লেখকের কথা

আজকের বর্তমান আগামীকালের অতীত। অনেক অতীত দিনের জীবনের সম্পৃক্ততার ঘটনা, কাহিনী, জয়-পরাজয়, অনুসন্ধান, তথ্যবিশ্লেষন সব মিলিয়ে সৃষ্ট হয় ইতিহাস।  তাই ইতিহাস রাজা বাদশার কাহিনী সম্বলিত গল্প নয়। ইতিহাস একটি জাতির সকল সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, প্রাকৃতিক সকল ঘটনা সমূহের তথ্য ভান্ডার। অতীত তথ্য ভান্ডারকে অবলম্বন করে বর্তমান দিনের তথ্য ভান্ডারের সমন্বয়ে সৃষ্ট হয় জাতির নতুন ইতিহাস। আমরা বাংলাদেশী, জাতিতে বাঙ্গালী। আমাদের রয়েছে গৌরবময় ভাষার ইতিহাস, স্বাধীনতার ইতিহাস। এছাড়া যুগপ্রবাহে ভু- উত্থান থেকে শুরু করে আমাদের সমাজ বিন্যাস। রাজনৈতিক ইতিহাস কম সমৃদ্ধ নয়। অতীত এ সকল সমৃদ্ধ ইতিহাসের তথ্য ভান্ডারের আলোকে বাঙ্গালী জাতি তার আয়নায় নিজেকে চিনে নিতে পারে। সেই সাথে দেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে সচেষ্ট হতে পারে। রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস রচনা মুলত দেশের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে সামান্য ও খন্ডাংশের ইতিহাস রচনার প্রয়াস মাত্র। রাজবাড়ি সাইবার রিসার্চ ইনষ্টিটিউট  রাজবাড়ি সাইবার রিসার্চ ইনষ্টিটিউট ফেইজ বুক রাজবাড়ি ডিসি অফিসের ফেইজ বুক  ♣  এক নজরে রাজবাড়ি জেলা জেলা প্রশাসক রাজবাড়িজেলা প্রশাসন রাজবাড়ি ♣ স্থানীয় সরকার ♣ সরকারী অফিস সমূহঅন্যান্য  প্রতিষ্ঠান ♣ ই-সেবা ফটোগ্যালারী ♣ ই-বুকবাংলাদেশ সরকারের ফরম

এ যাবৎ কালে দেশের অনেক বরেণ্য ঐতিহাসিকগণ বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস রচনা করে গেছেন। তা সত্ত্বেও বলতে হয় ইতিহাস রচনা একটি নিয়তধারা। ১৯৮৪ সালে ১লা মার্চ তৎকালিন ফরিদপুর জেলার মহকুমা গুলিকে ভেঙ্গে জেলায় রুপান্তরিত করা হয় এবং সে থেকে রাজবাড়ি জেলা। রাজবাড়ি আজ কোন জেলার অংশ নয় বা বৃহত্তর কোন জেলার অংশ হিসাবে পরিচয় দেবার প্রয়োজন নেই যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে তা করা হচ্ছে। রাজবাড়ি জেলার এটাই বাস্তবতা এবং জেলার পরিচয় দেবার মত রয়েছে অতীত ও বর্তমান ঐতিহ্য। একক ইতিহাস খন্ডাংশের সমষ্টিরুপ। আমাদের দেশের আনাচে কানাচে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের বিপুল উপাদান। বিশেষয়িত ভাবে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে ক্ষুদ্র অংশের ইতিহাসের মূল্য কম নয়। এ বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য রেখে এ যাবত কালে পূর্বের অনেক বড় বড় জেলা সমূহের ইতিহাস রচিত হয়েছে। দেশের বর্তমান জেলা সমূহের শাসন, সাহিত্য, উন্নয়ন, রাজনীতির ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রয়েছে। তাছাড়া নিদিষ্ট জেলার জেলাবাসী স্বকর্মের অবদান রাখতেও তৎপর। সেক্ষেত্রে আপন সত্বার পরিচয়, ঐতিহ্য তার জানা প্রয়োজন। বৃহৎ জেলাগুলি ভেঙ্গে মহকুমা জেলায় রুপান্তরিত হলেও সকল জেলার ইতিহাস রচিত হয় নাই। রাজবাড়ি জেলাবাসীর অনেকের সাথে আলাপ করে জানা যায় তারা মনে করে সামান্য হলেও তাদের জেলার ইতিহাস ঐতিহ্যের কাহিনী জানা একান্ত প্রয়োজন। ইতিমধ্যে রাজবাড়ি জেলা সম্বন্ধে স্থানীয় পুস্তিকা, পত্রিকা এবং জাতীয় পত্রিকায় কিছু কিছু তথ্য বিচ্ছিন্নভাবে আসলেও তা থেকে জেলার সম্যক ধারনা আসেনা। আব্দুস সবুর অনেক পূর্বে পাংশা থেকে একটি ইতিহাস পুস্তিকা বের করেন কিন্তু তিনি জেলার সমগ্র ইতিহাস ধারন করেন নাই।


পাংশা সমিতি ঢাকা কর্তৃক চন্দনা পত্রিকা প্রকাশের মাধ্যমে পাংশার অনেক ঐতিহ্য ধারন করা হয়েছে তা সত্ত্বেও তা ইতিহাস পুস্তক নয়। সাংবাদিক বাবু মল্লিক, সাংবাদিক জহুরুল হক, আবু মুছা বিশ্বাস, সংবাদ পত্রের মাধ্যমে রাজবাড়ি সম্বন্ধে অনেক তথ্য প্রকাশ করেছেন। এ সব ইতিহাস নয়, তবে ইতিহাস রচনার গুরুত্বপূর্ণ তথ্য। পাংশা কলেজের অধ্যাপক আবুল হোসেন মল্লিক রাজবাড়ি সম্বন্ধে অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছেন কিন্তু প্রকাশ করতে পারেন নাই। জেলা প্রশাসন স্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিবৃন্দের সংশ্লিষ্টতায় রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস রচনার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। এ ব্যাপারে তৎকালীন জেলা প্রশাসক মমতাজ উদ্দিন এবং এ,এফ,এম মতিউর রহমানের উদ্যোগ পরবর্তীতে নানা কারনে ফলবতী হয় নাই।

বাল্যকাল থেকেই আমার নিভৃত পল্লীর পাশে বিরাট আয়তনের তেঢালা বিল দেখে মনে প্রশ্ন জাগত এ বিল কখন থেকে? লোক মুখে শুনতাম বহু পূর্বে এখান দিয়ে নদী প্রবাহিত হত। এর বেশী কেউ বলতে পারত না। গ্রামের পাশেই মধুপুর গ্রাম। সে গ্রামের পাশ দিয়ে যেতেই দেখা যেত ঝোপ ঝাড়ের মধ্যে পড়োবাড়ির ভিটা। লোকে বলত কুঠি, কিসের কুঠি বলতে পারতো না। এখন জানি এটা ছিল নীল কুঠি। রাজবাড়িতে ৪০ বৎসর বসবাস করছি। পাশেই পদ্মা নদী। জানতে ইচ্ছা করত, এ নদী কত দিন ধরে এ পথে প্রবাহিত হচ্ছে? লোকজনের কাছে জিজ্ঞাসা করলে বলত এ নদী তিনবার ভেঙ্গে গোদারবাজার পর্যন্ত এসেছে আবার দুরে সরে গিয়েছে। জানতে ইচ্ছে করত, রাজধারপুর এলাকার এতবড় কল্যাণদীঘি কে, কখন খনন করেছিলেন? লোকে শুধু অলৌকিক কাহিনীর কথা বলত। জেলার বরেণ্য সাধক সাহ পাহলোয়ানের আগমন কখন, কেন? লোকে বলে তার ইচ্ছায় কবর না দেওয়ায় সাধকের মৃত্যুর পর মাজারটি এক রাতে ঘুরে পূর্ব-পশ্চিম হয়ে গেছে। এর সত্যতা কোথায়? রাজবাড়ি রেল শহর অথচ কখন কবে রেল এসেছে তাও লোকে বলতে পারে না। এমনকি রাজবাড়ির নামটি কিভাবে এলো তারও স্পষ্ট প্রমাণসহ কেউ জানে না। লোকে বলে রাজা সূর্য্যকুমারের নামে। তাও প্রমাণসহ জানা দরকার। আমার সবচেয়ে ঔৎসুক্য জাগত রাজবাড়ির এত গ্রামের নামে পুর কেন? পুরের অর্থ কি? কেন এসব গ্রামের নাম পুর দিয়ে হল? রাজবাড়ির জঙ্গল ইউনিয়নের ৯৮% হিন্দু কেন? আবার মুসলমানদের বসবাস কখন, কিভাবে শুরু হলো? রাজবাড়ির এত আউলিয়া, দরবেশ কখন, কেন এসেছেন? এ সব কিছুর মূল জানার জন্যই এ ইতিহাস রচনায় আমি গভীর গবেষণায় মনোনিবেশ করি। বলা যায়, সেই বাল্যকাল থেকেই এবং গত ১০ বৎসর যাবত নিরলস পরিশ্রমের ফলেই আমার আজকের রাজবাড়ির ইতিহাস রচনার সামান্য প্রয়াস মাত্র। আমি প্রথমেই পুস্তকটির নামকরণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ‘রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ এ ইতিহাস গ্রন্থে আধুনিক বানান রীতি অনুসরণ করে ‘রাজবাড়ীকে’ ‘রাজবাড়ি’ লেখেছি। এ সম্বন্ধে বলতে হয় ইতিহাসের ঘটনার তেমন পরিবর্তন লক্ষ্য করা না গেলেও যে ভাষায় ইতিহাস রচিত হয় সে ভাষার পরিবর্তন লক্ষ্যনীয়। অনেক পূর্বেই পাখী, বাড়ী বানান রীতির পরিবর্তন হয়েছে।


তা সত্বেও রাজবাড়ী একটি স্থানের নাম সেই হিসাবে রাজবাড়ী লেখা যেত। কিন্তু ইদানিং কালে রাজবাড়ীকে রাজবাড়ি লেখার প্রচলন সর্বত্র শুরু হয়েছে আর এর ব্যাপক প্রচলন লক্ষ্য করা যাচ্ছে গণমাধ্যম গুলিতে। বিশেষ করে রাজবাড়ির বহুল প্রচলিত দুটি পত্রিকা সহজ কথা ও অনুসন্ধান এ ব্যাপারে অগ্রাণী ভুমিকা পালন করছে। ইতিহাস ত্রিকালস্পর্শী। ইতিহাস অতীত আর বর্তমানের উপাদানে ভবিষ্যতের ইঙ্গিতবহ নির্মাণ। তাই নির্মাণ কৌশলের দ্বারা ভবিষ্যৎকে অর্থবহ করা ঐতিহাসিকের দায়িত্ব। অতীতের আলোতে বর্তমানে লেখা এবং ভবিষ্যৎ নির্মিতব্য ভেবে আমি রাজবাড়ীকে রাজবাড়ি লিখলাম। রাজবাড়ি না লিখেও রাজবাড়ী লেখা যেত কিন্তু তাতে কিছুটা দায়বদ্ধতা থেকে যেত দিন বদলানো প্রজন্মের কাছে। পরিবর্তনকে মেনে নিতে হয় আর পরিবর্তন স্থায়িত্ব পায় তার শক্ত শেকড়কে আশ্রয় করে। ‘রাজবাড়ীকে’ ‘রাজবাড়ি’ লেখাতে কারও ক্ষতি হবার সম্ভাবনা নেই। কিন্তু সকল স্তরে আমাদের মানসিকতার পরিচয় দেবার সুযোগ থাকে।

১৯৮৪ সালে ১৯টি বড় জেলাকে ভেঙ্গে তৎকালীন মহকুমা গুলি জেলায় রুপান্তর হলেও হালে বর্তমান জেলা গুলিকে পূর্বের জেলার নামে পরিচয় দেবার প্রবনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যে কারনে রাজবাড়ি, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরকে নিয়ে বৃহত্তর ফরিদপুর বোঝানোর চেষ্টা করা হয়। এই প্রবনতা ঠিক নয়। ফতেহবাদ অঞ্চল ভেঙ্গে ফরিদপুর হলেও তা ফতেহবাদ নয় তা ফরিদপুর নামে পরিচিত। আবার ঢাকা জালালপুর ভেঙ্গে ফরিদপুর হলেও তা জালালপুর নয় ফরিদপুর। তাই ফরিদপুর ভেঙ্গে যখন রাজবাড়ি জেলা হলো তখন তাকে বৃহত্তর ফরিদপুর বলার প্রয়োজন আছে কি? রাজবাড়ি, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, গোপালগঞ্জের পরিচয় দিতে বৃহত্তর ফরিদপুর বলার প্রয়োজন নেই। রাজবাড়ি অনেক ঐতিহ্যে দিপ্যমান। যদি কোন ভাবেই রাজবাড়িকে অন্য কোথায়ও পরিচয় দেয়া না যায় তাহলে তাকে পদ্মা, গোয়ালন্দের নামে পরিচয় দেওয়া যায়। এদ্বাঞ্চলে উন্নয়নের কোন পরিকল্পনায় রাজবাড়িকে বৃহত্তর ফরিদপুর বলে চিহ্নিত করারও প্রয়োজন নেই। কারণ স্থানীয় ভিত্তিতে (MICRO) উন্নয়নের আলোকে জাতীয় (MICRO) উন্নয়ন সংগঠিত হয়। সেক্ষেত্রে বৃহত্তর ফরিদপুর না বলে রাজবাড়ি, মাদারীপুর, শরিয়তপুর, ফরিদপুর জেলার পরিচয়ে উন্নয়ন পরিকল্পনা করার ক্ষতি নেই, বরং অর্থনীতির সামষ্টিক ভিত্তিকে শক্ত করবে।

আমার এই ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে যার নাম সর্বাগ্রে কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতে হয়, তিনি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক রাজবাড়ি সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর ডঃ ফকীর আব্দুর রশীদ। তিনি এবং বোয়ালমারি সরকারি কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর শংকর চন্দ্র সিনহা আমাকে জেলার ইতিহাস রচনায় উদ্বুদ্ধ করেন। যার সাথে আমি আমার লেখালেখি ও ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে প্রায়শ আলোচনা করি এবং ভ্রাতিৃসুলভ আচরণে যিনি সমস্যা সমাধানে আমাকে উপদেশ দেন তিনি পাংশা কলেজের অধ্যাক্ষ বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা এ,টি,এম রফিক উদ্দিন।


পুস্তকটি প্রকাশের পূর্বে তার সাথে আলাপ করলে তিনি বলেন, ‘করেন’ একটা কিছু হোক’। তার এমন উৎসাহ দেয়ার জন্য আমি কৃতজ্ঞ। আমার স্নেহের ছাত্র জেলার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা নাসিম আমাকে তার নিকট সংগৃহীত দুর্লভ পুস্তক তৎকালীন রেলওয়ে ম্যানেজার এল,এন, মিশ্রের ‘বঙ্গে রেল ভ্রমন’ পুস্তকটি দিয়েছিলেন। এল,এন মিশ্র তার পুস্তকটিতে বিভিন্ন ষ্টেশন এবং খ্যাতনামা স্থান সমূহের ঐতিহাসিক বণনা দিয়েছেন। পুস্তকটি আমার লেখার বিশেষ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। তা ছাড়া নাসিম অনেক তথ্য সংগ্রহ করে দিয়েছেন। আমি এই ছাত্রটির প্রতি চিরকৃতজ্ঞ। কমল বাবুর নিকট ছিল সেকালের আর,এস,কে ইনষ্টিটিউট এর প্রধান শিক্ষক ত্রৈলোক্যনাথ ভট্রাচার্য লিখিত ‘আমার জীবনী’ নামক গ্রন্থ। উক্ত গ্রন্থ থেকে আমি অনেক ইতিহাস সমৃদ্ধ তথ্য পেয়েছি (বইটির প্রকাশ ১৯২৪ কলিকাতা থেকে)। আ.ন.ম সোবহান রচিত ফরিদপুরের ইতিহাস পুস্তকটি থেকে সমৃদ্ধ তথ্য  পেয়েছি। ডঃ কে, এম মোহসিন সম্পাদিত ‘আমানত আলী মল্লিক স্মারক গ্রন্থ’ রাজবাড়ি জেলার ইতিহাস সমৃদ্ধ। প্রথিতযশা এ ঐতিহাসিকের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করছি। আব্দুস সাত্তার রচিত ‘ ফরিদপুরের ইসলাম’ তালেব আলী রচিত ‘ফরিদপুরের গুণীজন’ সমৃদ্ধ ইতিহাস পুস্তক। এ সব লেখদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। রাজবাড়ি জেলার বিশিষ্ট সাহিত্যিক মীর মশাররফ হোসেন রচিত ‘আমার জীবনী’ ও ‘গৌরী সেতুতে’ এলাকার অনেক তথ্য রয়েছে। উনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রারম্ভ পর্যন্ত তার নিজের দেখা সকল অভিজ্ঞতার অনেক তথ্য সংগ্রহ করেছি। এমন সাহিত্য সাধকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। জেমস টেলরের টপগ্রাফি অব ঢাকা একটা প্রামাণ্য পুস্তক। এ থেকে অত্র এলাকার অনেক ঐতিহাসিক তথ্য সংগ্রহ করেছি। আমি জেলার তথ্য সংগ্রহে কয়েক হাজার মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। যাদের নিকট ইতিহাসের তথ্য সংগ্রহে গিয়েছি তারা প্রায় সবাই ঘন্টার পর ঘন্টা আমার প্রশ্নের বাইরে নিজের এবং অপ্রাসঙ্গিক ইতিহাসের গল্প বলেছে। ধৈর্য ধরে শুনেছি এবং ভেবেছি মানুষ তার নিজের অজান্তে কত ইতিহাস প্রিয়। আমি প্রাচীন ইতিহাসের উপাদান সংগ্রহ করতে চেষ্টা করেছি ডঃ নীহার রঞ্জনের বাঙালীর ইতিহাস আদিপর্ব থেকে। পুস্তকটি ভাষায় উপাদানে অতি সমৃদ্ধ। তিনি বাংলার সকল এলাকাকেই স্পর্শ করেছেন। এমন ঐতিহাসিকের নাম চির অম্লান। মুক্তিযুদ্ধকালে আমি রাজবাড়ি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষক। মুক্তিযুদ্ধের সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্ট না হলেও যুদ্ধের পূর্ব এবং যুদ্ধকালীন অনেক ঘটনাই আমার নিজের দেখা। মুক্তিযুদ্ধে রাজবাড়ি পর্বটি লেখায় আমার নিজের অভিজ্ঞতা উপাদান সমৃদ্ধ করেছে বলে মনে করি। ইদানিং রাজবাড়ি থেকে যে সমস্ত পত্রিকা বের হচ্ছে, কিন্তু তা সংরক্ষিত হচ্ছে না। আমি ঐ সমস্ত পত্রিকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করেছি এবং বলা যায় সব বিচ্ছিন্ন তথ্যকে সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে এ পুস্তক রচনায় আমার দ্বিতীয় প্রয়াস। রাজবাড়ির সকল গ্রাম সমষ্টিকে আমার ইতিহাসের পাতায় সংরক্ষণ করেছি। আমার এ কাজটি অতি জটিল বিষয় হলেও বেনবেইসের সাহায্য নিয়েছি। আমি জেলার কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তির সামাজিক কর্মকান্ডের পরিচয় দিয়েছি। তাদের তথ্যে ভুলত্রুটি থাকলে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। এ ছাড়া আরো অনেকের সম্বন্ধে সময় ও তথ্যের অভাবে লেখা সম্ভব হলো না।


পরবর্তী সংকলন বের হলে এবং আমাকে এ ব্যাপারে তথ্য প্রদান করে সাহায্য করলে তা লেখা সম্ভব হবে। রাজবাড়ি সরকারি কলেজের বাংলা বিভাগের প্রভাষক মিজানুর রহমান, ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আব্দুর রহমান, উক্ত বিভাগের প্রভাষক ফকরুজ্জামান, ইংরেজী বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আকবর হোসেন, হিসাব বিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নিতাই চন্দ্র বসাক, ব্যবস্থাপনা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা কেরামত আলী আমাকে ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে বই, তথ্য, উপদেশ ও উৎসাহ দিয়ে কৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছেন। আমার  এ ইতিহাস রচনায় যিনি আমাকে তথ্য প্রদান, তথ্য বিন্যাস ও তথ্য সন্নিবেশ করে বেশী সাহায্য করেছেন তিনি আমার অতি নিকট আত্মীয় দেশের বরেণ্য কবি সমুদ্র গুপ্ত। তিনি আমার পুস্তকের ভাষা সম্পাদনা করে আমাকে চিরকৃতজ্ঞতায় আবদ্ধ করেছেন। সাংবাদিক বুলবুল আমাকে অনেক তথ্য প্রদান করে সাহায্য করেছেন। সাংবাদিক জহুরুলের নিকট আমি কৃতজ্ঞ। আমার স্ত্রী শাহীনুর বেগম সংসার ও সরকারী গুরু দায়িত্ব পালনের পরও আমাকে এ পুস্তক লেখায় যে সহযোগীতা ও ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছেন আমি তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি। ছাত্র শহীদুল আমাকে অনেক তথ্য ও ছবি সংগ্রহ করে দিয়েছে। ফরিদুল, লাইব্রেরিয়ান বুলবুল সহ অসংখ্য ছাত্র ছাত্রী তথ্য প্রদান সহ যে সাহায্য সহযোগিতা করেছেন এরজন্য আমি তাদের বিশেষভাবে স্মরণ করছি। স্নেহের ছাত্র আতাউল, ইউসুফ ও সঞ্জয় পুস্তকটির কম্পিউটারকরণ, তথ্য প্রদান এবং প্রচ্ছদ পরিকল্পনায় সাহায্য করে পুস্তকটিকে সমৃদ্ধ করেছে। স্নেহের ছাত্র সবুর পুস্তকটি কম্পিউটারকরণে অসীম ধৈর্যের পরিচয় দিয়েছে, কৃতজ্ঞতা ছাড়া এ কাজের মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। ছাত্র গোলাম জিলানী (ফরিদ) পুস্তকটির প্রকাশের দায়িত্ব না নিলে এত দ্রুত এ পুস্তক প্রকাশ করা সম্ভব হত না। আমার কন্যা তাহশেকা রহমান, জামাতা আবুল বাশার চৌধুরী পুস্তকটির প্রকাশে সব সময় উদ্দীপনা দিয়ে আসছে। বৌমা আফরীনা (রেখা) তার সেবা দিয়ে আমাকে এ পুস্তক লেখার কাজে সাহায্য করেছে। আমার লেখা ‘রাজবাড়ির ইতিহাস ও ঐতিহ্য’ রচনার ক্ষেত্রে তথ্য সংগ্রহ ও তথ্য সন্নিবেশে আমি ইতিহাসের নিয়ম মেনে তা রচনা করার চেষ্টা করেছি। তা সত্বেও ভুলত্রুটি থাকতে পারে। যুক্তিপূর্ণ ঐতিহাসিক উপাদান ও তথ্য পেলে আগামী সংকলন আরো সমৃদ্ধ করার ইচ্ছা রইল। সবশেষে শোভন, আনতারা, নাতি (প্রজন্ম) সহ সকল পাঠককুলকে স্মরণে রেখে আমার প্রায় দশ বৎছরের নিরলস কর্মের এ স্মৃতি চিহ্নটি সকলের প্রতি নিবেদন করছি।

মতিয়র রহমান

বেড়াডাঙ্গা-১

রাজবাড়ি।

০২/০২/২০০০

Additional information