স্মরণীয় যাঁরা-২

সপ্তদশ অধ্যায়

স্মরণীয় যাঁরা-২

ভাষাসৈনিক মুন্সী মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন

ভাষার দাবি আদায়ে যারা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে অংশগ্রহণ করেছেন, যারা শহীদ হয়েছেন তাঁরা স্মরণীয়, বরণীয়। তাঁদের মধ্যে একজন গর্বিত সন্তান রাজবাড়ি জেলার মুন্সী মোঃ তোফাজ্জেল হোসেন। ভাষার অধিকার আদায়ে তাঁর সাহসী উচ্চারণ, প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা ভাষা আন্দোলনের ইতিহাসে এক উজ্জ্বল স্বাক্ষর। ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন এদেশের ছাত্র বুদ্ধিজীবী, শিল্পী, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদসহ সকল স্তরের মানুষ। মুন্সী তোফাজ্জেল হোসেন সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে জীবন বাজি রেখে আন্দোলনকে সফল করার যে প্রচেষ্টা চালিয়েছেন তা জেনে শিহরিত হতে হয়।

১৯২০ সালের ১৭ ফেব্রয়ারি রাজবাড়ি জেলার পাংশা উপজেলার অন্তর্গত মৃগী ইউনিয়নের পাটকিয়াবাড়ি গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মুন্সী মোঃ বছির উদ্দিন আহমেদ ছিলেন আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি পাটকিয়াবাড়ি মাইনর স্কুল থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পাস করে রামদিয়া হাই স্কুলে ভর্তি হন। অতপর ফরিদপুর খ্রিস্টান মিশনারী টেকনিক্যাল ইন্ডাস্ট্রি স্কুলে অধ্যায়নকালে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ শুরু হয়। এ সময় তিনি বৃটিশ সেনাবাহিনীর মটর ভেহীকেল ম্যাকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার কোরে যোগদান করেন। চাকরি ও সামরিক প্রশিক্ষণে তিনি ইরান, ইরাক, প্যালেস্টাইন, মিশর লিবিয়া, ইটালি, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ায় অবস্থান করেন।বিশ্বযুদ্ধ শেষ এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব হলে তিনি ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীতে যোগদান করেন। পাকিস্তানের রিসালপুর ক্যান্টনমেন্টে অবস্থানকালে পাকিস্তানি সেনাদের দ্বারা পূর্ব পাকিস্তানের সেনাদের গঞ্জনা, ঘৃণা, অবহেলা দেখে তিনি ব্যথিত হন। বাঙালি সেনারা বাংলা ভাষার কথোপকথনকালে তারা বাধা দিত।

১৯৫০ সালে তিনি ৬০৪ কম্বাইড ওয়ার্কশপে বদলী হয়ে আসেন।১৯৪৮ সাল থেকেই পূর্ব-পাকিস্তানিদের মধ্যে ভাষার দাবি নিয়ে সংগঠিত হতে থাকে। বিশেষ করে ছাত্রসমাজ এ বিষয়ে অগ্রহী ভূমিকা পালন করে। তিনি ছাত্রসমাজকে নানা ঝুঁকির মধ্যে তথ্য দিয়ে সাহায্য করতেন। ১৯৫২ সালে ছাত্ররা বাঙালি সেনাদের নিকট আর্থিক সহযোগিতা কামনা করে। এসময় তিনি সৈনিকদের নিকট থেকে চার হাজার টাকা সংগ্রহ করে সলিমুল্লাহ হলের সেক্রেটারীর নিকট প্রদান করেন। নানা ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্ট মুন্সী তোফাজ্জেল হোসেন। ১৯৫২ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভাঙতে গিয়ে শহীদ হন। তিনি ছদ্মবেশে সেখানে উপস্থিত হন। বিষয়টি গুপ্তচরদের মাধ্যমে জানাজানি হয়। সেনাবাহিনী কোড অমান্য করায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁকে গুলি করার নির্দেশ দেওয়া হয়। ফায়ার রেঞ্জে নেওয়ার পূর্বে জিওসি শেষবারের মতো তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। বীরের মৃত্যুতে ভয় নেই একথা ভেবে তোফাজ্জেল হোসেন খোশ মেজাজে জিওসির সম্মুখে দাঁড়ান। জিওসি বলেন----‘দো ঘন্টা বাদ তোমকো গোলিসে হালাক কারদেগা, আওর তোম হাস রাহত।’ মুন্সি তোফাজ্জেল জবাব দেন----‘হাসনা যে জি জিয়ে রোনা কাহে কি, সবকই মরনা হোগা একদিন।’ জিওসি জিজ্ঞাসা করেন----আচ্ছা বাতাও--- ‘কই তোমকো মদদ কী ‘ এর উত্তরে তিনি বলেন------`Firstly I am a soldier of Pakistan and I love Pakistan. Pakistan has two wings. West Pakistan people speak Urdu and it is there mother Langueage. East Pakistan speak Bengali and it is their mother langueage. I am East Pakistani and I am Bengali and I helpe sliederts. Now whatever you can do as you like. কিছুসময় নিরব থেকে কোর্ট স্থগিত ঘোষণা করলেন। এরপর রাউয়ালপিন্ডি ওয়ারলেস করে সামরিক ব্যারিস্টারকে ঢাকায় নিয়ে আসেন। ব্যারিস্টার বিবরণ শুনে বলেন---- `How can you shoot him?  He is telling he is pakistani and he loves his mother langueage as I love my mother langueage Urdu.' এরপর গুলির আদেশ প্রত্যাহার করা হয়। এই সৈনিক ১৯৬৫ সালে সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করেন এবং বর্তমানে অবসর জীবনযাপন করছেন। তিনি ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে যুবক ছেলেদের প্রশিক্ষণ দেন এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেন।


ভাষার প্রতি গভীর মমত্ববোধে মুন্সী তোফাজ্জেল হোসেন জীবন বাজি রেখেছেন, ভাষার দাবি আদায়ে অকুতোভয় সৈনিকের ভূমিকা পালন করেছেন। ২০০৬ সালে ২১ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসন কর্তৃক আয়োজিত বইমেলায় (রাজবাড়ি সরকারি উচ্চ বালক বিদ্যালয় মাঠে) তাঁকে ভাষাসৈনিক হিসেবে সংবর্ধনা দেওয়া হয়।

মোঃ হামিদুল হক (ভোলা মিয়া)

১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষা আন্দোলনে যাঁরা যোগদান করেন তাদের মধ্যে হামিদুল হক (ভোলা মিয়া) একজন। তিনি তখন ঢাকা কায়েদে আজম কলেজের ছাত্র। ছাত্রকালীন তিনি রাজনীতি সচেতন ছিলেন এবং ভাষার দাবিতে ছাত্রদের সংগঠিত করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি তিনি ছাত্রদের নিয়ে মিছিলে যোগ দেন। পুলিশের ব্যারিকেড ও গুলির মুখে কায়েদে আজম কলেজে আত্মগোপন করেন। সেখান থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে জেল হাজতে প্রেরণ করা হয়। হামিদুল হক বড় আঙ্গারীয়া, শাহাজাদপুর পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মহব্বতজান চৌধুরী ছিলেন তৎকালীন অনার্স গ্রাজুয়েট। ১৯৫৮ সালে রাজবাড়ির কাজীকান্দায় স্থায়ী বসতি স্থাপন করেন। হামিদুল হক মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের প্রেস সেক্রেটারী ছিলেন। বর্তমানে তিনি কাজীকান্দায় অবসর জীবনযাপন করেছেন। 

এবিএম সাত্তার

সুদীর্ঘকাল শিক্ষকতার পেশায় থেকে এবিএম সাত্তার শিক্ষার সঙ্কট নিরসনে সর্বক্ষেত্রে বলিষ্ঠ ভুমিকা রেখে চলেছেন। জাতীয় জীবনে শিক্ষার গুরুত্বের ভাবনা ছাত্রজীবন থেকেই তাকে পেয়ে বসে, ফলে এ মেধাবী ছাত্রটি পেশা হিসেবে বেছে নেন শিক্ষকতা। কৃতিত্বের সাথে তিনি শিক্ষকতা করেছেন কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ, সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, সরকারি সারদা সুন্দরী মহিলা কলেজ, সরকারি নাজিমউদ্দিন কলেজ উলিপুর সরকারি ডিগ্রি কলেজ, ইয়াছিন কলেজ এবং ঝিনাইদহ সরকারি কেসি কলেজ। উপাধ্যক্ষ ও অধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন কেসি কলেজে। বর্তমান শিক্ষার সঙ্কট তাকে ভাবিয়ে তোলে, তিনি রচনা করেন জ্ঞানগর্ভ গবেষণামূলক প্রবন্ধ ‘কতিপয় শিক্ষা ভাবনা ---- এখনই সময়’ যা শিক্ষার সঙ্কট নিরসনে ও শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত। যশোর বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক ও চেয়ারম্যান হিসেবে শিক্ষার মান উন্নয়নসহ পরীক্ষায় দুর্নীতি দমনে বলিষ্ঠ ভূমিকা ও প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। শিক্ষার ক্ষেত্রে অবদান রাখায় ১৯৯৭ সালে শিক্ষা সপ্তাহে তিনি জাতীয় পর্যায়ে শ্রেষ্ঠ কলেজ শিক্ষক নির্বাচিত হন এবং প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক স্বর্ণপদকে ভূষিত হন। তিনি একজন প্রবন্ধকার, সাহিত্যবেবী। তার লেখা ধর্ম, দর্শন, সাহিত্য, ইতিহাস এবং শিক্ষাবিষয়ক প্রবন্ধ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। মুক্তিযুদ্ধ তার স্মৃতিতে নাড়া দেয়। তিনি রচনা করেছেন ‘ব্যালাড অফ এ ফ্রিডম ফাইটার্স’ তিনি ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদ ও নজরুল পরিষদের সভাপতি। ফরিদপুর জেলা শিল্পকলা একাডেমী, বায়তুল মোকাদ্দেম ট্রাস্ট এর প্রাক্তন সম্পাদক ছিলেন। স্থানীয়ভাবে হাসপাতাল, বিদ্যালয়, এতিমখানা এবং সাহিত্য সংস্কৃতি ও জনকল্যাণমুখী অরাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও বিকাশে অবদান রেখে চলেছেন। এবিএম সাত্তার গোয়ালন্দ উপজেলার বরাট গ্রামে ১ আগস্ট জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা মোঃ মোকসেদ আলী মিয়া এবং মাতা বেগম সোনাভান খানম।


একেএম শামসুদ্দোহা (বাবু মাস্টার)

রাজবাড়ি জেলার নাড়ুয়া ইউনিয়ন শিক্ষা-দীক্ষায় এবং আর্থিকভাবে এ জেলার বর্ধিষ্ণু এলাকা। ১৯৫১ সালে নাড়ুয়া লিয়াকত আলী স্মৃতি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে এ অঞ্চলে শিক্ষার ব্যাপক প্রসার লাভ করে। যে সমস্ত শিক্ষাবিদ শিক্ষা প্রসারের ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখে গেছেন তার মধ্যে মরহুম আব্দুল ওয়াজেদ, মোঃ নজরুল ইসলাম, আহম্মেদ হোসেন, মোঃ দেলোয়ার হোসেন, মোঃ জনাব আলী, মোঃ আজিজুল ইসলাম, অশ্বিনী কুমারসহ আরো অনেকের নাম স্মরণীয়। বিদ্যালয়ের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী বর্তমানে প্রশাসক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক, রাজনীতিবিদ হিসেবে দেশ ও জাতির সেবা করে চলেছেন। এ বিদ্যালয়ের উন্নয়নসহ শিক্ষা বিস্তারে নিবেদিত প্রাণ ব্যক্তিত্ব অত্র বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক  একেএম শামসুদ্দোহ (বাবু মাস্টার)। পাটকিয়াবাড়ির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। শিক্ষাজীবনের ফাঁকে ফাঁকেই তিনি এ বিদ্যালয়ের শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতেন। অতঃপর তিনি প্রায় ৩৫ বছর এ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। তাঁর প্রচেষ্টায় বিদ্যালয়টি কলেজিয়েট বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়েছে। ছিপছিপে গড়ন, চেহারায় প্রতিভার ছাপ, পণ্ডিত, সফল শিক্ষক, বিশিষ্ট সমাজসচেতন ও দরদি মানুষ হিসেবে পরিচিত।

ডা. একেএইচএম সিরাজুল হক (মুকুল)

ডা. সিরাজুল ইসলাম এলাকায় ডা. মুকুল বলে পরিচিত একজন নিবেদিত প্রাণ চিকিৎসক। তিনি এমবিবিএস (ঢাকা), এফসিপিএস (ঢাকা), এফআরসিপি (এডিন) এফএসিসি (আমেরিকা)। ঢাকা হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের পরিচালক ছিলেন। ডা. সিরাজুল  ইসলাম হৃেোগ বিশেষজ্ঞ এবং বর্তমানে বঙ্গবন্ধু মেডিকেল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক এবং কার্ডিওলজি বিভাগ প্রধান। তিনি পৃষ্ঠপোষক হেফা (বেথুলিয়া মাটিপাড়া), পৃষ্ঠপোষক শামসুল হক বে-সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, উপদেষ্টা ডায়াবেটিকস সমিতি, রাজবাড়ি। তার নেতৃত্বে এলাকায় বিনা পারিশ্রমিকে হৃদরোগীদের চেক-আপ ও ব্যবস্থাপত্র প্রদান করা হয়। তিনি রাজবাড়ি জেলা সমিতি পরিচালনার মাধ্যমে রাজবাড়ি জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে সংশ্লিষ্ট।

অ্যাডভোকেট সৈয়দ রফিকুছ সালেহীন

পাংশায় এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সৈয়দ রফিকুছ সালেহীন। রাজবাড়ি জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি। আইনশাস্ত্রে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে রাজবাড়ি বারে আইনজীবী হিসেবে যোগদান করেন। তিনি দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের সাথে ছাত্রজীবন থেকেই সংশ্লিষ্ট হন। সৈয়দ রফিকুছ সালেহীন মানবসেবায় নিবেদিত প্রাণ। পেশাগত হিসেবে একজন আইনজ্ঞ এবং সুবক্তা। সত্যই সুন্দর এ মর্মবাণী সৈয়দ রফিকুছ সালেহীনের নীতি। তিনি রাজবাড়ি বার এসোসিয়েশনের সভাপতি ছিলেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে কাজ করেছেন।

সিরাজুল মজিদ মামুন

সিরাজুল মজিদ মামুন দেশের প্রখ্যাত সংবাদপাঠক। তিনি বেতার ও টিভিতে নিয়মিত সংবাদ পাঠ করেন। সিরাজুল মজিদ মামুনের পৈত্রিক নিবাস রাজবাড়ির পাংশা থানার মাজবাড়ি গ্রামে। তিনি একজন প্রকৌশলী। 

 


অস্কার বিজয়ী নাফিজ বিন জাফর

অস্কার বিজয়ী নাফিজ বিন জাফরমুভি জগতের ‘নোবেল’ বলে পরিচিত ‘অস্কার’ প্রাপ্ত নাফিজ বিন জাফর রাজবাড়ির সন্তান। হলিউড কর্তৃক প্রদত্ত বিশ্বের সেরা অভিনেতা, অভিনেত্রী, চলচ্চিত্রকার পরিচালক এবং চলচ্চিত্রের অন্যান্য শাখার কলাকুশলীগণ প্রতিবছর এ পুরস্কারে ভূষিত হন। কেবলমাত্র ২০০৮ এ মুভি জগতের প্রযুক্তি ব্যবহারে ভিন্ন ধারা ‍সৃষ্টির জন্য সায়েন্টফিক এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং এওয়ার্ড শাখায় ‘অস্কার’ লাভ করেন নাফিজ বিন জাফর। এই প্রথম বাংলাদেশের কোনো কৃতিসন্তান এই বিরল সম্মাননা লাভ করেন সমাজ ও সভ্যতার অগ্রায়নে চলচ্চিত্রের ভূমিকা যে কোনো মাধ্যমের তুলনায় অধিক গুরুত্ব বহন করে আসছে। অচল থেকে সচল; অবাক থেকে সবাক, সাদাকালো থেকে রঙিন চলচিত্র বিকাশের ধারায় নানা প্রযুক্তির সংযোজন ঘটেছে। অভিনয়, সংগীত, ছন্দ, দৃশ্যশৈলীতে দর্শক শ্রোতা মুগ্ধ হয়। কিন্তু এর নির্মাণশৈলী সৃষ্টি হয় নেপথ্য প্রযুক্তির কৌশলে। নাফিজ বিন জাফর যে প্রযুক্তির সংযোজন করেছেন তা অভিনব ও বিস্ময়কর। ঝড়, প্লাবন, জলোচ্ছাস, ভাঙ্গন এসব দৃশ্যাবলী আমরা চলচ্চিত্রে দেখে থাকি। এ সব দৃশ্যায়ন প্রযোজক, পরিচালককে যেমন দৃশ্য ধারণে মাস বা বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হয়, তেমনি তা কষ্টসাধ্য ও ব্যয়বহুল কিন্তু নাফিজ কম্পিউটার প্রযু্ক্তির সাহায্যে  যে প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছেন তা হচ্ছে এমন যে, ঢাকা শহর বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসে তলিয়ে যাচ্ছে, সেটির উপর দিয়ে জাহাজ চলছে বা ভূ-কম্পনে শহর ভেঙ্গে চুরমার ধুলিসাৎ হয়ে গেল বা অগ্নিকাণ্ডে শহরটি পুড়ে ছাড়খাড় হল, প্রচণ্ড ঝড়ে সব কিছু তছনছ হল কিন্তু বাস্তবে কোনো পানি, ভূ-কম্পন, ঝড় বা আগুন নেই। কম্পিউটার সফটঅয়্যার প্রযুক্তির মাধ্যমে তিনি এ অভিনব কাজটি করেছেন। তার পুযুক্তি দ্বারা ব্যবহৃত ছবি ‘লর্ড দ্য কিং’ এরপর ‘ডে আফটার টুমরো’। আরো ফিল্ম হল---- ‘স্টিলথ ফ্লাগ অব আওয়ার’ ‘পাইরেসি অব দ্য ক্যারাবিয়ান’ ইত্যাদি। সভ্যতা বিকাশে উদ্ভাবনের সূত্র বিস্তারের মতই নাফিজের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়ছে বিশ্বের এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্তে। তার এ অবদানের জন্য বিশ্ব মুভ্যি জগতের সেরা পুরস্কার প্রদানকারী সংগঠন লস এঞ্জেলসভিত্তিক একাডেমী অব মোশন পিকচার্স আর্টস এন্ড সায়েন্সের ৭৯ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম যুক্ত হল বাংলাদেশের নাম। ২৯ বছরের যুবক রাজবাড়ির নাফিজ বিন জাফর এর নায়ক। ৯ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ হলিউডের বিভারলি উইলশায়ার মিলনায়তনে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের খ্যাতনামা অভিনেত্রী জেসিকা এলবা এ এওয়ার্ড বিতরণ করেন। এওয়ার্ড নিয়ে পেডিয়াসে বক্তব্যের সময় তিনি বাংলাদেশের মানুষ, নিস্বর্গের কথা তুলে ধরেন। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উ্জ্জ্বল করেন।

রাজবাড়ি শহরের ঐতিহ্যবাহী কাজীকান্দার জাফর বিন বাশারের একমাত্র সন্তান নাফিজ বিন জাফর। মাতা নাফিসা জাফর। নাফিসের বয়স যখন দশ বছর তখন বাবা পরিবারসহ আমেরিকাবাসী হন। নাফিসের চাচা কাজী আব্দুল মাসুদ ও কাজী আব্দুল আলিম রাজবাড়ির কাজীকান্দায় বসবাস করেছেন। নাফিস বিন জাফরের মামা সৈয়দ ময়নুল হোসেন সাভার জাতীয় স্মৃতিসৌধের পরিকল্পনাকারী স্থপতি। নাফিস একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার। কাজ করেন লস এঞ্জেলস সিটির ভ্যানিসে অবস্থিত ‘ডিজিটাল ডোমেইন’ নামক ফার্মে। মূলত তিনি সফটঅয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।

 মা-মাটি-মাতৃভূমি। মাতৃভূমির প্রতি মানুষের নাড়ির টান। সময় সুযোগ হলেই এ মাতৃভূমির টানে ছুটে আসেন স্বদেশে ভূমিতে। তার চেয়েও বড় কথা তিনি ছুটে আসেন পিতা মাতার বাস্তভিটা রাজবাড়ির কাজীকান্দায়। অস্কার প্রাপ্তির পরপরই গৃহের সন্তান কাজীকান্দায় আসেন। আনন্দের অভিব্যক্তিতে সিক্ত করেন নিজেকে। শহরের সকল স্তরের মানুষ তাকে ‘আমাদের সন্তান’ বলে সংবর্ধনা প্রদান করেন।


প্রফেসর অধ্যক্ষ মোহাম্মদ আলী খান

অত্যন্ত মেধাবী, শিক্ষাবিদ, সুবক্তা, সমাজসেবক, ধার্মিক প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান। তিনি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে স্নাতক শ্রেণিতে ডিসটিংশনসহ প্রথম বিভাগে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান ১৯৪০ সালে পাংশা উপজেলার চৌবাড়িয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৭ সালে গণিতে লেটারসহ ম্যাট্রিক পাস করে রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএসসি ও স্নাতক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিদ্যায় কৃতিত্বের সাথে এমএসসি পাস করেন। তিনি ১৯৬৪ সালে রাজবাড়ি কলেজে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। পরবর্তীতে প্রফেসর পদে উন্নীত হন এবং ১৯৯৫ সালে রাজবাড়ি সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ পদে নিয়োজিত হন। ১৯৯৭ সালে অবসর গ্রহণ করেন।

পদার্থ বিজ্ঞনের সফল শিক্ষক হিসেবে তাঁর ব্যাপক খ্যাতি রয়েছে। কেবল বিজ্ঞান বিষয়েই নয়, রাজনীতি, রাষ্ট্র বিজ্ঞান, ইতিহাস, সাহিত্য, দর্শন ও ধর্ম বিষয়ে তিনি গভীর জ্ঞানের অধিকারী। দীর্ঘসময় রাজবাড়ি কলেজের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের দায়িত্বে থেকে তিনি উক্ত বিভাগে প্রভূত উন্নতি সাধন করেন। অধ্যক্ষ থাকাকালীন লাইব্রেরি উন্নয়ন, খেলার মাঠ উন্নয়ন, মসজিদ উন্নয়ন, পুকুর ঘাট বাঁধানো, বৃক্ষ রোপন, কলেজে ভূতপূর্ব অধ্যক্ষের ছবি সংগ্রহ করে অধ্যক্ষের কক্ষ সজ্জিতকরণসহ অনার্স মাস্টার্স শ্রেণির উন্নতি সাধন করেন। তিনি অত্র অঞ্চলের হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রীর শিক্ষাগুরু। শিক্ষার প্রদীপ হাতে এ ব্রতচারী শিক্ষাবিদ ‍উচ্চ শিক্ষার আলোকে আলোকিত করেছেন। সমাজসেবায় রয়েছে তাঁর অনন্য অবদান। তিনি আরএসকে ইনস্টিটিউশন, অঙ্কুর স্কুল এন্ড কলেজ, শেরে বাংলা বিদ্যালয়, আবুল হোসেন কলেজ, শিশুকল্যাণ প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাজবাড়ি ল’ কলেজ, রাজবাড়ি হোমিওপ্যাথিক কলেজসহ প্রবীন হিতৈষী সংঘ, আঞ্জুমানে মফিদুল ইসলাম, বিশ্ব মানবধিকার ব্যুরো, রাজবাড়ি সরকারি কলেজ উন্নয়ন সংস্থা, হাফেজিয়া কওমী মাদ্রাসা, তাবলীগ জামাত, আয়না সমাজকল্যাণ সংস্থা, রাজবাড়ি কলেজপাড়া শান্তি কমিটি, কমিউনিটি পুলিশ কমিটি এরুপ সমাজকল্যাণমূলক অসংখ্য সংস্থার সহ সভাপতি, প্রধান উপদেষ্টা, জীবন সদস্য, আহবায়ক, দাতা সদস্য, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতির রাজবাড়ি শাখার সভাপতি। সমাজকল্যাণে নিবেদিত প্রাণ প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান রাজবাড়ির মানুষের নিকট শ্রদ্ধেয় নাম।

ডা. গোলাম মোস্তফা

রাজবাড়ি শহরে অতিপরিচিত এবং বিশিষ্ট চিকিৎসক ডা. গোলাম মোস্তফা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি চিকিৎসক হিসেবে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা করতেন। এভাবেই তিনি দেশ সেবায় আত্মনিয়োগ করেন। ডা. গোলাম মোস্তফা রাজবাড়িতে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সভাপতি। তিনি বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত। স্মৃতিচারণে লেখক তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছে। বাসায় শখের বসে একটি দেশী কুকুর পুষেছিলাম। নানাভাবে প্রশিক্ষণে কুকুরটি খুবই প্রভুভক্ত হয়। কুকুরটি রাবিস আক্রান্ত হয়ে ক্ষিপ্ত হয় এবং আমার উরুতে কামড় দিয়ে রক্তাক্ত করে। ডা. গোলাম মোস্তফা অতিযত্নের সাথে ১৪টি ইনজেকশন নিজ হাতে নাভিতে পুশ করেন এবং নানা পরামর্শ দেন। এর জন্য তিনি কোনো ফি গ্রহণ করেননি। রাবিস আক্রান্ত কুকুরের কামড়ে মৃত্যু অবধারিত। ইনজেকশন নেওয়ার পরও অনেক রোগী মারা যায়। হয়ত তাঁর দক্ষ হাতের ইনজেকশন পুশ এবং পরামর্শ আমাকে সে যাত্রা রক্ষা করেছে।


 তরুণ বিজ্ঞানী সাইফুল ইসলাম

রাজবাড়ি কলেজের প্রাণী বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক তেজেন্দ্র কুমার চন্দের অনুপ্রেরণায় মাছের ক্ষত রোগের কারণ ও ঔয়ধ উদ্ভাবন করে জাতীয় বিজ্ঞান সপ্তাহে শ্রেষ্ঠ পুরস্কারপ্রাপ্ত হন সাইফুল ইসলাম। সেই থেকে সাইফুলের চলা। দেশব্যাপী তখন মাছের ক্ষত রোগের প্রাদুর্ভাব চলছে। তার ঔষধ আবিস্কার এলাকায় সাড়া পড়ে যায়। মৎস্যচাষীদের মধ্যে আবার আশার সঞ্চার হয়। এরপর সাইফুল জগন্নাথ কলেজে প্রাণিবিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়। অতঃপর জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি জাদুঘর কর্তৃক তরুণ ও অপেশাদার বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ফেলোশীপ বৃত্তি লাভ করে। ১৯৯৪ সালে বাংলাদেশ ইউনেস্কো জাতীয় কমিশন দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়ার আঞ্চলিক কার্যালয়ের সহায়তায় ইউনেস্কো আযোজিত সপ্তাহে পুরস্কার লাভ করে। সাইফুলের গ্রামের বাড়ি গোপালপুর (মদাপুর) রাজবাড়ি। 

প্রফেসর সাইদুল হাসান

প্রফেসর সাইদুল হাসানের ছিল জ্ঞান অন্বেষণ ও শিক্ষার প্রতি গভীর অনুরাগ। উচ্চতর বিভিন্ন পেশায় যোগদানের সুযোগ থাকা সত্তেও শেষ পর্যন্ত শিক্ষা ক্যাডারে যোগদান করেন ১৯৭৪ সালে। দীর্ঘজীবনের শিক্ষাকতায় প্রথম যোগদান রাজবাড়ি কলেজে (১৯৭৪)। ১৯৭৪ সালে তিনি ময়মনসিংহ ক্যাডেট কলেজে যোগদান করেন। ঐ বছরই তিনি বিসিএস ক্যাডার (শিক্ষা) উদ্ভিদবিদ্যার প্রভাষক হিসেবে খুলনা বিএল কলেজে যোগদান করেন। এরপর তিনি ডিস্ট্রিক্ট পপুলেশন অফিসার হিসেব প্রেষণে দশ বছর কর্মরত থেকে বিএল কলেজের উদ্ভিদবিদ্যা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে যোগ দেন। অতঃপর যশোর সরকারি সিটি কলেজ, পটুয়াখালি সরকারি কলেজ, আজম খান কমার্স কলেজে উপাধ্যাক্ষের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি খুলনা সুন্দরবন কলেজের অধ্যক্ষ এবং খুলনা কলেজের অধ্যক্ষ এবং খুলনা বিএল কলেজের অধ্যক্ষের গুরুদায়িত্ব পালনের পর যশোর শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান এর দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবনযাপন করছেন। সাইদুল হাসান রাজবাড়ির সজ্জনকান্দা নিবাসী আব্দুর রহমানের (পুলিশ বিভাগের কর্মকর্তা) পুত্র। রাজবাড়ির মানুষের সাথে সাইদুল হাসানের অতি ঘনিষ্ঠতা। খুলনায় স্থায়ীবসতি গড়ে তুললেও বাবা, মা ও মাটির টানে প্রতিনিয়তই ছুটে আসেন রাজবাড়ি। রাজবাড়ি, খুলনা তথা দেশের সার্বিক কল্যাণে নানা কর্মকাণ্ডে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন।

ডক্টর শেখ মহঃ রেজাউল ইসলাম

রাজবাড়ি জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বাকসাডাঙ্গি গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের সন্তান। মধুখালি উপজেলাধীন মেঘচামী গ্রামে নানা বাড়িতে ১৯৬২ সালে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা মরহুম আজিজুল ইসলাম ছিলেন বালিয়াকান্দি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। মাতার নাম মরহুমা সালেহা বেগম। রেজাউল ইসলাম কিছুদিন নারুয়া এলএএম উচ্চ বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করেন। ১৯৭৮ সালে বালিয়াকান্দি পাইলট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে বিজ্ঞান বিভাগে মাধ্যমিক এবং ১৯৮০ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ, ফরিদপুর থেকে একই বিভাগে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করেন। ১৯৮৪ সালে শেরে - বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কৃষিতে স্নাতক ও বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ থেকে এমএস (কৃষিতত্ত্ব) করেন। পরবর্তী সময়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্যানতত্ত্বে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন।


তিনি ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসে যোগদান করেন। বর্তমানে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হিসেবে শরীয়তপুর সদর উপজেলায় কর্মরত আছেন। একজন বিশিষ্ট শিশু সংগঠক। এক সময়ে তিনি রেডিও কাব তথা ‘শাপলা শালুকের আসর’ এর জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। চাকরি জীবনে তিনি দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ছাড়াও ডেনমার্ক, জার্মান, সুইডেন প্রভৃতি দেশে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন

কাজী সিরাজুল ইসলাম খাজা

মানুষের কল্যাণ কামনায় নানাবিধ কর্মসংযোজনে নিয়োজিত একজন মানুষের নাম সিরাজুল ইসলাম। রাজবাড়ির মানুষের কাছে তিনি স্নেহ ও স্মৃতির পরশে ‘খাজা’ নামে পরিচিত। সংগ্রাম, স্থিতি ও বিকাশ এবং নিবেদন এই তিন কর্মের মধ্যে মানুষের সঠিক পরিচয়। যে মানুষ এ তিনটি কর্মের সমন্বয় ঘটাতে সক্ষম তিনিই সমাজ সংসারে প্রিয়তর মানুষ বলে পরিচিতি লাভ করেন। সিরাজুল ইসলামের মধ্যে এই তিন কর্মের  অপূর্ব সমন্বয় রয়েছে। পরিস্থিতির সম্মুখীন সংগ্রাম, দৃঢ় প্রত্যয় আর কর্তব্য কর্মের একনিষ্ঠতায় আপন ভুবন সৃষ্টিতে সচেষ্ট হন। তার জীবনের পথই তার পথের গন্তব্যস্থানে পৌঁছে দেয়। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। শিল্পপতির চেয়েও তাঁর বড় পরিচয় তিনি সমাজসেবক। রাজবাড়িতে ইতিমধ্যে শাপলা কিন্ডার গার্টেন স্কুল প্রতিষ্ঠা করেছেন যার ব্যয়ভার তিনি নিজে বহন করেন। রাজবাড়িতে তার উদ্যোগে গড়ে উঠেছে চিকিৎসার নিমিত্তে ‘হার্ট ফাউন্ডেশান’। বেড়াডাঙ্গা এক নং সড়কে হাসপাতাল নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। বিভিন্ন ক্লাব, সংগঠন, দুস্থদের অকাতরে অনুদান ও দান খয়রাত করেন। খাজার নিকট থেকে কেউ খালি হাতে ফেরে না এ বিষয়টি প্রবাদের মতো লোখমুখে শোনা যায়। সমাজসেবায় সিরাজুল ইসলাম দীর্ঘজীবী হন-এ কামনা সকলের।

 মানবকল্যাণে নিবেদিত এক নাম আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ

‘ধনে ধান্যে পুস্পে ভরা’ এ বাক্যের পূর্বাংশ রাজবাড়ির জন্য যথার্থ না হলেও পর অংশ সঠিক ও সত্য। মানবকল্যাণে অধিক সংখ্যক পুস্পের প্রষ্ফুটন ঘটেছে রাজবাড়ির মাটিতে। নানা পুস্পের ভিড়ে একটি পুস্পের নাম আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ। ফুল পাপড়ি মেলে, গন্ধ বিলায়। বিবর্ণ পাপড়ি, গন্ধ মিশে যায় মাটিতে, বাতাসে। কেবল মানবকল্যাণে ফোটা ফুল রেখে যায় স্মৃতি। মনের ক্যানভাসে ভেসে ওঠে তাঁদের ছবি। এমনি স্মৃতির আখর তিনি রেখে চলেছেন তাঁর কর্মের মধ্যে। মানবকল্যাণে তাঁর কর্মপরিধি কেবল বিস্তৃতই নয়, নির্মোহ এবং বহুমাত্রিক। শাহাবুদ্দিন আহমদ ১৯৪৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর পাংশা উপজেলার জয়কৃষ্ণপুর গ্রামে জন্মগ্রহন করেন। পিতা মুনসী দিয়ানত আলী। মাতা মোসাম্মাৎ মজিরন নেছা। ১৯৬২ সালে তিনি পাংশা হাবাসপুর কাসিম বাজার রাজ উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাটিকুলেশন পাস করেন। ১৯৬৪ সালে সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে আইএসসি এবং ১৯৬৬ সালে বিএসসি পাস করে ১৯৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি অর্জন করেন। প্রথমে তিনি বাংলাবাজার গভর্নমেন্ট গার্লস হাই স্কুলে শিক্ষকতা পেশায় নিয়োজিত হন। এলএলবি সনদ লাভের পর ১৯৬৯ সালে সাময়িক আইন পেশায় যোগ দেন। নানা চড়াই উৎড়াইয়ের মধ্যে বেড়ে ওঠা এ মানুষটি ১৯৭০ সালে পাক সায়েন্টিফিক এন্ড কেমিক্যাল মার্ট প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিজ্ঞান পাঠক্রমের যন্ত্রপাতি ব্যবসায় মনোনিবেশ করেন। যা স্বাধীনতা উত্তরকালে ‘সায়েন্টিফিক এন্ড কেমিক্যাল মার্ট’ নামে পরিচিত। বর্তমানে তিনি শাহাবুদ্দিন আহমদ এন্ড কোং মাল্টিটেক কম্পিউটারস এবং সায়েন্টিফিক সলিউশান প্রাঃ লিঃ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে সফল ব্যবসায়ী হিসেবে সুনাম অর্জন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বণিক সমিতির সহ-সভাপতি ছিলেন। ‘হায়রে পাতকি অর্থ তুই যত অনর্থের মূল’-গাজী মিয়ার বস্তানী গ্রন্থে মীর মশাররফ হোসেন এমন বাক্য ব্যবহার করেছেন প্রহসন অর্থে। আসলে অর্থ অনর্থের মূল নয়, যদি তা ব্যবহার হয় মানবকল্যাণে। এ দৃষ্টান্ত প্রতিষ্ঠা করেছেন শাহাবুদ্দিন আহমদ।


মানবকল্যাণে তার মুক্ত হস্ত প্রসারিত হয়েছে শিক্ষাবিস্তারে দান-অনুদানের কর্ম পরিধিতে। তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন মাদ্রাসা, কলেজ। তাঁর অনুদানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ নানা একাডেমী, নানা সমিতির ভবন। ড. কাজী মোতাহার হোসেন কলেজ; হাবাসপুর, পাংশা, রাজবাড়ি, আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ আদর্শ একাডেমী, আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ আদর্শ বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়; পাংশা, আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ জনক্যাণ ফাউন্ডেশন; ঢাকা আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ প্রশাসনিক ভবন; কালুখালি ডিগ্রি কলেজ, সাব্বির আহমদ অডিটরিয়াম; তারাপুর দাখিল মাদ্রাসা; পাংশা, মজিরুন্নেসা একাডেমী ভবন, আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ আদর্শ একাডেমী, মুন্সি দিয়ানত আলী প্রশাসনিক ভবন এর প্রতিষ্ঠাতা। জ্ঞানের বিকাশ ও অনুশীলনে তাঁর অনুদানে প্রতিবছর পাংশায় অনুষ্ঠিত হয় ‘আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ কুইজ প্রতিযোগিতা।’ তিনি ফরিদপুর মুসলিম মিশনের লিয়াজো কমিটি ঢাকা এর সদস্য এবং সভাপতি আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ জনকল্যান ফাউন্ডেশন; ঢাকা, জয়কৃষ্ণপুর জামে মসজিদ ও ইমাম কমিটি; ঢাকা। তিনি জয়কৃষ্ণপুর চাষী ক্লাব, রাজবাড়ি ইমাম কমিটি এবং অবসারপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি রাজবাড়ি শাখার প্রধান পৃষ্ঠপোষক। পৃষ্ঠপোষক মুছিদাহ বনগ্রাম আলিম মাদ্রাসা, তারাপুর জামে মসজিদ, গঙ্গানন্দদিয়া জামে মসজিদ, হাবাসপুর মিয়াবাড়ি জামে সমজিদ, আজিজপুর কওমী মাদ্রাসা পাংশা, হাবাসপুর বাজার জামে মসজিদ; পাংশা।

মেধা, ব্যক্তিত্ব, দান-অনুদানে তিনি সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রেজিস্ট্রার্ড গ্রাজুয়েট সোসাইটি, গুলশান সেন্ট্রাল মসজিদ ও ঈদগাহ কমিটি; ঢাকা, রাজবাড়ি জেলা সমিতি; ঢাকা, পাংশা উপজেলা সমিতি; ঢাকা, লায়ন্স ফাউন্ডেশন; আগারগাঁও ঢাকা, গুলশান সোসাইটি ঢাকা এর জীবন সদস্য। সদস্য বাংলা একাডেমী; ঢাকা, বাংলাদেশ চীন মৈত্রী সমিতি; ঢাকা, জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উল মাদানিয়া; যাত্রাবাড়ি, ঢাকা, ড. কাজী মোতাহার হোসেন ফাউন্ডেশন; ঢাকা, টিকাটুলি জামে মসজিদ। তিনি আইডিয়াল গার্লস কলেজ, পাংশা, অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম কলেজ, মীর মশাররফ হোসেন কলেজ, কালুখালি আয়না আদর্শ একাডেমী বায়তুল্যা কিন্ডার গার্টেন অংকুর স্কুল এন্ড কলেজকে বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি ও আসবাবপত্র অনুদানে শিক্ষাবিস্তারে বিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। সমাজসেবায় তিনি তাঁর কর্মপ্রবাহ নিয়মিত প্রশস্ত করে চলেছেন। ২১/০৯/২০১০ তারিখে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মচারী কল্যাণ সমিতি; রাজবাড়ি শাখার অফিস নির্মাণ কাজ উদ্ধোধন করেন। আড়ম্বরপূর্ণ উক্ত অনুষ্ঠানে তিনি সমিতির সভাপতি প্রফেসর মোহাম্মদ আলী খান সাহেবের হাতে ৪০.০০০.০০ টাকার একটি চেক প্রদান করেন। উল্লেখ্য ১১/১০/২০১০ তারিখে এলজিইডি মিলনায়তনে সম্মিলিত উন্নয়ন সংস্থার আয়োজনে উন্নয়ন শীর্ষক আলোচনা সভায় উক্ত সমিতির নির্মাণাধীন অসমাপ্ত ছাদের সমাপ্তি করনে আরও ৬০,০০০.০০ টাকার চেক অবসর সমিতির হাতে তুলে দেন। পৌর মেয়র কর্তৃক বরাদ্দকৃত উক্ত স্থানে তিনি অফিস সজ্জিতকরণে সহায়তা প্রদানে মোত ব্যক্ত করেন। তাঁর এ অনুদানে প্রফেসর কেরামত আলী প্রদত্ত ৫০ বস্তা সিমেন্টসহ অন্য সকলের সহায়তায় দীর্ঘ ২২ বছর পর জাতীয়ভিত্তিক এ সমিতির রাজবাড়ি শাখা স্থায়ী আশ্রয়ের ছাদের সন্ধান পেয়েছে। সমিতির হাজার সদস্য তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। এই মহৎ ব্যক্তি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, জাপানসহ প্রায় ১৫টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। তিনি চারবার পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন। দুই পুত্র, এক কন্যা, নাতি, ভাইবোনসহ বধিষ্ণু পরিবারের আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ দেশ ও জাতির সেবায় অনন্য অবদান রেখে চলেছেন। তিনি ‘রাজবাড়ি সম্মিলিত উন্নয়ন সংস্থা’র সভাপতি। তার প্রথম পুত্র সাব্বির আহমদ বিএ অনার্স যুক্তরাষ্ট্র, এমবিএ, একজন সফল ব্যবসায়ী ও সমাজহিতৈষী। দ্বিতীয় পুত্র সাবিত আহমদ বিএসসি যুক্তরাষ্ট্র, বিবিএ। মেয়ে ডা. সাদিয়া আফরিন এমবিবিএস।

আকাশকে ছোঁব বলে

যতই প্রশস্ত করি হাত


ততই পশ্চাতে সরে যায় আকাশ

আমি তো দুর আকাশকেই ছুঁতে চাই

আকাশ বলে, এই দ্যখো ----আমি আছি তোমারই কাছে।

আলহাজ্ব শাহাবুদ্দিন আহমদ এই কাছের আকাশকে চিনেছেন। এ আকাশ তার নিত্যসঙ্গী।

ডা. আবুল হোসেন

ডা. আবুল হোসেন আহমদ আলী খান পল্লীবাসী, কম শিক্ষিত। শামসুর রহমান, নির্মলেন্দু গুণ, বিষ্ণু দে, সমুদ্র গুপ্তের কবিতার সাথে ওর পরিচয় নেই। যা দেখে তাই নিয়ে কবিতা লেখে। নদী, বিল, শাপলা থেকে শুরু করে গাছ, মাছ, মাছরাঙা, শালিক এমন কি পিঁপড়ার ঢিবি, উইয়ের ঢিবি কিছুই বাদ যায় না। একদিন ৪/৬ সাইজের ৪ পাতার একটি কবিতা আমার হাতে দিয়ে বলর----স্যার বাসায় নিয়ে পড়বেন। গবেষকের নিকট কোনো কিছুই তাচ্ছিল্যের নয়। যত্ন করে আমার সংগ্রহের বান্ডিলে জমা রাখলাম। রাজবাড়ি জেলার ইতিহাসে ডা. আবুল হোসেনকে নিয়ে লিখতেই হবে এটা স্মরণে আছে। লেখার উপাদান খুঁজছিলাম। চোখে পড়ল আহম্মদ আলীর লেখাটি চোখ বুলাতেই মনে হল আহমদ অতি যত্নে কবিরতায় ডা. আবুল হোসেনের গল্প লিখেছে। আবুল হোসেন মানবসেবার দরদী নায়ক, আহমদ আলীর কবিতার নায়ক শত সহস্র ছাত্র-ছাত্রী আদর্শের নায়ক, রাজবাড়ির সাধারণ মানুষের অবসরের আড্ডায় দান দয়ার গল্পের নায়ক, চেতনাশীল মানুষের সমাজসেবায় উদ্ধুদ্ধকরণের নায়ক। আহমদ আলীর কথায়--------

ডা. আবুল হোসেনের কথা কী বলিব ভাই

তাঁহার মতো দানশীল ব্যক্তি আমরা দেখি নাই

কত প্রতিষ্ঠান তিনি মানুষের কল্যাণে

করেছেন প্রতিষ্ঠা ভাই সর্বলোকে জানে

সর্বত্যাগী, সর্বগুণী সর্ব গরিয়ান

সর্বপরি সর্বশ্রেষ্ঠ সর্ব মহিয়ান।

১৯৬৬ সালে আমি স্নাতক শ্রেণির ছাত্র। রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর চেম্বারে যাই। সবেমাত্র তিনি এবিবিএস পাস করে এসেছেন। তখনকার দিনে এমবিবিএস পাস করা ডাক্তার সারা ফরিদপুর জেলায় ২/৪ জনের বেশি ছিল না। রাজবাড়িতে সময় তিনিই একমাত্র উচ্চতর ডিগ্রিপ্রাপ্ত ডাক্তার। তিনি কেবল ব্যবস্থাপত্রই দিলেন না, আমাকে কাছে টেনে পুত্রবৎ আদর করলেন। পড়ালেখাসহ স্বাস্থ্যবিধি বিষয়ে নানা উপদেশ দিলেন। তখন রাজবাড়িতে পরবাসী হিসেবে আমার মনে হয়েছিল তিনি আমার আস্থা, আপনজন। এরপর রাজবাড়ি ছেড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। ১৯৭০ সালে জানুয়ারি মাসে রাজবাড়ি কলেজে শিক্ষক হয়ে ফিরে আসি। ডা. হোসেনকে খোঁজ করি। জানতে পারি তিনি সপরিবারে ইংল্যান্ডে চলে গেছেন। তখন ভেবেছিলাম ধনিক জোতদারের একমাত্র ছেলে, যিনি সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্মেছেন, এত বড় ডাক্তার তাঁর কি এমন টাকার অভাব হল যে, টাকার জন্য গরীব শহর ছেড়ে টাকার শহরে চলে গেলেন। আবুল হোসেন মানবসেবার ব্রতচারী হয়ে জন্মেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যাতায়াত, সৌন্দর্য বঞ্জিত রাজবাড়ির মানুষের জন্য কিছু করতে হবে।


এরজন্য বিপুল অংকের অর্থের প্রয়োজন। হয়ত এ স্বপ্নসাধ পূরণেই তিনি লন্ডন গেলেনে। ডা. আবুল হোসেনের এ স্বপ্ন সাধের কথা তখন বুঝতে পারিনি। স্বামী-স্ত্রী সেখানে কাজে নিয়োজিত হন। ৪০ বছরের শ্রমে সংগ্রহ করেন অর্থ। পিতার অগাধ সম্পত্তির কানাকড়িও গ্রহণ করেন না। একাকি পিতা আলহাজ্ব আবদুল করিম বসবাস করেন নিভৃত পল্লী ভবদিয়ায়। দীর্ঘদেহী গৌকান্তির আব্দুল করিম নিরহঙ্কার সদালাপী। গ্রামের খেটে খাওয়া মানুষ তার আপনজন। তাদের মুখ দেখেই তিনি একমাত্র সন্তানকে ভুলে থাকেন। সন্তান মাঝেমধ্যে আসেন ছেলে সন্তানদের নিয়ে। একদিনের কথা। ১৯৯৩ অথবা ১৯৯২ সাল। বর্তমান ‘নজর মওলা প্লাজা’ ছিল না। ব্যবসায়ী মজিবর রহমান সেখানে জুতার ব্যবসা করতেন। সেখানে আবদুল করিম-এর সাথে কথা। তাঁর পরিবার ও ডাক্তার সাহেবের কথা জিজ্ঞেস করি। কথায় কথায় তিনি বলছিলেন, এই সেদিন দুই নাতী এসেছে। ওরা সেখানে ডাক্তারি পড়ে। হয়েছে কী, আমি জাংলা থেকে অনেকগুলো লাউ কেটে ঝাঁকায় তুলেছি, রাজবাড়ি হাটে আনব বলে কামলার অপেক্ষা করছি। তখন বড় নাতি বলে -----‘দাদা লোক লাগবে কেন আমার মাথায় উঠিয়ে দিন। আমি বয়ে নিয়ে যাব।’ খাঁটি মানুষের খাঁটি কথা। যোগ্য মানুষের যোগ্য উত্তরসূরী। আমাদের ছেলে সন্তানেরা একটুখানি উপর ক্লাসে উঠলেই কাজতো দূরের কথা একটি বাজারের ব্যাগ নিতে সংকোচ বোধ করে। সাধারণ কাজের মধ্যেই যে জীবনের সাফল্য এ কথা ভুলে যাই। ঐ বছরেই প্রায় ৩৫ বছর পর ডা. আবুল হোসেনের সাথে দেখা। তরিতরকারির দোকানে সওদা কিনছি। পাশে দাঁড়ানো লোকটির গায়ে সাধারণ পোষাক, পায়ে চটি জুতা, গৌরবর্ণের ছয়ফুট উচ্চতার লোকটির মুখে শ্মাশ্রু। চিনতে ভুল হল ন। এমন অবস্থায় সাধারণ পণ্যের বাজারে তাঁকে দেখে বিশ্বাস হচ্ছিল না তিনিই সেই এমবিবিএস লন্ডনে বসবাসরত আবুল হোসেন। জিজ্ঞাসা করলাম ----আপনি এখানে? তিনি বললেন, কেন? আপনার গাড়ি কৈ? ব্যাগটানার মানুষ কই? এভাবে এই বাজারে? মৃদু হেসে উত্তর দিলেন, কি অসুবিধা এতে? আহমদ আলীর কবিতা দিয়ে আবুল হোসেনের গল্পের দ্বিতীয় পর্ব শুরু করি-----

 রাজবাড়ি জেলাধীন বরাট ইউনিয়ন

পদ্মা বিধৌত ধন্য ভবদিয়া গ্রাম

পাখি ডাকা, ছায়া ঢাকা, সুজলা সুফলা

জ্ঞানি গুণীর জন্ম দিয়া হইল উজালা।

রাজবাড়ি জেলার উত্তর পূর্বপ্রান্তে বরাট ইউনিয়নের ভবদিয়া গ্রামে ডা. আবুল হোসেন জোতদার পরিবারে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। সোনার চামচ মুখে দিয়ে জন্ম নেওয়া ছেলেটির গায়ের বর্ণ সোনাররঙের। ভবদহ থেকে ভবদিয়া। দহ, ভাঙ্গন, তল, সমতল, ধান পাটের সবুজশ্যামল বন শীতের সরষে ফুলের হলুদ রং তার কচি প্রাণে নাচন তোলে। পদ্মার প্রশস্ততার মতই তার হৃদয়ের প্রশস্ততা বাড়তে থাকে। বিদ্যালয়ের পরীক্ষায় সকলের উপরে। বিনয় ভদ্রতায় গুরুজনেরা পরিতুষ্ট। পিতা আব্দুল করিম মোল্লা আল্লাহপ্রেমিক খাঁটি মুসলমান। পাড়া প্রতিবেশী, আপনজন, রাখাল, কামলা, পরেত, দুস্থ, অসহায়ের দয়ার সাগর। কলেরা, বসন্ত, ম্যালিরিয়ায় আর্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। ভাঙ্গনের, বন্যার মানুষকে আশ্রয় দেন। যুবক আবদুল করিম ভাবেন ছেলে যদি মানুষের মতো মানুষ হয় তাহলে একদিন গ্রামের মানুষের কাজে আসবে।

আবদুল করিমের স্বপ্ন বিফলে যায় না। ছেলে ডাক্তার হল। অর্থের সংস্থান হল। এবার মানুষের জন্য, দেশের জন্য কিছু করা। অনেক স্বপ্ন তাঁর মনে। সাধ্যের মধ্যে কোনোটি আগে? আবুল হোসেন ৪৩ এর দুর্ভিক্ষ দেখেছেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের উদ্ভব ও প্রয়োজনীয়তার উম্মাদনা দেখেছেন। পাকিস্তানিদের শোষণ শাসন দেখেছেন, দেখেছেন মায়ের মুখের ভাষা কেড়ে নেওয়ার কুটচাল।


জাতীয় চেতনার স্মৃতি ধারণে ‘শহীদ মিনার’ নির্মাণ শুরু করেন। ভবদিয়া উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামনে নির্মাণ করেন আধুনিক স্থাপত্যশৈলীতে শহীদ মিনার। প্রশস্ত এ শহীদ মিনারটি উন্নত উজ্জ্বল টালি দিয়ে মোড়ানো। প্রচলিত নকশার কাজ অপূর্ব। আমাদের মতো অনুন্নত দেশে পাড়াগাঁয়ে জাদুঘর নির্মাণ যেন কল্পনারও অতীত তিনি কোটি টাকারও বেশি অর্থ দিয়ে নির্মাণ করেছেন দোতলা দুটি দালানে এম, এ করিম জাদুঘর। জাদুঘরের সংগ্রহের পরিমাণ হাজারের উপর। আমাদের গ্রামীণ জীবনের ঐতিহ্যসহ নানা বিরল সংগ্রহ রয়েছে। পৃথিবীর প্রায় সকল দেশের কোনো না কোনো সংগ্রহ এখানে স্থান করে নিয়েছে।

শিক্ষাই জাতিতে উন্নয়নের পথ প্রথস্ত করে। শিক্ষা বিস্তারের প্রতি অনুরক্ত ডা. আবুল হোসেনের কয়েক কোটি টাকায় শহরের প্রাণকেন্দ্রে সজ্জনকান্দায় গড়ে উঠেছে ‘ডা. আবুল হোসেন ডিগ্রি কলেজ’। কলেজের হোস্টেলটি শহরের মধ্যে দর্শনীয় অট্রালিকা। নিজ অথ দ্বারা কিনে দিয়েছেন ছাত্রদের জন্য বাস। অধ্যক্ষের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ লাইব্রেরি, খেলার মাঠ। কলেজের অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল আলম দুলালের দক্ষ পরিচালনায় জেলার অন্যতম কলেজ হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে ভবদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের বিল্ডিংসহ নানা স্থাপনা গড়ে তুলেছেন। সজ্জনকান্দায় মিসেস নূরজাহান প্রাথমিক বিদ্যালয়, ভবদিয়া এতিমখানা, এমএ করিম ফোরকানিয়া হাফেজিয়া মাদ্রাসা, এবতেদিয়া মাদ্রাসা, এমএ করিম খেলার মাঠ, গোরস্থান তাঁর অর্থ ব্যায়ে নির্মিত হয়েছে।

ডা. আবুল হোসেনের এক অভূতপূর্ব কর্ম ‘আবুল হোসেন কুইজ প্রতিযোগিতা।’ এর শুরুটা কাহিনীকেও হার মানায়। ২০০২ সাল। বিজন কান্তি সরকার জেলা প্রশাসক। এই মহৎ মানুষটির ভাবনা রাজবাড়ির ছাত্রদের মধ্যে কীভাবে মেধা উন্নয়নের চর্চা করা যায়? একদিন জেলা প্রশাসকের সম্মোলনকক্ষে সভা ডাকলেন। শহরের গন্যমান্য ব্যক্তি, শিক্ষক, সুধিজন সভায় উপস্থিত। জেলাভিত্তিক কুইজ প্রতিযোগিতা কীভাবে সফল করা যায়? জেলা প্রশাসকের এ প্রস্তাবনা উত্তম। তবে কিভাবে সফল করা যাবে? টাকার প্রয়োজন পঞ্চাশ হাজার। উপস্থিত সকলের সহযোগিতায় জেলা প্রশাসক কাজের ভার নিলেন। প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে। সে এক অভাবনীয় দৃশ্য। জেলা স্কুল মাঠে সহস্রাধিক ছাত্র, শিক্ষক, অফিসার, দর্শকের সমাবেশ। প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার দশ হাজার টাকা, দ্বিতীয় পুরস্কার সাত ও তৃতীয় পুরস্কার পাঁচ হাজার টাকা। প্রতিযোগিতা চলছে। এরই মধ্যে জেলা প্রশাসক ভাবেন কী করে এ প্রতিযোগিতার অন্তত স্থিতি দেওয়া যায়। ডা. আবুল হোসেন তখন লন্ডনে। তাঁর ভগ্নীপতি ভবদিয়া স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবু ইউসুপ আওয়াজ দেওয়ান, আবুল হোসেন কলেজের অধ্যক্ষ মঞ্জুরুল আলম দুলালের মাধ্যমে যোগাযোগ করেন। লন্ডনে বসে আবুল হোসেন কুইজের সফলতা জেনে টেলিফোনে পাঁচ লক্ষ টাকা দেওয়ার কথা জানান। সঙ্গে সঙ্গে মাইকে সে কথা জানিয়ে দেওয়া হল। সে এক অনন্য শিহরণ। হাজার মানুষের উচ্চ করতালির শব্দে চারিদিক আমোদিত হল। সপ্তাহ খানেকের মধ্যে জ্ঞানচর্চা কেন্দ্রের (জেলা প্রশাসকের আওতায়) মাধ্যমে একটি গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে ‘আবুল হোসেন কুইজ’ অনন্ত স্থিতি লাভ করল। (লেখক আবুল হোসেন কুইজের জেলা প্রশাসন কর্তৃক মনোনীত একজন সদস্য)। সেই থেকে প্রতিবছর একুশ ফেব্রুয়ারি আবুল হোসেন কুইজ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রাজবাড়ির শিক্ষা সংস্কৃতির ধারা যতদিন বহমান থাকবে আবুল হোসেন কুইজ অনুষ্ঠিত হবে ততদিন বছরে একবার। উল্লেখ্য, এ অনুষ্ঠানটি জেলা প্রশাসকের তত্ত্বাবধানে প্রথমে উপজেলা এবং চূড়ান্ত পর্ব জেলায় শহীদ দিবসে অনুষ্ঠিত হয়। দেশ ও জাতির স্থায়ীত্বের সরলরেখায় বহমান থাকবে শহীদ দিবস, সে সাথে থাকবে আবুল হোসেন কুইজ। উচ্চারিত হবে আবুল হোসেনের নাম। কিন্তু বিজন কান্তি সরকার? মহান এ উদ্যোগক্তার নাম থাকল এই ইতিহাসের পাতায়।রাজবাড়ির মানুষের সাংগঠনিক চেতনায় তাঁর অর্থে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘ডোনেশান টু রাজবাড়ি ওয়েলফেয়ার এ্যাসোসিয়েশন’ ‘ সেডো অর্গানাইজেন, ‘আসিয়া করিম ক্লাব ও পাবলিক লাইব্রেরি’ ‘হেলপ ফর দি ভেরিয়াস মাস্ক ফর পুয়োর পেমেন্ট’, ‘হেলফ ফর দি ম্যারেজ গালর্স’ ‘জাহাঙ্গীর নগর ইউনিয়ভারসিটি ফর স্কলারশীপ’, ‘প্রবীন হিতৈষী সংঘ’।


রাজবাড়ির খেলাধুলার জগত ও বিনোদনের জন্য প্রতিষ্ঠা করেছেন ‘এম এ করিম গোল্ডকাপ  টুনামেন্ট’, ‘শিশু ফুটবল’ ‘সাইকেল খেলা’ ‘ম্যারাথন রেস’ ‘কেরাম ক্লাব’ ‘পোস্ট অফিস, ‘সাঁতার প্রতিযোগিতা’ ইত্যাদি। সমাজসেবায় তাঁর এ সকল কাজ চলমান আছে এবং ভবিষ্যতে আরো অনেক উন্নয়নমূলক কাজ তিনি করবেন এ কথা তাঁর নিকট থেকে জানা যায়। লেখক রাজবাড়ি সাহিত্য ও সংস্কুতি সংসদের সভাপতি। এই সংসদের মাধ্যমে ২০০৯ এ আবুল আহসান চৌধুরীকে  ‘মীর মশাররফ হোসেন সাহিত্য পুরস্কার’ এ পুরস্কারের জন্য ডা. আবুল হোসেন সাত হাজার টাকা প্রদান করেন। সদালাপী, সহজ সরল মনের মানুষ ডা. আবুল হোসেনের গল্প আরো দীর্ঘ হবে। ভবদিয়ায় তাঁর কর্ম সংরক্ষণ করা জরুরি হবে। ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে গড়ে উঠবে পর্যটন কেন্দ্র। আবুল হোসেন একদিন তাঁর কর্ম থেকে সরে দাঁড়াবেন তারপর বিদায় নিবেন পৃথিবী থেকে। তাঁর নশ্বর দেহ স্মৃতি হয়ে থাকবে রাজবাড়ির মানুষের মনে এ দাবি রাজবাড়ির মানুষ করতেই পারে। এখন তিনি মাঝেমধ্যে লন্ডন থেকে এসে আমাদের সাথে মিশে থাকেন। তখন মিশে থাকবেন পিতৃভূমির মাটি, হাওয়া আর ফসলের সাথে। কোনো পথিক স্মৃতির গায়ে লেখা তাঁর নাম বা রকম কোনো কবিতার ছন্দ পড়ে শিহরিত হবেন-------

গরিব গোরে দীপ জ্বেলো না

ফুল দিও না কেউ ভুলে

শ্যামা পোকার না পুড়ে পাক

দাগা না পায় বুলবুল

কে নেবে ডা. আবুল হোসেনকে নিয়ে আরো গল্প ও ছন্দ লেখার ভার? বহুল প্রচলিত ছন্দটি এখানে ইঙ্গিতবহ।

একেএম রফিক উদ্দিন

একেএম রফিক উদ্দিন এর পরিচয় জানা থাকলেও এ মহৎপ্রাণ মানুষটির সাথে আমার প্রথম সাক্ষাৎ ঘটে ২০০৫ সালে রাজবাড়ি শহরে অবস্থিত ক্যামব্রিজ মাল্টিমিয়ার দোতলায়। পরিণত বয়সের সৌমকান্তি চেহারা, কথায় সুমিষ্টতা, সংযত বাক্য ব্যবহারে অসাধারণ ব্যক্তিত্বসস্পন্ন মানুষটিকে দেখে, আনন্দ অনুভব করলাম। চেষ্টা করছিলাম তাঁর মহানুভবতার প্রসারতা। ছোট্র অথচ আধুনিক জ্ঞান প্রসারে প্রত্যয়ী এ প্রতিষ্ঠানে তিনি এসেছেন আগামী প্রজন্মকে জ্ঞানালোকে সম্পৃক্ত করার লক্ষ্যে, ৪টি কম্পিটার ১টি এসি-সহ একটি কম্পিউটার ল্যাব গড়ে দিতে। ঐদিনই বিকেলে তাঁকে রাজবাড়ি পাললিক লাইব্রেরি হলে এক নাগরিক সম্বর্ধনা লাইব্রেরিকে তিন তলা করাসহ ১৯টি বই ভর্তি আলমারী অনুদানের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। জ্ঞানচর্চা আমার নেশা। আমি জানি এ নেশায় যদি কেউ মত্ত হন তার নিকট পার্থিব এ জীবনের অর্থকড়ি সম্পদ তুচ্ছজ্ঞান মনে হয়। মানবসেবা, কল্যাণ, প্রেম মুখ্য হয়ে ওঠে। তাঁর সঙ্গী অতিথির নিকট থেকে রফিক উদ্দিনের জ্ঞানর্চার বিষয়ে যতটুকু জানতে পারলাম তা হল তাঁর অতি নিকটের মানুষ তাকে সম্বোধন করেন ‘জ্ঞানকুম্ভ’ বলে। তাঁর জ্ঞানের গভীরতা অনুভব করলাম যখন তিনি বর্তমান বিশ্বের আইনস্টাইন বলে পরিচিত স্টিফেন হকিং এর জটিল তত্ত্ব নিয়ে আমার সাথে আলাপচারিতা শুরু করলেন। নদীর স্রোতের প্রবাহমানতার মতো জ্ঞানের স্রোতের প্রবাহমানতাও বিভিন্নমুখী। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই জ্ঞানের প্রয়োগ ব্যক্তিস্বার্থ এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক। তবে জ্ঞানের প্রয়োগ যখন বিজ্ঞান এবং সমাজ স্বার্থের দিকে প্রবাহমান হয়, ব্যক্তি তখন হয়ে ওঠেন আলফ্রেড নোবেল’, ‘হাতেমতায়ী’ বা হাজী মুহম্মদ মোহসীনের মত।


এ আদর্শে অনুপ্রাণিত একেএম রফিক উদ্দিন। তাঁকে দেখা যায় অর্জিত সম্পদের অংশবিশেষ প্রতিনিয়তই ব্যয় করে চলেছেন মানবকল্যাণে। দীন-দুঃখীদের অর্থ সাহায্য তাঁর নৈমত্তিক আদর্শ। সেবার এ ক্ষুদ্র গণ্ডীর মধ্যে নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখেননি। সেবার হস্ত প্রসারিত হয়েছে বিভিন্নমুখী সমাজকর্ম সম্পাদনে, দেশে বিদেশে। কেবল জাতীয় ভাষায় তিনি কিংবদন্তির ‘দাতা’ শ্রেষ্ঠ’ বলেই নন, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও তিনি ‘ Man for the men'  বলে পরিচিত।

কোনো রাজনৈতিক অভিলাষ নয়, নয় কোনো স্বার্থ, কেবল সেবার প্রেরণায় তাঁর দান অনুদানে নির্মিত হলো পাংশা কলেজের (বিশ্ববিদ্যালয় পাঠক্রম অনার্স মাস্টার্স অনুমোদিত) ‘জহুরুন নেসা ভবন’, মাছপাড়া ডিগ্রি কলেজের ‘খলিল উদ্দিন কলা ভবন’, মাজুরিয়া  ‘জোহরা জেরীন’ উচ্চ বিদ্যালয় ভবন, হোসেনডাঙ্গা ‘নিলুফার রফিক উচ্চ বিদ্যালয়’, বনগ্রাম ‘একেএম রফিকউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ভবন’ গোপালপুর ‘রাফাত রেষাদ কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয় ভবন’, কলিমোহর ‘খলিল ‍উদ্দিন মিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানা ভবন’, ‘কলিমোহর জহুরননেসা স্কুল এন্ড কলেজ ভবন’সহ জেলার অন্যান্য স্থানে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়, ভবনসমূহ।

জেলাটির কৃষি ও কৃষক পরিবারের ভাগ্যোন্নয়নে প্রত্যন্ত অঞ্চলের গ্রামীণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠা করেছেন কলিমোহর জহুরুননেসা কৃষি ইনস্টিটিউট। ইনস্টিটিউটি ভবিষ্যতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রুপদান করা তাঁর স্বপ্ন। পিতার নামে প্রতিষ্ঠা করেছেন, ‘খলিল উদ্দিন মিয়া ওয়েল ফেয়ার ফাউন্ডেশন’। সকল মানুষকে ধর্ম চর্চায় অনুপ্রাণিত করতে তিনি গড়ে তুলেছেন সর্ব-ধর্মীয় পাঠাগার। ইতিমধ্যে কলিমোহর একটি আধুনিক হাসপাতাল নির্মাণের কাজ শুরু করেছেন, যা ৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে উন্নীত করা হবে। কলিমোহর একটি ইউনিয়ন ও বাজার। রাস্তাঘাট পাকা করার কাজ সহ, নানাভাবে সজ্জিতকরণে গ্রামটি আদর্শ গ্রামে পরিণত হয়েছে। রাজবাড়ি জেলার পাংশা থানার ঐতিহ্যবাহী সিরাজপুর হাওড়ের কোল ঘেঁষে কলিমোহর গ্রামটিতে ১৯৪২ সালের ১৫ নভেম্বর এক সম্ভ্রান্ত বংশে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। পিতা খলিল উদ্দিন মিয়া ও মাতা জহুরুন নেসা। খলিল উদ্দিন মিয়াকে সবাই জজ সাহেব বলে জানত। তিনি ছিলেন বিচার বিভাগের জেলা জজ। রফিকউদ্দিন ১৯৫৮ সালে বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ম্যাটিকুলেশন, ১৯৬০ সালে ঢাকা কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বুয়েট) থেকে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং (সিভিল) ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি জাপান থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং (ফবট্রাস) এন্ড ম্যানেজমেন্টের উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। পেশা জীবনে ১৯৬৪ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত বিল্ডিং ডাইরেকটোরেটের সহকারী ইঞ্জিনিয়ার, ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৮ পর্যন্ত কনসালটিং ইঞ্জিনিয়ার্স (পাকিস্তান) লিঃ এর রেসিডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার, ১৯৬৮ থেকে ১৯৬৯ পর্যন্ত বাংলাদেশ কনসালটেন্টস লিঃ এর সিনিয়র ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

একেএম রফিক উদ্দিন একজন ব্রতচারী কর্মীপুরুষ। যাঁর নিসঙ্গ ভাবনার প্রধান অনুষঙ্গ অনুন্নত গরীব দেশটির মানুষ, আর মানুষদের কল্যাণ। ক্ষুদ্র কোনো ভাবনা নয় বরং বৃহত্তর পরিসরে উপযুক্ত কর্মপ্রচেষ্টাই এ দেশের মানুষের বেকারত্ব হ্রাস ও মেধার যথোপযুক্ত ব্যবহার হতে পারে। এই প্রত্যয় নিয়ে তিনি ১৯৭০ সালে ডেভেলপমেন্ট ডিজাইন কনসালটেন্সি লিঃ (ডিডিসি) প্রতিষ্ঠা করেন। যা আজ দেশে তো বটেই আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে খ্যাতিসম্পন্ন প্রতিষ্ঠান। এই কোম্পানিতে নিয়োজিত আছেন ৫০০ জনের অধিক ইঞ্জিনিয়ার, টেকনোক্রাট, ইকোনোমিস্ট, সোস্যালিস্ট এবং ৭০০ জনের অধিক অন্যান্য কর্মকর্তা ও কর্মচারী। দেশ বিদেশের বিভিন্ন স্থানে নির্মাণ করেছেন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান, বিল্ডিং, রোডস, হাইওয়েজ, ব্রিজ, পুল, কালভার্ট। এ প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ইঞ্জিনিয়ারিং জগতের অন্যতম দুর্লভ গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড’ ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয়। শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চার এক অনুকূল পারিবারিক পরিবেশ তাঁকে শিল্প সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী করে তোলে। ব্যক্তিগত জীবনে তিনি তা চর্চা করতে সদা তৎপর থাকেন। পরিশীলিত, ‍উদার মনের এ মানুষটি সেবা ও কর্মের জন্য রাজবাড়ির মানুষের নিকট পরিচিত ও প্রিয় মানুষ। সামাজিক কাজের জন্য বিভিন্ন সময়ে নানা সম্মাননা পেয়েছেন। তাঁকে প্রদান করা হয়েছে ‘জসীম উদদীন স্বর্ণপদক’। এই মহৎপ্রাণ মানুষটি দীর্ঘজীবী হোক, মানবকল্যাণে তাঁর হস্ত আরো প্রসারিত হোক, মন ছুঁয়ে যাক মানুষ, বৃক্ষ, নদী, হাওয়া, আকাশকে। রাজবাড়ি জেলার মানুষের কাছে তথা সারাদেশে মানবসেবায় ‘কিংবদন্তির নায়ক’ এ অভিধাভূষণে তিনি ইতিহাসের পাতায় ভূষণ হয়ে থাকবেন।

 

Additional information