স্মরণীয় যাঁরা-২ - পৃষ্ঠা নং-১০

এরজন্য বিপুল অংকের অর্থের প্রয়োজন। হয়ত এ স্বপ্নসাধ পূরণেই তিনি লন্ডন গেলেনে। ডা. আবুল হোসেনের এ স্বপ্ন সাধের কথা তখন বুঝতে পারিনি। স্বামী-স্ত্রী সেখানে কাজে নিয়োজিত হন। ৪০ বছরের শ্রমে সংগ্রহ করেন অর্থ। পিতার অগাধ সম্পত্তির কানাকড়িও গ্রহণ করেন না। একাকি পিতা আলহাজ্ব আবদুল করিম বসবাস করেন নিভৃত পল্লী ভবদিয়ায়। দীর্ঘদেহী গৌকান্তির আব্দুল করিম নিরহঙ্কার সদালাপী। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ তার আপনজন। তাদের মুখ দেখেই তিনি একমাত্র সন্তানকে ভুলে থাকেন। সন্তান মাঝেমধ্যে আসেন ছেলে সন্তানদের নিয়ে। একদিনের কথা। ১৯৯৩ অথবা ১৯৯২ সাল। বর্তমান ‘নজর মওলা প্লাজা’ ছিল না। ব্যবসায়ী মজিবর রহমান সেখানে জুতার ব্যবসা করতেন। সেখানে আবদুল করিম-এর সাথে কথা। তাঁর পরিবার ও ডাক্তার সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করি। কথায় কথায় তিনি বলছিলেন, এই সেদিন দুই নাতী এসেছে। ওরা সেখানে ডাক্তারি পড়ে। হয়েছে কী, আমি জাংলা থেকে অনেকগুলো লাউ কেটে ঝাঁকায় তুলেছি, রাজবাড়ি হাটে আনব বলে কামলার অপেক্ষা করছি। তখন বড় নাতি বলে -----‘দাদা লোক লাগবে কেন আমার মাথায় উঠিয়ে দিন। আমি বয়ে নিয়ে যাব।’ খাঁটি মানুষের খাঁটি কথা। যোগ্য মানুষের যোগ্য উত্তরসূরী। আমাদের ছেলে সন্তানেরা একটুখানি উপর ক্লাসে উঠলেই কাজতো দূরের কথা একটি বাজারের ব্যাগ নিতে সংকোচ বোধ করে। সাধারণ কাজের মধ্যেই যে জীবনের সাফল্য এ কথা ভুলে যাই। ঐ বছরেই প্রায় ৩৫ বছর পর ডা. আবুল হোসেনের সাথে দেখা। তরিতরকারির দোকানে সওদা কিনছি। পাশে দাঁড়ানো লোকটির গায়ে সাধারণ পোষাক, পায়ে চটি জুতা, গৌরবর্ণের ছয়ফুট উচ্চতার লোকটির মুখে শ্মাশ্রু। চিনতে ভুল হল ন। এমন অবস্থায় সাধারণ পণ্যের বাজারে তাঁকে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না তিনিই সেই এমবিবিএস লন্ডনে বসবাসরত আবুল হোসেন। জিজ্ঞাসা করলাম ----আপনি এখানে? তিনি বললেন, কেন? আপনার গাড়ি কৈ? ব্যাগটানার মানুষ কই? এভাবে এই বাজারে? মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, কি অসুবিধা এতে? আহমদ আলীর কবিতা দিয়ে আবুল হোসেনের গল্পের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করি-----

 রাজবাড়ি জেলাধীন বরাট ইউনিয়ন

পদ্মা বিধৌত ধন্য ভবদিয়া গ্রাম

পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা, সুজলা সুফলা

জ্ঞানি গুণীর জন্ম দিয়া হইল উজালা।

রাজবাড়ি জেলার উত্তর পূর্বপ্রান্তে বরাট ইউনিয়নের ভবদিয়া গ্রামে ডা. আবুল হোসেন জোতদার পরিবারে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্ম নেওয়া ছেলেটির গায়ের বর্ণ সোনাররঙের। ভবদহ থেকে ভবদিয়া। দহ, ভাঙ্গন, তল, সমতল, ধান পাটের সবুজশ্যামল বন শীতের সরষে ফুলের হলুদ রং তার কচি প্রাণে নাচন তোলে। পদ্মার প্রশস্ততার মতই তার হৃদয়ের প্রশস্ততা বাড়তে থাকে। বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় সকলের উপরে। বিনয় ভদ্রতায় গুরুজনেরা পরিতুষ্ট। পিতা আব্দুল করিম মোল্লা আল্লাহপ্রেমিক খাঁটি মুসলমান। পাড়া প্রতিবেশী, আপনজন, রাখাল, কামলা, পরেত, দুস্থ, অসহায়ের দয়ার সাগর। কলেরা, বসন্ত, ম্যালিরিয়ায় আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। ভাঙ্গনের, বন্যার মানুষকে আশ্রয় দেন। যুবক আবদুল করিম ভাবেন ছেলে যদি মানুষের মতো মানুষ হয় তাহলে একদিন গ্রামের মানুষের কাজে আসবে।

আবদুল করিমের স্বপ্ন বিফলে যায় না। ছেলে ডাক্তার হল। অর্থের সংস্থান হল। এবার মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করা। অনেক স্বপ্ন তাঁর মনে। সাধ্যের মধ্যে কোনোটি আগে? আবুল হোসেন ৪৩ এর দুর্ভিক্ষ দেখেছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ও প্রয়োজনীয়তার উম্মাদনা দেখেছেন। পাকিস্তানিদের শোষণ শাসন দেখেছেন, দেখেছেন মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার কুটচাল।

Additional information