স্মরণীয় যাঁরা-২

সপ্তদশ অধ্যায়

স্মরণীয় যাঁরা-২

ভাষাসৈনিক মুন্সী মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন

ভাষার দাবি আদায়ে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, যারা শহীদ হয়েছেন তাঁরা স্মরণীয়, বরণীয়। তাঁদের মধ্যে একজন গর্বিত সন্তান রাজবাড়ি জেলার মুন্সী মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন। ভাষার অধিকার আদায়ে তাঁর সাহসী উচ্চারণ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এদেশের ছাত্র বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদসহ সকল স্তরের মানুষ। মুন্সী তোফাজ্জেল হোসেন সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে জীবন বাজি রেখে আন্দোলনকে সফল করার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তা জেনে শিহরিত হতে হয়।

১৯২০ সালের ১৭ ফেব্রয়ারি রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার অন্তর্গত মৃগী ইউনিয়নের পাটকিয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মুন্সী মোঃ বছির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি পাটকিয়াবাড়ি মাইনর স্কুল থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পাস করে রামদিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হন। অতপর ফরিদপুর খ্রিস্টান মিশনারী টেকনিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি স্কুলে অধ্যায়নকালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় তিনি বৃটিশ সেনাবাহিনীর মটর ভেহীকেল ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কোরে যোগদান করেন। চাকরি ও সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি ইরান, ইরাক, প্যালেস্টাইন, মিশর লিবিয়া, ইটালি, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করেন।বিশ্বযুদ্ধ শেষ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে তিনি ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। পাকিস্তানের রিসালপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানকালে পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের সেনাদের গঞ্জনা, ঘৃণা, অবহেলা দেখে তিনি ব্যথিত হন। বাঙালি সেনারা বাংলা ভাষার কথোপকথনকালে তারা বাধা দিত।

১৯৫০ সালে তিনি ৬০৪ কম্বাইড ওয়ার্কশপে বদলী হয়ে আসেন।১৯৪৮ সাল থেকেই পূর্ব-পাকিস্তানিদের মধ্যে ভাষার দাবি নিয়ে সংগঠিত হতে থাকে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজ এ বিষয়ে অগ্রহী ভূমিকা পালন করে। তিনি ছাত্রসমাজকে নানা ঝুঁকির মধ্যে তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন। ১৯৫২ সালে ছাত্ররা বাঙালি সেনাদের নিকট আর্থিক সহযোগিতা কামনা করে। এসময় তিনি সৈনিকদের নিকট থেকে চার হাজার টাকা সংগ্রহ করে সলিমুল্লাহ হলের সেক্রেটারীর নিকট প্রদান করেন। নানা ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট মুন্সী তোফাজ্জেল হোসেন। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে শহীদ হন। তিনি ছদ্মবেশে সেখানে উপস্থিত হন। বিষয়টি গুপ্তচরদের মাধ্যমে জানাজানি হয়। সেনাবাহিনী কোড অমান্য করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফায়ার রেঞ্জে নেওয়ার পূর্বে জিওসি শেষবারের মতো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বীরের মৃত্যুতে ভয় নেই একথা ভেবে তোফাজ্জেল হোসেন খোশ মেজাজে জিওসির সম্মুখে দাঁড়ান। জিওসি বলেন----‘দো ঘন্টা বাদ তোমকো গোলিসে হালাক কারদেগা, আওর তোম হাস রাহত।’ মুন্সি তোফাজ্জেল জবাব দেন----‘হাসনা যে জি জিয়ে রোনা কাহে কি, সবকই মরনা হোগা একদিন।’ জিওসি জিজ্ঞাসা করেন----আচ্ছা বাতাও--- ‘কই তোমকো মদদ কী ‘ এর উত্তরে তিনি বলেন------`Firstly I am a soldier of Pakistan and I love Pakistan. Pakistan has two wings. West Pakistan people speak Urdu and it is there mother Langueage. East Pakistan speak Bengali and it is their mother langueage. I am East Pakistani and I am Bengali and I helpe sliederts. Now whatever you can do as you like. কিছুসময় নিরব থেকে কোর্ট স্থগিত ঘোষণা করলেন। এরপর রাউয়ালপিন্ডি ওয়ারলেস করে সামরিক ব্যারিস্টারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ব্যারিস্টার বিবরণ শুনে বলেন---- `How can you shoot him?  He is telling he is pakistani and he loves his mother langueage as I love my mother langueage Urdu.' এরপর গুলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এই সৈনিক ১৯৬৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যুবক ছেলেদের প্রশিক্ষণ দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন।

Additional information