স্মরণীয় যাঁরা-২ - পৃষ্ঠা নং-১৩

এ আদর্শে অনুপ্রাণিত একেএম রফিক উদ্দিন। তাঁকে দেখা যায় অর্জিত সম্পদের অংশবিশেষ প্রতিনিয়তই ব্যয় করে চলেছেন মানবকল্যাণে। দীন-দুঃখীদের অর্থ সাহায্য তাঁর নৈমত্তিক আদর্শ। সেবার এ ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সেবার হস্ত প্রসারিত হয়েছে বিভিন্নমুখী সমাজকর্ম সম্পাদনে, দেশে বিদেশে। কেবল জাতীয় ভাষায় তিনি কিংবদন্তির ‘দাতা’ শ্রেষ্ঠ’ বলেই নন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তিনি ‘ Man for the men'  বলে পরিচিত।

কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নয়, নয় কোনো স্বার্থ, কেবল সেবার প্রেরণায় তাঁর দান অনুদানে নির্মিত হলো পাংশা কলেজের (বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক্রম অনার্স মাস্টার্স অনুমোদিত) ‘জহুরুন নেসা ভবন’, মাছপাড়া ডিগ্রি কলেজের ‘খলিল উদ্দিন কলা ভবন’, মাজুরিয়া  ‘জোহরা জেরীন’ উচ্চ বিদ্যালয় ভবন, হোসেনডাঙ্গা ‘নিলুফার রফিক উচ্চ বিদ্যালয়’, বনগ্রাম ‘একেএম রফিকউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ভবন’ গোপালপুর ‘রাফাত রেষাদ কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয় ভবন’, কলিমোহর ‘খলিল ‍উদ্দিন মিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানা ভবন’, ‘কলিমোহর জহুরননেসা স্কুল এন্ড কলেজ ভবন’সহ জেলার অন্যান্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়, ভবনসমূহ।

জেলাটির কৃষি ও কৃষক পরিবারের ভাগ্যোন্নয়নে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠা করেছেন কলিমোহর জহুরুননেসা কৃষি ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউটি ভবিষ্যতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপদান করা তাঁর স্বপ্ন। পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন, ‘খলিল উদ্দিন মিয়া ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন’। সকল মানুষকে ধর্ম চর্চায় অনুপ্রাণিত করতে তিনি গড়ে তুলেছেন সর্ব-ধর্মীয় পাঠাগার। ইতিমধ্যে কলিমোহর একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন, যা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হবে। কলিমোহর একটি ইউনিয়ন ও বাজার। রাস্তাঘাট পাকা করার কাজ সহ, নানাভাবে সজ্জিতকরণে গ্রামটি আদর্শ গ্রামে পরিণত হয়েছে। রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার ঐতিহ্যবাহী সিরাজপুর হাওড়ের কোল ঘেঁষে কলিমোহর গ্রামটিতে ১৯৪২ সালের ১৫ নভেম্বর এক সম্ভ্রান্ত বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা খলিল উদ্দিন মিয়া ও মাতা জহুরুন নেসা। খলিল উদ্দিন মিয়াকে সবাই জজ সাহেব বলে জানত। তিনি ছিলেন বিচার বিভাগের জেলা জজ। রফিকউদ্দিন ১৯৫৮ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ম্যাটিকুলেশন, ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বুয়েট) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল) ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি জাপান থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং (ফবট্রাস) এন্ড ম্যানেজমেন্টের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পেশা জীবনে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত বিল্ডিং ডাইরেকটোরেটের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার, ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স (পাকিস্তান) লিঃ এর রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, ১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত বাংলাদেশ কনসালটেন্টস লিঃ এর সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

একেএম রফিক উদ্দিন একজন ব্রতচারী কর্মীপুরুষ। যাঁর নিসঙ্গ ভাবনার প্রধান অনুষঙ্গ অনুন্নত গরীব দেশটির মানুষ, আর মানুষদের কল্যাণ। ক্ষুদ্র কোনো ভাবনা নয় বরং বৃহত্তর পরিসরে উপযুক্ত কর্মপ্রচেষ্টাই এ দেশের মানুষের বেকারত্ব হ্রাস ও মেধার যথোপযুক্ত ব্যবহার হতে পারে। এই প্রত্যয় নিয়ে তিনি ১৯৭০ সালে ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্সি লিঃ (ডিডিসি) প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজ দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। এই কোম্পানিতে নিয়োজিত আছেন ৫০০ জনের অধিক ইঞ্জিনিয়ার, টেকনোক্রাট, ইকোনোমিস্ট, সোস্যালিস্ট এবং ৭০০ জনের অধিক অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী। দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, বিল্ডিং, রোডস, হাইওয়েজ, ব্রিজ, পুল, কালভার্ট। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ইঞ্জিনিয়ারিং জগতের অন্যতম দুর্লভ গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড’ ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক অনুকূল পারিবারিক পরিবেশ তাঁকে শিল্প সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তা চর্চা করতে সদা তৎপর থাকেন। পরিশীলিত, ‍উদার মনের এ মানুষটি সেবা ও কর্মের জন্য রাজবাড়ির মানুষের নিকট পরিচিত ও প্রিয় মানুষ। সামাজিক কাজের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁকে প্রদান করা হয়েছে ‘জসীম উদদীন স্বর্ণপদক’। এই মহৎপ্রাণ মানুষটি দীর্ঘজীবী হোক, মানবকল্যাণে তাঁর হস্ত আরো প্রসারিত হোক, মন ছুঁয়ে যাক মানুষ, বৃক্ষ, নদী, হাওয়া, আকাশকে। রাজবাড়ি জেলার মানুষের কাছে তথা সারাদেশে মানবসেবায় ‘কিংবদন্তির নায়ক’ এ অভিধাভূষণে তিনি ইতিহাসের পাতায় ভূষণ হয়ে থাকবেন।

 

Additional information