের সাহায্য দান, সমাজসেবা কাজ সংঘের মাধ্যম করা হত।

ত্রৈলোক্যনাথ অগ্নিযুগের মানুষ। তখন অনুশীলন, স্বরাজ, অসহযোগ এবং বৃটিশ খেদাও আন্দোলনের কাল। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের আন্দোলন তুঙ্গে। ত্রৈলোক্যনাথ কেবল এর সাঙ্গী নন, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে তা সমর্থন করেছেন, প্রয়োজনে সক্রিয় হয়েছেন। জাতীয় চেতনায় তিনি ছিলেন অত্যন্ত সচেতন। ফরিদপুরের কংগ্রেস নেতা অম্বিকাচরণ মজুমদার ছিলেন অতি ঘনিষ্ঠজন। রাজনৈতিক মতাদর্শে তাঁরা ছিলেন অভিন্ন হৃদয়। তাঁর লেখা ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থটি অত্র অঞ্চলের নানা ঘটনার প্রামাণ্য দলিল। অনুশীলন, স্বদেশী, স্বরাজ, খেলাফত, অসহযোগ, কংগ্রেস, মুসলিম লীগ, রেলপথ স্থাপন, রেল শ্রমিক আন্দোলনসহ নানা ঘটনা এবং ‘লক্ষীকোল রাজবাড়ি আশ্রয়লাভ’ ‘রাজা সূর্যকুমার গুহরায় গ্রীনবোটে সাক্ষাৎ’, ‘রাজা সূর্যকুমার ইনস্টিটিউশন’, ‘রতনদিয়া গ্রাম’ আমার রাজবাড়ি স্কুলে শিক্ষকতা কালে’, ‘আমাদের সংঘ’, ‘রাজবাড়ি শহরে একটি মুসলমান সংঘ’, ‘ফেরিফান্ড রোড’, ‘মাদারীপুর রাজরাজেশ্বর’, ‘চাঁদ সওদাগরের ঢিবি’, ‘ভাগ্যবান মালো’, ‘রতনদিয়ার দুর্গোৎসব’, ‘রতনদিয়ার সাহিত্যিক’, ইত্যাদি বিষয়ে ইতিহাসের অমূল্য সম্পদ রেখে গেছেন। শতবছর পরে লেখা রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস গ্রন্থখানা তাঁর লেখার উদ্ধৃতিতে সমৃদ্ধ হয়েছে। এ গ্রন্থটি হাতে না পেলে আমি রাজবাড়িবাসীকে অনেক ঘটনা বিশেষ করে রাজা সূর্যকুমারের বিষয়ে প্রামাণ্য লেখচিত্র তুলে ধরতে পারতাম না। তিনি কেবল ‘আমার স্মৃতিকথা’ গ্রন্থটিই লেখেননি তিনি ‘আনান্দবাজার’  ‘যুগান্তর’ পত্রিকায় শিক্ষা, শিক্ষার অবনতি, শিক্ষকের দায় দায়িত্বের বিষয়ে নিয়মিত লিখতেন। কর্মঠ ও নিষ্ঠাবান শিক্ষক হিসেবে জীবন অতিবাহিত করেছেন। কর্মই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। আর ছাত্র হেমচন্দ্র লিখেছেন, ‘তিনি যে কি প্রকার কর্মঠ ছিলেন তাহা বলিয়া শেষ করা যায় না। ক্ষণিকের নিমিত্তে তাকে বসিয়া গল্পগুজব অথবা আমোদ প্রমোদ করিয়া সময় কাটাইতে দেখা যায় নাই। কর্মই ছিল তাঁর জীবনের ব্রত। তাঁহাকে প্রকৃতই কর্মবীর বলা যায়। তিনি ১৯৫৮ সালে রাজবাড়ি থেকে পশ্চিমবঙ্গে বরাহনগরে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। দুই জামাতা, দুটি কন্যা ও পুত্রবধূর অকাল মৃত্যুতে পরিবারটি শোকে বিহবল বিদ্ধস্ততার মুখে পতিত হয়। পুত্র ধীরেন্দ্র (এসবি) চাকরি থেকে অবসর গ্রহণ করায় নিষ্ঠাবান পরিবারটি আর্থিক অসচ্ছলতায় পড়ে। সমাজ ও মানুষের জন্য তাঁর অবদান মূল্যায়নের ভাষা নেই। কেবল গ্রন্থের পাতায় তিনি শ্রেষ্ঠতম।


মুহম্মদ তোফাজ্জল হোসেন

জেলা ও দায়রা জজ মুহম্মদ তোফাজ্জল হোসেন রাজবাড়ি জেলার মানুষের নিকট পরিচিত নাম। তিনি আপন কর্মগুণে রেখে গেছেন নানা স্মৃতি। সুনামের শিখরে তার অবস্থান। পেশাগত দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন নিষ্ঠাবান। জাতীয় কর্তব্য পালনে সচেতন।

বিশিষ্ট চিন্তাবিদ ও ইসলামী আদর্শের অনুসারী মুহাম্মদ তোফাজ্জল হোসেন ১৯১৬ সালে রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার মুছিদাহ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। রাজবাড়ি আরএসকে ইনস্টিটিউট থেকে কৃতিত্বের সাথে এন্ট্রান্স (বর্তমান এসএসসি) পাশ করেন। এরপর কলিকাতা প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে বিএ ও এলএলবি পাশ করে রাজবাড়ি কোর্টে ওকালতি শুরু করেন। অতঃপর তিনি বিচার বিভাগে চাকরি গ্রহণ করেন। তৎকালীন বিভিন্ন জেলা শহর এবং ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিচারিক দায়িত্ব পালনকারীকে সর্বোৎকৃষ্ট মানবিক গুণাবলীর অধিকারী হতে হয়। তিনি এমন গুণের অধিকারী ছিলেন। তাঁর গুণাগুণের পরিধি এতটাই বেশি ছিল যে সাধারণ মানুষের নিকট তিনি ওলিয়ে কামেল, সূফি, মুত্তাকীন, দরবেশ বলে পরিচিত ছিলেন।

তিনি জাতীয় নেতৃত্বের অনুসারী ছিলেন। বৃটিশ ভারতের শাসন, শোষণ, নিপীড়ন থেকে দেশবাসীকে মুক্ত করার মানসে জীবনের প্রথম অধ্যায়ে অসহযোগ, খেলাফত ও ফরায়েজী আন্দোলনের সক্রিয় সমর্থক ও সহযোগী ছিলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পাকিস্তানের ভাবাদর্শের প্রতি অনুরক্ত থাকায় ১৯৭০ সালের নির্বাচনে গোয়ালন্দ মহকুমা থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক জীবনের অনুসারী। ফুরফুরা শরীফের বড়পীর আব্দুল হাই সাহেবের মুরীর। তিনি মুছিদাহ-বনগ্রামে ফুরফুরা সিলসিলা খানকা শরীফ প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে দেশের আলেম সমাজ, বুজুর্গ, পীর, মাশায়েখদের প্রতি বছর ১৫ পৌষ ইছালে ছওয়াবের দিনে আগমন ঘটে। তিনি ছিলেন পুঁইজোর সিদ্দিকীয়া সিনিয়র মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠাতা। মুসলিম আইন, বৃটিশ আইন, হিন্দু আইন ও বিবিধ আইন বিষয়ে ছিলেন সুপণ্ডিত। বিভিন্নক্ষেত্রে আইনের অসঙ্গতি তুলে ধরে সংশোধনের সুপারিশ করতেন। তিনি ১৭টি জেলায় বিচারিক দায়িত্ব পালন করেন। সদালাপী, মিষ্ট অথচ স্বল্পভাষী এই মহৎ ব্যক্তি ১৯৮৬ সালে শাহাদৎ বরণ করেন।

কেতাব উদ্দিন আহমেদ ও বেগম রাবেয়া আহমেদ

আমি তখন উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণির ছাত্র। সূর্যনগর থেকে ট্রেনে এসে কলেজে ক্লাস করতে হয়। একদিনের স্মৃতি এখনো মনে ভাসে। ট্রেন থেকে নেমেছি। সামনে একজন ষাটোর্ধ মানুষ হেঁটে যাচ্ছেন। ডান হাতে ভারি একটা চটের ব্যাগ। বাম হাতে কয়েক জোড়া নারকেল। ব্যক্তিত্ববান পুরুষের প্রতি আমার দৃষ্টি আকর্ষিত হল। কিন্তু চিনতে পারলাম না। পরে কে যেন বলল ঐ লোকটি প্রিন্সিপ্যাল কেতাব উদ্দিন। কেতাব উদ্দিন স্যার যে গ্রামের মানুষ সে গ্রাম থেকে আমাদের গ্রামের দূরত্ব বড়জোর ৮ কিমি। ফলে জ্ঞান বুদ্ধি হওয়ার পর থেকে কতবার যে এ নামটি এলাকার মানুষের মুখে শুনেছি তার অন্ত নেই। কিন্তু তিনি ময়মনসিংহে চাকরি করেন। মাঝেমধ্যে নিজ গ্রাম নিশ্চিন্তপুর আসেন। এছাড়া আমার ঐ বয়সে তাঁর মতো মানুষের সাথে কথা বলাটাও সাহসের ব্যাপার। এখন প্রায় প্রতি গ্রামেই ২/৪ জন এমএ পাস লোক পাওয়া যায়। বেশি দিনের কথা নয়, এই ষাটের দশকেও রাজবাড়ি জেলায় (তখন গোয়ালন্দ মহকুমা) এমএ পাশের সংখ্যা ৪/৫ জনের বেশি ছিল না। বালিয়াকান্দি উপজেলায় কেতাব উদ্দিন স্যার এমএ পাস করেন এরপর প্রায় চল্লিশ বছর ঐ উপজেলায় অন্য কেউ এমএ পাস করেননি। আমি ১৯৬৯-এ এমএ পাশ করি। আমার স্থান ঐ উপজেলায় সম্ভবত চতুর্থ কিম্বা পঞ্চম হবে। কেতাব উদ্দিন আহমেদ বালিয়াকান্দি উপজেলার নিশ্চিন্তপুর গ্রামে এক বধিষ্ণু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিশুকাল থেকেই তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী এবং প্রতিবাদী। দর্শন শাস্ত্রে তিনি ফার্স্ট ক্লাস পান। তাঁর নীতিবোধ ছিল প্রখর।


তিনি ছিলেন বৃটিশ বিরোধী ও গণচেতনার ধারক। তিনি এবং তাঁর ভাগনেয় হাতেম আলী (পিএলএ) এলাকার সমাজসচেতন ব্যক্তি। কথায় বলে মামা ভাগ্নে যেখানে ভয় নেই সেখানে। মামা ভাগ্নের এ জুটি এলাকার মানুষকে বৃটিশদের অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সচেতন করে তোলে। কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ তাদের বিষয় ছিল না। তারা বৃটিশ রাজত্বকে ঘৃণা করতেন এবং তাদের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীকে সংগঠিত করেন। একবার গ্রামে কোনো এক ঘটনায় মামা ভাগ্নে বৃটিশ পুলিশের বন্দুক ছিনিয়ে নিলে পুলিশ তাদের উপর গুলি চালায়। কথিত আছে মৌলবী হাতেম আলী মাথা নিচু করে এবং কেতাব উদ্দিন লম্ফ দিয়ে বন্দুকের গুলি থেকে বেঁচে যান। অসীম সাহসী কেতাব উদ্দিনের নাম পুলিশের খাতায় ব্লাকলিস্ট হওয়ায় তিনি সরকারি চাকরি পান না। এ ঘটনার পর তিনি ময়মনসিংহ চলে যান এবং করটিয়া সাদত কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। ময়মনসিংহে তিনি শেরপুর ও ভুয়াপুর কলেজের প্রতিষ্ঠাতা এবং প্রিন্সিপ্যাল। শেষ জীবনে তিনি নিশ্চিন্তপুরে ফিরে আসেন এবং বালিয়াকান্দি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। শিক্ষার আলো পৌছে দিয়েছেন দেশের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে। এ দার্শনিক পুরুষ অবসরের পর নিজ গ্রামে বাস করতেন এবং শৈশব স্মৃতি বিজড়িত মাঠে-প্রান্তরে ঘুড়ে বেড়াতেন।

প্রিন্সিপ্যাল কেতাব উদ্দিন আহমেদ ১৯৪৫ সালে বিবাহ করেন রাবেয়া খাতুনকে। রাবেয়া খাতুন ১৯৩২ সালে টাঙ্গাইল জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। রাবেয়া বেগম স্বামীর সহচর্যে এবং শিক্ষার প্রতি প্রবল আকর্ষণে ১৯৫২ সালে বিএ পাস করেন। ১৯৬০ সালে বিএড কোর্স সমাপ্ত করেন। শিক্ষক হিসেবে যোগদানের পর ১৯৫৮ সালে প্রধান শিক্ষকের পদে অধিষ্ঠিত হন। দীর্ঘদিন ফরিদপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পর ১৯৮১ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত খুলনা বিভাগে বিদ্যালয় পরিদর্শকের (Inspector of Schools) দায়িত্ব পালন করেন। এই মহিয়সী মহিলার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা অশেষ। তৎকালীন ডিপিআই হাফেজ আহমেদ রাবেয়া আহমেদের বাসায় আমার স্ত্রীর সঙ্গীত শুনে তাকে রাজবাড়ি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গীত শিক্ষিকা হিসেবে নিয়োগ প্রদানের বিষয়ে নিশ্চিত করেন। তিনি এখন রাজবাড়ি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক (১০/০৩/২০১০ এ অবসর গ্রহণ)। অধ্যক্ষ কেতাব উদ্দিন আহমেদ ও রাবেয়া আহমেদ রাজবাড়ি জেলার অহঙ্কার।

আমানত আলী মল্লিক

আমানত আলী মল্লিক সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনার আবু হেনার পিতা। আমানত আলী মল্লিক তাঁর মেধা, পাণ্ডিত্য, ন্যায়পরায়ণতা আর কর্তব্যনিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেই সৃষ্টি করে গেছেন ইতিহাস। এ মহান ব্যক্তির স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘আমানত আলী স্মারকগ্রন্থ’ যার সম্পাদনা করেছেন দেশের বরেণ্য ঐতিহাসিক ড. কেএম মহসিন। তাঁর সম্বন্ধে লিখেছেন দেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তিত্ব যারা সকলেই তাঁর ছাত্র ছিলেন। মানুষ তার কর্মের দ্বারাই মানুষের মনে স্থান করে নেন। আর ঐ সমস্ত কর্মের পরিধিতে সৃষ্ট হয় ইতিহাস। আমানত আলী মল্লিক এমনি ইতিহাসের উপাদান রেখে গেছেন তাঁর কর্মের দ্বারা। স্মৃতির আড়ালে এমন মহৎ ব্যক্তিকে যেন ভুলে না যাই।

মিয়া মোঃ কায়েম উদ্দিন

মিয়া মোঃ কায়েম উদ্দিন মানুষ গড়ার কারিগর নন। মানুষ গড়ার শিল্পী। সঠিক অর্থেই তিনি ছিলেন জাতি ও জাতিত্বের রুপকল্পনায় স্বপ্নচারী স্থপতি। এ শিক্ষাবিদ ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজ, পটুয়াখালি কলেজ এবং সর্বশেষ রাজবাড়ি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে শিক্ষা বিস্তার ও শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নে অনন্য অবদান রেখে গেছেন। ১৯৬১ সালে রাজবাড়ি কলেজ প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ অঞ্চলের মানুষের উচ্চ শিক্ষার দ্বার উম্মোচিত হয়। ১৯৬৬ সালে তিনি রাজবাড়ি কলেজে অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন। নব প্রতিষ্ঠিত কলেজের নানা সমস্যার সমাধানে তিনি কলেজটিকে দৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড় করান। তিনি কলেজের একতলা ভবনকে দ্বিতলে রুপান্তর করেন।


বিজ্ঞান বিভাগসহ স্নাতক শ্রেণিতে উন্নীত করেন। শিক্ষক হোস্টেল, বিজ্ঞানাগার, জমি ক্রয় করে খেলার মাঠ, লাইব্রেরি, কমন রুম, আসবাবপত্র, শিক্ষার নিমিত্তে যাবতীয় কাজ সম্পন্ন করেন। এলাকার ছাত্রছাত্রী এ কলেজে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত । তারা জাতীয় জীবনে নানা অবদান রেখে চলেছেন। এ শিক্ষাবিদ ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন শাস্ত্রে এমএসসি ডিগ্রি নিয়ে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে প্রভাষক হিসেবে যোগদান করেন। কর্মদক্ষতা, সততা ও নিষ্ঠার অল্প সময়ের মধ্যেই ঐ কলেজের উপাধ্যক্ষের পদে আসীন হন। এরপর অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিয়ে পটুয়াখালি কলেজে যোগদান করেন। কেবল রসায়ন পাঠদানেই তিনি দক্ষতার পরিচয় দেননি; ইতিহাস, ভূগোল, রাষ্ট্রনীতি, ধর্ম বিষয়ে তাঁর পাণ্ডিত্য সুবেদিত। দেশ ও জাতির ভাবনায় তিনি প্রতিনিয়ত তাড়িত হতেন। ধর্মীয় বিশ্বাসে অটল থেকেও ছিলেন প্রগতির দিশারী। গল্প কাহিনী বলায় ছিলেন সাবলীল। বক্তব্য বিবৃতিতে ছিলেন অসামান্য প্রতিভার অধিকারী। সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে ছিল তাঁর বিচরণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নকালীন ১৯৫২ সালের ২১ ফ্রেব্রুয়ারি তিনি মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। এই শিক্ষাবিদ মাদ্রাসা শিক্ষার পাশাপাশি প্রথম বিভাগে স্কুলের পরীক্ষায় পাস করেন। পাবনার অজ পাড়াগাঁয়ের জন্ম নেওয়া মানুষটি মেধা ও একাগ্রতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে শিক্ষার আলো জ্বালাবার ব্রত নিয়ে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চাকরি গ্রহণ করেন। সুদীর্ঘ - ৩৬ বছর শিক্ষাদানের পর ১৯৮৬ সালে অবসরে যান। তিনি ছিলেন বেড়াডাঙ্গা ১ নং সড়কের বাসিন্দা। মিয়া মোঃ কায়েম উদ্দিনের স্মৃতির উদ্দেশ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে মিয়া মোঃ কায়েম উদ্দিন পরিষদ। তাঁর সন্তানেরা প্রতিবছর এ পরিষদের মাধ্যমে রাজবাড়ি কলেজের মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের এককালীন বৃত্তি প্রদান করে থাকেন।

 বদরোদ্দজা খান (টুকু মিয়া)

কিছুকিছু মানুষ থাকেন যাদের বেশভূষা সহজ সরল। চলাফেরা দেখে তার গুণাবলীর বিষয় জানার উপায় থাকে না। এ ধরণের মানুষ হয় দার্শনিক প্রকৃতির। সবার উপরে তাদের থাকে এমন চিন্তা ভাবনা যার ফলাফল সামগ্রীক কল্যাণে কাজ করে সরল, অতি সাধারণ বেশভূষায় তাকে দেখা যেত রাজবাড়ি সূর্যনগর এলাকায়। অথচ এই মানুষটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রকালীন ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রয়ারি গুলির আঘাতে রক্তাক্ত হন। পত্রিকায় তার নাম আসে নাই। নীরবে কাজ করাই ছিল তার জীবনের দর্শন। তার এমনটি হওয়ার কারণও রয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শন শাস্ত্রে এমএ ফাইনাল পরীক্ষায় ফার্স্ট ক্লাস ফার্স্ট হয়ে ফুল ব্রাইট স্কলার হিসেবে বৃত্তিলাভ করেন। কিছু কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির কারণে তার ইংল্যান্ড যাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। অতঃপর তিনি ভেড়ামারাসহ কয়েকটি কলেজে অধ্যাপনা করেন এবং শেষে গফরগাঁ কলেজের অধ্যক্ষ নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন একজন সফল শিক্ষক ও সুপণ্ডিত। পরে চাকরি ছেড়ে দিয়ে এলাকার উন্নয়ন ভাবনায় আত্মনিয়োগ করেন। তিনি দুইবার চেয়ারম্যান নিযুক্ত হন। তিনি ছিলেন সূর্যনগর হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা। 

ডা. আব্দুল আজিজ, আহম্মদ ইরতেফা মর্জি, ড. গোলাম রব্বানী

ডা. আব্দুল আজিজ আহম্মদ ইরতেফা মর্জি ড. গোলাম রব্বানী রাজবাড়ির মাটিতে এমন কয়েকজন প্রতিভাবান ব্যক্তির জন্ম হয়েছে যারা বিশ্বের অমর অবদান রেখেছেন। তারা হলেন ডা. আব্দুল আজিজ, রামচন্দ্রপুর, রাজবাড়ি। আহম্মদ ইরতেফা মুর্জি, রাজবাড়ি ও ড. গোলাম রব্বানী, কাচারীপাড়া, পাংশা। ডা. আব্দুল আজিজ মিজানপুর ইউনিয়নের রামচন্দ্রপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন।


তার পিতার নাম মোঃ আবেদ আলী সরদার। ডা. আব্দুল আজিজ ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করে আমেরিকায় গবেষণার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি জটিল রোগের কারণ নির্ণয় এবং তার ঔয়ধ উদ্ভাবনের জন্য মেডিসিনে পিএইডি ডিগ্রীপ্রাপ্ত হন। ডা. আব্দুল আজিজ ১২টি জটিল রোগের ঔষধ উদ্ভাবন করেন।

সে সময় আমেরিকাতে ১২তম বৈজ্ঞানিক (ঔষধ উদ্ভাবন) ছিলেন। এজন্য তাকে পঞ্চাশ হাজার ডলার পুরস্কার দেওয়া হয়। তিনি দীর্ঘদিন আফ্রিকাতে কাটান। ডা. আব্দুল আজিজ স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে আসেন। ১৯৭৮ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

রাজবাড়ির আর আক প্রতিভাবান ব্যক্তি আহম্মদ ইরতেফা মর্জি। আহম্মদ ইরতেফা মর্জি রাজবাড়ি শহরে মৃধা পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রখ্যাত  আইনজীবী আহমেদ আলী মৃধার ২য় পুত্র। রাজবাড়ি জেলা স্কুলের ছাত্র ইরতেফা ছোটবেলা থেকে মেধাবী ও বিজ্ঞানমনস্ক ছিলেন। তিনি বর্তমানে নাসার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন। গ্যালিলিও এর যুগ থেকে মহাকাশ রহস্য উদ্ভাবনে মানুষ গভীর আত্মনিয়োগ করেন। হাবলের টেলিস্কোপ সে আগ্রহ আরো বাড়িয়ে দেয়। আমেরিকাতে গড়ে ওঠে মহাকাশ গবেষণাগার নাসা। নাসার মাধ্যমে মহাকাশ সম্বন্ধে জানা, মহাকাশে যন্ত্রযান প্রেরণ, মহাকাশ স্টেশন, চাঁদে অবতরণ, মঙ্গল বৃহস্পতিসহ দূর-দূরান্তের গ্যালাক্সি, নক্ষত্র, কুয়াশার, কৃষ্ণগহবরের রহস্য জানার গবেষণা চলছে। পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে তথ্য প্রযুক্তি, তথ্য প্রবাহের নেটওয়ার্ক। এই নাসার একজন বিশিষ্ট মহাকাশ বিজ্ঞানী রাজবাড়ির বৈজ্ঞানিক আহমেদ ইরতেফা মর্জিঅ ১৯৬৯ সালে মহাকাশযান এ্যাপোলো-১১ এর মাধ্যমে মানুষ চাঁদে অবতরণ করে। এ্যাপোলো-১১ অবতরণের প্রধান পরিকল্পনাকারী ছিলেন ইরতেফা মর্জি। তাঁর গবেষণার জন্য তিনি আমেরিকাতে পুরস্কৃত হয়েছেন বিভিন্নভাবে। আমেরিকাতে থেকেও তিনি ভুলে যান নাই দেশকে। আহমেদ ইরতেফা মর্জি স্কট অবস্তায় একবার দেশে এসেছিলেন।

মায়ের বুক থেকে সন্তান হারিয়ে যাওয়া বেদনাদায়ক। তা আরো বেশি বেদনাদায়ক সন্তান যদি হয় প্রতিভাবান আর তার মৃত্যু হয় বিদেশ বিভুঁইয়ে, আর কোনো ক্রমেই যদি না পাওয়া যায় সে লাশের খবর। ড. গোলাম রব্বানী এভাবেই চলে গেছেন। তার কোনো খোঁজ খবর না পাওয়া গেলেও সকলে নিশ্চিত যে তিনি আর ধরাধামে নেই। পদ্মার চর সংলগ্ন শহরের কোলাহল মুক্ত প্রাকৃতিক পরিবেশে অবস্থিত কাচারী পাড়া বিদ্যালয়ের প্রতিভাবান এ ছাত্রটি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় স্ট্যান্ড করেন। পরে ভূতত্ত্ব বিষয়ে মাস্টর্স করে আমেরিকা থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন এবং গবেষণায় রত হন। তার গবেষণার বিষয় ছিল বিভিন্নমুখী। ভূ-প্রকৃতিতে বিচিত্র কীটপতঙ্গের বাস আর বিচিত্র তাদের আচার আচরণ গুণাগুন বিশ্লেষণ। আফ্রিকা মহাদেশের ঘন অরণ্যে বিচিত্র প্রাণীদের আচরণ পর্যবেক্ষণ আর ভূ-পরিবেশে এদের খাপ খাওয়ানো ছিল তার গবেষণার বিষয়। পিছনের সকল টান উপেক্ষা করে প্রাণীর ভূ-পরিবেশ পরিকল্পনায় তিনি সমর্পন করে গেছেন নিজেকে। হারিয়ে গেছেন সকলের অলক্ষ্যে নিবিড় অরণ্যে। রেখে গেছেন কাচারীপাড়ার নিভৃত পল্লীতে কিছু স্মৃতি আর মানুষের কল্যাণে কিছু উদ্ভাবন।

অ্যাডভোকেট আব্দুল জলিল মিয়া

আব্দুল জলিল মিয়া ছিলেন রাজবাড়ির আইনজীবী ও ক্রীড়ামোদী। একবার রাজবাড়ি পৌর চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। তিনি রাজবাড়ি জেলার ক্রীড়া সংগঠক হিসেবে অধিক পরিচিত ছিলেন। মুসলিম জাগরণে তিনি অগ্রাণী ভূমিকা পালন করে গেছেন।


অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম মৃধা

জ্ঞানের পক্কতায় পরিপুষ্ট আবুল কাশেম মৃধা। কালুখালিতে জন্মগ্রহণকারী  এ বিশিষ্ট ব্যক্তি প্রায় চার দশক ধরে রাজবাড়ি কোর্টে ওকালতি করে অবসর জীবনযাপন করছেন। রজাবাড়ি জেলার মধ্যে তিনি বিশিষ্ট আইনবিদ বলে পরিচিত। অ্যাডভোকেট আবুল কাশেম মৃধা আলোচনা, কথা ও রাজনীতিতে মুক্তবুদ্ধি চর্চায় উদ্বুদ্ধ করেন। তিনি একসময় আওয়ামীলীগের সাতে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। পরে মওলানা ভাসানীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হন। সম্প্রতি তিনি পরলোকগমন করেছেন।

গোলাম কবীর মিয়া

রাজবাড়ি শহরে গোলাম কবীর মিয়া সকলের নিকট জিকে মিয়া হিসেবে অধিক পরিচিত ছিলেন। তিনি রেলওয়ে বিভাগে চাকরি করতেন। শেষজীবনে তিনি অনেক সমাজকর্মের সাথে জড়িত ছিলেন। তার জ্যেষ্ঠ পুত্র ডা. এনায়েত কবির এফআরসিএস দেশের একজন বিশিষ্ট চিকিৎসক। ডা. এনায়েত কবির ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ছিলেন। তার আর এক পুত্র প্রফেসর হেদায়েত কবির দীর্ঘদিন সরকারি রাজেন্দ্র কলেজে শিক্ষকতা করে রাজবাড়ি সরকারি কলেজের উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি মানিকগঞ্জ দেবেন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষের পদে থাকাকালীন অবসর গ্রহণ করেন। তার আর এক পুত্র শাহজাহান কবির এশিয়া ফাউন্ডেশনের এশিয়া অঞ্চলের প্রোগ্রাম ডাইরেক্টর। শাহজাহান কবীরের স্ত্রী ফারাহ কবির বেতার ও টিভির ইংরেজি সংবাদ পাঠক। তার অন্য পুত্র শাফায়েত জামিল পেট্রো বাংলার জিএম। এ পরিবারটির সকলে রাজবাড়িসহ দেশের সেবা করে চলেছেন।

চিকিৎসক

ডা. প্রমথ নাথ দত্ত

ডা. মাখনলাল রায় সাহা

ডা. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন

ডা. গোলাম সামদানী

ডা. প্রমথ নাথ দত্তডা. মাখন লাল রায়শাহা ডা. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেনডা. গোলাম সামদানী রাজবাড়ি অতীতকাল থেকেই রোগব্যধি আক্রান্ত এলাকা। ম্যালেরিয়া, কলেরা, গুটি বসন্ত প্রভৃতি ছোঁয়াচে রোগের প্রাদুর্ভাবে শতশত মানুষের প্রাণহানী হত। দীর্ঘ ৪০ বৎসর ধরে কয়েকজন নিবেদিত চিকিৎসক সার্বক্ষণিক মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রদান করতেন। এর মধ্যে ডা. প্রমথনাথ দত্ত, ডা. মাখনলাল রায়সাহা, ডা. গোলাম সামদানী, ডা. মোঃ মোয়াজ্জেম হোসেন উল্লেখযোগ্য।


তাঁরা সবাই এলএমএফ পাস চিকিৎসক ছিলেন। ডা. প্রমথনাথ দত্ত তৎকালীন সময়ে দক্ষ চিকিৎসক। সকলেই কৃতজ্ঞতায় তাদের নাম আজও স্মরণকরে। কথায় বলতো,  ‘ডা. মাখন-সে তো যখন তখন।’ সত্য সত্যই মানুষের কল্যাণে ডা. মাখনলাল সাহা সদা সর্বদাই প্রস্তুত থাকতেন। তিনি মিকচার পদ্ধতির ঔষধ ব্যবহারে সুনাম অর্জন করেছিলেন। ডা. গোলাম সামদানী চট্রগ্রাম থেকে রেলের ডা. হিসেবে এসে আর ফিরে যান নাই। রাজবাড়ির প্রধান সড়কে দীর্ঘ ৩০ বৎসর চিকিৎসক হিসেবে মানুষের সেবা করে গেছেন। তাঁরা সবাই ছিলেন মানব দরদী। অর্থের চেয়ে মানুষের সেবাই যেন ছিল তাঁদের কাজ। রোগীর নিকট থেকে সামান্য অর্থের বিনিময়ে চিকিৎসাপত্র দিতেন। ডা. গোলাম সামদানীকে উদ্দেশ্য করে লোকে বলত, ‘ডা. সামদানী রোগীর খুব আমদানী।’ ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের ক্লিনিকের নাম ছিল হোসেন ক্লিনিক। তার চিকিৎসাপত্র ছিল অতি অল্প খরচে। মানুষ ভালবেসে তাকে বলত, ‘ডা. হোসেন গেলেই বলে বসেন।’ এ চারজন চিকিৎসক জ্বরাব্যাধিপূর্ণ রাজবাড়িকে ধীরে ধীরে মু্ক্ত করেছেন। আজকের উন্নত চিকিৎসাকৌশল তাদের হয়ত আয়ত্ব ছিল না কিন্তু সেবামূলক মন দিয়ে তারা শহরকে সু-স্বাস্থ্যের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

ডিএমএন ইসলাম (ইসলাম ভাই)

জন্ম মানিকগঞ্জ জেলায়। রেলের চাকরিসূত্রে  পঞ্চাশের দশকের প্রথম দিকে রাজবাড়িতে আসেন। পঞ্চাশ-ষাটের দশকে রাজবাড়ি শহর, খানখানাপুর, বেলগাছি অত্র অঞ্চলে ফুটবল খেলা জমজমাট ছিল। রাজবাড়িতে খেলার মাঠ ছিল ঐতিহ্যবাহী রেলওয়ে ময়দান। ফুটবল খেলোয়াড়, ফুটবল প্রশিক্ষক, টিম সংগঠক, খেলা পরিচালনাসহ সকল বিষয়ে ইসলাম ভাইয়ের সমান পারদর্শিতা ছিল। রাজনৈতিক ধ্যানধারণায়ও তিনি অগ্রগামী ছিলেন। তাঁর অতি নিকটে থেকে আমি অত্র অঞ্চলে দেশের বিশিষ্ট রাজনীতিবিদদের কর্মকাণ্ড সম্বন্ধে তথ্য সংগ্রহ করেছি। ইসলাম ভাইয়ের কথায় বলতে হয় রাজবাড়ির ক্রীড়া, রাজনীতি, উন্নয়ন সকল বিষয়ে তিনি নিজেই ছিলেন ইতিহাস। তাঁর স্ত্রী জাহানারা বেগম একজন বিশিষ্ট সমাজসেবী ও নারী উন্নয়নের সাথে সংশ্লিষ্ট। জাহানারা বেগম এর প্রচেষ্টায় রাজবাড়িতে গড়ে উঠেছে নারী উন্নয়ন কল্যাণ সমিতি, সেলাই কর্মসূচীসহ আরো অনেক উন্নয়নমূলক সংগঠন।

মোঃ আব্দুর রব

ষাটের দশকের কোনো ছাত্রের প্রথম বিভাগে এসএসসি পাশ করা কঠিন ছিল। সমস্ত মহকুমায় তখন প্রতি বৎসর দু-চারজনের বেশি প্রথম বিভাগ পেত না। ১৯৬৪-৬৫ সালে আব্দুর রব মৃগী হাইস্কুল থেকে প্রথম বিভাগসহ ঢাকা বোর্ডে স্ট্যান্ড করেন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে এমএ ডিগ্রি লাভ করে অধ্যাপনার পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। দেশের ক্রান্তিকালে তিনি মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং নিজস্ববাহিনী গঠন করে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন। রাজবাড়িতে যুদ্ধকালে তার সহযোদ্ধা দিয়ানত শহীদ হন। তিনি একসময় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের নেতৃত্বে ছিলেন। এলাকার মানুষ আর এলাকার উন্নয়ন নিয়ে তিনি বিশেষভাবে ব্যস্ত থাকতেন। ফরিদপুর ইয়াছিন কলেজের উপাধ্যক্ষ থাকাকালীন তিনি ইন্তেকাল করেন।


মুন্সি ইয়ার উদ্দিন আহম্মেদ

রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার নাড়ুয়া ইউনিয়ন একটি বর্ধিষ্ণু এলাকা। নাড়ুয়া ইউনিয়নের মদনডাঙ্গী গ্রামের মুন্সি ইয়ার উদ্দিন ছিলেন অত্র অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক এবং বিশিষ্ট সমাজসেবক। তিনি নাড়ুয়ার লিয়াকত আলী মেমোরিয়াল উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিচালনা পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। তার নামে নাড়ুয়াতে মুন্সি ইয়ার উদ্দিন আহম্মেদ বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত  হয়েছে। তিনি চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন এবং এলাকার উন্নয়নে অবদান রেখে গেছেন।

 

মোঃ আমীর আলী মণ্ডল

বালিয়াকান্দি উপজেলার নাড়ুয়া ইউনিয়নের বিলটাকাপুড়া গ্রামে আমীর আলী মণ্ডল জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন অত্র এলাকার বিশিষ্ট সমাজসেবক। জেলার একজন বিশেষ ব্যক্তিত্ব হিসেবে তাঁর পরিচয় রয়েছে। তিনি বিশ বৎসর নাড়ুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হিসেবে এলাকার উন্নয়ন ও মানুষের সেবা করে গেছেন। তিনি নাড়ুয়া লিয়াকত আলী স্মৃতি বিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকাল থেকে এর পরিচালনা ও উন্নয়নের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। 

মোঃ হাবিবুর রহমান

রাজবাড়ি জেলায় সংস্কৃতির জগতে এক পুরোধা ব্যক্তিত্ব মোঃ হাবিবুর রহমান। শহরের এক বনেদি পরিবারে ১৯২০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোঃ ফখরুদ্দিন দীর্ঘসময় রাজবাড়ি পৌরসভার কাউন্সিলর ছিলেন। পিতামহ ও পিতা ফখরুদ্দিন বৃটিশ ভারতে দেশের স্বাধীনতাকামী বলে পরিচিত।

ফখরুদ্দিন নিখিল ভারত মুসলিমলীগের অত্র অঞ্চলের একজন নেতা হিসেবে পরিচিত ছিলেন। পাকিস্তান আন্দোলনে আহম্মদ আলী মৃধা, ফখরুদ্দিন আহমেদ, অ্যাডভোকেট আব্দুল মাজেদ রাজবাড়ি জেলায় সুবেদিত নাম। এ ক্ষেত্রে হাবিবুর রহমানের অবদান স্মরণীয়।

হাবিবুর রহমান শৈশবকাল থেকেই ছিলেন সাহিত্য, সংস্কৃতিমনা। আবৃত্তি, নাটক, সঙ্গীতচর্চা তাঁর নিত্যদিনের কর্মে পরিণত হয়। ‘হোসনেবাগ’ ও ‘চিত্রা’ হলে তাঁর নির্দেশনায় নাটক ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত। তিনি একজন দক্ষ অভিনেতা ছিলেন। শেষ বয়েসেও তাঁর কণ্ঠের আবৃত্তি শ্রোতাদের আকৃষ্ট করত।

তাঁর নিকট থেকে জানা যায় রাজবাড়ি, পাংশা, ফরিদপুরে কাজী নজরুল ইসলামের যাতায়াত ছিল। হাবিবুর রহমান শৈশবে কাজীদার সংস্পর্শে আসেন। কাজী নজরুল ইসলাম তাঁদের বাড়িতে একবার তিনদিন অবস্থান করেন। হাবিবুর রহমান ছিলেন একজন দরদী মানুষ। ধর্মভেদ, ধনি, দরিদ্র সকলের নিকট আপনজন বলে পরিচিত ছিলেন। ১৯৪৩ এর মহাদুর্ভিক্ষের সময় তাঁর ব্যকুল হৃদয় কেঁদে ওঠে। তিনি হিন্দু মুসলিম নির্বিশেষে গরিবদের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতেন।  সৎ নিষ্ঠাবান হাবিবুর রহমান পরিণত বয়সে জনসেবার লক্ষ্যে ১৯৬৭ ও ১৯৭৭ সালে দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। চেয়ারম্যান থাকাকালীন তিনি পৌরসভার উন্নয়নে নানা প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন।


স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় স্থানীয় জনগণের জীবন ও সম্পত্তি রক্ষায় তিনি আপ্রাণ চেষ্টা করেন। বিহারী প্রধান রাজবাড়ির বিহারীরা যখন দিনে দুপুরে হত্যা ও লুটতরাজ শুরু করে তখন তিনি এর তীব্র প্রতিবাদ করায় তাকে হত্যার পরিকল্পনা করে। তাকে না পেয়ে তার ভাই আশ্রাফ উদ্দিন আহমদ, আতা উদ্দিন আহমদ এবং ভাইয়ের ছেলে আতাউর রহমানকে গুলি করে। তাঁরা সকলেই শহীদ হন। এরপর হাবিবুর রহমান আত্মগোপন করেন। তিনি নানা ক্লাব, সমিতির পৃষ্ঠপোষক, সভাপতি ছিলেন। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি রাজবাড়ি জেলা বিএনপি’র সভাপতি নির্বাচিত হন। রাজবাড়িতে এ দল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছেন। ২০০২ সালে তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন। তাঁর স্মৃতির উদ্দেশ্যে রাজবাড়ি পৌর মেয়র কর্তৃক হাবিবুর রহমান সড়ক নামফলক স্থাপন করা হয়েছে।

এমএ মোমেন (বাচ্চু মাস্টার)

এমএ মোমেন বাচ্চু মাস্টার ১৯৩৯ সালে রাজবাড়ির সজ্জনকান্দায় বিখ্যাত মোল্লাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুল গফুর মোল্লা। এমএ মোমেন ছিলেন একাধারে শিক্ষক, রাজনীতিবিদ, সমাজসেবক, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, ক্রীড়াবিদ ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব। তিনি বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ (মোজাফফর) সভাপতি ছিলেন। এক সময় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি’র রাজনীতিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। দাবি আদায়ে যে কোনো আন্দোলন সংগ্রামে তিনি বলিষ্ঠ নেতৃত্ব দেন। তিনি রাজবাড়িতে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেন।

তিনি ছিলেন প্রকৃত অর্থেই একজন শিক্ষক। যে কারণে সর্বমহলে তিনি বাচ্চু মাস্টার বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি প্রথমে রাজবাড়ি বালিকা বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। ১৯৬৮ সালে বিদ্যালয়টি সরকারিকরণ হলে সরকারি নিয়ন্ত্রণের আওতায় না থেকে স্বাধীন সত্ত্বায় শিক্ষা বিকাশের লক্ষ্যে নিজ উদ্যোগে শেরে বাংলা বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যালয়টিকে এক পর্যায়ে কলেজে রুপদানের পরিকল্পনা নেন। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোসহ প্রভূত উন্নয়ন সাধন করেন। 

রাজবাড়ির সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে বাচ্চু মাস্টার একসময়ের খু্বই সুপরিচিত নাম। তিনি উডহেড লাইব্রেরির গুরুদায়িত্ব পালন করেন। তিনি রাজবাড়ি শিল্পকলা একাডেমী প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্যোগক্তা। বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সভাপতি ও সদস্য সচিব ছিলেন। তিনি ছিলেন জাতীয় পর্যায়ের স্বীকৃত ফুটবল রেফারি। তাঁর স্ত্রী ফেরদৌস আরা ফারজানা (শেফালী) ছিলেন রাজবাড়ি পৌরসভার প্রথম মহিলা সদস্য। তার সন্তান কায়সুল মোমেন কাঁকন বর্তমানে চ্যানেল আই’র সিনিয়র মার্কেটিং ম্যানেজার। এই মহৎ ব্যক্তি ২০০৪ সালে ইন্তেকাল করেন। তাঁকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়।

মোঃ ওমর আলী খান

পাংশা থানার মৃগী ইউনিয়নের খড়খরিয়া গ্রামের ওমর আলী খান একজন বিশিষ্ট সমাজসেবক ছিলেন। ৩০ বৎসর যাবত তিনি মৃগী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান থেকে এলাকার উন্নয়নসহ বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করেছেন। মৃগী হাই স্কুলের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি এ বিদ্যালয় পরিচালনায় দীর্ঘদিন সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ওমর আলী খানের একপুত্র তোফাজ্জেল হোসেন অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ। আর এক পুত্র আব্দুল হাই বর্তমানে উচ্চ আদালতের বিচারপতি। তাঁর পুত্র ডা. আব্দুল লতিফ খান বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক, আব্দুল বারি একজন বিশিষ্ট প্রকৌশলী এবং মেয়ে নাজমুন নাহার বিশিষ্ট চিকিৎসক।


মোঃ খলিল উদ্দিন মিয়া (জজ সাহেব)

মোঃ খলিল উদ্দিন মিয়া পাংশার কলিমোহর ইউনিয়নে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বিচার বিভাগে যোগদান করেন। যে কারণে তিনি জজ সাহেব বলে এলাকায় পরিচিত ছিলেন। জজ সাহেবের পরিবারটি সমাজকর্মে নিবেদিতপ্রাণ। তার সমাজকর্মের পথ অনুসরণ করে তার পুত্রদ্বয় মোঃ নাসির উদ্দিন,  মোঃ সালাউদ্দিন রাজবাড়ি জেলার সমাজহিতৈষী কর্মে প্রায়শই ব্যস্ত থাকেন। তাদের গড়া ডিডিসি (DDC) ঢাকা, দেশের অন্যতম প্রতিষ্ঠান। ধনাঢ্য পুত্রদ্বয় ভুলে যান নাই এলাকার মানুষকে। স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, মসজিদ, মন্দির প্রতিষ্ঠান গড়ার কাজে সাহায্য প্রদানে কখনো কুণ্ঠাবোধ করেন না। অতি উৎসাহে এগিয়ে আসেন এসব প্রতিষ্ঠান গড়ার জন্য।

মোঃ আবু হেনা

আবু হেনা মাটির গুণে মানুষ হয় ধন্য, আবার মানুষের গুণে মাটি হয় ধন্য। আবু হেনার ক্ষেত্রে এ কথাটি শতভাগ সত্য। রাজবাড়ির মাটিই সৃষ্টি করেছে দেশের একজন আবু হেনা আর আবু হেনা রাজবাড়ির মাটির জন্য বয়ে এনেছেন সুনাম। ক্ষুরধার মেধার গুণে নানা ক্ষেত্রে অতি উচ্চপদে আসীন হয়ে আবু হেনা সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠায় রেখেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। দেশবাসীর নিকট আবু হেনা একটি বিশেষ নাম, বিশেষ আদর্শ। ১৯৩৭ সালে রাজবাড়ির মাটির স্পর্শ নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন পদ্মা নদীর কোল ঘেঁষে ঐতিহ্যবাহী বাহাদুরপুর গ্রামে। পিতা আমানত আলী মল্লিক পেশায় মানুষ গড়ার শিল্পী। শিল্পী মন নিয়ে অত্যন্ত মেধাসম্পন্ন (সেকালে তিনি ম্যাট্রিক প্রথম বিভাগে পাস করেন) আমানত আলী ব্রতচারীর মতো ঐ অঞ্চলের মানুষের অন্ধকার মনের গহনে আলোক প্রজ্জ্বলন করে গেছেন। এমন ব্রতচারী শিক্ষকের সন্তান পদ্মার উথাল পাথাল ঢেউয়ের মতো মেধাকর্ষণের অব্যাহতধারায় পদ্মার মতো প্রশস্ত করেছেন জাতীর চেতনাবোধ। কর্তব্যকর্ম কখনো তাঁকে বিমূঢ়তায় আচ্ছন্ন করতে পারেনি। সকল কর্মে সফলতার স্বর্ণস্বাক্ষর রেখেছেন। অনেককে বলতে শোনা যায়, ‘এমন মানুষ এ মাটিতে কালেভদ্রে জন্মেছে।’

অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র আবু হেনা ১৯৫৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে কৃতিত্বের সাথে অনার্স ও এমএ ডিগ্রি অর্জন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাকতায় যোগ দেন। অতঃপর তৎকালীন পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে যোগদান করে ১৯৬৬ সালে মুন্সিগঞ্জে মহকুমা প্রশাসক হিসেবে নিয়োজিত হন। এরপর খুলনা জেলা প্রশাসক, খুলনার বিভাগীয় কমিশনার, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়, অর্থ মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব এবং সর্বশেষ সচিব পদে উন্নীত হয়ে স্থানীয় সরকার বিভাগ, পাট মন্ত্রণালয় এবং মৎস্য ও পশু মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। পরে তিনি প্লানিং কমিশনের সদস্য ছিলেন। বাংলাদেশ সরকার ও ইউনিসেফের এ্যাডভাইসরী চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সেমিনারে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব্য রাখেন। ১৯৯১-১৯৯৩ সালে তিনি জাপান ও ফিলিপাইনে রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে রুপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। মোহাম্মদ আবু হেনা ১৯৯৬ সালে ৬ এপ্রিল প্রধান নির্বাচন কমিশনারের দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। এ পদে থাকাকালীন অত্যন্ত দক্ষতা ও নিষ্ঠার সাথে ১৯৯৬ সালের নির্বাচন সম্পন্ন করেন। পাঁচ বছর সাংবিধানিক এ পদে থেকে কার্য সম্পাদনে সুনাম অর্জন করেন। সরকারি দায়িত্বের পাশাপাশি সমাজসেবায় তিনি অনবদ্য ভূমিকা রেখেছেন।


বাংলাদেশ স্কাউট এসোসিয়েশনের পক্ষে আন্তর্জাতিক কমিশনার হিসেবে ১৯৭৮ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত কাজ করেন। এশিয়া প্যাসিফিক আ্ঞ্চলিক স্কাউট কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। বাংলাদেশ স্কাউট আন্দোলনে তিনি বিশেষ ভূমিক রাখেন। স্কাউট আন্দোলনে বিশেষ ভুমিকা রাখায় ১৯৮৫ সালে তাঁকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হয়। ১৯৯৪ সালে তাঁকে স্কাউটের আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ পদকে ভূষিত করা হয়। রাজবাড়ি একটি অনুন্নত জনপদ হিসেবে পরিচয় বহন করে আসলেও বর্তমান সে প্রেক্ষাপট অনেকাংশেই বদলে গেছে। এর পিছনে রয়েছে জন মানুষের কর্মপ্রয়াসসহ কিছু মহৎ ব্যক্তির পথনির্দেশ। তাদের মধ্যে আবু হেনা অন্যতম। পাংশা ইউনিয়ন কাউন্সিলকে পৌরসভা এবং রাজবাড়ি পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত করতে তাঁর দান অনস্বীকার্য। বলা যায় তাঁর প্রচেষ্টাতেই এ কাজ সম্পন্ন হয়। রাজবাড়ির মানুষ গর্বভরে এ কথা স্মরণ করে। তাঁর প্রচেষ্টায় রাজবাড়ি জেলায় রাস্তা ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও সংস্কারসহ নানা কাজ সম্পন্ন হয়। রাজবাড়ি-কুষ্টিয়া মহাসড়ক, খোকশা সেনগ্রাম বাহাদুরপুর তারাপুর রাস্তা নির্মাণে তাঁর বিশেষ অবদান রয়েছে। তাঁর স্বপ্নসাধ পাংশায় পদ্মা ব্যারেজ নির্মাণ এখনো বাস্তবে রুপলাভ করেনি। অথচ এ ব্যারেজ নির্মিত হলে ভেরামারা কুষ্টিয়া, মাগুরা, রাজবাড়িসহ উত্তর দক্ষিণ জেলাসমূহে সেচ ব্যবস্থায় বিপুল কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি পেত। অন্যদিকে সেনগ্রাম, জৌকুড়া, রাজবাড়ি এবং ফরিদপুরের নদী ভাঙ্গন রোধ করা যেত। তিনি বাহাদুরপুরে একটি আলিম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি ঢাকায় হাইকেয়ার স্কুলের সভাপতি। তাঁর উদ্যোগে ঢাকাস্থ রাজবাড়ি সমিতি গড়ে ওঠে এবং তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি রাজশাহী ও চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সভাপতি ছিলেন। বাংলাদেশ মেডিক্যাল স্টাডি এন্ড রিসার্স ইনস্টিটিউটের উপদেষ্টা। তিনি কাজী মোতহার হোসেন ফাউন্ডেশনের সভাপতি। রঞ্জন নামক স্বেচ্ছায় রক্তদান সমিতির পৃষ্ঠপোষক। জাতি তথা শিক্ষা, সমাজ উন্নয়নে তাঁর অবদান কৃতজ্ঞচিত্তে দেশবাসী স্মরণ করবে।

মোতাহার হোসেন

মোতাহার হোসেন স্কুলের ছাত্র থাকাকালীন গ্রামের শিক্ষা বিবর্জিত মানুষ একজন মা ও তাঁর সন্তানের জীবন সংগ্রামের গল্প বলত। মাতা আর্থিক কষ্টে দিনাতিপাত করে কীভাবে তাঁর একমাত্র সন্তানকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করল, পিতৃহারা সন্তান কিভাবে ধ্যানস্থ ঋষির মতো একনিষ্ঠতায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে জীবনযুদ্ধে জয়ী হল, এই ছিল গল্পের সার বস্তু। সে গল্প মন দিয়ে শুনতাম। এ গল্পের প্রভাব যে আমার উপর পড়েছিল তা আজ অস্বীকার করতে পারি না। পরিণত বয়সে তাঁর সাথে আমার দুবার দেখা হয়েছে। তাঁর সরল বাক্য, বিন্ম্র স্বভাব, অতি সাধারণ জীবনাচরণ দেখে বিমোহিত হয়েছি। এই মানুষটি মোতাহার হোসেন। ১৯৩৭ সালের ৩০ নভেম্বর রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলাধীন পাটবাড়িয়া গ্রামে মোতাহার হোসেন জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোজফফর হোসেন, মাতা আমেনা খাতুন। ছাত্র হিসেবে ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী, একনিষ্ঠ ও বিনয়ী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে এমএ এবং লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকস থেকে এমএসসি ডিগ্রিপ্রাপ্ত । প্রথমে মাগুরা কলেজে অধ্যাপনা এবং এরপর পাকিস্তান সুপিরীয়র সার্ভিসে যোগদান করে করাচীতে অবস্থান। অর্থনীতিতে মেধাসম্পন্ন মোতাহার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতিতে গবেষণা ও শিক্ষাকতায় যোগ দেন। পুনরায় সরকারি চাকরিতে যোগদান করে প্লানিং কমিশনে এ্যাসিস্ট্যান্ট চীফ।


১৯৭৬ সালে উপসচিব পরিসংখ্যান বিভাগে যোগদান। অতিরিক্ত দায়িত্বে পরিচালক সার্ভে এবং জয়েন্ট সেনসাস কমিশনার। উপ-সচিব, হিসেবে অর্থ মন্ত্রণালয়, ত্রান ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয় এবং যুগ্ন-সচিব হিসেবে সংস্থাপন মন্ত্রণালয় এবং অতিরিক্ত সচিব হিসেবে ফিশারীজ ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন এর চেয়ারম্যান এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি প্রশাসনিক সংস্কার কমিটি (নুরবনী কমিটি) পূর্ণকালীন সদস্য। অতঃপর টার্নওভার ট্যাক্স কমিশনের পূর্ণকালীন সদস্য হিসেবে কাজ করেন। তিনি বিশ্বব্যাংক ইউরোপীয়ন কমিশন এবং এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করেছেন।

লেখক ও গবেষক হিসেবে তাঁর লেখা বই------

  1. Livestock and poultry population in East Pakistan (1968)
  2. Graduate job seekers in Bangladesh (1988)
  3. Sugarcane production in East pakistan-1970
  4. Timber trueds in East pakistan policies and program
  5. Methods and practice of statistics in Bangladesh
  6. The system of government budgeting
  7. The system of Accounting of Bangladesh
  8. Development Administration in Bangladesh

শেষোক্ত গ্রন্থ বাংলা একাডেমী কর্তৃক ভাষান্তর। তাঁর লেখা গবেষণামূলক এসকল গ্রন্থ বাংলাদেশের উন্নয়নের দিকনির্দেশা, সহায়ক ও নানা ক্ষেত্রে সমাধান। এছাড়া তিনি ‘জীবন সায়হ্নে’ পুঞ্জিভূত সংলাপ’ ‘আধারের কত রুপ’ গল্পগ্রন্থের লেখক। এ মহান মানুষটি এত কাজের ফাঁকেও ভুলে যান না জন্মস্থানের মাটি ও মানুষকে। বারবার ফিরে আসেন আপন মাটির টানে। নির্মাণ করেন মানুষের কল্যাণে রাস্তা - ঘাট শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। হাতে নেন নানা উন্নয়ন প্রকল্প। বাংলাদেশ হাট থেকে মৃগী বাজার পর্যন্ত রাস্তাটি তাঁর সহযোগিতায় নির্মিত। সাধারণ্যে সড়কটি ‘মোতাহার হোসেন রোড’ বলে পরিচিত। তাঁর মায়ের নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন, ‘আমেনা বিদ্যাপীঠ’ মহৎ ব্যক্তি রাজবাড়ির গর্ব, অহঙ্কার।

ড. কেএম মোহসীন

পাংশার হাবাসপুর, বাহাদুরপুরে জন্ম নিয়েছেন দেশের প্রথিতযশা সাহিত্যিক রাজনীতিবিদ, প্রশাসক, শিক্ষক, সমাজসেবক। তাঁদের ভিড়ে কেএম মোহসীন এক উজ্জ্বল নাম। তিনি মনে-প্রাণে শিক্ষক। শিক্ষকতার মহান পেশাকে গ্রহণ করে দেশ ও জাতির জন্য যে অবদান রেখেছেন তা বিশেষভাবে স্বরণীয়। শিক্ষকতার পাশাপাশি একজন শেকড় সন্ধানী গবেষক হিসেবে বাংলাদেশের ইতিহাসের পাতায় সংযোজন করেছেন নব অধ্যায়। জাতিসত্ত্বায় সূচনা করেছেন নব চেতনা, নব ভাবনা। আমার অপরিপক্ক হাতে রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসের প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হলে এ পণ্ডিত ইতিহাসবিদ আমাকে প্রশংসামূলক পত্র দেন। প্রথম সংস্করণে অনেক ভুল ত্রুটি থাকা সত্ত্বেও তাঁর প্রশংসাপত্র পেয়ে আমি অনুপ্রেরণা লাভ করি। দ্বিতীয় ও তৃতীয় সংস্করণে আমি পত্রটি যথাস্থানে সন্নিবেশিত করেছি।

কেএম মোহসীন ১৯৩৮ সালে ২৮ মে রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলাধীন হাবাসপুর গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা আব্দুল কাদের খান। মেধাবী ছাত্র হিসেবে হাবাসপুর কে রাজ হাইস্কুল থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা কৃতিত্বের সাথে পাশ করে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে ভর্তি হন। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে অনার্স ও এমএ পাস করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন।


১৯৬২ সালে চাখার ফজলুল হক কলেজে প্রথম যোগদান। ১৯৬৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারি অধ্যাপক হিসেবে ইতিহাস বিভাগে যোগদান। ১৯৭২ সালে একই বিভাগে সহযোগী অধ্যাপক এবং ১৯৮৩ সালে প্রফেসর পদে যোগদান। হাউস টিউটর সূর্যসেন হল (১৯৬৭-১৯৭৩), প্রভোস্ট সলিমুল্লাহ হল (১৯৮৩-১৯৮৯), বিভাগীয় চেয়ারম্যান (১৯৮৩-১৯৮৭), কলা অনুষদের (১৯৯১-১৯৯৩), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি (১৯৯৩), ইতিহাস সমিতির সেক্রেটারী (১৯৮০-১৯৮১)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোভার স্কাউটের শিক্ষক উপদেষ্টা ছিলেন। ১৯৭৪ সালে দিল্লীতে গান্ধী পিস ফাউন্ডেশন কর্তৃক ফেলোশীপ লাভ করেন। ১৯৭৪-১৯৭৫ সালে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক কমনওয়েলথ একাডেমিক স্টাফ কর্তৃক তাঁকে ফেলোশিপ প্রদান করা হয়। ১৯৮৫-১৯৮৭ সালে জাপান বাংলাদেশ গবেষণা টিমের সদস্য। ১৯৯৪-১৯৯৫ ওসাকা ইউনিভার্সিটি অব ফরেন সার্ভিস ফেলোপ্রাপ্ত হন।

গবেষক হিসেবে কেএম মহসিনের রয়েছে অমূল্য অবদান। এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ পত্রিকার সম্পাদক ১৯৮৩, ৮৮, ৮৯ । সভাপতি সম্পাদনা পরিষদ ২০০৪, ২০০৫। বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতির পত্রিকা ১৯৮০, ৮১। সেক্রেটারী হিস্ট্রি অব বেঙ্গল কমিটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১৯৭৫, ১৯৭৬। সদস্য বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস প্রকল্প ১৯৭৮-১৯৮৫। সম্পাদক বাংলার ইতিহাস, (পঞ্চম খণ্ড) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সদস্য সম্পাদনা পরিষদ ঢাকা পোস্ট, প্রজেক্ট এন্ড ফিউচার, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ। তিনি বঙ্গভবনের শতবর্ষের ইতিহাস গ্রন্থ প্রকল্পের চেয়ারম্যান ছিলেন।

বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চায় এবং মুক্তিযুদ্ধের দলিল প্রণয়নে তাঁর অনেক গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। ৪০টিরও বেশি গবেষণামূলক প্রবন্ধ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ এবং বাংলা একাডেমী কর্তৃক প্রকাশিত। বিটিভিতে ইতিহাস ও ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিয়মিত আলোচনায় অংশগ্রহণ। তিনি এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশের জীবন সদস্য। এ প্রতিষ্ঠানের কাউন্সিলর। জীবন সদস্য বাংলাদেশ ইতিহাস সমিতি। বাংলাদেশ স্কাউটের জাতীয় কমিশনার। ইউনাইটেড ন্যাশনস এসোসিয়েশনস অব বাংলাদেশের সদস্য। সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেট। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন সিনেট সদস্য। জীবন সদস্য সলিমুল্লাহ মুসলিম হল এ্যালামনাই এসোসিয়েশন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যালামনাই এসোসিয়েশন। সদস্য বাংলাদেশ জাদুঘর। জন্মভূমির সাথে তাঁর নিবিড় সম্পর্ক। রাজবাড়ির মাটি ও মানুষ তাঁর প্রিয়। হাবাসপুর-বাহাদুরপুর প্রাক্তন ছাত্র সমিতির সদস্য। সদস্য ‘পাংশা থানা সমিতি’, ‘রাজবাড়ি জেলা সমিতি’, ‘সাবেক ফরিদপুর চাকরিজীবী কল্যাণ সমিতি’। শিক্ষা, সেমিনার, আন্তর্জাতিক সম্মেলনে নিয়মিত যোগদান। রাজবাড়ি জেলার মানুষের শিক্ষা সংস্কৃতি বিকাশে তাঁর অবদান অসামান্য।

অধ্যাপক আব্দুল গফুর

অধ্যাপক আব্দুল গফুর রাজবাড়ি জেলার এক কীর্তিমান পুরুষ যিনি ভাষা আন্দোলন, বাংলা ভাষার লালন এবং ভাষার উৎকর্ষ সাধনে অপরিসীম ভূমিকা রাখায় একুশের পদকে ভূষিত হয়েছেন। ২০০৫ সালে তাঁকে এ সম্মাননা প্রদান করা হয়। তিনি কেবল ভাষাসৈনিক নন, প্রথিতযশা সাংবাদিক, শিক্ষক, সংগঠক, সাহিত্যিক, গবেষক। জাতীয় চেতনা বিকাশে নিরলস কর্মী। তাঁর অবদান জাতি গর্বভরে স্মরণ করে। ইসলামী মূল্যবোধের অনুরক্ত অধ্যাপক আব্দুল গফুর জাতিত্ববোধে ধর্ম বর্ণ গোত্র ভেদে একজন আদর্শ মানুষ হিসেবে পরিচিত। আধুনিক চেতনার ধারক ও বাহক। লেখনী, বক্তৃতা, কর্মপ্রবাহের মাধ্যমে তিনি মানুষের কাছে চেতনার বার্তাই পৌঁছে দেন।


অধ্যাপক আব্দুল গফুর ১৯২৯ সালে রাজবাড়ি জেলার খানগঞ্জ ইউনিয়নের দাদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মোঃ হাবিল উদ্দিন মুন্সী ও মাতা শুকুরুন্নেসা খাতুন। পাবনা জেলার তামিলনগর জুনিয়র মাদ্রাসা থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে ফরিদপুর ময়েজ উদ্দিন হাই মাদ্রাসায় ভর্তি হন। ফরিদপুর মাদ্রাসা থেকে ১৯৪৫ সালে বোর্ডের পরীক্ষায় ২য় স্থান অধিকার করেন। অতঃপর ঢাকা গভর্নমেন্ট ইসলামিক ইন্টারমিডিয়েট কলেজ থেকে ১৯৪৭ সালে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় মেধা তালিকায় নবম স্থান অধিকার করেন। এসময় তিনি পাকিস্তান আন্দোলন, সাংবাদিকতাসহ রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৬২ সালে সমাজকল্যাণে কৃতিত্বের সাথে এমএ ডিগ্রি গ্রহণ করে ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। অতঃপর ঢাকা আবুজর গিফারী কলেজে সমাজকল্যাণের অধ্যাপক নিযুক্ত হন।

সাংবাদিকতা, সম্পাদকীয়, কলামিস্ট হিসেবে অধ্যাপক আব্দুল গফুর অত্যন্ত পরিচিত নাম। সাংবাদিকতা দিয়েই তাঁর কর্মজীবন শুরু। ১৯৪৭ সালে পাক্ষিক ‘জেন্দেগী’ তে তিনি কাজ শুরু করেন। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি সাপ্তাহিক সৈনিকে প্রথম সহ-সম্পাদক ও পরে সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৭ সালে মিল্লাত ও ১৯৪৮ সালে ‘দৈনিক নাজাত’ পত্রিকাতেও সহকারী সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭১ সালে দৈনিক আজাদের বার্তা সম্পাদক। ১৯৭২ সালে দৈনিক পিপলসের সহকারী সম্পাদক। ১৯৭৯-৯০ দৈনিক দেশ এর সহ-সম্পাদক। ১৯৮৬ সালে দৈনিক ইনকিলাবের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে উক্ত পত্রিকার ফিচার সম্পাদকের দায়িত্বে আছেন। তিনি এক সময় চট্রগ্রাম যুবকল্যাণ অফিসার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৯-৬০ পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের সুপারিনটেনডেন্ট এর দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৮০-১৯৮৯ পর্যন্ত ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ এর প্রকাশনা পরিচালক ছিলেন।

অধ্যাপক আব্দুল গফুর ছাত্রজীবন থেকেই স্বদেশ প্রেমে উদ্বুদ্ধ। দেশের প্রতি অনুরক্ততায় মানুষ, শিল্প, সাহিত্য, ভাষা, সংস্কৃতি উজ্জীবন তাঁর আরাধ্য কাজ। তাই পাকিস্তানিরা যখন  এদেশের মানুষের সংস্কৃতি আর মাতৃভাষার প্রতি আঘাত হেনেছিল, অধ্যাপক গফুর তখন কেবল প্রতিবাদই করেননি, প্রত্যক্ষভাবে সে আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছেন, আন্দোলনকে বেগবান করেছেন, জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। ১৯৪৮ সালে ভাষা আন্দোলন সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হলে তিনি সে পরিষদের সাথে সংশ্লিষ্ট হন। মাতৃভাষার দাবি আদায়ের লক্ষ্যে আবুল কাশেমের নেতৃত্বে তুমদ্দুন মজলিশ গঠিত হলে তিনি দাবি আদায়ের লক্ষ্যে তমুদ্দন মজলিশের সদস্য হিসেবে সার্বক্ষণিক নিজেকে ব্যস্ত রাখেন। তমুদ্দন মজলিশেল মুখপত্র হিসেবে ১৫ নভেম্বর ১৯৪৮ এ সাপ্তাহিক সৈনিক পত্রিকা প্রকাশিত হলে আব্দুল গফুরসহ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫২ সালের একুশ ফেব্রুয়ারির মিছিলে অংশগ্রহণ করেন। ভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য তাঁকে তিনমাস আত্মগোপনে কাটাতে হয়। ভাষা আন্দোলনসহ বাংলা ভাষার সাহিত্যচর্চা ও ভাষার উৎকর্ষতা সাধনে তাঁকে ২০০৫ সালে একুশে পদকে ভূষিত করা হয়।

তাঁর লেখা প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশেরও বেশি। উল্লেখযোগ্য গ্রন্থগুলো-----

‘ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও ইসলাম’, ‘বিপ্লবী ও ঘর’, ‘পাকিস্তানে ইসলামী আন্দোলন’, ‘কর্মবীর সোলায়মান’, ‘সমাজকল্যাণ পরিক্রমা’, ‘খোদার রাজ্য’, ‘কুরআনী সমাজের রুপরেখা’, ‘ইসলামের জীবন সৃষ্টি’, ‘শ্বাশত নবী’, ‘আসমান জমিনের মালিক’, ‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম’, ‘স্বাধীনতার গল্প শোন’, ‘বাংলাদেশ ও আমার স্বাধীনতা’, ‘আমার কালের কথা’, ইত্যাদি।

তাঁর লেখা আমার কালের কথা গ্রন্থে রাজবাড়ি জেলার অনেক প্রামাণ্য চিত্র উঠে এসেছে। অধ্যাপক আব্দুল গফুর রাজবাড়ি জেলাবাসীর এক প্রিয় নাম।


আহমেদ আতাউল হাকিম

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের আওতাধীন হয়েও স্বাধীন সত্ত্বায় কাজ করে এমন সাংবিধানিক পদ স্বল্পসংখ্যক। প্রধান বিচারপতি, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কম্পট্রোলার এ্যান্ড আডিটর জেনারেল সাংবিধানিক পদভুক্ত। এসব পদ যেমনি সম্মান তেমনি দায়িত্বভার বহন করে। বাংলাদেশের অভ্যূদয় থেকে এ পদে যাঁরা অধিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের সংখ্যাগত পরিমাণও খুব বেশি নয়। রাজবাড়ি জেলায় দুইজন কৃতি সন্তান কর্মগুণে এসব পদের অধিকারী হয়েছেন। আহমেদ আতাউল তার মধ্যে একজন।

সদালাপী, বিনয়ী, কর্তব্যনিষ্ঠ, অনাড়ম্বর জীবনে অভ্যস্থ আহমেদ আতাউল হাকিম রাজবাড়ি শহরের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা- আজাহার উদ্দিন আহমেদ মানবসেবায় নিবেদিত একজন চিকিৎসক ছিলেন। নিজ ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ওসমান মেডিক্যাল হলে সকাল-সন্ধ্যা নিয়মিত রোগীর ব্যবস্থাপত্র দিতেন। এর জন্য কোনো বিনিময় মূল্য নিতে দেখা যায়নি। তিনি রাজবাড়ি জেলা স্কুলের সেক্রেটারী রাজবাড়ি কলেজের গভর্নিংবডির সদস্যসহ নানা সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠানের সাথে জড়িত ছিলেন। মন-মানসিকতায় তিনি ছিলেন উদার, পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র। সাধারণ্যে তার পরিচিতি ছিল ক্লীন ম্যান হিসেবে। তাঁর সকল সন্তানকে দেশ মাতৃকার সেবায় উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করেছিলেন। সন্তানদের মধ্যে সততা, শৃংখলা মানবিকতা ধর্মানুরাগ, সকল গুণের সঞ্চারণ ঘটিয়েছিলে

এ পরিবারের তৃতীয় সন্তান আতাউল হাকিম শিশুকাল থেকেই কর্তব্যনিষ্ঠ, শান্ত এবং মেধাবী। লেখাপড়া শুরু রাজবাড়ি বালিকা বিদ্যালয়ে (বর্তমান সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে তখন ছেলে ও মেয়েদের প্রাথমিক শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল)। অতঃপর টাউন মক্তব প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে তৎকালীন গোয়ালন্দ মডেল হাই স্কুলে (বর্তমান সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হন। তিনি কৃতিত্বের সাথে ৮ম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিলাভ করেন। অতঃপর মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় মেধা স্থান অধিকার করেন। ঢাকা ইউনিভার্সিটি থেকে অর্থনীতিতে সম্মান ও এমএ পাস করেন। বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিরীক্ষা বিভাগে যোগদান করেন। সততা ও কর্তব্যনিষ্ঠায় তিনি উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হন। রাজবাড়ি জেলার পক্ষ থেকে তাঁকে গণসংবর্ধনা দেওয়া হয়। রাজবাড়ি সরকারি কলেজ, রাজবাড়ি সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে তাঁকে সংবর্ধনা জানানো হয়। দেশ ও মানুষের কল্যাণে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। তিনি রাজবাড়ি জেলার গৌরব ও অহঙ্কার।

মাওলানা আনম আমিনুল ইসলাম

‘মুখপত্র বিকিরণ’ প্রকাশকাল ১৯৯৩, প্রকাশক প্রাথমিক শিক্ষা ঢাকা বিভাগ-মুখপত্র বিকিরেণে প্রাথমিক শিক্ষা ঢাকা বিভাগের উপ-পরিচালক কলিম উদ-দীন আহমদ ‘বরণীয় যারা’ নিবন্ধে মাওলানা আনম আমিনুল ইসলাম সম্বন্ধে লিখেছেন, ‘দেশে বহু শিক্ষক ও কর্মকর্তা আছেন যাঁরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে যথেষ্ট নিষ্ঠাবান ও দক্ষ। তারা নিরলসভাবে শিক্ষার আলোকবর্তিকা বহন করে সামনে এগিয়ে চলেছেন। সেইসব নিবেদিতপ্রাণ ব্যক্তিবর্গের কয়েকজন যারা তাদের অবদানের স্বীকৃতি লাভ করেছেন তাদের মধ্যে একজন হচ্ছেন আনম আমিনুল ইসলাম।’ ‘শিক্ষা ছাড়া চলে না’ --এটি নিরেট সত্য কথা। এই সত্যের বিস্তার ঘটান শিক্ষক। তাই শিক্ষক শ্রদ্ধেয়, গুরুজন, জাতি গঠনের রুপকল্পকার।


তিনি আরো শ্রদ্ধাবান যদি তিনি হন টোল, গৃহগুরু বা প্রাথমিক স্তরের শিক্ষক। কারণ শিক্ষা নামের অতিকায় বৃক্ষটির প্রাথমিক বীজ অঙ্কুরিত হয় তার হাতে। এরপর ব্যক্তিক জীবনে শিক্ষার ধারণা নানা ডালপালা মেলে পত্র-পল্লবে, রঙে, রেখায় বিকশিত হয়। অঙ্কুরোদগমের কার্যটি সহজ মনে হলেও তা সহজ নয়। কারণ অফলা পতিত জমিনকে তাকেই শ্রম, মেধা, ধৈর্য দিয়ে সরস করতে হয়। এ কাজের প্রতি মমত্ববোধই একজন শিক্ষককে শিক্ষাবিদে পরিণত করে। বৈশ্বিক আয়-উপার্জনের পাথেয় বলে যে সমস্ত শিক্ষক শিক্ষাদানে ব্রতী আছেন তারা শিক্ষক কিন্তু শিক্ষাবিদ নন। আনম আমিনুল ইসলাম একজন শিক্ষাবিদ কারণ পেশাকে তিনি নেশা হিসাবে গ্রহণ করেছেন, পেশার আওতার বাইরে শিক্ষা বিস্তারে প্রতিনিয়ত আত্মনিবেদনে ব্যস্ত আছেন।

ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, জেলা ও দায়রা জজ মোঃ তফাজ্জল হুসাইন, এবিএম নুরুল ইসলামের স্নেহধন্য আনম আমিনুল ইসলাম পাংশা উপজেলাধীন বিকয়া ইউনিয়নের মুছিদাহ গ্রামে ১৯৫০ সালে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা তৈয়বুর রহমান ছিলেন সাদা মনের মানুষ। মাতা আজিরন নেছা’র ও ছিল শিক্ষার প্রতি বিপুল আগ্রহ। তিনি ১৯৭০ সালে মাদ্রাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা থেকে কামিল ডিগ্রি অর্জন করেন। এছাড়াও পরবর্তীকালে ক্বারীয়ানা, সিভিল ডিফেন্স, সিইনএডসহ নানা প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। কর্মজীবনে তিনি প্রথমে বিকয়া হাইস্কুলে শিক্ষকতা শুরু করেন। দীর্ঘসময় প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পর সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার হিসেবে অবসর গ্রহণ করেন। তিনি বিভিন্ন সময়ে মাদ্রাসা, রেজিস্টার প্রাথমিক বিদ্যালয়, উচ্চ বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে নানাভাবে সহায়তাদান করেন। তিনি মুছিদহ-বনগ্রাম সিনিয়র মাদ্রাসার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। একজন প্রতিষ্ঠিত ইমাম, ক্বারী ও তেজস্বী বক্তা। তিনি পুঁইজোর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিদ্যোৎসাহী সদস্য। পড়, পড়াও, পড়ার ব্যবস্থা কর এটাই তার আরাধ্য বিষয়। তিনি ফুরফুরা শরীফের বড়পীর মরহুম হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রঃ) এর মুরীদ। বর্তমানে পাংশাসহ জেলার সকল স্তরের শিক্ষা বিস্তারে নানাভাবে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।

Additional information